| কবি টি কে সেনগুপ্তর কবিতা |
| পরম আরাধ্যা মাতৃসমা সেজ মামীমার প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি ( প্রতিমা সেনগুপ্ত ) প্রয়াণে শ্রদ্ধাঞ্জলি কবি টি. কে সেনগুপ্ত আজ তুমি নেই যত ভাবি মনে দুঃখ পাই ক্ষণে ক্ষণে । বুঝিবারে বোঝাবারে শত চেষ্টা বিফলে যায় রাত্রি দিনে ॥ স্নেহ ভরা মনে দিনে দিনে করেছ যতন দিয়েছ বুক ভরা মন । যতদিন রহিবে শ্বাস, অত্মবিশ্বাস কেমনে ভুলিব সেসব সন্ধিক্ষণ ॥ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা রয়েছে কত কথা কত ব্যাথা কত ক্রন্দন । রেখেছ আপনকরে মাতৃহারা শিশুরে দিয়েছ শক্তি সাহস সর্বক্ষণ ॥ কোন সুদূর পাটনার বাঁকিপুর থেকে যেদিন এসেছিলে বল্লভপুর গ্রামে । ছোট্ট বালক দৌড়ে এসেছিল টাউন স্কুল থেকে রাম নিবাস বাসভূমে ॥ ভুলি নাই ভুলি নাই সেদিনের কথা ক্লান্ত উজ্জ্বল মুখে সিঁদুর মাখা সিঁথি । মিষ্টি হাসি দিয়ে সুমধুর কন্ঠে ডেকে নিলে কাছে দিলে মনে প্রশান্তি । তৃপ্ত হল মন অনেক কিছু পাওয়ার আকাঙ্খায় দূর হল সকল ক্লান্তি ॥ লজ্জাতুর মুখে কাছে যাই বারে বারে তাকাই মুখপানে যেন প্রতিমা । নামও ছিল তাই পরে ভেবে পাই স্বার্থকনামা আমার মা-মীমা ॥ গান জানতেন গান গাইতেন মধুক্ষরা সুর ও ব্যঞ্জনায় প্রভাতে ও রাতে । অপেক্ষায় থাকিতাম কখন হইবে সকাল কখন আসিবে রাত একসাথে ॥ অশান্ত ও অসহিষ্ণুতায় কখনও কখনও করেছি কাজ দুষ্টুমিতে ভরা । মামার বকুনি আসিবে এখুনি কানমলা আর বেয়াদপ শব্দের ধারা ॥ স্নেহময়ী, মাতৃরূপীনির বেশে ও মানসে উদ্ধার করিতে দিনে রাতে । এই ভাবে কেটেছে দিন তরিছে রাত্রি দায়িত্ব চেপেছে কাঁধে ॥ চাকুরীর সুবাদে সংসারের টানাটানিতে হল ছাড়াছাড়ি । দেখা হল পুণর্বার, সখ্য না ছাড়িবার ব্যাবধানবহুতর যেন অন্য এক বাড়ী ॥ এটা ঠিক কেহ নাহি রবে এ ভুবনে চিরতনে । যেতে হবে ছাড়ি সকল ভালবাসার বন্ধন ভুবনে ॥ তবু আশা রাখি বিয়োগ ব্যাথা না বাড়ায় দৈহিক কষ্ট । যেন যেতে পারি হাসিমুখে লাগাম ছাড়ি হেরি মুখ ক্লিষ্ট ॥ পারেনি দমাতে কোন রোগ জীবনের শেষ ক্ষণে । ক্লান্ত পথিক রচিছ জীবন সংগ্রাম আপন গুণে । বিরক্ত করেছি যত অনুরক্ত হয়েছি তত বেশী । ফিরিয়ে দিয়েছ সব অনুযোগ দীপ্ত মধূর হাসি ॥ সেজমামীমা আজ তুমি নাই ভাবিতে পারি না মনে । সতত সজাগ থাকি এই বুঝি এই বুঝি আসিবে ডাক ফোনে ॥ জানি এ সবই মনের ভ্রম অবচেতন মনের এক দুরূহ আশা । বুঝেও বুঝিতে পারি না এ অলৌকিক ধারণা দীর্ঘদিনের ভালোবাসা ॥ যতদিন রবে এ দেহে প্রাণ বহিবে শ্বাস-প্রশ্বাস থাকবে তুমি মনে । ভুলিবনা, ভুলিবনা, তুমি সেজ মামীমা জাগরুক রবে সর্বক্ষণ আমার প্রাণে । শেষ প্রণাম জানায়ে তোমার দুটি পায়ে ধরে সশ্রদ্ধ চিত্তে । প্রার্থনা করি ভাল থাক সুখে থাক তুমি তোমারই বৃত্তে ॥ . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| আমার মেজ ভগ্নিপতি প্রয়াত অসিত দাশগুপ্ত ( সীতুর ) স্মরনে কবি টি. কে. সেনগুপ্ত জন্মেছিলে বাংলা দেশের ফরিদপুর কোটালিপাড়া গ্রামে | পিতা দীনেশ দাশগুপ্ত মাতা সুনীতি দাশগুপ্ত নামে || কৈশোর পেরিয়ে আসা কলকাতায় থাকা মানিকতলার ভারা বাড়ীতে | স্বাধীনতা আন্দোলনের সৈনিক পিতা কাজ নিলেন পত্রিকায় লেখনীতে || খুল্লতাত নরেশ দাশগুপ্ত স্বাধীনতা সংগ্রামী যুক্ত কমিউনিষ্ট পার্টিতে | অপর জ্যাঠামশাই যোগেশ দাশগুপ্ত ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামীতে || তাঁরই স্মৃতিতে গড়া যোগেশ চন্দ্র মহা বিদ্যালয় হাওড়া শহরে জানি | বড়দাদা শান্তি দাশগুপ্ত অধ্যাপক হয়েছিলেন শিক্ষা মন্ত্রী গুনী ও মানী || অন্য দাদা ছিলেন সত্যজিৎ দাশগুপ্ত আইনী ব্যবসায় হাওড়া বিচার শালার | বড় সংসারের মিলন ক্ষেত্র ভরে উঠেছিল আনন্দে চারিধার || হাওড়া শহরে পৌরসভায় চাকুরি সুবাদে স্থায়ী বসবাস | স্বল্প আয়ে সংসার চালাতে হয়নি হতোদ্দম ফেলেনি দীর্ঘশ্বাস || পূর্ণ উদ্দম ও উত্সাহে আয় বাড়াতে গড়ে তুলেছিল বৃদ্ধাশ্রম | সদা হাসি মুখে সয়েছো যাতনা বুঝিতে বোঝাতে চায়নি অর্থ সংযম || কিছু করার কিছু গড়ার প্রতি ছিল অদম্য আগ্রহ চিন্তশীলতা | সূক্ষ্ম হস্ত শিল্পে গড়ে তোলায় দেখেছি আনন্দ অবয়বে সাফল্যতা || বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে আগ্রহ আকর্ষণ ছিল অনির্বার | কখনও কিনে কখনও চেয়ে পথ বেছে নিত ক্ষুধা নিবৃত্ত করার || কখনও লক্ষিত হয়নি মুখে বিষন্নতা চিন্তার বিমূর্ষ ছায়া | সদা হাস্যমুখ উদ্দমে ভরা বলিষ্ঠতায় পরিপূর্ণ মায়া || দানেশ শেখ লেনে ভাড়া বাড়িতে কাটালে জীবন পুত্রদ্বয়কে গড়ে তোলা | স্ত্রীর আমৃত্যু সঙ্গিনী হয়ে হাসিমুখে সয়েছ দুঃখ যন্ত্রনা করেছ কন্ঠমালা || এ মিলন দেখিবার বুঝিবার অনুকরণিয় ছিল সবাকার | চলে গেলে ২৬শে জুলাই কাঁদিয়ে বিরহবেদনায় যেন নির্বিকার || জন্মিলে মরিতে হবে এই ব্রাত্য কথা জানি | তবুতো মানে না মন শোক বিহ্বল শূণ্য হৃদয়খানি || মনে পড়ে কত কথা, কত ঘটনা স্মরণে আনি বুকে ব্যথা বাজে | তুমি নেই দেখিতে না পাই ভাবি মনে মনে তুমি আছ আমাদের সবার মাঝে || . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| প্রয়াতা স্নেহের মেজ বোন বরুণা দাশগুপ্তের ( রীনা ) স্মৃতির প্রতি কবি টি.কে.সেনগুপ্ত জন্মেছিলে ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে বেজগাঁও গ্রামে | পিতা শৈলেশ কান্তি সেনগুপ্ত মাতা মলিনা সেনগুপ্ত নামে || শৈশব কেঠেছে পিতার ভিটে বিক্রমপুরের হাঁসাড়া গ্রামে | নদী, খাল, বিল পুকুর গাছ-গাছালি ঘেরা সেন বাড়ি ধামে || পিতা কার্যোপলক্ষে এ বাংলায় উপার্জনে ব্যস্ত এক কাকাও তাই | দাদু-ঠাকুমার কর্তৃত্বে অপর দুই কাকা বাড়ী বিষয় আসয়ে ব্যস্ত যারপরনাই || দিন যায় রাত যায় বছর পেড়িয়ে এল কঠিন সমস্যার দিন | দেশ ভাগের চরম সঙ্কট গড়ে তোলে ভীতির সঞ্চার রাত্রি নিদ্রাহীন || সাম্প্রদায়িক হানা হানির ফলে শতসহস্র জীবন হানির আতঙ্কের ছায়া | গ্রাস করেছিল সমাজের সকল অংশের দাগ কেটেছিল দেশ প্রাণের মায়া || শিশুমন বোঝে না এতসব সত্যঘটনা শুধু আন মনে তাকায় সকলের দিকে | চনমনে দুষ্টমিতে ভরা অবুঝ মন যেন বিহ্বল চাহনি বড়দের মুখে || দেশ ভাঙ্গল ঘর বাড়ী দিয়ে বিসর্জন প্রাণ বাঁচাতে ছাড়তে হল দেশ | বোঝেনা শিশু সমস্যা সংশয় ঘটনা প্রবাহ রাজনীতিররেশ || প্রতিকারের আশা নিরাশায় পর্য্যবসিত শুধু হতাশার হাতছানি | দাদু-ঠাকুমা সহ সমগ্র পরিবার নিঃশ্বাসিল কলকাতায় আনি || প্রথমে বৌবাজার হলবর্ধন লেনে ভাড়া বাড়ি পরে দমদমের পূর্বসীথি | এয়ার ভিউ ভাড়া বাড়ি দিল আনি স্বস্তির প্রসার বিড়ম্বনার অনুবিধি || জীবন হল শাস্বত, সংযত কর্মধারায় আপ্লুত ও ফল্গুধারায় সুস্নাত | শৈশব, কৈশোর বিদ্যাভাস দিয়ে শুরু জীবনের ছন্দময় গতিপথ || যৌবনের অগ্রগতি এনে দিল বিভিন্ন দিশা বাড়িয়ে দিল জীবনের গতি | যোগ্যতা পেল বিবাহের খোঁজা হল সম্ভাব্য পাত্রের বানাতে যোগ্যতর পতি || প্রবল বর্ষায় বিবাহ শেষে পতিগৃহে যাবার প্রস্তুতি, আনন্দের অশ্রুধারা | কষ্ট ছিল সেদিন সংগ ছাড়ার ধন্যতুমি নারী কারিগর পতির বাড়ীগড়া || মাধ্যমিক পাশ করে হয়েছিল তোমার বিয়ে আগ্রহ ছিল আরও পড়িবার | কথা মত পরিশ্রম বিদ্যাঅর্জনে স্বামীগৃহে গিয়ে গড়িমা স্নাতক হবার || সেবা দিয়ে নিষ্ঠার সাথে কাটিয়েছ দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন | দিয়েছ অনেক পেয়েছ তার বেশী পাড়ি দিয়েছ জীবন-যৌবন || দুটি পুত্রের জননী তুমি দেখেছ পুত্র বধূদের নাতি-নাতনীর মুখ | পেয়েছ তৃপ্তি ঘরভরা প্রজন্মের সান্নিধ্য দিয়েছিল শান্তি ও সুখ || দীর্ঘ রোগ ভোগ বাড়িয়েছে জীবন কষ্ট অনুভবক্লিষ্ট মুখায়ব | সয়েছো নীরবে কষ্ট পরিতাপে সেবা করতে না পারার পরাভব || তিরিশে জুলাই বিদায় নিয়েছো তুমি কাটিয়ে সবাকার মায়া | নীরবে নিভৃতে নিশ্চিন্তের অভিমুখে ছিলনা মুখে কোনো যন্ত্রনার ছায়া || বিদায় নিয়েছো সবাকার মাঝে দেখিতে পাবনা কোনদিন | শুনিতে পাবনা তোমার ডাক তবে বিরাজিবে তুমি মোদের মাঝে চিরদিন | . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| আমার দাদা প্রয়াত শৈবাল কান্তি সেনগুপ্তের স্মরণে কবি টি.কে.সেনগুপ্ত জন্মেছিলে বাংলা দেশের ( বিক্রমপুরে ) হাঁসাড়া গ্রামে | পিতা শৈলেশ কান্তি সেনগুপ্ত মাতা মলিনা নামে || কেটেছে বাল্য জীবন গ্রাম বাংলায় নদী খাল বিল নিয়ে | ছিল ভরা সংসার আত্মীয় পরিজন সহ আদর আব্দার দিয়ে || ছিল না জাঁক জমক বিরাট আশা আকাঙ্খা কিন্তু শান্তি ছিল মনে | দিন যায় রাত যায় নানা ঘটনায় জীবন এগিয়ে চলে নানান টানে || বংশের প্রথম সন্তান আদর আব্দার আকাঙ্খা ছিল ভারি | শান্ত সুন্দর জীবন সন্ধ্যের পর ভূত প্রেতের ভয়ে বাড়ী || দাদুর প্রথম নাতি ভরসা ছিল জ্বালাবে বংশের বাতি | জীবন হবে কর্মময়, কেউকেটা হয়ে বাড়াবে বুকের ছাতি || গ্রাম্য বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে ঢাকা শহরে হবে উচ্চশিক্ষা | দেশভাগের সর্বনাশা নীতি সকল আশায় ছাই ঢেলে দিল ধাক্কা || উন্মত্ব দিবস ও রজনী শঙ্কা আনি দিল মনে প্রাণ ভয় | প্রতিদিন কাতারে কাতারে মৃত্যুর বন্যা হিংসার কথা কয় || বড়দের কথা শুনে যত না বুঝে আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয় মনে | বুঝিতে চায় বোঝাতে চায় মনে উদ্বেগ চেয়ে থাকে আনমনে || অপরিণত মন বুঝিতে পারে না কেন এমন হয় জনে জনে | কখন কবে শেষ হবে এই রক্তক্ষয় সমাপ্তি ঘটিবে কতক্ষণে || অসহায় মানুষ বুঝিতে পারে না কেন এমন হয় বাধা সম্প্রীতিরপথে | চলে যায় দেশ ছেড়ে সম্পদ সম্পত্তি ভিটে মাটি ছেড়ে বাঁচার তাগিদে || সব মোহ ভঙ্গ করে জীবনের তাগিদে ছেড়ে যেতে হল দেশ বাড়ী | কোন অজানা টানে চোখের জলে ভেসে গেল সব বন্ধন নাড়ী || শৈশব চোখ ব্যাকুলে খুঁজিল নদী খাল বিল আপন জন | শিশু মন অবাক হল দেখে ঘর, বাড়ী, গাড়ী, লোকজন || পরিবারের লোকেদের কোন এক অজানা আতঙ্ক ঘিরে রাখে চারিধার | চলে জীবন যুদ্ধ ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন লোকালয়ে বিব্রত বিধ্বস্ত তাগিদ বাঁচিবার || দিন যায়, রাত যায়, মাস যায়, বছর ঘোরে ঘর গোছাবার তত্পরতা | অসহায় শিশু খুঁজে চলে তার পরিচিত স্থান পরিবেশ অনুভবে অনিশ্চয়তা || কালের অমোঘ নিয়মে সময় ও স্রোত বয়ে চলে আপন গতিতে | দুঃখ শোক তাও কেটে যায় আগামী আশায় বুক বাঁধার আকর্ষণেতে || শিশু একদিন শৈশব কাটিয়ে কৈশোরে পরিণত হয় প্রকৃতির নিয়মে | ব্যস্ত হয় লেখা পড়া আর নিয়ম শৃঙ্খলা মেনে চলার প্রচলিত মাধ্যমে || শিক্ষার কারণে প্রথমে ঝাড়গ্রাম পরে রায়গঞ্জে মেজমামার বাড়ী | শিক্ষা শেষে ফিরে আসা আবার কলকাতায় চলে খোঁজ চাকুরী || সুযোগ এল ছোটমামার বাড়ী বারাউনীতে ইণ্ডিয়ান অয়েলে কর্মসংস্থান | প্রয়োজনের তাগিদে নিজের ও পরিবারের চিন্তায় সরাসরি যোগদান || চাকুরীতে সুস্থির জীবনে পূর্ণতা এনে দিল বৌদির আগমন | প্রকৃতির নিয়মে দু জনে আনি দিল জয় এক পুত্র সন্তান || চাকুরী জীবন শেষ হলদিয়ায়, বাড়ী হল মল রোডে, দমদমে | করিতে জীবন স্মৃতিময় বধূমাতার আগমন বিকাশিল পূর্ণদ্যোমে || বধূমাতা প্রদানিল দুটি কন্যা যমজ সন্তান করিতে পূর্ণ সংসার | সুমেধা সুকন্যার খল খল হাসি টলমলে পদ চারণায় বিন্যস্ত চারিধার || এল কাল দিন ২১শে নভেম্বর, ২০১৬ কেড়ে নিল দাদার জীবন | হারালাম দাদাকে, বিদায় হতোদ্দম শূন্য হল মন || জন্মিলে মরিতে হবে এই ব্রাত্য কথা মানি | তবুও মানে না মন, বোঝেনা যুক্তি মৃত্যু সত্য তাও জানি || . **************** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |