কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তীর কবিতা
*
স্মৃতির দরোজা   
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

স্মৃতির দরোজাখানা ভেঙে পড়ে অমোঘ কুঠারে।

অভিমান বুনে-বুনে আজ আর জিততে চাই না—
তাই এই হাট হয়ে যাওয়া;
পাট ভেঙে একবার পড়ে ফেলা শাড়ি
রেখে দিলে জলে যাবে,
রোদে দিলে জ্বলে যেতে পারে...

ছায়া তাও সঙ্গ নেবে,
কিছু মায়া ঘিরে থাকবে বাড়ি,
দুলে উঠবে মধ্যবর্তী জলের আয়না—
মুখচ্ছবি ছিঁড়ে নেওয়া একরাশ পাতার হাওয়ায়

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ল্যান্ড অব গড
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

যেমন সমুদ্র এসে গেলে বোঝা যায়,
সে-ভূগোল অন্যরকম,
তার আকাশ খুব শাদা—
পাখিসম্ভব,
বাতাসের নুনগন্ধ
কনুই মেরে বলে সমুদ্র সামনে।
সমুদ্রেরও আছে বিশাল নিজের আকাশ:
একটি মশারি যেন তার জলের বিছানার
মধ্যবর্তী হাওয়ার পৃথিবী
বহু বাসনায় পেয়েছে।

শহরের আকাশ দাঁতাল চিমনি,
প্রোমোশন পাওয়া বাঁকা পথ
আর তারের নুডল্‌স দিয়ে মোড়া,
এখানে মানুষরা ঘোড়া—
সবসময় লাস্ট মেট্রো ধরে,
ফ্রাস্ট্রেশন চরম:
অফিসে ঘোঁটালা, বান্ধবীর ফোন বন্ধ,
বউ-বাচ্চা না খেয়ে বসে আছে
দীর্ঘক্ষণ।

কাঁটাতারের কাছাকাছি চলে এলে
আবার নতুন আকাশ,
সেখানে মানুষের চলাচল ওঁৎ-পাতা শৃগালীর মতো—
ছিঁড়ে যাওয়া অতীতের ভয়
তাদের ভ্রূ-বিশ্বে নামা-ওঠা করে,
চোখের নাভিতে বিষ, স্মৃতি আর
প্রীতির মরামাছ...

দুটো কাঁটাতারের মধ্যে থাকা আকাশ
এরও খানিকটা আলাদা,

তবু ভালো—

সবই তো মানুষ খেয়েছে
এই ক’ছটাক
আকাশ, জমি, আলো
নাহয় ঈশ্বরের জন্য থাক...

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নম্রতার জন্য কবিতা
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

নম্রতা আকাশ দ্যাখে
আমি নম্রতাকে দেখি
এভাবে বুলবুলি খেলাতে অমোঘ প্রতিভা
আছে তার
সবাই নম্রতাকে দ্যাখে
নম্রতা কাউকে দ্যাখে না
সে জানে সপ্তনরী হার
পায় শুধু সদাগর, রাজার কুমার
দুঃখ হয় ভেবে
তাকে ভালোবাসবার মতো যোগ্য নেই কেউ
সকলেই দেখতে যায় ঢেউ
সমুদ্র দ্যাখে না
সে যাকে পায়
তারা চায় দেহতত্ত্বের সুচলতি নোট্‌স—
ঈশ্বরের বাগান তারা বাজার বানাবে!
অথচ এমন কেউ নেই যে তার দুঃখতাপ নেবে
যে তাকে পায় তার নেই দিব্যপ্রভ হাত
সে পেশিশক্তি জানে,
সে জানে সভ্যতার আদিম প্রপাত...
এভাবে কর্পূর ওড়াতে বিনম্র ক্ষমতা
নম্রতার
সে দ্যাখে আকাশ
আমি তাকে দেখি
তার পিঠে বিশুদ্ধ ডানার আভাস

আমি নম্রতাকে দেখি
নম্রতা আকাশ দ্যাখে
নিজেকে দ্যাখে না

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
কাচের জীবন
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

উত্থানের জান্তব শব্দ চারদিকে
অথচ পতিতাপল্লী নাম
এখানে কয়েকঘর রমণীর বাস
পেশা: অগ্নি নিবারণ
তামাম মুলুক থেকে লোক এখানে আসে— আগুনলাগা লোক
আগুন নিভিয়ে ফের আগুন জ্বালিয়ে নিয়ে চলে যায়
কখনও গঞ্জে, লোকালয়ে ডাক পড়ে
এই রাতকন্যাদের;
সে-সব ডাকঘর প্রকৃত জ্বালার হতে পারে
কিংবা হারামির হাতবাক্সপনা—
পায়রার বাজি ধরে  
আগুনের অনেক উৎস, অনেক কারণ
আগুন নেভায় যারা, তারা স্বচ্ছন্দে
দমকলে চাকরি নিতে পারত!
তবু তাদের কাচের জীবন:
ব্রেক দ্য গ্লাস টু গেইন অ্যাকসেস

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পারদদিনের লেখা
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী

এখন আমার যন্ত্রণা নেই
একটা সময় যন্ত্রণাতেই
ব্যাখ্যা ছিলো
আমার সঙ্ঘ, আমার যাপন
ঘরের পর ও ঝড়ের আপন
শিক্ষা ছিলো
এখন আমার যন্ত্রণা নেই
একটা সময় যন্ত্রণাতেই
ব্যাখ্যা ছিলো
একটা সময় সংবেদনায়
অনন্ত দিন, অনন্ত হোম
একটা সময় চোখের জলের মাপনী চোঙ
থই পেত না
এখন আমার যন্ত্রণা নেই
একটা সময় যন্ত্রণাতেই
আলোবাতাস ভিক্ষা ছিলো
এখন আমার যন্ত্রণা নেই
একটা সময় যন্ত্রণাতেই
ব্যাখ্যা ছিলো
একলাদহন মোমবাতিটার সূক্ষ্ম আঁচে
আত্মগোপন, মন-কেমন আর দুঃখ আছে
তোমার জন্য
গহনভুবন রেখে দিলাম;
আচক্রবাল পাখির খোঁজে
আমার রোজের
সব অছিলা,
রৌদ্রদীঘল আমনধান্য
তোমার কাছে
এখন আমার চক্ষে-বক্ষে
কক্ষ এবং অন্য কক্ষে
অন্তরীক্ষ বৃক্ষ আছে,
বৃক্ষ আছে, বৃক্ষ আছেই
এখন আমার যন্ত্রণা নেই
একটা সময় যন্ত্রণাময় প্রেক্ষা ছিলো
আমার শূন্য, আমার ডুবান
আমার পাপ ও বীজ-ওড়া গান
বীক্ষা ছিলো  
এখন আমার যন্ত্রণা নেই
একটা সময় যন্ত্রণাতেই
ব্যাখ্যা ছিলো

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সিঙ্গুর - এখন
কবি স্নিগ্ধদীপ চক্রবর্তী
এই কবিতাটি দিলীপ চক্রবর্তী সম্পাদিত "সপ্তাহ" পত্রিকার ২৯ ডিসেম্বর ২০০৬-এর বর্ষ-
৪০/সংখ্যা ১৯-২০/ এ প্রকাশিত হয়েছিল।

চুলোয় যাক চাষ, এখানে বারোমাস টাটার গাড়ি হোক উৎপাদন—
মন্ত্রী-আমলারা, “দোহাই আপনারা”, বলছে, “বীতশোক, শান্ত হোন”।
শান্ত হব আজ! তুমি তো মহারাজ— তুমি যা বল তাই সেটাই ঠিক—
উত্তরাধিকার বেবাক চুরমার: নিথর— শুধু চাই নির্নিমিখ।
বেকার পিছুটান; একটু দেখে যান কেমন ছিল আর আজ কেমন;
— ‘হেই সামালো’ গান তখন ছিল প্রাণ— অবাক-ক্ষমতার উত্তরণ!
জ্বলছে ঘরদোর, শ্মশানচত্বর-বাড়িতে যেন আজ তফাত নেই—
গোপন শত লাশ ফেলছে সন্ত্রাস, রাজা তো,— আন্দাজ আনন্দেই!
ঘুমিয়ে আছি সব। টুকরো বিপ্লব— তেমন তাতে কই আগুন-আঁচ?
প্রজাতি লোপ হোক, গিলব তবু ঢোঁক, আমরা নাচবই পুতুলনাচ!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর