কবি দেবকুমার সোমের কবিতা
*
প্রভুকে নগ্ন দেখে
কবি দেবকুমার সোম
কবির “প্রভুকে নগ্ন দেখে” (১৯৮৭) কাব্যগ্রন্থের কবিতা।

সে রাম নেই
নেই সে অযোধ্যা
অগত্যা
আপনার সে অকুলান কটন্মিলে
আজ তালা

হস্তিনাপুরে প্রভু
সেবার যে ছকে সেজেছিল পাশা
দ্রৌপদীদের শাড়িতে
আপনার সাবান বিজ্ঞাপন
আমাদের প্র-প্রিতামহীদের
জুগিয়েছিল আশা

হায়
এ ঘোর কলিতে
প্রভু সত্যি বলছি
আপনাকে দেখে দুঃখ হয়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অদ্ভুত কবিজন্ম
কবি দেবকুমার সোম

শশ্মানে এক পাগলের বাস
মৃত্যুর অর্থ যার জানা

চাতালে পড়েছে চড়া জোছনা
নির্জন চরাচর
নদীর বুকে ছল্ ছল্ শব্দ
নিশাচরের নির্জন শিকার

একটি মৃতদেহ
নিরাপত্তাহীন
কেউ নেই
কেউ নেই, কেবল
একটি চাটাই আর হাঁড়িকুড়ি
মৃত্যুর অর্থ যার জানা
বন্ধুহীন রাতে তার
এ এক অদ্ভুত কবিজন্ম।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাছা ঘুমিয়ে পড়
কবি দেবকুমার সোম

হাত ফস্কে বেড়িয়ে গেছেন সুসময়
দুস্সময় তিনিও হাঁটি-হাঁটি পা-পা
এখন আমাদের সুখও নেই দুখ্যোও নেই

এখন অন্ধরাতে কড়া নেড়ে
ডেকে যায় পলিটিক্স হাওয়া
বলেঃ ইলেকশন শেষ
বাছা ঘুমিয়ে পড়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিষ
কবি দেবকুমার সোম
কবির 'শূন্য কায়া পূর্ণ ছায়া' কাব্যগ্রন্থের (২০০৬) কবিতা।

কোনো কোনো কঠিন কথা বলা কত সহজ
অথচ সহজ কথাগুলো এমন অবাধ্য
বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখি বিষ এমন জায়গা কোথায়?

উত্সবে সেজে ওঠে প্রাঙ্গণ। ক্রমশ ব্যবহার প্রীতি ও শুভেচ্ছা

গেলাসে গেলাসে ঢেলে নিই পানীয়
সহজাত হওয়ার চেষ্টা করি। মুখে জমে প্রচুর থুতু
প্রভুভক্ত হওয়া ভালো। পোষমানা ভালো। বুঝি সে সব
তবুও কীভাবে বুকের ভেতর জায়গা নেবে এত বিষ!

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বাধীনতা
কবি দেবকুমার সোম

জলের সমীপে গেলে নতজানু
বৃক্ষশীর্ষের ছায়ার ভেতর ভেসে ওঠেন ঈশ্বর
মেধাবি পর্যটক যদি আঁজলা ভরে জল ধরেন
ঈশ্বর তাঁকে উপহার দেন স্বাধীনতা তখন।

হিসাবি মানুষ বারবার পরিযায়ী হতে চেয়ে
মূর্খের মতো সন্তানের অমল মুখ প্রার্থনা করে।
ব্যক্তিগত রক্তক্ষরণ যত গোপন ; ব্যভিচার
তার চেয়েও গোপনতর সমীকরণ
ঈশ্বর মানুষ নন, ক্ষত মোছাবার দায় নেই কারও।

বস্তুত তিনি পাখি যদিও ডানায় লেগেছে
ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষরণ
আকাশের প্রতিভায় উজ্জ্বল হয়ে আছে বিহঙ্গপথ
জলজ প্রাণীর মতো বৃক্ষশীর্ষে থেকে শতাব্দীভর
উড়তে ভুলেছেন আজ ঈশ্বর স্বয়ং।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নির্জনতার কবিতা
কবি দেবকুমার সোম

কোলাহল থেকে কোলাহলে যাই
নীরবতা থেকে নীরবে।
নির্জনে বিজনে নিঃসঙ্গতায়
তবু
বারবার ফিরে আসি সেই একই কোলাহলে

কে কাকে মারছে, কেন মারছে
সে-সব না বুঝেই ভিড়ে যাই একটা দলে
বারবার পালটে ফেলি নিশান
টুপির রঙ, শার্টের বোতাম, চুলের কায়দা
ঢুকে পড়ি বাজারের কেনাবেচায়
ঝগড়া করি গলা ফুলিয়ে রাজনেতার বিরুদ্ধে

নির্জনতার ভেতর ডুবে যাই
গহীন শীতল একাকীত্বে
বারবার তবু খুঁজে পাই নিজেকে
কোলাহলে, আরও কোলাহলে

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হারুমাতাল ও গরু
কবি দেবকুমার সোম

মাঝরাতে বাড়ি ফেরার পথ খুঁজে দিশেহারা হারু
আজ তিরিশ বছর মাতাল সে ডাকে হারিয়ে যাওয়া
গরু এবং প্রথম প্রেমিকাকে।

কখনও আমার সাথে দেখা হয় যদি নিশ্চিত
ছুঁড়ে দেবে হেঁয়ালি
যটা বাজতে যত মিনিট বাকি,
তটা বাজতে তত মিনিট বাকি
কতো মিনিট বাকি?

সময়ের এই গণিত নিয়ে বসে আছি
কতো কাটাকুটি, সংশয়, সংশোধন প্রত্যয়
কেটে যায় ঘুমহীন রাত লক্ষ্মীছাড়া তিরিশ বছর
মাতাল হারু দিশেহারা গরু এবং রমণীর সন্ধানে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভয়
কবি দেবকুমার সোম
সংকলিত “সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা” (২০১৩) থেকে।

এখানে কোনও ঋতু নেই ফুল ফোটার।
ঘাতক মুখোশহীন।
স্বাক্ষরে রেখে দেয় রক্তের রঙ বেচারি প্রেম।

প্রতিদিন পরিচিত হয় অশুভ আত্মা নতুন নামে
সমঝোতা হয় বিপ্লবী ও শাসকের।
শ্বেতপত্রে লেখা হয় শোকগাথা দরদি বিদুষকের।

ভয়। কেবল ঘিরে থাকে চাপা ভয় ইতিহাসবিদের কলমে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দিনান্তে
কবি দেবকুমার সোম

তিনপ্রহর পার হলে আমার দিনান্তের জিরেন
নদী-ঢেউ মুছে দিল বালুচরে গৃহলক্ষ্মীর চরণছাপ
নদী-তটে জ্ঞানবৃদ্ধ সারসদম্পতি, পাকুড়শীর্ষে নিবাক চখাচখি
বলদের ওপর শান্ত বাতাস নদীর কথা কয়।

আঁকাবাঁকা ঘাটমুখো পথ, কলায়ের ক্ষেত, নিষ্পত্র আমলকি বন
দিনান্তের জিরেন কাটি, দেখি কমলকরে পতঙ্গ মৌমাছি
নিকটে কোথাও ফুটেছে কদম্ব, বকফুলে ঈষদ হিল্লোল
দুটি কামপ্রিয় পারাবত চ্ঞুপ্রেমে বধির করেছে বনভূমি।

বিরল নদীঘাটে বিগ্রহহীন ভাঙা মন্দিরখানি ঘিরেছে বট
শিকড়ের গায়ে লক্ষ্মীমন্ত তেল-সিঁদুরের চিত্রাভাষ
দূরে কোথাও শোনা যায় চাঁদবণিকের গান।

দিন অবসানে মেঘমেদুর আলো-ছায়ায় আমার জিরেন
এমন শান্ত দিনান্তে দেখো অন্য কিছু নয়
বলদের পিঠে শান্ত বাতাস কেবল তোমার কথা কয়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঘাট-আঘাটের কথা
কবি দেবকুমার সোম

কেমন হলো দ্যাখ, বহু ঘাটের শেষে তোর নিকট ফিরে আসা  
এভাবে কি ফিরে আসা যায়?

সুভে কা ভোলা রাত মে ওপ্যাস আনে সে
তাকে কি ভোলা বলা যায়?

অথচ কখনও কোত্থাও যাইনি আমি
দূর অথবা নিকট
আমি তোর ছায়াবর্তী থেকেছি পড়শি নারকেল গাছ

গভীর রাতে আকাশে যখন বৃত্ত চাঁদ
আমি উন্মনা পাতা ঝাঁকাই-- দীর্ঘশ্বাস ফেলি

অপু, তুই একবার তোর পুবের জানলাটি খুলে দে
দ্যাখ, যে নারকেল পাতা অনুপ্রবিষ্ট তোর ঘরে
সে আমারই হাত।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর