আমি চলে যাব কবি অমিত চক্রবর্তী “আমি চলে যাব” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৭৩-৭৪, প্রকাশ ১৯৭৪ মে। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।
আমি চলে যাব সব কিছু গুছিয়ে ফেলেছি কান্নার গন্ধ ভরা ঘরের মেঝেতে এত জল এখন শীতের শেষ চাল ভেঙে বৃষ্টির কথা নয় ধূসর টেবিলে শূন্য জলের গ্লাস চিৎ হয়ে শুয়ে খেজুর গাছের মতো ঝরাচ্ছে জল ফোঁটা ফোঁটা মানুষ কাঁদলে বোঝা যায় তোমরা কাঁদলে ধরা যায়না
এই বুড়ি বটগাছ তুমিও এসেছ কিনা শেষে অন্ধের যষ্টির মতো ঝুরি ধরে নিঃশব্দে আমার দুয়ারে সমস্ত চৌকাঠ জুড়ে তুমি এক বিরাট গম্বুজ, তোমাকে প্রণাম শেকড় দিয়ে জড়িয়ে কেঁদো না এভাবে আমি চলে যাব সব কিছু গুছিয়ে ফেলেছি . **************** . সূচীতে . . .
সমর্থন কবি অমিত চক্রবর্তী “আমি চলে যাব” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৭৩-৭৪, প্রকাশ ১৯৭৪ মে। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।
আমি কোনো ধর্মকে স্বীকার করি না ধর্মের আসল অর্থ ভয় আর পুলিশ বেষ্টনী
আমি কোনো রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন করি না যারা ভাবসত্য বোঝায় না, ছন্দ পাঠ করে বরং সম্মতি জানাবো সমুদ্র জেলে, পর্বত আরোহীদের
আমি কোনো আইনজ্ঞকে স্বীকার করি না যার নীতির বচন মৃত্যুর পাচন স্বরূপ গিলে খায় কপালপোড়া বিধবা রমণী
আমি কোনো ধর্মগুরুকে বিশ্বাস করি না মুখে ওই শতনাম হরে কৃষ্ণ হরে রাম আসলে কিছুই নয় ধর্মের ধুয়ো দিয়ে নারীকে আঁকড়ে ধরে বলে ভয় নেই বাছা তুমি তো আমারই বোন অতীব আপন ভেতরে লুকিয়ে থাকে কঠিন রাবণ
তার চেয়ে স্বীকার করে নেবো একজন বহেড মাতাল যে নিচেতে স্বর্গ দেখে ওপরে পাতাল . **************** . সূচীতে . . .
নো ম্যানস ল্যান্ডের ধারে কবি অমিত চক্রবর্তী “আমি চলে যাব” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৭৩-৭৪, প্রকাশ ১৯৭৪ মে। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।
নো ম্যানস ল্যান্ডের ধারে বেড়ে ওঠা হিংস্র শৈশব এখন যৌবন কখনো ঘুমের চোখে দেখি না সকাল একাল স্তব্ধ যেন ত্রিকাল মাথায় নিয়ে চোরাই চালান হয়ে যায় সেই মতো সব যায় খড়ের জঠর ভেঙে হেঁটে যায় কঠোর বিশ্বাস জঙ্গল ঠ্যাঙানো রাত, ঘরে কম্বল নেই রুগ্ন মায়েরা সব চোখেই দেখে না যেমন দেখেনা জানি আমাদের মহারানী এখানে কঙ্কাল আছে হাজারে হাজার যাদের নিঃশ্বাস ছাড়া আর কিছুই জোটে না দেশের ওপর নিচে ছড়ানো আকাল কতকাল ধরে আর হবেনা আজান একজন রমণী তুমি এতই শয়তান; কেউ তা বোঝে না যেমন বোঝে না কেউ আমি এক দাঁতাল শূকর চোখেতে আমার যেন পলক পড়ে না মন হয় এই দাঁতে সব টেনে ছিঁড়ে ফেলি পালক ছাড়িয়ে মুরগির চিরে ফেলি সার্বিক শোষণ আমার মায়ের বুকে নেই যে বসন পঁচিশ বছর ধরে শৃঙ্খল প্রবাসে দেখেছি মৃত্যুর ভিড় কেউ তা বোঝে না নো ম্যানস ল্যান্ডের ধারে বেড়ে ওঠা হিংস্র শৈশব এখন যৌবন কখনো ঘুমের চোখে দেখি না সকাল . **************** . সূচীতে . . .
নকশালবাড়ি কবি অমিত চক্রবর্তী “মুহূর্ত ক্ষমাহীন” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৭৪-৭৯, প্রকাশ ১৯৮০ জানুয়ারি। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।
তুমি কি এলিয়ে পড়া নতমুখ দিবস যামিনী নাকি অশ্বগামী ক্ষুরধার ঝাঁসি বাঘিনী যদি বলি উপকূলে সপ্তডিঙা মধুকর দেশে না-বোঝা ভাষার মতো ভাষা এক অথবা কোথাও কোন হস্তিনাপুরে ভুলে যাওয়া নদীটির নাম, নাকি হৃদয় উষ্ণ করা বাষ্পদহে বেজে ওঠা হার্দ্য বিউগল!
ইতিহাসের পাতায় -- পোড় খাওয়া জাতীয় চরিত্রে তুমি বুঝি বায়ুভূত বর্ণহীন পাতন প্রক্রিয়ায় টোপায় টোপায় পড়া চুয়াড় বিদ্রোহ, ঋতু পরিবর্তনে -- বার্ষিক আহ্নিক গতির বিবর্তনে শেকল বাঁধা কলে -- বুদ্ধিজীবী বেকার তন্ত্রীতে যেন গভীর গুঞ্জন অথবা পত্রপুষ্পহীন গ্ৰামে গ্ৰামে দেশে দেশান্তরে-শ্বেতাঙ্গ শোষণে রৌদ্রতাড়িত মেঘে জলভরা কালবৈশাখীর নিবিড় বন্ধন।
যুগ যুগে সঞ্চিত ব্যথা আর তামস রজনী ঘেরা পৃথিবীর শঙ্খচূড় বনে তুমি সেই উষ্ণ প্রস্রবণ অথবা সময়হীন - চঞ্চল - ক্ষিপ্রগতি নীল জলধারা; শহরে ধোঁয়ার গন্ধ গ্ৰামেও শান্তি নেই কলোনিতে বাজপাখি ওড়ে তুষ্ট নয় গুপ্তচরে দিবারাত্রি কালো করে অন্যরূপে বহুরূপী নেতা মাটির অনেক নীচে কোথায় যে শুয়ে আছে নিখিলের জাফরান আলো
তার খোঁজে ঝাউবন শিরীষের ডালপালা বসন্তের বজ্র নির্ঘোষে গ্ৰাম দিয়ে ঘিরে ধরে সামন্তের ঘুঘুদের বাসা; ডাগর মোচার বুকে পুষ্ট হয় হলুদ বিন্যাস! উৎসাহ আশায় দোলে রাঙা ভবিতব্য পীত সমুদ্র থেকে উঠে আসে নিপীড়িত মানুষের গান।
সে গান ছড়িয়ে পড়ে গিরিশৃঙ্গে নীলাচলে -- কন্যাকুমারিকায়। আবেগজনিত স্রোতে সংক্ষিপ্ত পরিক্রমায় তর্জনীও মধ্যমার শ্রেণীশত্রু হয় হয়তো তা ত্রুটিপূর্ণ -- ঈষৎ রোমাঞ্চলোভী তবুও মহান তুমি, দুর্ণিবার কেয়াঝোপে অবিরল বিষের গরল।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসে, গ্লানি ও গৌরবে তত্বে ও প্রয়োগে -- দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে তুমি যেন স্পর্ধাধাবিত মেঘে গোপন টেলিগ্ৰাম অথবা তিলককাটা ধর্মভীরু দেশে তেত্রিশ কোটি দেবদেবতার ভিড়ে অন্ধ সাম্প্রদায়িকতায় সুখী মানব সমাজের স্বপ্নে স্পষ্ট দূরাগত স্বগত সম্ভাষণ। . **************** . সূচীতে . . .
রবীন্দ্রনাথ কবি অমিত চক্রবর্তী “চরিত্রের সঠিক প্রতিভা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৩-৮৭, প্রকাশ ১৯৮৭ আগস্ট। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।
আমি বড় হয়েছি খুব আস্তে আস্তে আরও আস্তে আস্তে বুঝেছি এই বাংলাদেশে কবি হতে গেলে অন্তত একবার মে দিবস আর মাকে নিয়ে কবিতা লিখতে হবে, আর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখতে হবে বারবার।
মা আমার কবিতার উঠোনে ধান শুকোতে দিয়ে প্রায়ই ঢুকে পড়ে রান্নাঘরে, কিন্তু খুব কঠিন ছিল মে দিবসের কবিতা লেখা তাও লিখেছি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন হাসপাতালে লাং ক্যান্সারে ফোলাচ্ছিল পৃথিবীর ব্লাডার।
শুধু লিখতে পারিনি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি কবিতা হয়তো এই কবিতার জন্যে আমাকে আরও অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে, হয়তো ঘুম আসবে না মাঝে মাঝে উঠে তাকাতে হবে পশ্চিমের আকাশে।
মুখ ফেরালে যেমন দেখা যায় না কঠিন শিরদাঁড়া রবীন্দ্রনাথ এতই জরুরি এই প্রাত্যহিক অনুভূতির প্রদেশে যে তাঁকে পৃথক করা যায় না কোন কিছু থেকে, যেমন বুকে হাত দিয়ে বলা যায় না কোথায় প্রাণ আছে। . **************** . সূচীতে . . .
আরওয়াল ১৯৮৬ কবি অমিত চক্রবর্তী “চরিত্রের সঠিক প্রতিভা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৩-৮৭, প্রকাশ ১৯৮৭ আগস্ট। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।
তিসি ও রহড় ক্ষেতের ধারে ওই যে শীর্ণ নদী ও ব্যাহত আষাঢ় তার পাশে রৌদ্রে শুয়োর চরিয়ে বেড়াতে কেউ তোমাকে চিনত না। বৈশালী মগধের মতো তোমার ঐতিহ্য নেই -- পত্রহীন শমীবৃক্ষ ছাড়া, ফুলে ওঠা বেলুনের মতো অনন্তের দেহ থেকে নির্মাণ ঝরে যায়।
হয়তো কোনদিন চোখে দেখনি স্বর্ণমুদ্রা; যা সংগ্ৰহ করেছিল পাটলিপুত্রের শ্রেষ্ঠীরা, ফলে নহর ভরাট করে বানিয়েছ জীর্ণ কুটির তোমার ছিল না উজ্জ্বল সামর্থ্য, তাই শোনপুরের মেলা থেকে কিনতে পারনি উন্মুখ পায়েল, এমনকি ছট পরবের দিনে একটু ভয়সা ঘি-র জন্যে লাল করে ভাজতে পারনি ঠেকোয়া। সারাজীবন শুকরীর সাথে কচুর মূল খুঁজে বেড়ালে -- কেউ চষক ভর্তি দ্রাক্ষারস দিল না তোমাকে, ফলে বিধৃত স্তনের মাঝে জন্ম নিল উষ্ণ প্রস্রবন !
আর সেই উদ্ভাস প্রশমনের জন্যে সুধান্যের প্রহরী ও নগর কোটালেরা যখন হত্যা করল একটি ভোরবেলা ও তার প্রকৃত রাজহাঁসকে তখন বুঝলাম শিলালিপির মৌনতা ভেঙে জেগে উঠছে বিকল্প চরাচর। . **************** . সূচীতে . . .
উদ্বন্ধন কবি অমিত চক্রবর্তী “চরিত্রের সঠিক প্রতিভা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৩-৮৭, প্রকাশ ১৯৮৭ আগস্ট। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।
উৎসর্গ : বেঞ্জামিন মোলায়েজ
কুয়োর উপরে কাঠ, কাঠের পাটাতন টানলেই সরে যাবে, তারপর নীল হয়ে যাবে অন্ধকার! যাকে ধরে আনা হয়েছে সে প্রেমিক, রাজনীতিবিদ, কবিও হতে পারে কী আসে যায় তাতে, উচিত শিক্ষা তো দেওয়া হলো।
কিন্তু মুশকিল হল তখন, যখন একটি তারার পাশে এসে গেলো আরও অনেক নক্ষত্র! . **************** . সূচীতে . . .
চরিত্রের সঠিক প্রতিভা কবি অমিত চক্রবর্তী “চরিত্রের সঠিক প্রতিভা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৩-৮৭, প্রকাশ ১৯৮৭ আগস্ট। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।
বিবাহের যোগাযোগ ঘটলে আজকাল অনেকেই বলে সন্তান ভদ্রঘরের, সৎ ও উজ্জ্বল, কোনো পর্টিফার্টি করে না তাহলে কি বুঝতে হবে রাজনীতির উপরে মানুষের ঘেন্না ধরেছে
আমি কিন্তু এমন একটা ছেলেকে চিনি যে রিকশা চালায় আমলকী গাছের ছায়ায় সে দেখেছিল ম্যাজিক লণ্ঠনের আলো
নেতা হিসেবে যাদের আমরা আরাধনা করি তার থেকে ওই ছেলটিই চরিত্রের সঠিক প্রতিভা কারণ মৃত্তিকার অহংকার নিয়ে নিসর্গ যে পরিণত হয়েছে!
চৈত্রের কাঠফাটা রোদে যখন কাকের চোখেও পিচুটি পড়ে রিকশা স্ট্যান্ডে একটা রিকশা থাকেনা তখন কিন্তু ছেলেটা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে নিজের বিশ্বাসে
বর্ষার রাতে যখন প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হয় এই শহরে নৈঋতের চমকানি উপেক্ষা করে সে ভিজতে থাকে, তারপর প্যাসেঞ্জার পেলে উদ্যত বাসুকীর মতো হুড তুলে পথ দেখায় বাসুদেবকে।
আমরা উৎসাহ হারালেও সে তো আর অনন্তের রাজনীতি ছাড়েনি তাই কৃষ্ণ-কামনায় দৈবকীদের পৌঁছে দেয় প্রসূতিসদনে। . **************** . সূচীতে . . .