আমার বাবা কবি শম্ভু রক্ষিত ১৯৯৩ সালে সাহিত্য অকাদেমি থেকে প্রকাশিত, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, “বাংলা কবিতা সমুচ্চয় ১৯৪১-১৯৮৫ ২য়খণ্ড”-এর কবিতা, ২৬৭-পৃষ্ঠা।
আমার বাবা জীবন্ত ডিজাইন এঁকে . আর তাই দেখে ছাপ তৈরি করে . নতুন রেশমি রুমাল তৈরি করত।
আমার বাবা রেশমি রুমাল তৈরির সময় . তারের সংশীতযন্ত্রে যেন আলাপ করত . .এবং সেহেতু ক্লান্ত হলে তা প্রকাশ করতে . খুব লজ্জা পেত।
আমার বাবা, যিনি রেশমি রুমালের স্রষ্টা . মানুষকে জাগতিক সম্পদ দিতে পারেন, ভাবত প্রতিটি প্রাকৃতিক ঘটনাকে নিজের চৈতন্যের মধ্যে . গ্রহণ করে, শেষে . স্থায়ী স্বতন্ত্র সংজ্ঞা দিতেও চেষ্টা করত।
আমার বাবার ছেলেরা, একেকজন দৈত্যের মতো . ও একজন ঐতিহ্যবোদ্ধা বাস্তবিক আমরা, বাবার দেহহীন আবেগ . ও সৌখিন বন্ধুও নয় . ভাঁড়ার ঘরে খোঁজা শৌণ্ড শয়তান।
আমার ধারণা, যখন মানুষেরা ছিল না, তখন বাবা ছিল আর ছিল পৃথিবীতে বন, সাপ, জল-কচ্ছপ সেই দিনগুলি থেকেই আমার বাবা অমর হবার . প্রথাটা শুরু করেছিল।
আমার বাবার কথাবার্তা থেকে বোঝা যায় : . ঘোড়া, অশ্বতর কুকুর বাবারই উপচয় অর্থাৎ যারা, এখন অদ্ভুত একঘেয়ে আওয়াজ বের করে আমাদের উত্থ করে বায়েন করে তুলতে পারে।
আমার বাবার শস্য আর উদ্যান সম্বন্ধেও সমস্ত কথা সত্যি আমি স্বপ্নেও ভাবিনি, এই বন্য পাথুরে গিরিনিতম্বগুলোকে . আমার বাবা এমন রমণীয় স্থান করে তুলবে।
আমার বাবা থুড়থুড়ে বুড়ো-বুড়ীদের মতোই রোগা . আর শিরা বার করা . . . আমার বাবার গালদুটি তোবড়ানে।
ঐ তো, টিনের বাক্স করে রেশমি রুমাল . বয়ে নিয়ে আসছে আমার বাবা এবং মদের দেবতা ও শস্যের দেবীকে . নতুন রেশমি রুমাল বিক্রী করছে ও আমার বাবা রেশমি রুমালে পরিদৃশ্যমান হয়ে . দর্শকদের সসম্মান অভিবাদন জানাচ্ছে।
আজও যাদের কাছে আমার বাবার তৈরি রেশমি রুমাল নেই যাদের উপাধি যুষ্ট এর মত্তখিয় আর যাদের রেশমি রুমাল কেনার কোনো চেষ্টাও নেই তাদের জন্য আমার বাবার কোনো স্বেচ্ছাচারিতাও নেই।
সজ্জনগণ, কমার বাবা কখনও জেলে, কখনও শোধনাগারে . আমার মতো জীবনও কাটাননি!
পিটিশন কবি শম্ভু রক্ষিত ১৯৯১ সালে প্রকাশিত, উত্তম দাশ ও মৃত্যুঞ্জয় সেন সম্পাদিত, “আধুনিক প্রজন্মের কবিতা” সংকলন, ২৮৭-পৃষ্ঠা।
জুট কমিশনার, আমি আমার ভার্যা ও নম্র সহচরীকে ঘাগরাবিহীন . চাষ ও মেয়োপাখিদের শহরে ছেড়ে এসেছি।
আমার কুব্জ শিরদাঁড়া ওয়াস্তা করে তাই আম্বা পেয়েছে, . আমার কুকুরটা গচ্ছিত হয়েছে তাই অন্য ঘরে--- কচ্ছপী আর কাঁকড়াদের অবয়বের কাঠিন্যের সঙ্গে . আমার ভাষার শব্দের কেমন তাই মিল দেখে ফেলেছি
আর তাই 'তিব্বতী রেশমবল আমাকে কৌতুক-সংকেত, ফটোগ্রাফ পাঠাচ্ছে আমার উচ্ছল হৃদয় তাই বৈজয়ন্ত নির্মাণ করেছে নিযুত বায়স আমার বংশানুচরিত তাই রচনা করতে বসেছে
বেথুয়াডহরির মাঠে তামাকের নল চিবিয়ে চিবিয়ে . তাই আমার স্তোত্রপাঠও শেষ হল
. তবে আমি বাচাল, সত্য ও পরমেশ্বর বিষয়ে অজ্ঞ। . হাড়িয়ারার উপকণ্ঠ থেকে সবার আগে ফিরেছি। শরণার্থী . সহায়তা করার, না আমার উপায় নেই।
জুট কমিশনার, আমার একটা বাহুও তো ভাঙ্গা। ঠাট হয়ে . সাম্মে বসে আমি তাই আমার প্রিয় চর্চারি বাজাতে চেয়েছি আমি কোনদিন কাউকে সামাজিকতা জানাতে যাইনি, আছি আমার অনঘ মোহিনীকে . হৃদয়ের বহর দেখিয়ে কান্নার প্রসূন ফলাতে চেয়েছি ; . বড় বড় কথাবিন্যাস জাহির করে কাবিতা লিখতে চাইনি।
বাস্তবিক, যারা আমার সহচর, তাদের আমি . তাই কোনাদিন সাফল্য দেখাতে পারিনি।
বিভ্রাট : ককাইচণ্ডী, শীতলার চুল আমার জন্য পুনরায় আরক্ষিক রেখেছে।
আমাদের প্রেম কবি শম্ভু রক্ষিত ২০০৭ সালে প্রকাশিত, নিতাই জানা সম্পাদিত, “পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতা” সংকলন, ৮৫-পৃষ্ঠা।
আমাদের নতুন বাড়ির দিকে আসার পথে পাশাপাশি তুমি তিনটে সিনেমা হাউস দেখতে পাবে, যেখানে হিন্দী আর নোংরা ছবি সব শোতেই দেখানো হচ্ছে॥ সিনেমা হাউসের নামগুলোও বিশ্রী, নোংরা এবং দীর্ঘ উদীরিত। আর তারপরই হোটেল, চায়ের দোকান, মনিহারীর দোকান ইতাদির ভিড়। অতঃপর মুখোশ ও পরচুলোর একটা দোকান, তার পাশে পশ্চিমী মজুরদের একটা খানাঘর, পেঁয়াজিভাজার দোকান, মুদিখানা--- এসবের পাশ দিয়ে ডাকবাংলোর গেট, গেটের পাশে আবার খানকতক বিচিত্র দোকান পশরা, তারপর পেট্রোল পাম্প, দুর্লভ কেবিন, সোডাওয়াটারের স্টল এবং সেই ঘরেই মুদিখানা দোকান, অতঃপর খানকতক হুমড়ি খাওয়া চালার পিছন দিক এবং একটা মিষ্টির দোকান, গোকুল মিত্তিরের ডাক্তারখানা, তারপর একটা ভাঙ্গা কাঠের দোতলা, ওপরে নর্থপোল ল্যাবোরেটরি, নীচে দি ওরিয়েন্ট প্রেস ও হোটেল, তারপর ফাঁকা, রেলের গুদাম আর তারপরেই আমাদের নতুন বাড়ি ‘মহাপৃথিবী’। তুমি যেদিন আমাদের নতুন বাড়িতে আসবে, সেদিন এই রাস্তার দুই দিকে একবার না একবার চোখ ফেরাতে হবেই হবে তোমাকে। অবশ্যি, এই রাস্তা, বড় রাস্তা ধরে যেতে যেতে রাস্তার বড় রাস্তার দুই দিকে আমার এক-একদিন চোখ পড়ে, আবার এক-একদিন পড়ে না। আমি তখন নিঃস্ব রিক্ত শুকনো মাঠ দেখার কথা ভাবি, পাহাড়ী নদী, ধানগাছের ডাঁটা দেখার কথা, তোমার কথা, অথবা আঙ্গুলের নখগুলোকে দাঁত দিয়ে কেটে কেটে তোমার ফিতের মত সরু করে ফেলি আমি। কিংবা সেই শিলাবৃষ্টির সময় সেই ছোট্ট বাগানটিতে ( যেখানে আমাদের প্রণয়ের প্রথম সুত্রপাত হয়েছিল ) যেখানে মানুষ নেই, রণহুঙ্কার নেই, দ্বেষ নেই, ষড়যন্ত্র নেই, নেই বৈরিতা, নিষ্টুরতা--- সেখানে তোমাকে নিয়ে গিয়ে ঘর বাঁধবার কথা ভাবি। আবার মাঝে মাঝে আমার স্বার্থপর-মামার সেই অশিক্ষিত কথাও আমার মনে পড়ে যায়, ‘তোমাদের কি আর তেমন বয়েস হয়েছে, তোমাদের আবার প্রেম কি?’ অতএব বেশ কিছুদিন ধরে অপেক্ষা করতে হবেই তোমাকে। যেমন, অপেক্ষা করছে আমাদের নতুন বাড়ির দিকে আসার পথে রাস্তার দুই দিক, যেমন, অপেক্ষা করছি আমি, অপেক্ষা করছে আমাদের প্রেম। বিশেষ করে এই ততদিন, অন্তত দশ বছর, যখন আমরা সাবালক, অবিশ্যি, ইতিমধ্যে আর কোন দুর্বিপাক যদি না ঘটে। তাছাড়া তুমি তো জানো, তোমার অপেক্ষার শেষ লক্ষ্য কে? তোমার আমার জন্যেই তো মৃত্যুর সৃষ্টি হয়েছিল।
ব্যতীপাত কবি শম্ভু রক্ষিত ২০০৭ সালে প্রকাশিত, নিতাই জানা সম্পাদিত, “পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতা” সংকলন, ৮৫- পৃষ্ঠা।
আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি তিন টাইপিস্ট আর পাঁচ টাইপরাইটার কীবোর্ডের আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আন্তর্জাতিক বৈঠক আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি পাভেল ঝিয়েলিয়েজনোভের ভূগর্ভস্থ রেলগাড়িবই আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি আমার বিরিঞ্চিবেড়িয়ার বাড়ি এক আজব জায়গায় আমার বাড়ির কর্ত্রী ছেলে মেয়ে নিয়ে নাতি চলাফেরা করছে কবেকার সেই ইস্যু করা . প্রাচীন দিনের টাইমটেবিল অনুযায়ী--- উলার মুস্তোফীবংশ আমার বাড়ির পাশের খালের হাঁটুসমান কাদার মধ্যে আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি এসটারেলিনা থেকে প্লেনে চড়ে
. সমুদ্রসৈকতের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছি আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি, একটি ধ্যানী বুদধমূর্তি, . একটি ব্রাহ্মণ্য-হিন্দু-দেবমূর্তি, দুটি মূর্তিই প্রায় আঠাশফুট উচ্চতার আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি, আমি নূলি সেকেণ্ডাস অর্থাৎ এয়ারশিপজাতীয় কিছু একটা তৈরি করতে শুরু করেছি। আমার হার্লেকুইন টুপির নিচে আমার মুখটাকে দেখাচ্ছে কোণা খোঁচায় ভরা আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি আমি এক বিরাট উঁচু দেওয়াল যাতে লেপে দেওয়া আলোর পোঁচ ও একটি রেশমি ড্রেসিং গাউন ৬টি রেশম শর্টি, ২টি ডোরা কাটা ও একটি শাদা শার্ট ও তিনটি ডিনার জ্যাকেট আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি, আমি ঠাণ্ডা বর্ষা ও করকাপাতের . আমি নোংরা কাদা পাঁকের সমুদ্রের---
আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি পঞ্চকোটের রাজা জটালেগরুড় . আমাকে অমৃতরস পান করাচ্ছে ( জটালেগরুড় বিরাট দীর্ঘপ্রস্থ পুরুষ, খুব বেশী কথা বলতেন না, কিন্তু সদা হাস্যময় ) আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি কাগজের মত হালকা অথচ ইস্পাতের চেয়ে শক্ত পদার্থের ছাউনি দিয়ে সমাপ্ত করেছি একটি ঘুপসি ক্ষুদে শহর আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি আমার বাবা সরোদে গদগদ হয়ে রাধাবল্লভকে বাজিয়ে শোনাচ্ছে বাগেশ্রীরাগ ( বৃহস্পতিরার ২১ মার্চ ১৯৮৫ অপরাহ্ন ২-১৫ এ আমার পিতার পরলোকপ্রাপ্তি ঘটে ) আমি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে দেখি লিঙ্কন মেমোরিয়ালের পাশ ঘেঁষে পথ হাঁটছি
বঙ্গদেশে টুপি কবি শম্ভু রক্ষিত ২০০৭ সালে প্রকাশিত, নিতাই জানা সম্পাদিত, “পোস্টমডার্ন বাংলা কবিতা”, ৮৫-পৃষ্ঠা।
বিশ শতকের গোড়ায় অজঅ বঙ্গালে টুপির সংস্কার ও টুপির প্রসারসংক্রান্ত ৪৮০ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট বিখ্যাত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র উদ্ভবের সময় রিপোর্টের সবকটি পৃষ্ঠা ব্রিটিশ শক্তির হাতে চলে যায়। আমি বিধিসম্মতভাবে রিপোর্টটি উদ্ধার করে এনেছি আজ। বঙ্গদেশ টুপিপ্রদর্শক দেশ। এইদেশে সর্বাধিক বিক্রিত বস্তু টুপি। বঙ্গদেশে এর পরই বিক্রি মেষচর্মের ওপর লেখা টুপিবিষয়ে তথ্যপুস্তক। সেই দেশের অধমাধম আবহমানকাল ধরেই টুপি পরে আসছে। তাদের টুপি পরার ইতিহাস ১০,০০০ বছরের। তারা টুপিকে দেবতার দূত, অপদেবতা ও মানুষের মাঝে হিশেবে ধরে। এদের টুপিদেবতার নিম্নাংশে গাধা, উপরার্ধে ষাঁড়, সশ্মশ্রু, কৌতুকপ্রিয় তার মুখশ্রী, মাথার মস্তকাবরণে মহিষের শিং। মাত্র দুশতক আগে বঙ্গদেশে প্রথম ফ্যাশনদার টুপি প্রচলন করেন মেরী টেলার নামক এক মহিলা। তিনি টুপি বুনতেন স্টকিংস পদ্ধতি ডিজাইন ২x২ রিবং দিয়ে। সেই সময় এই দেশের মেয়েদের মাথায় মাংকি, কাউন্টি, স্কাল ক্যাপ ; কিস্তি, ফারা, পানামা, কাশ্মিরি, বর্মী টুপি ইত্যাদি পোশাকের শুধু কাযদাবাগিশ উপাদানই ছিল না, ছিল পোশাকের কৃতকীর্তি অঙ্গও। আর সব প্রদেশের সব বয়সের জন্য যথাযথ টুপি ব্যবহৃত হত। উনিশশতকী বঙ্গদেশে বাঙ্গালিটুপি আ-মু-খৃ-দরদের প্রতীক বলে গণ্য হয়। আর এই শতকেই বেঙ্গলি ক্যাপ সোসাইটি প্রতিষ্ঠা পায়। এই কোম্পানির প্রকৃত মালিক স্কটল্যাণ্ডের আর্টিবণ্ড। তার উদ্দেশ্য ছিল এদেশের মহিলাদের উপযোগী টুপিনির্মাণ ও নির্মাণে সাহায্য করা এবং তা প্রদর্শন করা। তার কোম্পানি অনেকদিন সচল ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে মাথার টুপি দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় বাস্কেটের খেলোয়াড়রা পোষা কাকেদের অন্যের টুপি ছিনিয়ে আনতে শিখিয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত কাকেদের এটা আর শেখানো হয়নি। তবে তারা টুপি ছিনিয়ে নিয়েই চলেছে। মজার ব্যাপার বঙ্গদেশের প্রত্যেকেরই মাথায় এক অদৃশ্য টুপি রয়েছে। আর এ শিল্পকলা ক্রমশ ঢাকা পড়ছে ক্র্যাশ হেলমেট আর ব্রেস্টপ্লেটে। আর হয়ে উঠেছে অপেক্ষাকৃত সরল গণতান্ত্রিক, আর একই সঙ্গে তার সহজাত রোম্যান্টিক বৈশিষ্ট্য বজায় থাকছে। বঙ্গদেশের একো টুপির নতুন চিত্তাকর্ষক নমুনার প্রস্তাবও রেখেছেন আর্মামেন্ট রিসার্চ এসটাবলিশমেন্ট-এর শ্রীগেগং আপাং। তার তৈরি প্রতিটি টুপিতেই তিনটি কনডেনসর একটি ট্রানসিসটার ও একটি রয়েল থাকছেই।
আমার শত্রুদের জন্য কবি শম্ভু রক্ষিত ২০০০ সালে প্রকাশিত, মারুফ হোসেন, মধুমঙ্গল বিশ্বাস ও মোস্তাক আহমেদ সম্পাদিত, “নয় দশকের কবিতা” সংকলন, ৩৯-পৃষ্ঠা। লিটল ম্যাগাজিন “সবুজের অভিযান”-এর পঞ্চাশতম সংখ্যার বিষয় ছিল “নয় দশকের কবিতা”। সেই সংখ্যাটির গ্রন্থাকারে প্রকাশিত সংস্করণ হলো এই সংকলন।
আমি আমার অগণিত শত্রুদের মধ্যে একা, সঙ্গীহীন। আমি সেই শক্রদেরই চিনি, যারা আমার বিকৃত গল্প নিয়ে মাঝরাত্রি পর্যন্ত মেতে থাকেন।
আমি আমার শত্রুদের জন্য আমার তেজ ত্রিধা বিভক্ত করেছি . এবং আমার হৃদয় বায়ুদ্বারা বর্ধিত হয়ে . তাদের সঙ্গে এখন বীরের মতো যুদ্ধ করছে।
সেদিন এত বেশি ঝড়ের মতো হাওয়া বইছিল যে, মনে হচ্ছিল আমি ও আমার শক্ররা একই সঙ্গে মারা যাব যেদিন আমি একটি উঁচু মাটির ওপর নরমুণ্ড সাজিয়ে একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছিলাম।
বালক, বৃদ্ধ বা যেসব অনুচর, যারা এখনও . আমার শক্রদের আজ্ঞাবহ হতে পারেনি আমি তাদেরকে রত্নখচিত ছোরা, প্রাচীরবেষ্টিত ভূমি . এবং একটি ক্ষকরে গৃহ দান করেছি আমি শহর ছেড়ে দণ্ডকারণ্য পথে আমার শত্রদের জন্য . এক বিশ্রামকেন্দ্র গড়েছি পৃথিবীর যে সমস্ত দুর্গম স্থান কারুর দেখা হয়নি . তা আমি অমার শত্রদের জন্যই দেখেছি আমি বরফের দেওয়াল-ঘেরা একটা ছোট্ট জায়গায় আমি আমার কয়েকজন শত্রুকে মৃত সঞ্জীবনী খাইয়েছিলাম।
আমি আমার শত্রুদের সৃষ্টিকর্তাকে দেখে দূত হয়েছি আমার সমস্ত শত্রুরা তাদের সৃষ্টিকর্তার আজ্ঞায় . আমার মৃন্ময় রাস্তার ওপর এসে এখন দাঁড়িয়েছে। আমার শক্ররা পায়ে পায়ে পিছিয়ে গিয়ে দ্রুত আমার ওপর তীর নিক্ষেপ করুক।
পারমানবিক মৌনতা কবি শম্ভু রক্ষিত ২০০০ সালে প্রকাশিত, মারুফ হোসেন, মধুমঙ্গল বিশ্বাস ও মোস্তাক আহমেদ সম্পাদিত, “নয় দশকের কবিতা” সংকলন, ৪০-পৃষ্ঠা। লিটল ম্যাগাজিন “সবুজের অভিযান”-এর পঞ্চাশতম সংখ্যার বিষয় ছিল “নয় দশকের কবিতা”। সেই সংখ্যাটির গ্রন্থাকারে প্রকাশিত সংস্করণ হলো এই সংকলন।
আজ সব ফিসফাস মিলিয়ে গেছে যেমন প্রাটীন ধসের দিকে ঘুরে পরে উড়ে মিলিয়ে যায় ভাসমান শূন্যের ক্ষীণ-আলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে দুদিকে মোড়া হাড় আর দুদিকে মোড়া এক ভাঁড় আর দুদিকে মোড়া বজ্রপিন্ড আর তপ্ত ড্রেসিং গাউন আর সূর্য-ঘসা কাঁচের দস্তানা আলোয়-তৈরি মূর্তিটার ওপর ঠোটের আর মুখের আর দুই হাতের দাগ বা ছাপ --- এক অতি কুব্জ বিছানা --- আর ওয়ান-টু-খ্রি দের হাত একটা মরকে ঢাকা দিচ্ছে এবং এখানে এক পাপেট রমনী কেঁদে কেঁদে পাপেট রমনী মৃতের মাথার ওপর পুরুষাঙ্গ এঁকে দেয় হিম ঝঞ্চা পাথরকুচি হয়ে ঘোরে ঘুরেই যায় কায়দা করে এক ধোঁয়াটে শূন্যতা আমার উরু চেপে ধরে মোমবাতি ঘরের মেঝের ওপর জ্বলে মোমবাতি ভ্বলে এবং এক উন্মস্ত সৈনিক ছুটে আসে জানালার দিকে এক বামন জ্বলন্ত পোশাক পরে মশাল জ্বালিয়ে মাঠে দৌড়ে চলে যায় আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার ক্রমাগত চূর্ণ হয়ে ভেঙে যায় চুমকি আলোতে কে বসে ঘন্টা নাড়ে পিতার-ঈশ্বর আজ মৃত আমার স্ত্রীলোক আমার মৃত পিতার ঈশ্বরের কাছে যায় এবং মৃতের হৃদযন্ত্র পরীক্ষা করে এখন যদি নগ্ন সংগীতকে নাড়িভুঁড়ি করা সম্ভব হত... আমার তাজা বুলেট লুকিয়ে রেখেছি তলপেটের নীচে নগ্ন সংগীত বেজে যায় যে সংগীত বেজেই যাবে আমার শরীরের ত্বক মিশে যায় নগ্ন-সঙ্গীতের সঙ্গে এবং পৃথিবীর ওপর দিয়ে উড়ে যায় ধোঁয়ার পতঙ্গে ঝাঁক এবং একটা লোক শ্রীহীন পোষাক ঢেকে মেঢ় উঁচিয়ে সন্তর্পণে ছুটে দূরে চলে যায় কিংবদন্তী হয়ে ঘুরে যায় ঘুরেই যায়
সোনার দাসী কবি শম্ভু রক্ষিত ২০০৩ সালে প্রকাশিত, অনুপকুমার মহাপাত্র সম্পাদিত, “সহজ পাঠের কবিতা” সংকলন, ৮৪-পৃষ্ঠা।
অনেক দূরদেশ ঘুরে আমার সোনার দাসী আসে আমি সংক্ষিপ্ত গলিপথ থেকে ঘরে কোলে করে নিয়ে আসি তাকে। সোনার দাসী, যাকে প্রজাপতির মত দেখতে আমি চোখ বুজে শুঁকি যার টকটকে লাল সিল্কের জামা, গর্ভের শিরা যার শুকনো অল্প চুল মাথার ওপর দুভাগ হয়ে আমার কানের পাশে জটার মতো ঝোলে
আমার ঘরে লোহার খাট, জামাকাপড় রাখার দেরাজ, দেয়ালের মধ্যে মার্বেল পাথর বসানো কয়েকটা ড্রয়ার এবং আখরোট কাঠের ওপর খোদাই-কাজ করা ছোট্ট একটা টেবিল যেন স্মৃতিস্তস্ত হয়ে থাকে আমি অবৈধ কার্পেট পুঁথি, ছেঁড়া কাপড় সোনার দাসীকে পরাই
আমি হেসে তার সঙ্গে কথা বলি, আঙুলের সাদা হাড় তাকে দেখাই তার জন্যে আমার নিঃশ্বাস, তার জন্যে আমার জলস্তম্ভ এবং আমার জন্যে তার দ্বিতীয় সত্তা অনেক দূরে চলে গেছে।
আমি সোনার দাসীর মনের কথা চিন্তা করি, সগর্বে উদাসীন হই ফলে সোনার দাসী ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ে, বায়ুমণ্ডলের মতো তাকে মনে হয় সে রঙিন বাদ্যযন্ত্র ও টুপি নিয়ে আমার সঙ্গে লড়াই লড়াই খেলে আমি দেখি তার দীর্ঘ স্পন্দিত খেলা, দীর্ঘ অঙ্গসঞ্চালনও করি সোনার দাসীর অনুপত্রীড়ায় এখন আমার মূর্ত শরীর---
আমার ও সোনার দাসীর খেলা দেখে নিরাবণ বুড়ীরা উঁচু বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে ; সোনার দাসীকে তারা দয়াময়ের বাতাস দিতে খাকে তাকে ঘিরে ধরে পাথরের পতগ লাগানো ওদের গুলবদন সম্ভ্রম
চতুর্দিক-দেখা বারুদের মতন সোনার দাসী শীতল মনে হাই তোলে তার নিহিত চোখের ভেতর হতে অনর্গল রশ্মিকণা আসতে থাকে তার জালি চোখ, উত্তপ্ত লাল ঠোঁট---ঝালর লাগানো স্মৃতি তার শরীরে আমার বেদনা মাখানো গন্ধ
আমি ও সোনার দাসী আমরা দুজনে এখনও স্পষ্ট, স্ফীত আহরিৎ কাঠের সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে যাই প্রায়ই নিচে।
স্বপ্ন কবি শম্ভু রক্ষিত ২০০৭ সালে প্রকাশিত, আশিস সান্যাল ও মৃণাল বসুচৌধুরী সম্পাদিত, “বাংলা কবিতার ভুবন” সংকলন, ৩৫৪-পৃষ্ঠা।
আচমকা এক ঝীকানি খেয়ে চলে আসব আমি আমার কাছে অদ্ভুত এক রহস্যময় রোগে মারা যাব আমি, যাদু থাকবে আমার বেহালায় ; এক দুষ্টু বানর ছুঁচের ফুটোর মধ্যে ঢুকিয়ে দেবে আমাকে ; আমি ধর্মনিষ্ঠ, কোন ঈগলকে ধরব না আমি। আমার গান আমার প্রতিকৃতি হয়ে যাবে ভয়ঙ্কর সংকেত দগ্ধ হয়ে জড়িয়ে ধরবে আমাকে খচ্চর ছোটলোক প্রভুদের নিয়ে আমি গবেষণা করব আমি কাঁদতে পারব না, কাউকে কিছু বলতে পারব না আলো আঁধারির লুকোচুরি খেলার মধ্যে আমার বোয়িং গর্জন করতে করতে চলে যাবে---সূর্যস্নাত আকাশ থেকে মৃদুহাস্যে নেমে আসবে বিদ্যুৎ---সমস্ত দেওয়াল কানাকানি করে উঠবে কবি রূপকের মত মূর্ছিত হয়ে কাঁদবে বিষণ্ণ গিটারে লোকায়ত সুর শোনাবে আমাকে আমি স্বর্ণকৌপীন পরে দাঁড়ালে কুয়াশা উড়ে যাবে একটা ভাঙা ফুসফুস বেজে উঠবে আমার কানে যুবা দেবতা মানুষ চুম্বন করে আলিঙ্গন করবেও আমাকে ও ‘জীবন অনেকটা ভেরীর মত’ মন্ত্র লিখে মরবে আমার ভালো লাগবে না ; জ্যোত্স্নায় হেঁটে যাবে আমার শরীর শুদ্ধ পিয়ানো আমার পায়ে মাথা নত করবে মুহূর্তে সমগ্র পৃথিবীর বাকি অন্ধকার ও শৈত্য জ্বলে উঠবে . বৃষ্টি কুয়াশা নিয়ে আমার শরীর জেগে উঠবে