কবি অমিত চক্রবর্তীর কবিতা
*
কবিতা লিখি বলেই
কবি অমিত চক্রবর্তী
“চরিত্রের সঠিক প্রতিভা” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৩-৮৭, প্রকাশ ১৯৮৭ আগস্ট।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

কবিতা লিখি বলেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো না
চৈতি গাজনের দলে বাঘছাল পরে আমার বালক বয়স
ছাই মেখেছিল সারা গায়ে।

কবিতা লিখি বলেই কলেজে এসে
'আপেলের মতো মুখ, আপেলের মতো বুক' কেয়াকে দেখে
যতীন বাগচীকে অনুসরণ করে লিখলাম প্রেমের কবিতা।

কবিতা লিখি বলেই বন্ধুদের অনুরোধে
লেনিনকে নিয়ে লিখতে হলো এস এফ আই কবিতা
সেই আমার কবিতা যা প্রথম মুদ্রিত হলো।
ফলে একটা দুর্বলতা জন্মালো
আরও দুর্বলতা জন্মালো যখন সবুজ আবির লাগানো মস্তানরা এসে
সমস্ত স‍্যুভেনির ও প্রচ্ছদের পেট্রোগার্ড দখল করলো
আর লেনিনের হাজার হাজার উত্তোলিত হাত
পুড়তে লাগল কলেজ ক‍্যাম্পাসে।

ভেঙে পড়া সেই মূহুর্ত্তের সাক্ষী রাস্তার পিচ, অলিগলির দেওয়ালগুলো
নিজের বুক ফুটো করে পালাতে সাহায্য করেছিল অনেককে
যে পালাতে পারেনি তার ধকধক থেকে পিচকিরি ছুটেছে।

কবিতা লিখি বলেই চলে গিয়েছিলাম আরশি নগরে
বন্ধুর বোনকে নিয়ে রচনা করেছিলাম তপতী সংবরণ উপাখ্যান
অবশ‍্য তাকে পেতে গিয়ে রাজা সম্বরণের মতো
আমাকেও অনেকদিন তপঃক্লেশ ব্রত করতে হয়েছে।

সে ছিল নিতান্তই সাধারণ
কবিতার পংক্তি মসৃণ করার মতো শব্দ তার ভান্ডারে ছিলনা।
তবু খোঁচা লেগে ছিঁড়ে যাওয়া পাঞ্জাবি সে রিফু করতে পারতো
বিষ্ণু দে, সুধীন দত্তের কবিতা না বুঝলেও অসম্ভব যত্ন তাদের প্রতি
আলমারি পরিষ্কার করে কাপড়ের আঁচল দিয়ে
মুছে রাখে  এলিয়ট, মায়াকোভোস্কিকে।

কবিতা লিখি বলেই দুরন্ত গতির সাথে পাল্লা দিয়ে
ছেলের জন‍্যে কিনিনি রিমোট খেলনা
মানুষ মরে গেলে কান্নার লোক ভাড়া করতে হয় যেখানে
সেখানে যতই দুলুক ঝুলন্ত ফুলগাছ আমার কাছে অর্থহীন।

কবিতা লিখি বলেই এক একদিন রাত্রে কিছুই ভালো লাগে না
আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি তারা নেই
তমস্বিনীর ভিতরে শুনতে পাই সমুদ্রের ঝাপটানি
কারা যেনো ভাসে কারা যেনো তলিয়ে যায়
তখন নিজের হাত নিজের গায়ে লাগলে চমকে উঠি !

কবিতা লিখি বলেই আকাশ যেখানে শেষ হয়েছে
সেখান থেকে শুরু করে অধিক আকাশের মধ্য হারিয়ে যাই
হারিয়ে গিয়েও কিছুই আয়ত্তে আনতে পারি না বলে কষ্ট পাই
কষ্ট পাওয়ার জন্যেই কবিতা লিখি।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভিস্তিয়ালা
কবি অমিত চক্রবর্তী
“হালিশহরের চড়ায় দাঁড়িয়ে” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৮-৯০, প্রকাশ ১৯৯০ সেপ্টেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

এঘর থেকে ও ঘর দিয়ে সব ঘরেই সে আসছে
পেট ফোলা এক ছাগলপচা জলের মধ্যে ভাসছে

সেই ছাগলের মুখ বন্ধ অনুরোধ সনির্বন্ধ
জীবন ভোর দেবার জন্যে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে

জলপোকা তার হাত খেয়েছে   কেউ পারেনি জানতে
সিঁড়ি উঠছে সিঁড়ি নামছে  শ্বাস টানতে টানতে

যেই মশকের মুখ খুললো  হাঁড়ি কলসি ভরে উঠলো
পান্থপাদপ হাসি ছড়ালো ধূসর মরুর প্রান্তে

জলপোকা তার হাত খেয়েছে   কেউ পারেনি জানতে

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ইছামতী
কবি অমিত চক্রবর্তী
“হালিশহরের চড়ায় দাঁড়িয়ে” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৮-৯০, প্রকাশ ১৯৯০ সেপ্টেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

বলি দুর হয়ে যা দেখাস না মুখ তবুও স্বভাব দোষে
জড়িয়ে ধরে ফিতে শ‍্যাওলা ছড়িয়ে দেয় ঝাঁঝি;
জল ছিল তার সবুজ আমার শৈশব দিয়ে ঢাকা
এখনো কি যায় থাকা? কই? দেখি না সে মুখখানি
সে ছিল আপন স্রোতা, ছিল সে তো রাজরানি
মৃত কবচীর খোলা ভেসে যায় স্বপ্নের মাঝখানে।

তিতপল্লার হলুদ ফল এখন দুপাশে হয়তো যায়না দেখা
পরিধি বাড়াতে হলধর এসে পড়েছে জলের কাছে
মাঠে গরু নেই, হাত ট্রাকটর; পালিয়েছে মাছরাঙা
বক নেই কাছে, দু-চারটে কাক ডাকছে ভেরেন্ডা গাছে।

গঞ্জের ঘাটে জলগাড়ি ছিল, ভিড়-ঠেলাঠেলি ব‍্যস্ত সবাই মিলে
চিনা সিন্দুর, হুকোর তামাক  কত কি সওদা নিয়ে
'কলি কালের বউ' পাওয়া যেত   মাত্র দু'আনা দিয়ে
নেই সেখানে স্বভাব কবি ঝুমুর ধ্বনি মিশে গেছে অন্তিমে

নদী কোথায়? বদ্ধ জলাশয়! পানক দাম ভর্তি হয়ে আছে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হালিশহরের চড়ায় দাঁড়িয়ে
কবি অমিত চক্রবর্তী
“হালিশহরের চড়ায় দাঁড়িয়ে” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৮-৯০, প্রকাশ ১৯৯০ সেপ্টেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

নাম শুনেছি ইয়াংসির, টেমস, রাইন, ভলগা
প্রতিটি ফল ও ফুলের কাছে
প্রার্থিত যা দেবার আছে
তবু শতমুখের মধ্যে তোমায় খুঁজছি গঙ্গা।

আমি কাঙাল চিরদিনই
অসন্তুষ্ট বিনোদিনী
নুন জোটেনি, ভাত জোটেনি, জোটেনি শর্করা,
তাই লজ্জা শরম ভুলে
বসন খুলে দেখিয়েছিলে
মৃত কাছিমের পিঠের মতো হালিশহরের চড়া।

সেথায় চাষার সফল কর্মে
রামপ্রসাদ যেন পরের জন্মে
ধান বুনছে, ছাগ চরাচ্ছে, উঠনে মাধবীলতা।
জোয়ার- ভাঁটা সবাই বন্ধ
পচা শব আর দুর্গন্ধ
ভাসতে ভাসতে মকরপুচ্ছে চলেছে কলকাতা।

অল্প একটু বালি তুললে
নাব‍্যতা নেই আনুকূল্যে
ন‍্যায়সঙ্গত বন‍্যা এলেও সংসদীয় অবজ্ঞা।
প্রতিটি ফল ও ফুলের কাছে
এখনো প্রভূত দেবার আছে
শত মুখের মধ্যে আমি তোমায় খুঁজছি গঙ্গা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিদায় সম্ভাষণ
কবি অমিত চক্রবর্তী
“হালিশহরের চড়ায় দাঁড়িয়ে” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৮-৯০, প্রকাশ ১৯৯০ সেপ্টেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

চলে যেতে হয়, যায় না কিছুই থাকে মনের মধ্যে
ভালোবাসার মধ্যে কিছু, কিছুটা তার ঊর্ধ্বে।

কেউ কি চায় সহজে তাকে হারায় ?
ভালোবাসা দাঁড়িয়ে থাকে পাগল ঝরনাধারায়!

হঠাৎ এলে মেঘ এবং দুর্যোগে উদভ্রান্ত;
তোমার আঙুল জড়িয়ে ধরতো সবার হাতের প্রান্ত।

তেমন সাহচর্য কি আর সহজে ভুলতে পারি?
এখনো যা বুকের মধ্যে একান্ত সরকারি।

চলে যেতে হয়, যায় না কিছুই, থাকে মনের মধ্যে
ভালোবাসার মধ‍্যে কিছু, কিছুটা তার ঊর্ধ্বে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দু'একজনই আসে
কবি অমিত চক্রবর্তী
“হালিশহরের চড়ায় দাঁড়িয়ে” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৮৮-৯০, প্রকাশ ১৯৯০ সেপ্টেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

দু'একজনই আসে
ভেঙে পড়েনা নুয়ে পড়েনা দীর্ঘ কারাবাসে।

ভিতরে হয় ক্ষরণ
বাইরে নেই সে ধারা
তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে উজ্জীবনের সাড়া।

দু'একজন আসে
ফুটিয়ে তোলে রক্তজবা কুসুম সংকাশে।

দু'একজনই আসে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
চড়ুইপত্র
কবি অমিত চক্রবর্তী
“৩০ শে চৈত্রের পর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৯১- ৯৫, প্রকাশ ১৯৯৫নভেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

একটি ঘরোয়া শব্দকে খুঁজি
ছোটো এক পাখি এসে বসে জানালায়।
আমার মেরুদণ্ড পাইপে ঘোরে, উড়ে যায়
ফের ঘুরে আসে
আরশিতে মুখ দেখে পরম মমতায়।

হই হট্টগোলের শহরে, পাড়াগাঁয়ে
যেখানে মানুষ আছে, আছে সে
নিঃসঙ্গতার কাছেও যায় অনায়াসে।
কোনো ধাঁধা নয়, আড়ম্বর নয়, স্বচ্ছলতা নয়
ভাঁড়ুদত্তকে তাড়িয়ে তুলে আনে জীবনকে।

এরাই আমাদের ঘরোয়া পাখি
পৃথিবীর সব দেশে পাওয়া যায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঠোঙা
কবি অমিত চক্রবর্তী
“৩০ শে চৈত্রের পর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৯১- ৯৫, প্রকাশ ১৯৯৫নভেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

সারাদিন পর ঠোঙায় করে আটা নিয়ে যাচ্ছি
এই আটা দিয়ে ভাঙা মসজিদ সারাবো
এই আটা দিয়ে ভাঙা মন্দির সারাবো।

আগুন পাশে বসে মন্দির বানাচ্ছে
বস্তি ওধারে সেঁকে ফুলিয়ে তুলছে মসজিদ
রন্ধনশিল্পের কাছে বোধহয় সবকিছু হেরে যায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
শঙ্কর গুহ নিয়োগী
কবি অমিত চক্রবর্তী
“৩০ শে চৈত্রের পর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৯১- ৯৫, প্রকাশ ১৯৯৫নভেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

পচা ঋত্বিকের ভিড়ে গেঁজিয়ে উঠেছে বিশ্বকোষ, তবু দূরে
স্বল্প কিছু মেঘ, একরোখা হয়ে যায় মাদক বিরোধী।

সে মেঘের কথা কোনো স্তবকে ধরেনা তাই
অশত্থমা ক্রোধ নিয়ে জেগে ওঠে মিথ্যার ব‍্যাপারী।
আর তখনই ভেসে ওঠে গুপ্তহত্যার ছবি
গভীর সৌপ্তিক রাত; ঘুমন্ত কাকের বাসায় পেচক সদৃশ.....

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিভূতিভূষণ
কবি অমিত চক্রবর্তী
“৩০ শে চৈত্রের পর” কাব্যগ্রন্থের কবিতা, রচনা ১৯৯১- ৯৫, প্রকাশ ১৯৯৫নভেম্বর।
মিলনসাগরে প্রকাশ ৩.৬.২০২১।

আজ তোমার জন্যে সারাদিন কেঁদেছি
থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে
কী বিশাল ভিড় মাংসের দোকানে
হারিয়ে যাওয়ার পর পাক্বা এক বছর হলো
এখনো ছাতা কিনতে পারিনি
ভূতের মতো কোণায় দাঁড়িয়ে
ফাঁকা হলে ফাটা ডিম কিনি অবিশ্বাস্য দ্রুততায়
রোজ চোরের মতো পঞ্চাশ গ্ৰাম তেল কিনতে ভালো লাগেনা।

আজ তোমার জন‍্যে খুব আনন্দ পেয়েছি
সাতদিন মাছ খেতে চাইবেনা বলে
মাংস কিনে আনলাম পাঁচশো গ্ৰাম
রবিবার বাড়ি থাকলে, নিজে রান্না করলে
ছেলেমেয়েরা অপু-দূর্গা হয়ে যায়।
কষা মাংসের গন্ধে তাদের উন্মাদনা ঠেকায় কে
সেদ্ধ না হলেও দিতে হয় দু-পিস্ করে
একটা হলুদ সূর্যের মতো নৈনিতাল।

এই উজ্জ্বল ভক্ষণ দৃশ‍্যে দুজনেই কেঁদেছি
ছুঁতে পারবো কি সর্বজয়া হরিহরকে......

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর