কবি অভিজিৎ হাজরার কবিতা
*
অক্ষর জন্মের ঋণ
কবি অভিজিৎ হাজরা

দূষণ নদীতে বান ডেকেছে ........
.       ভেসে যাচ্ছে শহর থেকে গ্রাম।

সন্ধ্যার অন্ধকারে বিষাক্ত সাপ
.       গিলে খাচ্ছে আস্ত একটা ব্যাঙ
চিৎকারটা ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে ,নিস্তেজ প্রাণ।

লাটাই হাতে দাঁড়িয়ে ,ছেলেটা বড্ড অসহায়
ভোকাট্টা হয়ে যাওয়া ঘুড়িটা আনন্দে পাগল
ছেলেটার ওকে ধরার ক্ষমতা নেই।

শখের রেষ্টুরেন্টে মানুষ পেট্রোল খাচ্ছে
শিরায় শিরায় ছুটছে আগুন
আর বিষাদের কালো ধোঁয়া উঠছে আকাশে।

আধুনিকতার ইতিহাস লেখা থাক তোমার চোখে
বাড়ি ভাড়ার টাকা মেটাতে বিক্রী হয় শরীর
.                 আমাদেরই প্রিয় নিষিদ্ধ শহরে,
আর সমকামীতার এপিটাফ ময়ূরপঙ্খী ভেলায়
ভেসে যাচ্ছে অলকানন্দার গভীর জলে।

আমি এক আটপৌরে কবি ফুলের টবে
যত্নে করছি আলোর চাষ তোমায় দেব বলে
জেনো এ আমার অক্ষরজন্মের ঋণ

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
লড়াই
কবি অভিজিৎ হাজরা

নাঈমা বিবি এই ল‌ও তুমার বকশিশ
তুমার মোরগ মোরে জিতিয়েঁ দিইনচে।
হালিম চাচার চোখে মুখে হাসির ঝলক
নাঈমা বিবির এই মোরগটার নাম বাদশা।

তা কারে হারালো ও ....হালিম মিঞা !
উত্তরটো শুনেই এক মুহুর্তে
ন‌ঈমা বিবির মুকটো ফিকে হয়েঁ গ্যেল্
বাদশার পায়ে নবাবের তাজা রক্ত।

ওরা দুজন ভাই ভাই ছিল ,
কোন বিহান বেলায় দুজন ডাক পাড়তো
নাঈমা বিবির ওদের ডাক শুনে ঘুম ভাঙতো
দুজনে খুঁটে খুঁটে খুদ খেতো উঠোনে।

হালিম মিঞা ও রসুল মিঞা মোরগ লড়ায় হাটে
বাজি রাখে টাকা পয়সা আর দুই অবলার প্রাণ।
দুই ভাই দুই শিবিরে পরস্পরের শত্তুর
পায়ে লোহার নক পরে ওরা লড়াই করতো
মরণপণ লড়াই গো .... খুনোখুনির লড়াই
সব্বায় ওদের লড়াই দেখে হাততালি দিতো
দুজনে লাল ঝুঁটি উঁচিয়ে লড়াই করতো
নবাব, বাদশা ভুলে গেইছিল্ ওরা ভাই ভাই।

নাঈমা বিবির চোখের জল গড়িয়ে পড়চে
নবাব , বাদশার মতো মানুষগুলান্ও অবুজ
ভাই আজ ভাইয়ের শত্তুর ,বোঝে না কেউ
পতাকা উঁচিয়ে লড়াই করে কী পাবে ওরা?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পারবে ফিরায়েঁ দিত্যে
কবি অভিজিৎ হাজরা

অ- বাপ্ পেরানকিষ্ট রে . . .
কুথায় গেল্যি রে বাপ হামাদিগে ছাড়্যেঁ?
অ- বাপ্ , অ- বাপ্ পোরানকিষ্ট রে . . .
তকে যে বারহণ করলিহি
য্যাসনে বাপ্ ঐ পাটিমাটি করতে
নাঁয় শুনলিস বাপ্
বাপ মায়ের কথা নাই শুনলিস বাপ্
পতাকাটো হাতে লয়েঁ সেই যে বেরিন গ্যেলি
আর ফিরল্যি না রে বাপ আর নাই ফিরল্যি।
ঐ লেতা জিত্যে গেইচে রে বাপ জিত্যে গেইচে
আসে লাই দেখত্যে হামাদের
উয়াদের চইখের লে একফঁটাও জল পইরছে নাঁয়
হামার ছাতির ভিতরে হাঁপর জ্বইলছে
দকদঁকায় দমে আগুন সলগিছে
রাত-দিন ভিথরটো জ্বল্যেঁ পুড়ে ছাই হয়ে যাছে
কি লিয়্যেঁ বাঁচবো বাপ্ পেরানকিষ্ট রে।
কি হথ্য যদি ঐ পাটিমাটি নাই করত্যিস
কি এমন ক্ষেতি হথ্য বাপ্ ?
তুঁই তো হামার থাইকথিস
নুন দিয়্যেঁ পান্তাভাত ম্যাখে কাঁচা মরিচ দিথ্যম
মুনিস খাট্যেঁ খাথিস্।
ভোটট্যো দিয়েঁ কী পেলাম্ রা বাপ?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গান দাও পেরানে
কবি অভিজিৎ হাজরা

ও সাঁই গান দাও পেরানে গো
গান দাও ..... মন খুলে গান গাই।

মোড়ক লেগেচে দ্যাশে
কতো যে মরে ভাসলো লদীর জলে
কতেক মরলো অনাহারে .......
এ্য দুক্ আর স‌য় না পেরানে ,
"এ যে বড় আজব কুদরতি" ।

এই রাঙামাটির দ্যাশে
শাল ,পলাশ শিমুলের দ্যাশে
এই জংলা লদীর বাঁকে বাঁকে
তোমার একতারাটো লিয়েঁ
আমি গান গেয়ে ফিরব বাউল বেশে
গান দাও পেরানে সাঁই, গান দাও।

এ দ্যাশেতে আর সুখ লাই গো
আগুন লেগেচে আগুন চারদিকে
এতো অকতো এতো খুন
আর স‌ইতে লারি সাঁই  .........
এ দ্যাশেতে এই সুখ হলো !

মনে হয় লৌকায় পাল তুলে
হারিয়ে যাব অচিন দ্যাশে
যেথায় দুঃখু লাই ,মানুষের কষ্ট লাই
শত্রুতা লাই , হিংসা লাই
গান দাও সাঁই ,পেরানটো জুড়ায়
গান দাও সাঁই এ রাঙামাটির দ্যাশে
"অবোধ মনরে তোমার হ’ল না দিশে।
এবার মানুষের করণ হবে কিসে।"

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ত্যেলের দামটো একশো ট্যেঁকা
কবি অভিজিৎ হাজরা

বলি ও টুকুর বাপ --- এই সক্কাল বেলা
ঐ ভাঙাচোরা, জং ধরা সাইকিলটো লিয়েঁ কী হবেক?
হুঁশ আছে কিছু .... মেয়ে জামাই আসবেক আজ
সক্কাল সক্কাল বাজারটো তো করতে হবেক।

হুঁশ আমার আছে গিন্নী মেয়েমানুষ তু বুঝবি কী !
হিসেব করিস কোথা হতে আসবে গরম ভাতে ঘি।
পাম্পে ত্যেলের দামটো একশো ট্যেঁকা
মোটরসাইকিলটো চালাব কী গিন্নী হাতে লাগচে ছ্যাঁকা।

বলি ও টুকুর বাপ তুমি সাইকিল চড়তে পারবা?
তোমার শরম লাগবেক লাই ... ওটো চড়তে?
ক্যানে , শরম ক্যানে লাগবেক?
কাম কাজের বহর লাই, হাতে লাইকো ট্যেঁকা
একশো ট্যেঁকা তেল্যের দাম, ঘুরবে কী করে চাকা?

বলি ও টুকুর বাপ তোমার শরম লাগবেক লাই ?
বেড়াবে ভাঙা ফুটো সাইক্যেলটো চালায় চালায় !

সোজা করে বলতো দেখি টুকুরমা বলতে কী চাস?
সক্কালবেলা অকারনে ক্যানে মরদটোরে খোঁচাস?

মনে আছে টুকুর বাপ এই সাইক্যেলটোর কুথা
আজ‌ও মনে দগদগে ঘা পেরানে লাগে ব্যাথা।
মোটরসাইকেলটো দ্যায়নাই বলে পাঠিয়ে দিয়েছিলে বাপের বাড়ি
এ কুথাটো এ জেবনে কী আমি ভুলতে পারি?

ও সব কথা ভুলে যা টুকুর মা কবে কী হয়েচে
টুকুর বাপ তা বাদে আর কী কিচু চেয়েচে ?

মুরোদটো তোমার তাইলে ফুটুস হয়ে গ্যালো
বলো
আমার বাপের দেওয়া সাইক্যেলটোই শ্যেষ ভরসা হলো।

সে তুই যা বলিস্ বল্ ত্যেলের দামে হাতে লাগছে ছ্যেঁকা,
সাইকিলেই এবার বাজারে যাব বাঁচবে কটা ট্যেঁকা।
যে ক'টা ট্যেঁকা বাঁচবে টুকুর মা এ মাসের শ্যেষে গুনে গুনে
ঐ ট্যেকাতে একটো লতুন শাড়ি দিবক তুকে কিনে।
টুকুর বাপ চা বসিয়েচি, খেয়ে তারপর বাজারে যেও
আর এই লাও একশো ট্যেঁকা সাইকিলটো ভালো করে বাগিয়ে লিও।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ধিতাং ধিতাং তা
কবি অভিজিৎ হাজরা

বনের ধারে ঝুপড়ি ঘরে ছিলহ্ মোদের বাস
সুখে দুঃখে কেটে যেত বছর মাস।
সন্ধ্যে হল্যে ঘরে ফেরা ফেল্যে মাঠের কাজ
মুনিষ্ খেটে খেতম্ ,সত্যি বলতে লাগে না লাজ।
সাঁঝের বেলহা মেয়ে মরদে খেতম্ মহুয়া
ঘরে ঘরে বাজতো মাদল ধিতাং ধিতাং তা।
পরনে ছিলহ্ ছেঁড়া টেনা্ উল্কি ভরা গা
কী যে সুখ ছিলহ্ পান্তা ভাতে নুন আর লঙ্কা !
বাবু চাই নাই মোরা তুদের মত সভ্য হতে
আনন্দেই ছিলহম্ মারাংবুরুর দোয়াতে !
সভ্য জগতের মানুষ তুদের মনে পাপের বাস
মোদের ব‌উ বিটির মন ভুলায়েঁ করলি সর্বনাশ।
কালা গুলাব ফুটতো মোদের যে উঠানে
সে গুলাবটো সাদা হলো বল দেখি বাবু কেমনে ?
দেশী মহুয়া বাদ দিয়েঁ কে ধরাল্যে চুল্লুর বোতল
বল না এটো কী লয় তুদের সভ্যতার গেরাঁকল !
শাল গাছের পারা গড়ন ছিলহ্ গায়ে অগাধ বল
ধীরে ধীরে ছেলেগুলান হয়ে গ্যেল দুর্বল।
মোদের গাঁয়ে জ্বলছে আজ বিদ্যুতের আলো
সেই আলোতেই মোদের সভ্যতা হারিয়েঁ গ্যেল্ !
ভালো কিছু হয়েচে বটে সেটো ফেলার লয়
আজ ছেলেমেয়েদের হাতে খাতা কলম বই।
লেখাপড়া শিখে সবাই সরকারী চাকরী করে
দেখে মোদের বুকটো বাবু আনন্দে ওঠে ভরে।
আনন্দের মাঝে দুঃখু আছে এ মনটো জুড়ে
ওদের আজ নিজের ভাষা বলতে লজ্জা করে !
প্যান্টশার্টে ওরা হয়েছে তুদের মত বাবু
লোক ঠকিয়ে খাচ্ছে ওরাও ভাবতে পারি না কভু।
একটো কথা শুধায় বাবু সত্যি উত্তর দিস্
কে দিল্যে বল ওদের রক্তে বেইমানির বিষ?
এ দেশটো মোদের ছিলহ্ আমরাই আদিবাসী
এতোদিন কী ভেবেছিলিস আমরাও ভারতবাসী?
আজ ভোটের লগে মনে পড়েচে মোদের কুথা
উঠে পড়ে লেগেচিস্ তাই উন্নত করতে সভ্যতা।
কেউবা তুরা হাততালি দিস দেখে মোদের লাচ
মন্ত্রী হয়েও কেউবা তুরা আনন্দে কোমর লাচাস !
বড় ডর লাগে বাবু কেন্যে জানিস তা ....
দিনে দিনে উন্নত হচ্ছে মোদের সভ্যতা !
কলের গান বাজছে সব জাগাতে ....
কতোদিন আর বাজবে মাদল ধিতাং ধিতাং তা !

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর