কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তীর কবিতা
*
একটি তড়িদাহত লেখা
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

যে-কথাটা বলার কথা বলতে গেলে ঠোঁট কেঁপে যায়
আমার ফুলের বর্ণমালার ভিতর-ভিতর ভিত কেঁপে যায়
শব্দ এত নরম তা কে জেনেছে
ছন্দে এত প্রপাত যদি সে জানত
মধ্যবর্তী সময় খালি মধ্যে-মধ্যে জল মেপে যায়
যে-কথাটা লেখার ছিলো লিখতে গিয়ে হাত কেঁপে যায়
নদী এত তরল তা কে-ই বা জানে
গণিত এত সরল যদি বুঝত সে
ধান ভানবার বেলা শুধুই শস্যশালায় চাল মেপে যায়
যে-কথাটা ভাবার তবু ভাবতে গিয়ে বুক কেঁপে যায়
এখন আমার সকল লেখায় ভুল থেকে যায়...

একটা জীবন ভুল থেকে যায়
একটা মরণ ভুল থেকে যায়

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শীত ও শঙ্খের আলাপ   
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

ব্যথা নেই, তাই আর বাজে না বাঁশিটি
ডাকবাক্স বহুদিন ভুলে গেছে চিঠি
বাতাস ভুলেছে পথ, খুরের কদম
ভোলে ঘোড়া, ফুলের সময় কত কম—


এই নিয়ে মনস্তাপ একটি তরুণ
করেছিলো, তরুণীর পিঠে ঝুরো চুল
তবুও ভূগোল, তবু দেয়ালের চুন
খসে পড়ে, ছেড়ে যায় আঙুলে আঙুল

চাঁদ পোড়ে, হেরে যায় শিশুপাঠ্য ছড়া
মানুষের মৃত্যু হলে থেকে যায় খাট
মরে গেলে গাছ তো নিজেই চিতাকাঠ
ফিরে যায় হতবাক ডাকহরকরা

অলস দুপুরে, তাই বাজে না বাঁশিও
ব্যথা নেই, দূরে দূরে ভালোটি বাসিও

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সূর্যাস্তে চুম্বন
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

পিপাসা আলোর তাই অন্ধকারে যাই,
পিপাসা বীজের মতো—
উড়ে যাবে, ফেটে পড়বে রাগে।
এ-জীবন প্যান্ডোরা-বাক্সের কাছে অপেক্ষায় থাকি,
স্থির বুঝি জল উঠে এসেছে কিনারে,
ডুবে যায় ঘাঁটি, মাটি— জল বাড়ে,
জলের মধ্যস্থলে দু’জন দাঁড়াই;
টিলার ওপাশ থেকে ডেকে ওঠে আচম্বিত-পাখি—
কোথাও কি ঘর ছিলো নাকি!  
ধর্মত মনস্তাপ জাগে।   
প্রহর ফুরোয়,
তবু প্রস্বর ধরে রেখে, থাকার অধিক থেকে,
আত্মঘন জ্বলেছি তখন...  
গ্রহরা পালক লেখে:
.                                কথা নয়—
.                                সূর্যাস্তে চুম্বন

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অলৌকিক ইস্টিশান
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

মাসান্তে একবার অন্তত মনে করে
মনখারাপ হয়।
বর্ণচোরা মেয়েলি আদল ধরে
সে আমার পাশে এসে বসে;
মৃদু হাসে, নখে নখ ঘষে;
ঘাড় আড়কাত করে বলে— কী ভয়?
সামনে অনন্ত, পিছনে
জীবন ও মায়া,
দক্ষিণে ধানখেত,
বামে প্রেত-
অমার্জিত ছায়া
চান্দ্রমাসে উলুখড় বোনে!
অলৌকিক ইস্টিশান-বাঁশি যেন বাক্‌সিদ্ধ ছুমন্তর:
মধ্যস্থ হৃদয় শুধু প্লুতস্বর শোনে—
সামনে অনন্ত…

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নষ্ট
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

ধুলোর মধ্যে ধুলো হয়ে ভাসতে-ভাসতে
তুমি এসেছ।
আমার একার গেরস্তালি,
হাওয়ায় ছিলো সোঁদা গন্ধ, নরম রোদে চড়ুই-শালিখ
ডানা ঝাড়ছে,
উঠোন বেয়ে চারপেয়ে সব আদর কাড়ছে।

আমি তখন এতই মগ্ন,
প্রথাভাঙার যথালগ্ন
এলেও যেন টের পাইনি!
কখন তুমি আস্তে-আস্তে
দাওয়ায় উঠে বসে পড়লে খুব স্বাভাবিক;

আমি আবার এমন কেঁচো—
ভ্রষ্ট নাবিক...
তুমি এসেছ, কোথায় যে পাই বরণডালা—
ভেবে উঠতেই উঠে বসেছ ভাতের থালায়,
আমি তো কম চমকাইনি।

একা যোগীর একটা বেলা নষ্ট হলো।
মরা উনুন, আঁচ বানানোর দোনামোনা
পুরো দৃষ্টি অচল করতে একটা বালি-ই যথেষ্ট না?
(লবণ-গোলা অক্ষিগোলক!)

তবে আমায় ধুলো করো, ভাসিয়ে নাও,
আমার চেনা
ভূ-সমুদ্র পেরিয়ে চলো—
যেন তোমার বাধ্য প্রেমিক পেঁচার মতো,
পেঁচার চেয়েও অন্ধ এবং রন্ধ্রগত,

কিংবা এই সবেমাত্র বয়েস-বাড়া,
মার্কামারা
ছবি দেখেছি, তুমি হয়তো বুঝে ফেলেছ প্রথম বারেই...
অনেক বাড়ের
সামাল হবে মুঠোয় এলে!
কিন্তু দেখি পরক্ষণেই আমায় ফেলে
হঠাৎ ওঠা দমকা হাওয়ার শরিক হলে,
আদিম গাছের ঘুড়ি ছেঁড়ার নখ পেরলে;
এমন হবে জানলে আগেই দিব্যি দিতাম—
এখন বৃথা।
আলোকগোচর ভাতের থালা
মহাশূন্য, মনে— মনের উদ্ভাবনে নকল পালা
দিনের মতো স্পষ্ট হলো...

মরা উনুন, আঁচ বানানোর দোনামোনা
পুরো দৃষ্টি অচল করতে একটা বালি-ই যথেষ্ট না?
একা যোগীর সারা জীবন নষ্ট হলো...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঘর
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

যখন কোথাও ঘর থাকে না থাকার জন্য
বুকের মধ্যে ঘর তুলে নিন
বুকের সকল ঝড় ভুলে যান
জীয়ন্তে যার এককুলও নেই, তিনকুলও নেই—
জাতিস্মর স্বপ্ন টাঙান
নিজেই নিজের দুঃখ ভাঙান

যখন কোথাও জল থাকে না, একটু পুড়ুন
বুকের মধ্যে সুখের মতো গর্ত খুঁড়ুন
ভেজার জন্য, নিজের জন্য— নিজেই বাঁচুন
নিজের জন্য শস্যখামার
দুঃখদায়ক কাপড়জামা
নিজেই কাচুন

যখন কোথাও দিন থাকে না, সবই ছাড়ুন
নিজের সঙ্গে নিজের সখ্য
নিজেই নিজের আপনপক্ষ
যাহোক দারুণ
পারলে নিজের ছায়াও ছাড়ুন
তাতেও মায়া পড়তে পারে— সাঁতরাতে চান?
দুঃখ পাবেন— যখন কোথাও টান থাকে না রাখার জন্য
নিজের কাছেই হাত পেতে দিন
বুকের মধ্যে ঘর তুলে নিন
সব ভুলে যান

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাড়ন্ত
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

বাড়ন্ত বাচ্চা আর বাড়ন্ত চাল এক নয়।
বাচ্চাকে বাড়তে দেখে মাম্মির
আত্মতৃপ্তি হয়,
এনার্জি পাউডারের খালি বোতলগুলো
সাক্ষ্য দেয়
বারমাস্যা পালার;

চাল বাড়ন্ত হয়ে এলে
মায়ের
আনন্দ হয় না:
সংসারের অমঙ্গল তাতে,
সব সোনামুঠ হয় ধুলো।
শাঁখার আয়ুষ্কাল ফুরলে
শাঁখা বেড়ে গেছে—
এমনটাই মায়েরা বলে।
বাপের নাম নিতে নেই উত্তেজনাকালে—
সাপের নাম নিতে নেই রাতে,
স্বামীর নাম নিত না নারীরা একদা সামাজিক খাতে,
(সম্পর্ক তো সহজ হলো হালে)
মৃত্যু নিয়েও নাকি এ’রকম
সুভাষণ আছে— গঙ্গালাভ…
জীবনের জন্যই শুধু কিছু নেই!

অথচ একবার বাড়ন্ত হয়ে গেলে
তাকে আর ভরানো যায় না…

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রবীন্দ্রনাথ
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

জানলা থেকে হাত বাড়ালে— রবীন্দ্রনাথ,
ছাতার মতো শাসন করছ মোড়ের মাথা
আমরা যারা নামতে নামতে ঢের নেমেছি
মই খেলেছি, সাপের পিঠে ফের নেমেছি
লুডোর দেশে—একা এবং অনুক্রমিক
আগুন-ধরা মূল্য আর ভাঙন-ধরা মূল্যবোধে
স্ববিরোধে, সংবিরোধে
আমরা যারা পুড়ে যাচ্ছি, যাবার আগে শেষ থেমেছি
জলের ধারে, আমরা যারা কুরে খাচ্ছি আত্মরমণ
তাদের জন্য একদুয়ারী তোমার হৃদয়—বিশ্বহৃদয়, ফলন্ত হাত
হারতে হারতে সব হারালে— রবীন্দ্রনাথ,
এখন বুঝি, তুমি একাই পূর্ণ কবি-পূর্ণ মানুষ-পূর্ণতম
আমরা সবাই খণ্ড কবি, পণ্ডশ্রমিক
বিদ্যালয় তো ক’টা দেয়াল নয় কখনও,
বিদ্যা তো আর যথেষ্ট নয় বইয়ের পাতায়...

জানলা থেকে হাত বাড়ালেন রবীন্দ্রনাথ

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিষাদ
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

দেশ এমন একটা ব্যাপার, আগে
মাথা নত করে দাঁড়াতুম
তার নিচে
ভক্তির এই প্রকাশ আজ পলকা লাগে
এখন দেশপ্রেমের সুদৃশ্য পিরিচে
দারুণ লাথি মারতে ইচ্ছে হয়
দেশ না রাষ্ট্র। রাষ্ট্রই করুণ বাস্তব
সে আমার কেড়ে নেয় ঘুম
অথচ তার দোষ নয়
সে যাদের ঠেলাগাড়ি,
সাধের খেলাঘর—
তাদের বুকের ভিতর
কোনও দেশ নেই, গ্রাম নেই
বেনিয়া সময়ের সর্বাধিক পচে যাওয়া জাতক আসলেই
তারা সব।
তারা মানুষ ঠকায়,
কুবেরের যোজনাপদ্ধতি ভালোবাসে,
তারা রাতের শরীরে ছিপ ফেলে
দেশ ধরতে আসে
মন থেকে দেশ মুছে না গেলে
এভাবে রমণ করা যায়?
দেশ বলতে মনে পড়ে দেশের বাড়ি
বাঁধানো পুকুরঘাট
গাছে অমোঘ দোলনা
রৌদ্র ক্ষুরধার
খোলামেলা আমার সহজপাঠ
রাষ্ট্র মানে রাজনীতি, আত্মতত্ত্বসার
বুড়োদের বাজারি খেলনা
রাষ্ট্র হলো ভোটযন্ত্র, ছবিছাপা কলের বোতাম
দেশ একটা হারানিধি, ভূতপ্রাপ্ত ইজেলের নাম

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নদী ও মানুষবিষয়ে লেখা  
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

একটা নদী পাথর ভেঙে আসতে-আসতে কাতর হয়ে পাশ ফিরেছে:
একটা বাউল নাড়ি-বাড়ি সব ছেড়েছে
কিংবা শিশু দুর্নিবার ঘাস ছিঁড়েছে,
এখন আর শরীরে তার ঢেউ থাকে না।
জলের ঘেরে বাস ছিলো যে গ্রাম ক’খানির—
তারা এখন চোদ্দ আনির
হিসেব করে,
কিন্তু নদীর পাঁজর জুড়ে ভাঙার ক্ষত, পোড়ার ক্ষত,
ডাঙার এবং জোড়ার ক্ষত;
পাহাড় চিরে নামতে থাকার কষ্ট কত,
উপল ঘিরে জন্ম লেখার কষ্ট কত,
একটা নদী জীবন দিয়ে রোজই মরে!  
এখন তার শরীরে আর ঢেউ থাকে না

একটা কারও জীবনভর কেউ থাকে না...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর