রাজকৃষ্ণ রায়ের কবিতা
*
অদর্শনে
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৮৭৬ সাল প্রকাশিত কবির "অবসর সরোজিনী" কাব্য থেকে নেওয়া।
(নির্বাচিত অংশ)

                       (১)
যদিও উভয়ে এবে আছি বহুদূরে,
.        জীবন-সঙ্গিনী!
কিন্তু আমাদের প্রেম, আমা দোঁহাকার
.        জীবন-বন্ধনী
.        পলকের তরে নহে দূরে,
.        দু'টি ফুল গাঁথা এক ডোরে
.                দিবস রজনী |
.        প্রেম কভু তফাতে থাকে না,
.        রবি সম ডুবিতে জানে না |


                       (২)
কি ঊষায়, কি দিবায়, কি সন্ধ্যায়, কি নিশায়,
.        কি নিদ্রায়, কিবা জাগরণে
.        তুমি শুধু জাগ মোর মনে |
.                ভাবনা আমার
.                ভাবে অনিবার
.                তোমারে, ললনে!
তুমি বই কিছু নাই অনন্ত ভূবনে |
.        আমি বটে আছি হেথা,
.        কিন্তু মোর প্রাণ কোথা?---
.                তোমার সদনে |


                       (৩)
.                যদিও ভানুর তনুখানি
লুকায় জলদ কালো,       তবু সেথা আছে আলো,
.                ওরে আলোময়ি!
.                        যদিও এখন
দূরে আছি দুইজনে,                  সমুখে আঁধার,
.                তবু তা'র মাঝে, প্রিয়তমে!
.                ভরপুর আলোক সঞ্চার ;
.                আছে কি আঁধার কভু প্রেমে?
.                        বিচ্ছেদে আঁধার!
দূরে আছি ;---এ বিচ্ছেদ বিচ্ছেদ তো নয়,
.        এ বিচ্ছেদ অবিচ্ছেদে প্রেম আলোময় |

.                     ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
শূণ্য কৌটা
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৮৭৬ সাল প্রকাশিত কবির "অবসর সরোজিনী" কাব্য থেকে নেওয়া।


                       (১)
একদা বিরক্ত হ'য়ে জন-কোলাহলে
.                চলিলাম শান্তি-লাভে বিজন কাননে ;
নিবিড় পাদপশ্রেণী,             দৃষ্টি নাহি চলে ;
.                বসিলাম স্থির হ'য়ে চিন্তাময় মনে |
ব'সে আছি ; অকস্মাৎ         করিলাম দৃষ্টিপাত
.                পিছনে---অনতিদূরে পড়িল নয়নে
.                একটি সুচারু কৌটা বিজন কাননে |


                       (২)
নিরজন বনে কৌটা! বিচিত্র ব্যাপার!
.        কুতূহলী হ'য়ে সে'টি কুড়ায়ে নিলাম |
খুলিলাম তাড়াতাড়ি, ভিতরে তাহার
কি আছে, দেখিতে আশা, শেষে দেখিলাম
কিছু নাই---শূণ্যময় ;               কিন্তু হেন বোধ হয়,
আছিল রতন তা'য়, দেখি' জানিলাম,
যেহেতু রতন-চিহ্ন লক্ষ্য করিলাম |


                       (৩)
নারকী কলুষী চোরে করিয়া হরণ
.        এ কৌটারে, আনি' এই অটবী মাঝার,
আত্মসাৎ করিয়াছে কৌটার রতন,
.        খালি কৌটা ফেলে গেছে আঁটিয়া আবার |

বিবিধ রঞ্জনে আঁকা কৌটা এবে ধুলিমাখা,
.        রতন হারায়ে যেন মলিন-আকার ;
.        বাসী ফুল্ল ফুল যথা পল্লব মাঝার |


                       (৪)
নিরখি' কৌটায়, মনে হইল উদয়
.        ভারতভূমির দশা, দুখের কাহিনী |---
স্বাধীনতা-রত্ন-হারা                 এবে শূণ্যময়---
.        ভারত এ কৌটা সহ অদৃষ্টভাগিনী!
চিত হ'ল ব্যাকুলিত,               নানা চিন্তা সমুদিত
.        হইল মানসে ; হায়, দুখের কাহিনী!---
.        ভারত এ কৌটা সহ অদৃষ্টভাগিনী!

.                     ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
জানি আমি, কেন গেল ভারতের সিংহাসন
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" গীত সংকলন থেকে
নেওয়া।

॥ সাহানা - ধামাল॥

জানি আমি, কেন গেল ভারতের সিংহাসন,
জানি আমি, ভারতের বুকে কেন হুতাশন ||
কেন যে ভারত হেন, এ ঘোর কুদিন কেন,
তাও জানি, আরও জানি, যা না জানে অন্যজন |
কিন্তু কী দুঃখের কথা, জানি না কেন একতা,
.        ভারতবাসীর নাই, একী বিধি-বিড়ম্বন---
হায়, কত দিন আর, রসাস্বাদ একতার,
.        লবে না এ মূর্খ জাতি, ধৈরজে ধরিয়া মন ||

.                     ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
ভারতীয় আর্যনাম এখনো ধরায়
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" গীত সংকলন থেকে
নেওয়া।

॥ ঝিঁঝিট - আড়াঠেকা॥

.        ভারতীয় আর্যনাম এখনো ধরায় |
.        আর্যের শোণিত আজও আছে কি শিরায় ||
তা, যদি থাকিত তবে,            এ দশা কেন রে হবে,
.        কেন বা ভাসিতে হবে নয়ন ধারায় |
আর্যনামে পরিচয়,                দিবার এ কাল নয়,
.        অনার্য অধম এবে ভারতবাসী ---
আর্যত্ব যাহাতে রবে,              ভারতে নাহি তা এবে,
.        মুখে আর্যনাম ভাণে গৌরব কোথায় ||

.                     ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কোথা সে অযোধ্যাপুর, মথুরা এখন
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" গীত সংকলন থেকে
নেওয়া।

॥ বাগেশ্রী - আড়াঠেকা॥
('কোথায় আনিলে আমায়' - সুর)

কোথা সে অযোধ্যাপুর, মথুরা এখন,
কোথা সেই কুরুক্ষেত্র-সমর-প্রাঙ্গন |
কোথা সেই বীরত্বলীলা, কোথা সে অসির খেলা,
.        কোথা সেই হুহুংকার হৃদয়কম্পন |
কোথা সেই ধনুর্বাণ,   কোথা বীর-কণ্ঠগান,
কোদণ্ড টংকার ঘোর এবে রে কোথায় ---
বীরমাতা হয়ে তুমি, হইলে অবীর ভূমি,
ভারত রে, ভাগ্যে তোর বিধি বিড়ম্বন ||

.             ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
কলকণ্ঠময়ী গঙ্গে, এখনো সাগরপানে
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" গীত সংকলন থেকে
নেওয়া।

॥ পরজখাম্বাজ - মধ্যমান॥

.        কলকণ্ঠময়ী গঙ্গে, এখনো সাগরপানে
.        কোন মুখে ঢলি, চলেছ মৃদুল তানে
পূর্বে তুমি দিবানিশি,          কনক-কণিকারাশি,
.        প্রবাহে ভরিয়া তব, ধাইতে মধুর গানে |
এবে এ ভারত আর           কই স্বর্ণ-কাণভার,
.        রাশি রাশি পঙ্ক, সতি, ভারত ভরিয়া ---
এ পঙ্ক লইয়া মিছে,            কেন যাও সিন্ধু কাছে,

.                     ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
জগৎ দেখো রে চেয়ে, যাচ্ছে বেয়ে, সোনার তরণি
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" গীত সংকলন থেকে
নেওয়া।

॥ বিভাস - একতালা॥

জগৎ দেখো রে চেয়ে, যাচ্ছে বেয়ে, সোনার তরণি
তরির উপর, শ্যাম-কলেবর রামরঘুমণি ||
যিনি ভবের জলে, অবহেলে করেন জীবে পার,
আজকে তাঁরে, নিচ্ছি পারে, হয়ে কর্ণধার,
পাড়ের কড়ি, ধরে নিব চরণ দুখানি ||

.                     ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
প্রেম যদি সই শিখতে হয়
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" গীত সংকলন থেকে
নেওয়া।

॥ গৌরী - দাদরা॥

প্রেম যদি সই শিখতে হয়,
মানুষের কাছে নয় ||
সাঁঝের রবি, প্রেমের ছবি,
প্রেমের আলো আকাশময় ||
ওই রবি সই প্রেমের খেলা,
খেলছে কেমন সাঁঝের বেলা,
আধেক আঁধার, আধেক আলো,
কমলবালা চেয়ে রয় ---
দূরে দুজন, তবুও কেমন,
প্রাণে প্রেমের তুফান বয় ||

.          ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
নগর চেয়ে কানন ভালো
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" গীত সংকলন থেকে
নেওয়া।

॥ সাহানা - যৎ॥

.        নগর চেয়ে কানন ভালো,
.        নাইকো হেথা কোলাহল |
ভক্তি ভরে মধুর স্বরে, মন রে আমার হরি বলো ||
প্রতিধ্বনি গভীর সুরে, বলবে হরি দূরে ঘুরে,
.        বনের পাখি বলবে হরি,
.        দুলবে প্রেমে কুসুম-দলে ||

.                     ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর
*
দেখো লো সজনি, চাঁদনি রজনি
কবি রাজকৃষ্ণ রায়
১৯০৫ সালে প্রকাশিত দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত "বাঙ্গালীর গান" গীত সংকলন থেকে
নেওয়া।

॥ বেহাগ - একতালা॥

দেখো লো সজনি, চাঁদনি রজনি,
সমুজল যমুনা গাওত গান |
কানন কানন, করত সমীরণ,
কুসুমে কুসুমে চুম্বন দান |
কাহে লো যমুনা, জোছন ঢলঢল,
সুহাস সুনীল বারি |
আজু তেঁহারই, উজল সলিল পর,
নয়ন সলিল দিব ডারি |
কাহে সমীরণ, লুটই কুসুম বন,
অলসি পড়সি যমুনায় |
তোঁহার চম্পক, বাসিত লহরে,
.        মিশাব নিশান বায় |
জনম গোঁয়ানু, রোয়ত রোয়ত,
হামকো কোইত সাধল না |
সকল তয়াগনু, যো ধন আশে,
সো বি তয়াগল মোয় ;
আপন ছোড়ি সব, আপন করনু রোয়,
সো বি সজনি পর হোয় |
যমুনে হাম, হাসলো হরষে,
হাম তর রোয়বে কে,
তোহারি সুহাসিত, নীল সলিল পরি,
.        রাধা সপদে দে ||

.            ****************                     
.                                                                                
সূচীতে . . .   


মিলনসাগর