খণ্ড খণ্ড বিমুগ্ধতা কবি সুশীল রায় ফেব্রুয়ারি, ২০০০
জীবনে প্রথমবার আমাদের ঝড়ের আভাস অনুভূত হয়েছিলো কিছুটা বাতাস আর কিছুটা মন্দ্রধ্বনি কিছুটা পথিক হয়ে ওঠা
সে এক মুগ্ধতা শুধু, সে এক ঐশ্বর্য আহরন সে এক স্মরন-সুখ, আজীবন তৃপ্ত শিহরন।
২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৫
সুদীর্ঘ বিরতি শেষে আমরা আবার মুখোমুখি চোখ শুধু বলেছিলো, ‘সুখী, মহাসুখী’। সুখীই ছিলাম বটে, বিবর্ণ বিরতি-ভাঙা শেষে অন্তরঙ্গ আলাপন ফুল,পাখি, সঙ্গীতের দেশে।
১লা মার্চ, ২০০৫
কিছু ব্যক্তিগত কথা যা ছিলো আমার বিপরীতে, তোমাকে শোনানো হ’ল; যে কথা আমাকে কিছু ম্লান ক’রে দিতে পারে জেনে তবুও বলেছি, প্রিয়জন অপ্রিয় সকল সত্য, হাসির গভীরে জমা ক্ষত দেখে নিক, বুঝে নিক তার যুক্তি মতো
. ১ কতো দীর্ঘ আরাধনা; সুদীর্ঘ প্রস্তুতি - বিদেশে বেড়াতে যাবো। অজানা গ্রহের মতো দেশে রয়েছে আমার সব ইচ্ছেগুলো পূরণের চাবি। -রয়েছে কবিতা-ফুল, সোনা ও রুপোতে মোড়া . আকাঙ্খার স্বপ্ন জাদুকাঠি। স্বপ্ন যথাযথ হ'লে ছোঁয়া যায় তর্কবিহীন। এবং আমিও শেষে আরাধ্যা দেশের বুকে নামি...
. ২ ভিন্ন দেশের ভিন্-ভাবনায় মরছি জ্বলেপুড়ে, সেইতো আকাশ উদার হাতে ডাকছে বুকের কোলে, সেই তো ফুলের প্রসন্নতা, সেই তো পাখির গানে বাংলা ভাষা, নদী'র বুকে নীল আকাশের চাঁদ নাচছে তাথৈ; ঊর্মিমালায় হাসির তুফান; দূরে রহস্যময় অরণ্যানী, আনন্দ হিল্লোলে গান ধরেছে চিরন্তনী, জাগছে কবি'র প্রাণে কাব্যমালার সৃষ্টি-আবেশ; সহজ নির্বিবাদ নতুন সকাল; মন্দ-বাতাস গান গেয়ে যায় সুরে; সেই তো আমার নয়ন ভোলে, সেই তো হৃদয় দোলে। পাহাড় ডাকে,লজ্জাবতীর সেই তো নয়ন-বাণে বিদ্ধ কবির চিত্তে জাগে কাব্য, অকস্মাৎ।
. ৩ কোথায় বিদেশ! কোথায় বিদেশ! -এই তো মাতৃভূমি; জগত জুড়ে, বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে আছো তুমি। কোথায় বিদেশ! কোথায় বিদেশ! -এই তো বসুন্ধরা; দেশ-বিদেশের ঊর্ধ্বে মানুষ; -ধন্য পরম্পরা।
সুশীল রেখেছে নাম মা-বাবা যতনে, স্বপ্নরাশি চোখেমুখে : খোকা বড় হ'য়ে মহাজন যেন হয় - অন্তরের ধনে। তৃণের চেয়েও নত হোক সে বিনয়ে; সামাজিক যন্ত্রনার তীব্র অবক্ষয়ে কিছুটা প্রলেপ দিক্; -এই ছিলো আশা। অন্তরে ধরেছি আলো স্নেহ সমুচ্চয়ে, ঈশ্বরে বুঝেছি সার সত্য-ভালোবাসা।
দিকে দিকে অন্ধকার জাগে সর্বনাশা, নুয়ে পড়ে মুখোশের মানবিক বোধ। সুশীল সমাজে জাগে বিপুল প্রত্যাশা; -একান্ত গোপনে চলে আমোদ-প্রমোদ। নামের আড়ালে যদি এতো অনাচার, তবে সে নামের মোহ করি প্রত্যাহার।
১ ব্যস্ত ছিলে পূজার আয়োজনে, বিশ্বাসে আর নিজের প্রয়োজনে। মন্ত্র পড়েন সুঠাম পুরোহিত; ছন্দে-সুরে অপূর্ব সঙ্গীত ছড়িয়ে পড়ে তোমার সকল ঘরে ; গৃহকর্তা প্রবাসে কাজ করে। মাইনে ভালো, দেখতে আকর্ষক ; বাড়ি তীর্থভূমি মাত্র, তিনি পর্যটক।
২ ছলচাতুরি বোঝো না, ঊর্বশী ; বারে বারে উর্বরা হও, পর্যটকের অসি বিদ্ধ করে, ঋদ্ধ হওয়া হয়নি, অনুর্বরা সঙ্গত তাই বলছে সবাই, তোমার পরম্পরা শিখিয়ে চলে পাখির বুলি, তুমি অনর্গল শুনলে না তা, পুরোহিতের মন্ত্রপূত জল ধারণ ক'রে সগৌরবে হয়েছো ফলবতী ; ভূভারতে জন্ম নিলো একটি সরস্বতী।
এই কিছুদিন আগের কথা, জাপানবাসী আমি ; পড়শিরা সব ফুলের মতন, বন্ধুরাও ভালো ; সুনামীতে হারিয়ে গেছে অনেক জীবন, বাড়ি।
আমরা ক'জন মিলে সেদিন গান গেয়েছি ; প্রাণ জুড়িয়ে গেছে -ধ্বংস ভেঙে জাগছে জীবনমুখী।
একবার সেই আমেরিকায় আমার ছোট্ট ঘরে একলা বসে মোবাইল-ফোনে বান্ধবীকে নিয়ে মত্ত আছি, এমন সময় ফোনটা গেলো কেটে ; শব্দ বিকট! উপগ্রহ পড়লো না কি ভেঙে! -পড়লো নুয়ে আকাশ ছোঁয়া গর্ব,অহংকার।
আমরা ক'জন মিলে সেদিন গান গেয়েছি; প্রাণ জুড়িয়ে গেছে -ধ্বংস ভেঙে জাগছে জীবনমুখী।
আমি তখন বাংলাদেশের গ্রাম্য লাজুক ছেলে; প্রিয় মাটির গন্ধ মেশা বাংলা আমার ভাষা। হঠাৎ শুনি ভাষার ঘরে লুঠেরা শয়তান! হার না মানা জাতি সেদিন প্রাণ রেখেছে বাজি ; রক্ত-চোখের চোখ রাঙানি রক্তে গেছে ভেসে।
আমরা ক'জন মিলে সেদিন গান গেয়েছি; প্রাণ জুড়িয়ে গেছে -ধ্বংস ভেঙে জাগছে জীবনমুখী।
আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা ছোট্ট চাঁদের দেশে। চন্দ্র-অধিপতি আমায় বলল : 'পৃথিবীটা বড্ড ছোট! রাত পোহালেই দেয়াল গড়ে ওঠে ; ধর্ম-জাতি দেশে দেশে হচ্ছে ক্ষুদ্রতর। পৃথিবীতে তুমিই আমার নির্বাচিত দূত, যাও ওখানে; কেবলমাত্র কবিকূলের কোনো দেশ-জাতি নেই, নেই অবয়ব; চন্দ্রকবিপতি, একটা কাব্যগ্রন্থ লেখো দুই মলাটের তলে এক পৃথিবী মানুষ রবে, এক পৃথিবী দেশ'।
আমরা ক'জন মিলে সেদিন গান গেয়েছি ; প্রাণ জুড়িয়ে গেছে - ধ্বংস ভেঙে জাগছে জীবনমুখী।
নদীর মতন ভাষার মতন জীবন এগিয়ে চলে। এখন তেমন স্বচ্ছতা নেই, শুরুর গতিও গেছে ; এই শুধু সার -অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি বলে বিগত দিনের দুঃখ ও শোক স্মৃতি-রেখা বিছিয়েছে।
নুড়ি-পাথরের চোখে ঘুমঘোর, পয়ার ছেড়েছে ভাষা, বালিকারা ক্রমে কুমারী এখন গোল্লাছুটের ছুটি ; সময়ের স্রোতে ভেসে ভেসে কিছু জমিদারও আজ চাষা; কখনো-সখনো বৃষ্টিবাদলে ভালো আছি মোটামুটি ।
জোয়ারে ভাটায় সমতলে জলে কুজ্ঝটিকার মতো অস্পষ্টতা; ভাষা আধুনিক; কুমারী ক্রমশ নারী, কিছুদিন হলো বুকে মনে হয় জমাট বেঁধেছে ক্ষত ; বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালো আছি,রয়েছে নিজের বাড়ি।
নদীরও আপন ঠিকানা হয়েছে, ভাষা পেয়ে গেছে দেশ ; তুমি ভালো আছো; আকাশে অকাল ঝড়ের অশনি তবে কোন ভাষা বয়ে আনে পৃথিবীতে -কোন কথা অবশেষ এখনো তোমার অন্তরে, স্মৃতি? . -নীতি শেষ কথা কবে?
শাড়ির ঘরে শরীর তোমার ; সিক্ত-আবরণে সব আভরণ আলোক হয়ে ছূটলো...... . সংগোপনে দেখছে বিভোর এক উভচর নিত্যকালের কবি ; বিড়বিড়িয়ে বলছে যে যার - 'এমন বেয়াদবি কাঁহাতক আর সইবো বলুন? অকর্মণ্যের ঢেঁকি, লজ্জা-লাজের মাথা খেয়ে ঘরে কি, বাইরে কি ; উঁকিঝুঁকি মারছে দেদার ; সব নারী বান্ধবী'।