কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা
*
শব্দ
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

বাতাসে বয়ে যাচ্ছে শব্দ।
তোমার আদরের শব্দ, তার তিরস্কার।
মারণাস্ত্রের শব্দ, দোয়েলের শিস।
বাঘের থাবার শব্দ, হরিণের শুদ্ধতম স্বর।
তৃপ্তির গ্রাসের শব্দ, হাভাতে চিৎকার।
শব্দ তুলছে, কেবলি বলছে
আছি, আছি, আছি
ভালোবাসার পাশে ঘৃণা হয়ে
ঘৃণার পাশে তৃষ্ণা হয়ে
তৃষ্ণার পাশে জল হয়ে
এভাবেই আছি চিরকাল।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নৈঃশব্দ্য
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

মৃত নক্ষত্রটি যদি ঝরে পড়ে তোমার তালুতে
তুমি তাকে দেখিও না।
বোলো না কারুর কাছে একদিন এসেছিল
হিম পাড়ি দিয়ে।
সে অগ্রহায়ণ বেলা পড়ন্ত দুপুর
গচ্ছিত থাক জলে নিবিড় নদীতে।
তুমি তাকে দেখিও না।
তার শেষ ইচ্ছেটুকু কেঁপে কেঁপে তোমার তালুতে
নিবিড় নৈঃশব্দ্য আশা করে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মেঘখণ্ড
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

আমি অশ্রুলোভী একখণ্ড অভিশপ্ত মেঘ,
থমকে আছি আকাশ আর পৃথিবীর
ঠিক মাঝখানে।
অশ্রুকণার জন্য অঙ্গে ধারণ করতে রাজি আছি
দুরারোগ্য রোগ।
হাসপাতালে সাদা চাদরের নীচে পা থেকে
মাথা অবধি ঢেকে যদি সেই আশ্রুবিন্দুটির
দেখা পাই, কথা দিচ্ছি ঝরে পড়ব
বৃষ্টি হয়ে তোমার সর্বাঙ্গে শিরায় শিরায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অপেক্ষা
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

তাহলে থাক, মনে পড়েনি যখন।
ঝাঁট দেওয়া উঠোন থাক, গাছে ফুল,
ঘাসে ঘাসফড়িং। বারান্দার সামনের সিঁড়ি
থাক যত্ন করে মোছা।
বাতাসে সুগন্ধ থাক, আকাশে আবির।
সবাই থমকে থাক, মনখারাপ নিয়ে।
কী আর করার থাকে, মনে পড়ে না যখন?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্পর্শ
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

প্রেম ছুঁয়ে আছে বলে নদী বয়ে যায়।
বেগুনি ফুলটি দোলে জংলি লতায়
দূরে মাঠে গাভীটি শাবক নিয়ে
কচি ঘাস খায়।
দিগন্তে অনাবিল আষাঢ় ঘনায়।

প্রেম ছুঁয়ে আছে বলে, মৃত্যুও চৌকাঠে এসে
একবার থমকে দাঁড়ায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নীড়
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

জমাট মেঘের থেকে কয়েকটা ফোঁটা
বিষুবরেখার দিকে নামতে নামতে
এমন এক চোখ খোঁজে
যেখানে মরুদ্যান নেই।
আছে খালি গ্রীষ্মকালীন বিনিদ্র দীর্ঘরাত;
চৌকাঠ ডিঙোলেই মেঘ জানে সেখানেই
কয়েকটা ফোঁটা হবে আলুথালু জলপ্রপাত।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মাথুর
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

সোনারং কাঁসার থালায়  বাড়া আছে তপ্তভাত পঞ্চব্যঞ্জন।
তার পাশে অপেক্ষায় সুশীতল জলের পাত্রটি।
ও পাশের আঙিনায় জ্বলে আছে পথ চেয়ে
সন্ধ্যাপ্রদীপ।কোথাও আসন বোনা  
সবে শেষ হয়েছে এখন। জ্যোৎস্নায় ডুবে যাওয়া
নিকোনো উঠোনে কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি  
কবে থেকে পাতা। বারান্দার এককোণে
পা ধোয়ার টলটলে জল।

তবু তুমি হাঁটবে কেবলি?
সত্য, দ্বাপর, কলি ছুটবে সোনার রথ
মথুরার পথে? দাঁড়াবে না, জুড়োবে না,
বাসি হবে সব আয়োজন?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তৃষ্ণা
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

আকণ্ঠ তৃষ্ণা নিয়ে মরে যাবে যে নদী
শেষবার তার  চরে চাঁদ উঠেছিল।
পূর্ণিমার পরিপূর্ণ চাঁদ ---স্বার্থপরের মত
দেখেছিল নিজের শরীর জলে,
দূর থেকে। চাঁদ আর নদীর
মধ্যবর্তী শূন্যতায় কয়েকটি চাতক শুধু
উড়ে উড়ে যায়, সহজাত ভঙ্গিমায়
তৃষিত ডানায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বরফ
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

মনখারাপের কোন রং হয় না।
তার হাতের মুঠোয় থাকে কেবল
বিবর্ণ এক বরফকণা।
সে কেবলি ভাঙতে থাকে
চোখের ভেতর, মনের ভেতর
লাল, নীল সব রঙিন পাথর।
ভাঙতে ভাঙতে বিছিয়ে দেয় সে বরফ চাদর।
ঠিক যেখানে হৃৎপিণ্ড
তারই ওপর।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দূরত্ব
কবি শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়

দূরত্বর একটা নিজস্ব স্বরলিপি থাকে।
দূরে চলে গেলে আচমকা বদলে যায় কণ্ঠস্বর।
পোশাকে চিবুকে লেগে থাকে
দূরে চলে যাওয়ার গন্ধ।
আলিঙ্গনের মাঝে জেগে ওঠে
একটা হেমন্তের ফসল হারানো মাঠ।
যে মাঠের ক্ষেত্রফল কেশব নাগের বই
কিছুতেই মেলাতে পারে না।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর