কবি রূপক ঘোষের কবিতা
*
মোদের গাঁয়ে
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ১৩ই বৈশাখ, ১৪২৭

ওই যে হোথা তালের সারি,
ওই খানেতে মোদের বাড়ি।
বাড়ির পিছে গহীন বন,
ঝিঁ-ঝিঁ ডাকে সারাক্ষণ॥

ওই তো ভোরে সুয্যি মামা,
চোখ রাঙিয়ে দিচ্ছে হানা।
রাঙা চোখে বলছে যেন,
তাড়াতাড়ি কাজটি সারো॥

সকাল হতেই সালেম চাচা,
মাথায় নিয়ে সবজি ঝাঁকা।
মেঠো পথের আলটি ধরে,
হাটের পানে যাত্রা করে॥

মোদের গাঁয়ের মায়ে-ঝিয়ে,
ঘরের কাজে বাইরে নামে।
ঝাঁট দিয়ে ওই উঠান গুলো,
লেপচে গোবর দাওয়া গুলোয়॥

দাওয়ায় বসে বাচ্চা গুলো,
সুর করে ওই পড়ছে শোনো।
পড়াশুনা সাঙ্গ  হলে ,
দিঘির জলে নাইতে নামে॥

থুড়থুড়ে ওই মিন্তি পিসি,
বাড়ি বাড়ি দিচ্ছে উঁকি।
মিন্তি পিসির কাজ কি জানো,
ঘরের খবর বাইরে আনো॥

বিকেল হলেই খেলার মাঠে,
ছেলে-পুলে খেলতে ছোটে।
একটু পরেই সন্ধে হলে ,
বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে॥

তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বেলে,
গাঁয়ের বধূ প্রণাম করে।
ঝুপ করে ওই আঁধার নামে,
গাঁ-টি মোদের ঘুমিয়ে পড়ে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পালোয়ান
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ১৩ই বৈশাখ, ১৪২৭

লাঠি হাতে দারোয়ান,
নাম তার পালোয়ান।
মোচ খানা তা দিয়ে,
সুর তোলে গান গেয়ে॥

সুর তো নয় যে এতো,
ভাগে সব পাখি যতো।
তবুও থামে না গান,
পালোয়ান ধরে তান॥

দেখা যদি পেতে চাও,
পায়ে হেঁটে এসে যাও।
খুব বেশি নয় দূর,
বাড়ি থেকে ডোমজুর॥

উত্তরে মুখ করে,
যেই তুমি হাঁটবে।
চার মাথা মোড়ে এসে,
পথ খানা মিশবে॥

ঘুরপাক খেতে খেতে,
যেই তুমি থামবে।
রোজকার মতো গান,
শুনতে যে পারবে॥

চোখ মেলে দেখো ওই,
তিন তলা বাড়িটা।
বাগানেতে বসে আছে,
উড়ে ওই মালিটা॥

উড়ে মালি সব জানে,
কোথা থাকে পালোয়ান।
এক খাটে শুয়ে থাকে,
গায়ে দিয়ে আলোয়ান॥

পালোয়ান কোথা থাকে,
কর যদি আরজি।
বলবে না উড়ে মালি,
এটা ওর মরজি॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দেব দর্শন
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ১৬ই বৈশাখ, ১৪২৭
কবি এই কবিতাটি সকল স্বাস্থ্য কর্মী, নার্স, ডাক্তার ও পুলিশ কর্মীদের উৎসর্গ করেছেন।
যাঁরা কোভিড১৯ এ মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করেছেন।

শিশু মনে ছিল সাধ,
দেব - দেবী দেখবো।
কোথা থাকে কি করে,
সব কিছু জানবো॥

মা কে বলি দেব - দেবী,
থাকে কোনখানেতে?
মা বলে দেব - দেবী,
থাকে দেবালয়ে তে॥

দেবালয়ে গেছি আমি,
দেব - দেবী দেখতে।
কথা কেউ কয় নাকো,
পারিনি তাই জানতে॥

মা কে বলি দেব - দেবী,
কথা কেউ বলে না।
মা বলে দূর বোকা,
দেব কথা বলে না॥

আমি বলি তুমি বলো,
আমি চাই শুনতে।
দেব - দেবী কি  করে,
চাই আমি জানতে॥

মা বলে দেব  চায়,
মঙ্গল আমাদের।
আঁধার ঘুচে গিয়ে,
শুভ হোক সমাজের॥

বড় হয়ে বুঝলাম,
মা ঠিক বলে নি।
মানুষের বিপদেতে,
দেখা তার মেলে নি॥

দেখেছি দেবতা আমি,
মিছে কথা বলি নি।
নীরবে করেছি প্রণাম,
মুখে কথা বলি নি॥

দেখনি বিশ্ব জুড়ে,
কতো লোক মরছে।
জীবন কে বাজি রেখে,
কারা সেবা করছে॥

নার্স থেকে ডাক্তার,
সেনা থেকে সেনানী।
এরাই যে দেব - দেবী,
চিনতে কি পারো নি॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সাধ
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ১৭ই বৈশাখ, ১৪২৭

কু ঝিক-ঝিক রেল গাড়ি,
যাব চড়ে মামার বাড়ি।
মামার বাড়ি অনেক দূর,
যেতে হবে ভরতপুর॥

মামার বাড়ি হরেক মজা,
খেতে দেবে খাস্তা গজা।
পুজোয় পাব লম্বা ছুটি,
অনেক মজা নেব লুটি॥

সেথায় আছে মোহন মামা,
কিনে দেবে নূতন জামা।
পড়াশুনার নেই কো চাপ,
আনন্দের ও নেই তো মাপ॥

মরজি মাফিক ঘুরতে যাব,
এটা - ওটা খেতে পাব।
শাসন করার নেই তো কেউ,
লাগবে না তাই পিছে ফেউ॥

এটা আমার মনের আশা,
নয় তো এটা সর্বনাশা।
আশ পূরণ হবেই হবে
জানিনা ওদিন আসবে কবে॥

কবি শিশু মনের কল্পনা কে ধরার প্রয়াস করেছেন এই ছড়াটিতে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পয়লা মে
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ১৮ই বৈশাখ, ১৪২৭

পয়লা মে পালছি মোরা,
মে দিবসের নাম করে।
কেউ বা মানে পয়লা মে,
শ্রমিক দিবস নাম ধরে॥

যে যা নামেই ডাকছে ডাকুক,
নামেতে কি যায় আসে।
পয়লা মে সেই মহান দিবস,
অধিকারের নাগপাশে॥

আমরা স্মরি লাখো শ্রমিকের,
পথ চলা ওই মিছিলের।
পতাকা তলে দাঁড়িয়ে যারা,
ডাক দিয়েছিল সংগ্রামের॥

শ্রমিক ভাইয়ের আত্মত্যাগ,
হয় নি ব্যর্থ তাই তো আজ।
শোষণ থেকে মুক্তি পেতে,
ওই তো আওয়াজ উঠছে আজ॥

পয়লা মে নয় যে শুধু,
নিছক একটা ছুটির দিন।
জড়িয়ে আছে অনেক স্মৃতি,
লড়াই ছিল আপোষহীন॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চোর
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ২১শে বৈশাখ, ১৪২৭

শুয়েছিনু ছোট মেয়ের সাথে এক খাটে,
কটাই বা বাজে? দ্বিপ্রহর বটে।
হঠাৎ উঠলো রব মোর আশেপাশে,
চোর-চোর ওই পালিয়ে যাচ্ছে ছুটে॥

চট করে নেমে আসি মোরা খাট থেকে,
হঠাৎ আওয়াজ এলো বার ঘর থেকে।
চকিতে দৃষ্টি গেল বার ঘর দিকে,
দাঁড়ায়ে আছে যে কেউ মুখখানি ঢেকে॥

কাছেতে এসে দেখি এ তো এক মেয়ে,
হরিণীর মতো কাঁপে থরথর করে।
আমি কহি কেন তুমি ঢুকেছ মোর ঘরে
কেঁদে উঠে মেয়েটি বলে লুকোবার তরে॥

আমি কহি বলো তুমি কি করেছে চুরি?
বিশ্বাস করো বাবু করি নাই চুরি।
আমি কহি হাতে তবে ধরা আছে কি?
কৌটো দেখায়ে বলে, গয়লানী দিয়েছে মুড়ি॥

খেতে দিতে পারি নাই দুধের বাছারে,
মেগেছি ভিক্ষা আমি প্রতি দ্বারে - দ্বারে।
পাড়ার ওই লোকগুলি ভুল বুঝে মোরে,
চোর - চোর চিৎকারে হাঁক ডাক পাড়ে॥

মেয়েটির মুখখানি দেখে মায়া হলো,
ছোট মেয়েকে বলি ওকে খেতে দিতে বলো।
বলি আমি ওগো মেয়ে খাবে দুটি চলো,
বিস্ময়ে আঁখি তার করে ছলোছলো॥

আমি কহি, আছি পাশে চুপ করে বসো,
অন্যায় করো নি তো, ভয় কেন অতো।
দরজা খুলিতে দেখি লোকজন যতো,
চোর কে দেখার তরে উৎসাহ ততো॥

গম্ভীর ভাবে কহি, কার গেছে চুরি?
বলিতে না পারো যদি এখনি যাও চলি।
দেখেছি মমতাময়ী জননীর ছবি,
কোনো মতে দেবো নাকো তোমা হাতে তুলি॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কিপটে বুড়ো
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ২২শে বৈশাখ, ১৪২৭

ময়রা পাড়ার নবীন খুড়ো,
সবাই ডাকে কিপটে বুড়ো।
চাইলে চাঁদা পুজোর নামে,
চোখের জলে বন্যা নামে।
এইতো সেদিন হারাণ কাকা ,
চাইতে গেল দশটি টাকা।
মুখের  'পরে না টি করে,
দরজা দিল বন্ধ করে।
জমি-জমা, পুকুর-বাড়ি,
আছে সবই কাঁড়ি-কাঁড়ি।
টাকার পাহাড় গড়ে তুলে,
গরীব কে আজ গেছে ভুলে।
হঠাৎ সেবার বন্যা এল,
খাবার রসদ ফুরিয়ে গেল।
খাবার আশায় মানুষগুলো,
খুড়োর বাড়ি ধরনা দিল।
কিপটে বুড়োর কি যে হল,
চাল-ডাল সব বিলিয়ে দিল।
লাগলে টাকা পাবে জেনো,
অনাহারে মারা যায় না যেন।
কিন্তু বলি পুজোর নামে,
কাটবে না বিল আমার নামে।
বুঝিয়ে দিল নবীন খুড়ো,
নয় সে মোটেই কিপটে বুড়ো।
সেদিন থেকে গ্রামের লোকে,
খুড়োর নামে প্রণাম ঠোকে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বপ্ন
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৭
কবি এই কবিতাটি সেই সকল মায়েদের উৎসর্গ করেছেন, যাঁরা অনেক আশা নিয়ে এবং
কষ্ট করে ছেলে-মেয়েদের বড় করার স্বপ্ন দেখেন।

খোকা যে তার মানুষ হবে সাধটি ছিল মনে,
তাইতো মা তার পড়িয়েছিল কষ্ট হবেও জেনে।
না থাক বাবা চিন্তা কি তার মা যে আছে পাশে,
স্নেহের পরশ রাখছে মা তাই খোকার মাথার পাশে॥

ধীরে ধীরে বাড়ছে খোকা ভালো রেজাল্ট করে,
তাই না দেখে মায়ের মনে অনেক আশা ধরে।
নাই বা খেলো দু-বেলা মা কি যায় আসে তাতে,
যে ভাবে হোক খোকার যেন খাবার পড়ে পাতে॥

মা ভাবছে খোকা যখন মস্ত বড়ো হবে,
থাকবে না আর দুঃখ তাদের আনন্দেতে রবে।
মায়ের আশা সত্যি করে গেলো  খোকা বিদেশ,
গুনছে দিন খোকা তার ফিরবে কবে স্বদেশ॥

মাসে মাসে আসছে চিঠি পড়তে লাগে বেশ,
ধীরে ধীরে কমে এলো রইলো না আর রেশ।
হঠাৎ করে বললো খোকা করছে যে সে বিয়ে,
চিন্তা যেন না করে মা, আসবে তাকে নিয়ে॥

মা ভাবে ওই এলো বুঝি খোকা মাকে নিতে,
স্বপ্ন যে তার মিথ্যে হলো আসলো না আর নিতে।
কাঁড়ি কাঁড়ি পাঠায় টাকা খোকা মায়ের কাছে,
খোকার টাকার মায়ের কাছে সত্যি কি দাম আছে॥

খোকা এখন ব্যস্ত বড়ো সময় হাতে নেই,
মায়ের অসুখ জেনেও খোকার আসার ইচ্ছা নেই।
মা লেখে ওরে খোকা আয় রে ফিরে তুই,
মরার আগে একটিবারের জন্য তোকে  ছুঁই॥

চিঠি খানি লেখা আর হলো না তো শেষ,
শেষবার খোকা ডেকে  হলো  নিঃশেষ।
খোকা চায় যে ভাবে হোক আরো বড়ো হতে,
তাইতো খোকা পাড়ি জমায়
দেশে-বিদেশেতে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বরষা
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ২৬শে বৈশাখ, ১৪২৭

তপনের তেজে দেখ,মাঠ-ঘাট চৌচির,
পুকুরেতে জল নেই, নদী বহে ঝিরঝির।
চাষী ওই চেয়ে আছে, আকাশেতে করে মুখ,
বরষা নামবে কবে,হয়ে আছে উন্মুখ॥

তপনের তেজে জীব,পড়েছে যে হাঁফিয়ে,
বরষার দেখা নেই, আছে তাই ঝিমিয়ে।
পথ-ঘাট শুনশান, পথিকের দেখা নেই,
ঝরে গেছে পাতা সব, কিশলয়ের দেখা নেই॥

ঝুপ করে কালো মেঘে,ঢেকে গেল নীল আকাশ,
বরষা নামবে বুঝি, মনে জাগে বড় আশ।
মেঘ ডাকে গুরু গুরু, সাথে বুঝি পড়ে বাজ,
বাড়ি বাড়ি শাঁখ বাজে, না যেন পড়ে আজ॥

টুপ্ টাপ্ ঝরে পড়ে, মুক্তোর ফোঁটা যেই,
তান ধরে ভেক সব,পুকুরের ধারে ওই।
তারপরে  ঝম্ ঝম্ বরষা যেই নামলো,
থামার আর নাম নেই, একটানা চললো॥

খাল-বিল থৈ-থৈ, মাঠে- ঘাটে হাঁটু জল,
পুকুরেতে ঝাঁপ মারে, দামাল ছেলের দল।
হাল নিয়ে মাঠে নামে, চাষী চাষ করতে,
ডিঙি খানি নিয়ে জেলে,যায় মাছ ধরতে॥

জল পেয়ে প্রকৃতির, প্রাণে ঢেউ লাগলো,
তাই বুঝি ডালে ডালে, কুঁড়ি ভরে আসলো।
প্রকৃতি ভরে ওঠে, নানা ফুলের সুবাসে,
ভাটিয়ালি সুর ওই, ভেসে আসে বাতাসে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অভাগিনী
কবি রূপক ঘোষ
রচনাকাল ২৭শে বৈশাখ, ১৪২৭

পরনে মলিন বেশে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে,
মাগিছে ভিক্ষা আজ,জঠরের জ্বালাতে।
কত লোক যায় আসে,তাকে পাশ কাটিয়ে,
ভাত দুটি খেতে চায়,শুধু খিদে মেটাতে॥

কেউ দেয় বাসি রুটি,কেউ দেয় শুধু ভাত,
তাই খায় গোগ্রাসে,পেটে খিদে নাহি লাজ।
দোরে দোরে ঘোরে সে,ভাঙা থালা নিয়ে সাথ,
ভিক্ষা মেলেনি তার,সারাদিন ঘুরে আজ॥

একদিন সবি ছিল,ছিল ভরা সংসার,
বিধাতা কেড়ে নিল,চোখ দুটি দামী তার।
তারপর কি যে হল,সংসার ছারখার,
স্বামী ছেড়ে চলে গেল,খোঁজ নেই আজ তার॥

অবসরে মনে পড়ে,সোনালি সে সব দিন,
কোথা দিয়ে কেটে গেল,এল আজ দুর্দিন।
চোখেতে অশ্রু নামে,বুক করে চিনচিন,
অভাগিনী কবে পাবে,ফেলে আসা সেই দিন॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর