কবি টি কে সেনগুপ্ত - কবির পুরো নাম
“তুষার কান্তি সেনগুপ্ত” এবং ডাক নাম “ভানু”।
তাঁর নিকট আত্মীয়রা তাঁকে “ছোড়দা” বা “ভানুদা”
বলে ডাকেন। কিন্তু সবাই তাঁকে “টিকে সেনগুপ্ত”
নামেই চেনেন। রাজনীতিতে তিনি টি.কে. সেনগুপ্ত
নামেই পরিচিত। এমন কি তিনি নিজে কবিতা লিখে নিচে “টিকে সেনগুপ্ত” সাক্ষর করেন অনেক সময়ে!
কবি জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার বেজগাঁও গ্রামে, তাঁর মাতুলালয়ে। পিতা শৈলেশ কান্তি
সেনগুপ্ত এবং মাতা মলিনা দেবী। কবিদের পৈতৃক বাড়ী ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুর সাবডিভিশনের
হাঁসাড়া গ্রামে। নয় ভাই বোনের মধ্যে কবি ছিলেন মেজ।
১৯৭৯ সালে তিনি চিত্রা দেবীর সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন।
দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে বিচরণ করার পরেও তাঁর নামের ’পরে একটি আঁচরও লাগেনি। তাঁর
"অসাধারণ সাধারণ জীবনযাত্রা" আজকের পঙ্কিল রাজনৈতিক পরিবেশে বেমানান। তাই তাঁকে “কবি” বলে
সম্বোধন করতে মিলনসাগরের কোনও দ্বিধা নেই।
আমরা মিলনসাগরে কবি টি কে সেনগুপ্তর কবিতা তুলে আনন্দিত।
কবির সঙ্গে যোগাযোগ -
চলভাষ - +৯১ ৯৮৩০২৮৯৭৩৫
উত্স -
- ১০ই ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে কবির সঙ্গে একটি সাক্ষাত্কার। মিলনসাগরের পক্ষে সাক্ষাত্কারটি
নিয়েছিলেন মিলন সেনগুপ্ত।
কবি টিকে সেনগুপ্তর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল - srimilansengupta@yahoo.co.in
এই পাতার প্রথম প্রকাশ - ১৫ই আগস্ট ২০২০ ^^ উপরে ফেরত
...
কবি টিকে সেনগুপ্তর শিক্ষাজীবন - পাতার উপরে . . .
ছোটবেলায় মামাদের সঙ্গেই কবির বেশী থাকা হয়েছিল। সেজমামা ভূপালচন্দ্র সেনগুপ্ত ছিলেন পি.ডব্লু.ডি.-র
ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর ছিল বদলির চাকরি। ফলে কবির স্কুলজীবন কেটেছে মেদিনীপুর টাউন স্কুল, বাঁকুড়া জেলা
স্কুল ও বনগাঁ হাই স্কুলে। সেখান থেকেই তিনি মাধ্যমিক পাশ করেন ১৯৫৪ সালে। এরপর বড়মামা
নেপালচন্দ্র সেনগুপ্তর কাছে থেকে, কলকাতার আশুতোষ কলেজ থেকে ইংরেজী অনার্স নিয়ে স্নাতক হয়ে
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন ১৯৫৮ সালে।
কলেজ জীবন থেকেই তিনি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখন ছিল ভারতের অবিভক্ত
কমিউনিস্ট পার্টি। কবি, দলের নেতা গুরুদাস দাসগুপ্তর আহ্বানে All India Students Federation of India তে
যোগদান করেছিলেন।
কবি টিকে সেনগুপ্তর খেলাধুলা ও ক্রীড়া জীবন - পাতার উপরে . . .
কবি বরাবরই খেলাধুলা-দৌড়ঝাঁপে ছিলেন তুখোড়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে তিনি Calcutta
University Blue হয়েছিলেন Long Jump এবং 100 Mtrs দৌড়ে। ১০০ মি দৌড়ে তাঁর নিজস্ব সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ছিল
১০.৮ সেকেণ্ডস! যা সেই সময়ের এশিয়ান গেমস এর ১০০ মিটার দৌড়ের রেকর্ডের সঙ্গে তুলনা করা চলে!
১৯৫১ সালে ভারতের লেভি পিন্টো, ১০০ মিটারে রেকর্ড করেছিলেন ১০.৮ সেকেণ্ডস্ যা কিনা কবিরই সমান!
১৯৫৪ সালে ফিনিপাইনসের ম্যানিলাতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমস্ এ সেই রেকর্ড ভেঙেছিলেন পাকিস্তানের
আবদুল খালিক্ ১০.৬ সেকেণ্ডসে দৌড় শেষ করে।
কবি টিকে সেনগুপ্তর কর্মজীবন - পাতার উপরে . . .
কর্মজীবন শুরু হয় ভারত সরকারের দণ্ডকারণ্য প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ১৯৫৮ সালে। দেশভাগের পরে,
পূর্ববঙ্গ থেকে আসা শরণার্থীদের মধ্যপ্রদেশের দণ্ডকারণ্যে বসবাস করানোর জন্য এই প্রজেক্ট তৈরী হয়েছিল।
তখন ভারত সরকারের রিহ্যাবিলিটেশন মিনিস্টার ছিলেন মেহেরচাঁদ খান্না।
কবি, পুর্ববঙ্গ থেকে আসা শরণার্থীদের প্রথম দলটিকে রায়পুরের নিকট মানা ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে
এসেছিলেন। সেখানকার বোরগাঁও, যুগনিয়া প্রভৃতি বসতির সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। সেখানকার বিচিত্র
অভিজ্ঞতার কথা নিয়ে স্মৃতিচারণের ইচ্ছা ছিল কবির। পারিবারিক কারণে সেই চাকরিটি ছেড়ে তাঁকে
কলকাতায় চলে আসতে হয়।
কবি টিকে সেনগুপ্ত ও ট্রেড-ইউনিয়ন আন্দোলন - পাতার উপরে . . .
দণ্ডকারণ্য থেকে কলকাতায় ফিরে কবি যোগ দেন মার্কারি ট্র্যাভেলস্ এ। তখন ১৯৬১ সাল। এই সময় থেকে
তিনি প্রত্যখ্যভাবে ট্রেড-ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। মধ্য কলকাতার গ্র্যাণ্ড হোটেল সহ
অন্য বহু হোটেলের কর্মচারী ইউনিয়নের তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
এই সময়ে গ্র্যাণ্ড হোটেলে কর্মচারীদের এক আন্দোলন হয়। তখন মালিক ছিলেন রায়বাহাদুর এম.এস.
ওবেরয়। তিনি ডেকে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে? কবি টিকে সেনগুপ্ত বললেন যে কথা তো হবেই কিন্তু
বসে কথা হোক। এটা শুনে অন্যান্য কর্মচারীরাও চমকে গেলেন! মালিক আর শ্রমিক সামনা-সামনি বসে কথা
বলার রেওয়াজ তখনও অজ্ঞাত। ওবেরয় রেগে গেলেও সামনাসামনি বসে কথা বলতে বাধ্য হলেন। তাঁকে
জানিয়ে দেওয়া হলো যে দাবী না মেনে তিনি যদি সবাইকে বরখাস্ত করে নতুন লোক নেন, তাহলেও হটোল
চালাতে পারবেন না। কোনও দাবী মেনে নেবার আগেই কর্মচারিরা উল্লাসে ফেটে পড়ে! তাদের কাছে সব
চেয়ে বড় পাওনা ছিলো মালিকের সঙ্গে সামনাসামনি বসে কথা বলার অভিজ্ঞতা!
এরই মধ্যে ১৯৬৪ তে ঘটে গিয়েছে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন। মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির
জন্ম হয়েছে। সে বছরই কবি সেই দলে যোগ দেন।
কবির পরিবার দমদমে থাকতেন। মার্ক্সবাদের আদর্শ এবং নকশালবাড়ী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৯৬৮
সালে CPI(M) দলে ঘটে যায় আরেকটি বিভাজন। এই দুটি দলের মধ্যে শুরু হয়ে যায় প্রাণঘাতী বৈরিতা।
পশ্চিমবঙ্গে তাঁর দলের সম্পাদক এবং পলিটব্যুরোর সদস্য প্রমোদ দাশগুপ্ত তাঁকে সতর্ক করেছিলেন যে
দমদমে তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কবি তা প্রথমে গ্রাহ্য করেন নি। কিন্তু একবার লোকাল ট্রেনে
বাড়ী ফেরার পথে তিনি সন্দেহজনক দুজনকে দেখতে পান যাঁরা তাঁকে অনুসরণ করছিলো। তারা নিজেদের
মধ্যে তাঁকে নিয়ে চোখে চোখে কিছু ইশারাও করছিলো। কবি তখন উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে তাঁর একটি হাত
তাঁর ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনিও নিরস্ত্র নন। সে যাত্রায় তিনি বেঁচে যান।
তার পরেই তিনি বহু দিন, অন্তত বছর খানেক সারাদিনের কাজের পরে বাড়ী না গিয়ে, কোনও হোটেলের
টেবিলেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন।
এরকম ট্রেড-ইউনিয়ন নেতা আজকের দিনে ক’জন আছেন তা পাঠক ভেবে দেখতে পারেন!
বামফ্রন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে কবি টিকে সেনগুপ্ত - পাতার উপরে . . .
১৯৭৭ সাল। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর দ্বারা বলবত করা Emergency বা জরুরী অবস্থা তুলে নিয়ে নির্বাচন
ঘোষণা করার পরে কংগ্রেস বিরোধী দলগুলি মূলত কংগ্রেস (ও), জনসঙ্ঘ, ভারতীয় লোক দল এবং
সোসিয়ালিস্ট পার্টি মিলে জনতা পার্টি গঠন করেন। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে জগজীবন রাম গঠন করেন
কংগ্রেস ফর ডেমক্র্যাসি নামের একটি দল। রাজ্য ও জাতীয় স্তরেও বিরোধীরা মোর্চা গঠন করেন। সেই
বছরের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে বামফ্রন্ট
লড়াই করেন ২৬টি কেন্দ্রে, যার মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে ছিলেন মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী, যার মধ্যে
তাঁরা ১৭টি কেন্দ্রে জয়প্রাপ্ত হন। বাকি আসনগুলিতে দাঁড়িয়েছিলেন জনতা পার্টির সদস্যরা।
এর পরে এল বিধান সভার নির্বাচন। বামফ্রন্ট আর জনতা পার্টির মধ্যে দীর্ঘ টানা পোড়েন চলার পরে
তাদের কথাবার্তা ভেস্তে যায়। বামফ্রন্ট জনতা পার্টিকে দিতে চেয়েছিলেন ৫৬% আসন কিন্তু জনতাদল
চাইছিলেন ৭০%। নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের ২৩১টি আসনে বামফ্রন্ট জিতে এসে সরকার গঠন করেন
জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রীত্বে।
শ্রমিক নেতা কৃষ্ণপদ ঘোষ হন লেবার মিনিস্টার। কবি টি কে সেনগুপ্ত হন তাঁর কনফিডেনশিয়াল
অ্যাসিস্টান্ট। ১৯৮৫ সালে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তাঁকে Political Secretary to the Chief Minister পদে বহাল
করেন। এর সাথে সাথে তিনি চিড়িয়াখানা সংক্রান্ত Zoological Garden Committee-র সম্পাদকও হয়েছিলেন।
২০০২ সালে স্ত্রী চিত্রা দেবীর মৃত্যুর পরে তিনি Political Secretary-র পদটি ছেড়ে দেন।
কবি টি কে সেনগুপ্তর কবিতা - পাতার উপরে . . .
মিলনসাগরে কেন টি কে সেনগুপ্তর কবিতা তোলা হলো?
এই প্রশ্নটি খুবই উচিত প্রশ্ন। আমরা মিলনসাগরে বহু বহু কবির কবিতা তুলেছি, যাঁদের কবি হিসেবে
পরিচিতির থেকেও বেশী তাঁদের অন্য কাজের জন্য পরিচিতি রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক
নেতা-নেত্রীও।
টিকে সেনগুপ্ত রাজনীতির মানুষ হয়েও কবিতা লিখেছেন মূলত একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে। তিনি লিখেছেন
তাঁর কোনও খুব নিকট আপনজন বা সহকর্মী বা কমরেড বিয়োগে তাঁদের স্মরণে। তাঁর দুটি মাত্র কবিতা
আমরা পেয়েছি যা তিনি কারও স্মরণে না লিখে কোনও সুখবর বা আনন্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে
লিখেছেন। মূলতঃ স্মরণাত্মক কবিতা লেখেন এমন কবি খুবই বিরল। আমরা এমন কবিকে
মিলনসাগরের কবিদের সভায় আসন দিতে পেরে আনন্দিত।
তাঁর কবিতার ভাষা সহজ, সরল এবং স্মরণীয় জনের জীবন-কথা ও ভাব তিনি খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে
তুলতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।