সঙ্কোচন কতটুকু, কতটুকু আছে ব্যাপকতা- কতো আয়তনে আছে শুদ্ধ দিনরাত; তুলে আনি সেই সব গভীরের কথা।
নিজের গভীরে আমি খুঁজে ফিরি অনন্ত আকাশ; -তেজদীপ্ত আদি সূর্য, কে সে নিত্য বিধাতাপুরুষ, অন্তরে রয়েছে কি না সুকোমল শ্যামলিমা ঘাস, অথবা দহন যোগ্য বেদনার তুষ।
নিজেকে খুঁড়ছি আমি নিজেকে খুঁড়ছি সুগভীর খননে খুঁজছি শুধু ঐশ্বর্য কবির...
পড়ে পড়ে মাথা ঘোরে কী কঠিন ওরে বাপ! ছন্দ কি কবিদের জীবনের অভিশাপ? কভু যদি মিলে যায় অক্ষরে অক্ষর ছন্দের খপ্পরে পড়ে খাই চক্কর! এক মাত্রার বেশি পায় না সে সম্মান, অক্ষর বৃত্ততে যদি লিখে যেতে চান। অথচ সে অনায়াস হবে দুই মাত্রার, কলাবৃত্তের চালে চলাচল যদি তার। মাত্রার সংখ্যাটা বলে দেবে সিলেবল্, স্বরবৃত্তের চালে যদি করে চলাচল।
ছন্দ ছিল না জানা, আজো জানা হলো কই? কাছে নেই শিক্ষক, নেই কোনো ভালো বই। তবু লিখে যেতে হবে, এ যে বড় ঘোড়া রোগ! না হয় হলাম শুধু মাত্রাতে অপারগ। আছে এক পদ্ধতি; বিকল্প বলা যায়, বলব কি বলব না, ভেবে পিলে চমকায়! তবু জানি গুণিজন মার্জনা করবেন, একটু না হয় ভুল গাড়িতেই চড়বেন।
আসল কথাটি তবে বলা যাক এইবার- মনুষ্য প্রজাতিতে দুটি কান নেই কার? কান দুটি টেনে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিন, অন্তরে যে যে ভাব এক্ষুণি লিখে নিন। কর্ণই মাত্রার উত্তম বিচারক, সেই সাথে তালে তালে করে যান ঠক্ ঠক্; হাতের আঙুল ঠুকে, পা ঠুকেও করা যায়। কান পথে মাত্রারা এসে যাবে হাতে-পায়! মাত্রার নামধাম না জেনেই বিলকুল নানা মাত্রার চালে লেখা হবে নির্ভুল।
কবির সঙ্গে কাটছিল কাল জগত সভায়- আনন্দ ক্ষণ যায়-আসে-যায়, দাঁড়ায় এসে; মহাকালের কোন আবরণ? কোন আভরণ... সব কালিমা মুক্ত এবং খনন যোগ্য দাঁড়ায় এসে; দহন যোগ্য... দাঁড়ায় এসে
জলখাবারের সঙ্গে আসে খননযোগ্য মহাকালের সব আভরণ দাঁড়ায় এসে।
কবির সঙ্গে মগ্ন ছিলাম; যায়-আসে-যায় কাব্য-হরণ মহাকালের শেষ কথাটি...
বনমল্লিকার নাম হয়তো আপনারা শুনে থাকবেন; নামটির মধ্যে বেশ একটা আর্তি আছে, একটা উদোম বন্যতাও থাকতে পারে; কিন্তু এ বনমল্লিকা সে বনমল্লিকা নয়। কাজেই নামটিও আপনাদের অজানা থাকাই স্বাভাবিক।
শহরের এক বনেদি ঘরেই জন্ম হয়েছিল তার প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে মা-বাবাও যেমনটি ভেবে থাকেন- ছেলে হলে মল্লার আর মেয়ে হলে মল্লিকা ... এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
তার জন্মক্ষণে শাঁখ বেজেছিল বটে তবে তা নিতান্তই ভুলবশত। জন্মের কিছুক্ষন পরেই জানা গেল - তার কোনও লিঙ্গ পরিচিতি নেই; সে অজনিকা।
বাড়িতে বিষাদের সুর আর চাপা গুঞ্জন -শিশুটিকে ফেলে আসবে কোথাও?
না; ফেলে আসতে হয়নি কষ্ট করে। বাতাসের কান যেমন সবকিছুই শুনে নেয় তেমনি খবর পৌঁছে দিতেও তার জুড়ি মেলা ভার। একদল বৃহন্নলা এসে তাকে তুলে নিয়ে গেল আনন্দ আগ্রহে।
মা-বাবার শাপমুক্তি ঘটলো!
যাবার আগে অবশ্য ওরা বলেছিল- শিশুটি আসলে মেয়ে প্রজাতির ক্লীব।
নাম রেখেছ তোমরা কিছু . সোনামুখী... চন্দ্রমুখী...? কাঁদতে কাঁদতে মা বলেছিল – ভেবেছিলাম মেয়ে হলে মল্লিকা আর ... ওরা বলল- ঠিকাছে, ঠিকাছে; ওটাই হবে- বনবাসী মল্লিকার নাম রেখে দে বনমল্লিকা। হাসতে হাসতে, গা দুলিয়ে নাচতে নাচতে চলে গিয়েছিল ওরা।
বনমল্লিকা এখন আগত যৌবনা, চোখে কাজল টানে, লিপস্টিক দেয় ঠোঁটে, কানে বড় আকারের দুল আর দুহাতে একগাদা চুড়ি। উৎসবের সময় ডাক পড়ে বনমল্লিকার। গানের তালে তালে নেচে ওঠে সে, লোকে বলে হিজড়ে-নাচ। ভিড়ও হয় প্রচুর! উদ্ভ্রান্ত মত্ত যুবকেরা ওকে প্রকাশ্যে চুমু খায়, আদর করে, অন্তরালে নিয়ে গিয়ে দলিত মথিত করে; বনমল্লিকার ভাল্লাগেনা। তবে এতদিনে সে জেনে গেছে- হিজড়েদের সম্মান থাকতে নেই, লজ্জা থাকতে নেই, এমনকি থাকতে নেই কোনও প্রতিরোধ।
ইতিমধ্যে সে দু’একবার বাড়িতেও ঘুরে এসেছে জন্ম ভিটে বলে কথা! লোকে বলেঃ ‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’... কিন্তু অভিজ্ঞতায় সে বুঝে গেছে যে বাড়িতে সে একেবারেই অনভিপ্রেত...
বুকে অসীম কষ্ট নিয়ে দিন কাটে বনমল্লিকার অজনিকা মায়েরা তাকে ভালবাসায় ভরিয়ে দেয় আর শিখিয়ে দেয় অনন্ত কষ্টের দলা গিলতে গিলতে কিভাবে হো হো করে হাসতে হয়, নাচতে হয়, গাইতে হয়...
কিন্তু এ বনমল্লিকা সে বনমল্লিকা নয়। মন খারাপ করা উদাস দুপুরে পুকুর পারে বসে তার ঢিল ছুড়তে ইচ্ছে করে; খুব আদর খেতে ইচ্ছে করে তবে সেই উন্মত্ত যুবকদের আদর নয় রাজকুমারের আদর... পক্ষিরাজ ঘোড়ায় উড়ে এসে সে তার চোখে পরিয়ে দেবে প্রেমের সুরমা, জড়িয়ে ধরবে সজোর ঘনিষ্ঠতায়।
সমকামীদের আন্দোলনে দিগ্বিদিক তোলপাড় ছেলেরা ছেলেদের আর মেয়েরা মেয়েদের বিয়ে করার অধিকার চাইছে অথচ কী কপাল নিয়েই সে জন্মেছে!
অজনিকা মায়েরা আরও একটি শিশুকে নিয়ে এসেছে - মেয়ে প্রজাতির ক্লীব। কিছু আগেই সে জেনে গেছে তৃতীয়প্রকৃতিকেও মানবিক স্বীকৃতি দিয়েছে মহামান্য আদালত। এই শিশুটিকে সে আর নাচুনে হতে দেবে না; সে ওকে স্কুলে পাঠাবে; নাম দেবে অরুন্ধুতি; মায়ের নাম বনমল্লিকা। সে ওকে মানুষের মতো মানুষ করে তুলবে, বিয়েতে সানাই বাজবে আকাশে বাতাসে বছর যেতে না যেতেই কোল জুড়ে ফুটফুটে একটা ... না, না; একটু হয়তো বেশিই ভেবে ফেলেছে সে, স্বপ্নের উড়ান বুঝি এমনই হয়, ......লাগামছাড়া।
ভাবতে ভাবতে তার চোখে জল চলে আসে। নিজেই চোখের জল মুছে নেয় সে। ক্লীব-মায়েরা তার আবদার শেষ পর্যন্ত মানবে তো?
তবু এই যে ভাবনাটুকু সে ভাবতে পেরেছে সেই অনুভবে তার দু’চোখ বেয়ে আবার জল নেমে আসে, আবার... আবার... আবার জল নামে... -আনন্দের অমলিন জল; বিরল সংগ্রামের এক প্রত্যয়ী অশ্রুধারা...
অজপাড়াগাঁয় জন্ম আমার, বাবার দোকানদারি, গৃহবধূ মা-ও বাবার যোগ্য সহকারী। আমার ছোট ভাই ছিল এক, আমি তখন তেরো, স্কুলে যাই, স্বপ্ন দেখি, মায়ের আদরেরও ভাগ ছাড়ি না, ভাইয়ের সাথে খুনসুটি দিনরাত। সময় আঁকে শরীর জুড়ে চিহ্ন অকস্মাৎ! মা ডেকে নেয় ঘরের ভিতর, শেখায় সামলে চলা; ঘুম আসে না, যন্ত্রণা হয়, মাকেই শুধু বলা যায় সে কথা; সময় চলে- থামতে জানে না সে। নবম শ্রেণীর প্রথম হয়ে দিন কাটে উল্লাসে। বাবার চোখে স্বপ্নের ঘোর- ‘একটি বছর বাদে মাধ্যমিকে জেলার সেরা’- কল্পিত সংবাদে।
*************************
আমি তখন চতুর্দশী, তখন জ্যৈষ্ঠ মাস; গ্রীষ্মকালীন দীর্ঘ ছুটি; মায়ের অভিলাষ -কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসি মামার বাড়ি গিয়ে; ইচ্ছে পূরণ হবে মায়ের, নিজেই যাবে নিয়ে। সঙ্গে কিছু বই নিয়েছি; পড়ার সরঞ্জাম ছাড়লে কি আর চলবে খেয়ে পাকা কাঁঠাল, আম! মামার বাড়ি খুব দূরে নয়, হেঁটেই যাতায়াত, পথিকজনও পরিচিত, কি দিন কিবা রাত। দুপাশ জুড়ে ফসলি ক্ষেত, তখন বিকেল ক্রমে পড়ছে ঢলে, চলছি হেঁটে মা-মেয়ে বিক্রমে। হায়রে কপাল! পথের মাঝেই ভিনদেশি চার-পাঁচ যুবক এসে ধরল ঘিরে, ছিল না আন্দাজ কী চায় ওরা; ওদের চাওয়া জানত ওরাই ভালো- আমরা দুজন, মা আর মেয়ে, দেখেছি মিশকালো বর্বরতার নৃশংস রূপ, মায়ের চেতন হলে মাটির পরে পা বিছিয়ে আমায় অকুস্থলে শুশ্রূষাতে ভরিয়ে দিয়ে বলল কানে কানে -‘জ্ঞান ফিরেছে? এসব কথা কেউ যেন না জানে; ফিরে যাওয়া ঠিক হবে না, মামার বাড়িই চল, কয়েকটা দিন কেটে গেলেই ফিরবে মনের বল’।
**************************
সেই থেকে মাস দুয়েক হল হইনি রজস্বলা, মায়ের নাকি কঠিন ব্যামো, বন্ধ চলা-বলা। কদিন বাদেই অমরলোকে চলল মায়ের গাড়ি, ভাবছি বসে মায়ের পথেই আমিও দিই পাড়ি- এমন সময় বুকের ভিতর কার যেন আবদারে চমকে উঠি –‘মা! সেদিনের পশুর অত্যাচারে আমার জন্ম; ভীষণ ইচ্ছে, আসব তোমার কোলে- মৃত্যুদণ্ড দিও না মা, অবাঞ্ছিত বলে’।
****************************
সে ডাক শুনে ঘর ছেড়েছি নিরুদ্দেশের পথে- প্রলেপ দিতে আসবে কি কেউ কপাল পোড়া ক্ষতে?
***************************
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এক মমতাময়ী মায়ের চোখের দৃষ্টি আমায় করেছে প্রত্যয়ী। সব শুনে সে বলল ‘বাছা, আমাদের আশ্রমে মেয়ে হয়েই থাকবে তুমি, দেখবে ক্রমে ক্রমে তোমার কোলে আলোক হয়ে হাসবে আগন্তুক! সেই কথাটি ভেবেই কাটুক দিনগুলি উন্মুখ।
**************************
আমার এখন চল্লিশে পা, ছেলের পঁচিশ পার, ক’মাস আগেই চাকরি পেল- গ্রুপ বি অফিসার।
*************************
বাবা, তুমি কেমন আছো; কেমন আছে ভাই? আমার কথা ভুলেই গেছ- কিছুই মনে নাই? কী আর আমার করার ছিল? লজ্জা পেতে প্রানে; সারা জীবন কাটত সবার তীব্র অসম্মানে। এই জীবনে স্বপ্ন পূরণ হয় কি সবার, বলো? আমার স্বপ্ন ছেলেই এখন; জীবনের সম্বলও। ছেলের কাছে সব বলেছি জীবন ইতিহাস; আমাদের এই আশ্রমে সব ধর্ষিতাদের বাস। বিয়ের জন্য বলছি কতো, হচ্ছে না সে রাজি, -ধর্ষিতা সব মায়ের জন্য জীবন রাখবে বাজি। উপার্জনের সবটুকু তার আশ্রমে দেয় ঢেলে। এক জীবনে আর কী চাওয়া, এমন রত্ন পেলে!
**************************
কিশোরী মা বলেই ডাকে সকল আশ্রমিক। সময় চলে আপন মনে টিকটিক, টিকটিক...
কিছুই লিখিনা আমি জগতের মহাযজ্ঞ হতে নিজেকে আড়াল করি।সুদৃৃশ্য ঘনকে ঢুকে যাই। আড়ালের নাম গৃহ, যাপনের নাম রাখি সুখ। এ বিশিষ্ট সভ্যতার সমস্ত সৌধে আছে মাননীয়া মৃত্তিকার বিদগ্ধ শরীর; সমস্ত সৌধে তার সন্তানের কঙ্কালসমূহ। মহার্ঘ আড়াল ভেঙে মৃত্তিকার কাছে ছুটে যাই। প্রবৃদ্ধ বৃক্ষের নিচে বসে দেখি দিগন্তের আলো। উড়ান বাতিল করে মাটির সোহাগ পেতে নেমে আসে আনন্দিত দেয়া। মাটির গভীর হতে নীরবে উত্থিত হয় সুগন্ধ-শুশ্রূষা। এ নিবিষ্ট আলোড়ন, এ মুগ্ধতা করেছে বাউল। কিছুই লিখিনা আমি; বঙ্গদেশে সবকিছু লেখা হয়ে আছে।
(পুর্ব মেদিনীপুর জেলার ‘কালো মেয়ে’ শিক্ষিকা ব্রততী দাসের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনায় বেদনার্ত হয়ে) . ১ আফ্রিকা পর্যটনে আঁধারের ইতিহাস কোথাও পাবে না তুমি। ওখানে মানুষ আছে; সূর্য উদিত হয় ভোরে। উদ্বাহু বিজয়ে হাসে নেলসন ম্যান্ডেলা।
আমার ভ্রমণপথে যেন মস্ত হিমালয় জাগে। ব্রততী পাহাড়-সম প্রশ্ন রাখে যাত্রা পূর্বভাগে।
. ২ ব্রততী গাঁয়ের মেয়ে, ত্বকে তার আজন্ম আঁধার। 'রাতেরও আয়ুষ্কাল দিনের সমান' এই ভ্রমে সে-ও বিদ্যালয়ে যায়, বুকে জাগে সময়-সংকেত। ঋতুচক্র সবদেশে দেশজ নিয়ম মেনে আসে।
ব্রততী গাঁয়ের মেয়ে, মেধাবী সে; স্বপ্নবিলাসী। কিশোরী বয়সে তার দুচোখে জেগেছে অভিলাষ। দুচোখে স্বপ্ন তার – কলকাতার ছেলে হবে বর। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পেয়েছে; অকাতরে শিশুমনে আলোকণা বুনে রাখে কৃষ্ণাঙ্গী মেয়েটি।
. ৩ এই পোড়া দেশে হায়, সকলের সময় প্রবাহ সমান বেগেই ধায়। কালো মেয়েটিরও তাই জোটে শরীরে সময়-ছাপ। সংগত কারণে রেগে জেগে ওঠে পিতা। (মূলতঃ সে প্রতিনিধি, মহাভারতের অন্ধ পিতা।)
. ৪ জেগে ওঠে রোষানলে, মেয়েকে সে বলেছে উপায়- ছিদামের বড় ছেলে জেল থেকে ছাড়া পেলে ওর সাথে বিয়ে দেবে; এভাবে মিটাবে কন্যাদায়। এমন বিষোদ্গার করে সে দ্বিতীয়বার বলেছেঃ কুলক্ষণা, কেরোসিন পড়ে না কি চোখে? দ্বিতীয় পথটি ধরে ব্রততী গিয়েছে সরে আঁধারের ইতিহাস লিখে রেখে অনন্ত আলোকে।