কবি প্রবীর কুমার চৌধুরীর কবিতা
*
কেন জন্মদিলি আমায়
কবি প্রবীর কুমার চৌধুরী
রচনা ২০.০৮.২০২১।

জোছনার মুখ ভার, তানপুরাটার ছেঁড়া তারে-
কেঁদে যায় বে-সুর বিবর্ণ সন্ধ্যায়।
ভাঙ্গা ভাঙ্গা প্রাচীরের ফাটলের ফাঁকে -
গোপন আছে কত অপ্রকাশিত ইতিহাস।
সম্পর্কগুলো গঙ্গা-পদ্মায় ভেসে যায় মাঝতল ফুটো নৌকায়,
কবরে-চিতায় অতৃপ্ত আত্মা মিলনের দ্বারে দুহাত বাড়ায়।

অজানা পথে হেঁটে চলি স্বজনহীন, নিঃসঙ্গ-একাকী-
দুপাশে জঞ্জালসম অবক্ষয়ের হাতছানি,হাতে তুলে মানিক খুঁজি,
এখনও কত দেখি ছাই চাপা আগুনে বীরগাঁথা কথা বলে।
মাঝে মাঝে থমকে যাই, বৈভবের রঙিন পর্দা নড়ে ওঠে জানালায়-
দেখি - পরকীয়া নির্লজ্জতায় আবেশ মুখর, উন্মত্ত কামনায়,
কুৎসিত, অবৈধ প্রেম আধুনিক সভ্যতায় আনন্দ মুখর।

পথে ঘাটে হিংস্র কুকুর লজ্জিত, নতমুখ দুচোখে ভৎসনা,
ভাদ্রের অপেক্ষায়, নিয়মের ঔরসে অনুশাসনে বদ্ধপরিকর,
এও এক ঈপ্সিত কালচক্র সন্তান কামনা - জীবনচক্রে আত্মসমর্পণ পবিত্রতায়।

কালপ্রবাহ ছুটে চলে শতক নিস্ক্রান্তে ,হতাশার দীর্ঘশ্বাসে -
ক্ষিধেরা উন্মত্ত, অসহায় মাতৃত্বের নিরুপায় সমার্পন-
সন্তান বিকায় হাটে, ঘাটে, খোলা মাঠে,
অশান্ত, দুর্দম অবাধ্য যৌবন কড়ি দিয়ে সঙ্গম কেনে-
হিতাহিত জ্ঞানশূন্য পঙ্কিল সংসার, এও জীবনের অদ্ভুত চলমান প্রহসন।
বুক খুলে ঘরে ফেরা-, ছানার যতন, একদিন সে ছানাও নীড় ভেঙে ডানা মেলে-
পালকে- পালকে  পেরিয়ে যায় গর্ভের আকাশ।

আজও নিশান ওড়ে নীল আকাশে,
কালি ঝুলি মাখা ল্যংটো দেহ-মিথ্যামাখা স্বাধীনতা খায় চেটেপুটে -
কতদিন পরে  কে জানে - স্বরূপ চেনাবে কেহ এ মাটির।
ধোঁয়াশার জীবন বহনে বড় দুঃখ,বড় যন্ত্রণাময় কষ্ট,
কারা যেন গুনছে প্রহর, ভাবছে বসে মৃত্যুই এখন শ্রেয়।
বলনা মাগো তোর গর্ভকোষে কেন জন্মদিলি আমায়?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাসবো প্রগলভতায়
প্রবীর কুমার চৌধুরী
রচনা ১৯.০৮.২০২১।

আজ ছিন্ন-ভিন্ন ,জগৎ বিদীর্ণ, তুচ্ছ অভিলাষ দাসত্বে,
জাগো রে মহাকাল, ধর মর্তের হাল, ধ্বংসের আবর্তে।
বিদ্রোহী ভৈরব, তুলেছে আত্মরব, দিকবলয়ে আশনির সংকেত,
ক্ষুধা দীর্নে মরে, দিনান্তে অনাহারে, কোথা পাবে অনিকেত?

সিঁদুর মুছে যায়, সতী অসহায়, যৌবন লুটায় ধুলায়,
নিরুদ্দেশ যাত্রায়, কলঙ্ক মাখে বাধ্যতায়, ফেরে নাকো কুলায়।

পরশুরামের কুঠারখানি, আকাশে তুলুক জয়ধ্বনি, দুঃসাহস খেলুক,
করি ভেঙে তছনছ, সাজাবো নৌকা-গজ, ধর্মযুদ্ধ চলুক।
দিকে দিকে রব উঠুক, মৃত্যুঞ্জয়ী জাগুক, জাগাবো কালভৈরব,
কুরুক্ষেত্রের প্রগলভ হাসি, শুনতে ভালোবাসি - সত্যের চিরন্তন গৌরব।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রায়শ্চিত্ত
কবি প্রবীর কুমার চৌধুরী

ঘুনধরা খিলান, ভাঙ্গা নাটমঞ্চ, শূন্য ঠাকুরদালান
আজ ধ্বংস দেউড়ির ইতিবৃত্তে নড়বড়ে সংসার।
তিন মহলার দোদন্ড প্রতাপ আর আর্তচিৎকারে -
ভরানো আছে নোনাধরা দেওয়ালে,সাক্ষী ইতিহাসের পাতা।
ঝুলের ঘেরাটোপে টাঙ্গানো অনুতপ্ত মুখ -
অনুশোচনার দগ্ধতায় অন্তরে করুন  মর্মগাঁথা।
সেদিনের গঙ্গার বুকে কত শবযাত্রার মিছিল -
আজও দম্ভ আর শোষনের কাহিনী শোনায় ছেঁড়া তমসুকে।

গুমঘরে রাত্রীনিশীথে কত অসহায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ -
পনেরো থেকে পঁয়তাল্লিশ নিস্তারহীন কান্নায় ভরা।
রক্তাক্ত রাজপথ, বোবা প্রতিবাদের মিছিল, ধরনা,
কৃষ্ণশূন্য মহাভারত আনে যা এখনও ভবিতব্য।
হাসিশূন্য,অশ্রুসজল বাধ্যতায় মেনকারা আবরণশূন্য দেহে - ভরেছে অনীহার বীর্য।
গুমখুন ঢেকেছে লজ্জার সত্য,অর্থের পদভারে ঘুমিয়েছে অনুশাসন।
আজ চাঁদ কলঙ্ক মেখে, মেখে অভিশাপ হয়ে ফিরে আসে আত্মজায়।
কালো অতীত লেপটে আছে রক্তমাখা সিংদুয়ারে,
ক্ষমাহীন কর্মফল বুকে আজ দাঁড়িয়ে অবশিষ্ট হতভাগ্য উত্তরাধিকার।

ভালোবাসাগুলো দুহাতে কুড়ায় ঝড়ে যাওয়া
চাঁদোয়ার ভগ্নাংশ,
ভাঙা পালংকের নিচে সান্ত্বনা খোঁজে  মুছে যাওয়া সিঁদুরের হাহাকার,
গুমঘরে সতীর মুখের অসতীর অট্টহাসিতে ভীত-সন্ত্রস্ত যুবতী।

বাঈমহলে লোভের ঘুঙুর খুশীর ফোয়ারা ছোটায় অশরীরী-
আজও প্রতিহিংসার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অশৌচ হানা দেয় রাজপ্রাসাদে ।
এ যুগের অভিশপ্ত  বংশধর নিরুপায় -রক্তঋণ শোধ করে।

রৌদ্রচিতায় দহীত পরাজিত সময়, শতাব্দীর অবসানেও জীবনের রং ফিকে, ফিকে,
নিশিরাতে অতৃপ্ত আত্মারা আজও বিক্ষুব্ধ মিছিলে প্রতিবাদ তোলে।
জেগে ওঠে যত গোপন জিঘাংসা ছাইচাপা আগুনে -
প্রতিশোধ স্পৃহায় কফিনে ঢাকা আত্মার আত্মজে।
আজও ক্রোধানলে ছিনিয়ে নিতে চায় নিপীড়িত মহাকলরবে অধিকারের আন্দোলন ।
শতাব্দী অতীতের গলিত দেহাবশেষ বয়ে বয়ে দিনান্তে ক্লান্ত, যন্ত্রণাকাতর -
অবসান হোক জীবনের রঙ্গমঞ্চে অভিশপ্ত পদাবলী
ধুয়ে যাক পঙ্কিলতার কষ্টিপাথর,
অবসান হোক জীর্ণ ধরায় ফেলা আসা পূর্বপুরুষের পাপস্খালন।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সময়ের ডাকে
কবি প্রবীর কুমার চৌধুরী

( নির্ভীক ভাবে এগিয়ে চলার নামই জীবন। কবি,সাহিত্যিকের লেখনী কখনও মিথ্যার
আশ্রয় নেয় না তাই কাউকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। মিথ্যার আবরণে সত্য ঢাকা পড়ে
গেছে।সেই সত্য কে উদ্ধার করতে কলম খোঁচানোর ভীষণ প্রয়োজন, না হলে একদিন
আমাদের উত্তরাধিকারীরাই আমাদের কাঠগড়ায় তুলবে।আমরা অক্ষর-শিল্পের  মধ্যদিয়ে
সেই সত্য ও স্বচ্ছ জীবনেরই  জয়গান গাইবো। আমরাই সমাজটাকে পাল্টাব এই হোক
আমাদের মহান ব্রত। )

এখনই সময় ভেবে দেখার-
সত্যি বেঁচে আছি কিনা,জীবন্মৃত-
গাছ,প্রাণ, রাজপথ কাঁদে জীবন যন্ত্রনায়,
কর্মের দোহাই দিয়ে, স্বার্থপরতা পাখা মেলে।
আর কতকাল পলায়ন বৃত্তি আঁকড়ে জীবন?
উত্তরাধিকার চেয়ে আছে স্বকরুন আঁখি জলে।

মিথ্যার আবরণে সত্য যে ঢাকা পড়ে গেছে
শোনো তার গোঙানির আওয়াজ। ছিল, এখনও আছে-
দেওয়ার অনেক কিছুই তো, যা দেওয়ার বাকি আছে।
নিতে নিতে লালসার সিঁড়িতে রাখে মেকি প্রেম,ছলনা।
জীবনের আঙিনায় পেতেছি আয়না-
একবার মুখ দেখো ঝাপসা, বিকৃত ,এতো চেনা যায়না ....

দাবদাহের দুপুরে - শ্রাবনহীন খণ্ডক সূর্য
জ্বালায় চিতা, একদিন - প্রতিদিন -
বিদায়ে ঋণশোধে  কর্মের অনন্ত অভিশাপ,
গ্রহণের ভারে হাতে প্রস্ফুটিত কালিমা রেখা শুধু ভৎসনায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এ কোন স্বাধীনতা
প্রবীর কুমার চৌধুরী
রচনা ১৫
.০৮.২০২১

এ দেশে জন্ম আমার এদেশেই বড়,
এদেশে জন্মাবধি ভয়েই জড়োসড়ো।
এদেশের আরেক নাম সূর্যের দেশ-
এদেশেই ক্ষয়ে ক্ষয়ে কত যৌবন শেষ।

এদেশের অন্ধকারে কে জ্বালাবে আলো?
গণতন্ত্রের নিচেই দেখি জমাট বাঁধা কালো।
স্বাধীনতায় ধনতন্ত্রের একছত্র অধিকার,
গরিবী হটাও বৃথা স্লোগান,বাড়ছে হাহাকার।

লুটেপুটে খাচ্ছে দেখ যত ক্ষমতাবান
বন্ধ কথার,
নীরব দর্শক, শাসনে ভগবান।
স্বাধীনতার চোখে জল,
প্রজাতন্ত্র অজানা,
সকল জাতির ভারতবর্ষ অনেকেই মানেনা।

বাপ,
ঠাকুরদার ভারতবর্ষ স্বপ্নের এক দেশ,
আজ দেখি দৈন্যদশা, বর্বরতা, উৎশৃঙ্খলতায় একশেষ।
মানুষে মানুষে এত বিভেদ, এত অন্যায় কোথায় আছে?
এখন শুধু ক্ষমতা, ঘুষ - বিবেক,মনুষ্যত্ব গেছে।

পঞ্চাশের প্রজাতন্ত্র মানুষকে পুরস্কার,
সম্মান দিল,
আর সংবিধানে মানুষের অধিকার,নাগরিকত্ব পেল।
আজ শুনি হায় প্রজাতন্ত্র মানুষের অজানা,
দিকে দিকে রক্তের হলি প্রতিবাদে তবু মানা।

সংবিধানে ন্যায়বিচার,
স্বাধীনতা, সমতার কথা আছে,
এখন শুধুই মৃত্যুযন্ত্রনা ন্যায়বিচার কার কাছে?
বাহুবলির প্রতাপে রাত ঘুমহীন,
প্রাণ ওষ্ঠাগত-
ওরাই সমাজের রূপকার আর আমরা শরণাগত।

এই স্বাধীনতাই কি চেয়েছিল,
এর জন্যই আত্মবলিদান,
এ স্বাধীনতা দেয় না ভাত,
দেয় না সম্মান।
ফিরিয়ে দাও সেই ভারতবর্ষ যেথায় একতার হাসি-
ছিল শত দুঃখেও খুশির সকাল, ছিল বোধ ভারতবাসী।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জেগে উঠছে প্রমত্ত
কবি প্রবীর কুমার চৌধুরী
রচনা ১৩.০৮.২০২১

কাব্যরশ্মির বিচ্ছুরণে উদ্ভাসিত এ বিশ্বজগৎ
আমি দিবানিশি অবলোকনে ব্যাপিত শব্দ জগতে।
দূর আলোকবর্ষ পেরিয়ে এসেছি জন্মের বাহুডোরে-
হয়তো রব,কিছু কবো সাহিত্যের এ অঙ্গনে।

হয়তো হবে না প্রকাশিত,হয়তো গোপনেই অনন্তকাল
হয়তো গোবাক্ষের অন্তরালে দেখবে মহাকাল।

গ্রহান্তরের দেবতা নইতো,হাড়-মাংস- চামড়াই সম্বল
তবু হৃদয় ভরা আশার স্বপনে মরুদ্দ্যান নেশায় মশগুল।
সমকালের শ্রেষ্ঠ যাঁরা শব্দের তরঙ্গে  কাব্যতরী ভাসান-
শ্রদ্ধাভরে তাঁদের কেতন দুহাতে ভরাই আসমান।

মানবতাবাদী আর সাম্যতা আজীবনের অন্বেষণ
আমি তো কবি নই শুধু অক্ষর প্রেমিক ভীষণ।

অক্ষরনাদে আমার প্রকাশ শুধু  জ্ঞানচেতনার চৈতন্য
সকলে ঘুমায় আমি জাগি নিস্তব্ধতার ছন্দে,মহানন্দে।
নিশান্তে অবকাশহীনতা প্রমত্ত  গ্রামে,গঞ্জে আলোকিত শহরে,
আমি স্তম্ভিত হই যাপনে,দেখি দুর্বৃত্তায়ন জেগে ওঠে কত মনে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অভিযান চলবে
কবি প্রবীর কুমার চৌধুরী
রচনা ১২.০৮.২০২১

শীত মেখে মেখে কেটে যাক নিদাঘের দুপুর,
রাত্রিগুলো বড় বেদনা তুমিহীন একায়,
পাকুর শাখে গান বাঁধি নিরালায়,নিভৃতে-
ঘন কুয়াশায় কান্না ঝরেছে সারারাত।

আকাশ খেলে সূর্য-তারায়,কৃষ্ণগহ্বরে ভীতিহীন,
এ বুকের মাঝে গোপন রেখেছি যে দহন জ্বালা-
আজ শ্রাবনে বৃষ্টিঝরুক শীতল করে প্রাণ।
হাজার স্মৃতির মালা পরি কে বলে আজ একা?

আমি শব্দহীন হতে পারি এ বিমূর্ত সময়ে,
মনে রেখো এখনো বিকিয়ে যায়নি লোভের দাসত্বে।
এখনই ছুঁড়ে দিতে পারি শব্দহীন আগুনে এ দেহ,
আঘাত করতে পারি কবিতার বজ্রবানে সত্যের আহ্বানে।

রোদ চশমার আড়ালে যতই মাপ অবিবেচক মুহূর্ত,
ভুলো না বিধাতার দাঁড়িপাল্লা ঠিক মেপে দিয়েছে।
ভাতের থালায় তাই তো খুঁজে পাই মেহনতি মানুষ-
আজও যাঁদের স্বপ্ন খোঁজার অভিযান গ্রাম,
গঞ্জ, নগরে।

ফসলের স্বাদ-গন্ধহীন ও কপালে স্বেদবিন্দু ঝরে সমানে,
অবসরেও অবসরহীন ছুটে চলি  ব্যস্ত মাঠের কোন্দরে
ঘাম মোছাতেই মুখে হাসি,চোখ বোজে তার সুখে,
লাঙ্গল ফলায় রক্ত ছোঁয়ায় লিখবো-যে কবিতাটি না মোছে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সেই ক্ষন ঠিক ফিরে পাবো
কবি প্রবীর কুমার চৌধুরী
রচনা ২৭.০৮.২০২১।

বরাবরই আমি আশাবাদী, চোখজোড়া স্বপ্নও ভালোবাসি - সাথে তোমাদের।
রোগাতঙ্কে তোমরা কেউ, কেউ নিজেদের দুমড়ে-মুচড়ে কুঁচকে রাখো, দ্বীপের নিচের কালো
ছায়া প্রতীয়মান তোমাদের হরিণচোখের নিচে। প্রগলভ হাসি আর বাজেনা ও প্রিয়মুখে।

অহর্নিশি চোখের জল ভাসায় দেবমূর্তির চরণ - মুক্তির  কামনায়, কামনায়। এতো যে
উদ্দ্যেগে আর হতাশার কথা ভরছ মোবাইলে, ওর যে একটু বিশ্রাম দরকার-তোমরা
বিশ্বাস-ই করো না।
দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য আর তারস্বরের চিৎকার-চেঁচামেচিতে বিদীর্ণ হয় নীলাকাশ - এই
কেমন আছিস, ওরা কেমন আছে ..উৎকণ্ঠার প্রশ্ন, উত্তর, আর কৌতূহলে পরিপূর্ণ অলস,
অবহেলিত সময়।

দিন নেই-রাত নেই কেবলই শোকবার্তায় আলোড়ন উঠছে, কেউ  বলছে নাতো বয়স ছিল
সত্তর, সাথে ছিল ব্রঙ্ক-নিমুনিয়া, আরও ছিল প্রেসার, সুগার? বলছো নাতো কেমো চলছিল,
বাড়ির লোক ঠিকমতো নিয়ম মানেনি তাতেই হয়েছিল সংক্রমিত ! বেপরোয়া,উদাসীন,
নির্লিপ্ত  - কেন  মুখোশ আঁটছে না কিংবা রাখছে নাকের ও মুখের নীচে।
দেখতে হবে তো কে এখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে খৈনি ডোলছে দূষিত  হাতে,কিংবা লোভের
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে পথের ধুলো মাখিয়ে খাচ্ছে মুখরোচক কুখাদ্য।

কেবলি উনি আর নেই, আর কখনো আসবেন না, ইস কি ভালোবাসতেন আমায়..........
বেকার চোখের জলে, নাকের জলে ভাসতে ভাসতে জড়ানো কথার প্রলাপ বকাটা  নিষ্ফল
অরণ্যে রোদন মাত্র। এখুনি, এই মুহূর্তে কঠোর নিয়মে সংযত থাকতেই হবে। ছুটতে হবে
রক্ষণাত্বক, যাতে কেউ না পড়ে আতান্ত্বরে। আর না পড়ে মুখে মাছি, অটুট থাকে হাসি।

এইখানেই তোমাদের সাথে আমার দ্বন্দ্ব , মতবিরোধ।
তোমরা হতাশায় নিমগ্ন আর সরল বিশ্বাস গুলো ধুকে,ধুকে মরছে।
অনেক বিধ্বস্ত, পঙ্গু বিশ্বাস এখনও আমার বুক জুড়ে খেলা করে। তারাই আমায় সান্ত্বনা
দেয়,মনোবল বাড়ায়। নিশীথের একাকীত্বের অবসরে জোনাকির আলোয় পথ করে  তারা
একে, একে প্রতীয়মান পৌঢ়ত্বের এ চোখে, গভীর সোহাগে গলা জড়িয়ে বলে - তুমি কি
ভাবছো, প্রত্যয় রাখো খুব শীঘ্রই এ বিপর্যয় কেটে উঠবে পৃথিবী। আমি,তুমি আমরা
সকলেই আবার হাসবো আগের মতোই।

রোজ ভোরবেলার স্নিগ্ধ,শীতল, নির্মল হওয়া দৌড়াতে দৌড়াতে আমার দক্ষিণ জানালা
দিয়ে ঢুকে আমার গায়ের চাদর টেনে নিয়ে ঘুম ভাঙায় আর উচ্ছলতায় বলে - ওঠো ,
চোখ মেলো, দেখো পূবের আকাশ কেমন লালিমায় আরক্ত। মুক্ত বিহঙ্গ ডানা মেলে উড়ছে
নীল গগনে, আনন্দে উদ্ভাসিত সবুজ প্রকৃতি। এখনও সিন্দুরহীন সিঁথি ভরায় লাল নিশানে।
ক্রমেই পথে পথে
প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে,ফুটছে কথাকলি। দোকান খুলছে,
কাগজের হকার ছুটছে সাইকেলে সংবাদের বোঝা বয়ে।
প্রতিটি বেলায় ফেরিওলা ছুটছে আপন কাজে, বলছে - এখনো প্রাণ আছে তাই এখনও  
আশা আছে। চোখ ভরা স্বপ্ন আছে এখনও।

সময়ের কাঁটায়, কাঁটায় ভোরের রবি সমগ্র পৃথিবী কোলে নিয়ে তার কিরণ চুম্বনে উদীপ্ত
করবে মানুষকে - আমরা ছুটবো জীবন সংগ্রামে।
কেউ থেমে থাকবে না। থেমে তো থাকা যায়না।শুধু
নিয়ম কে আঁকড়ে ধরে চলতে হবে, "জন্মিলে, মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে" এটাই
যে বিধির বিধান।
তাহলে মরার আগেই মরে থাকতে রাজি হবো কেন?

আমি জানি আবার প্রাণপ্রাচুর্যে মেতে উঠবে সবাই। স্রোতস্বিনী  ফল্গু ধারার মতোই বয়ে
চলবে জীবনধারার গতি। হৃদয়ের গহনে থেমে থাকা প্রেম জেগে উঠবে দুঃস্বপ্ন ভুলে।
চারিজোরা চোখ খুঁজতে খুঁজতে খুঁজে পাবে পরস্পরের প্রিয়জনকে। মহামিলনের সানাই
বাজবে প্রথম প্রহরে, আনন্দে ভরে উঠবে নিথর, স্তব্ধ পৃথিবী। আবার কফিহাউসের সেই
আড্ডাটা জমে উঠবে, খোলা কলমের উৎগিরিত মুখের অক্ষরে, অক্ষরে। কাঁটাতারের
বেড়া ডিঙিয়ে ছুটবো ওপারে প্রাণের বন্ধুর আহবানে। কলেজ স্ট্রিটের পথে পথে পুরানো
বইয়ের দোকানে আবার দুটি হাত সচল হয়ে খুঁজবে সুনীল গাঙ্গুলি,শক্তি চ্যাটার্জি, জয়
গোস্বামী, সুবোধ সরকার, বিনয় মজুমদার, জীবনানন্দ কে। আবার সবাই মিলিত হবো
নন্দনে, চিৎকারে চিৎকারে চমকে - থমকে দাঁড়াবে পথ চলতি মানুষ, কৌতূহলী দৃষ্টিতে
খোঁচাবে প্রেমিকা-প্রেমিককে। মোড়ের মাথায় ফুচকার ঝুড়ির সামনে উপচে পরবে ফুচকা
প্রেমিকার দল। সারাদিনের কর্মক্লান্ত মানুষ ফিরে আসবে হাসিমুখে তাঁর নিজস্ব নারীর
কাছে।

আমরা চেনা ছন্দে, চেনা পথে হাঁটবো নতুন দিনের, নতুন পথের সন্ধানে।

"আকাশ ভরা সূর্য-তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ"
সবার মাঝে ভালোবাসার থাকুক আহ্বান।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এক জীবনের পামর
কবি প্রবীর কুমার চৌধুরী
রচনা ২৩.০৮.২০২১।

যে অঙ্গের আকর্ষণে তুমি পঙ্কিল  করে তোলো-
যৌবন বসন্ত,কলঙ্কিত করো প্রেম স্পন্দন,
চির স্পন্দিত কুসুম পল্লবিত চির মিলনের আহ্বান,
কুহক আবরণে, দুর্বার প্রলোভনে বিদীর্ণ করো শাশ্বত নন্দন।

যে নিতম্ব, জঙ্ঘা, যোনিমূলে, স্তনবৃন্তে সৃষ্টির মহা-উল্লাস, ওই নারীদেহের সৌষ্ঠব
নবজাতকের ভ্রূণ আকারে ধরিত্রিতে করে আগমন,যেথায় বন্ধনহারা
মাতৃত্বের মুক্ত আবাহন, সেথায় অনাচারের-বিভিৎস, কুৎসিত, কদর্য বলশালীর অশ্লীল
আচরণ।

নখাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত কুৎসিত অভিলাসে রক্তাক্ত করে তোমার বিকৃত সুখ, যে যোনির
আকর্ষণে তুমি বর্বর, উন্মাদ হয়ে ছোটো নিষ্ঠুর আগ্রাসনে,
আজ পর্দানশীনে চাও সমগ্র মায়ের ভুবন, বর্বরোচিত অনুশাসনে রসাতলে নিক্ষিপ্ত তোমার
কুটিল, হিংস্রকামনা।
অনু, অসুস্থ চেতন।
সেই যোনি, সেই স্তন, সেই নারী শরীর তোমার জন্মদাত্রী স্বরূপ রহস্যে ঘেরা,স্নেহডরে বাঁধা
যাকে করেছিলে মাতৃত্বের অবজ্ঞায় ছেদন।

যে পবিত্র দেহ নিঃসৃত রক্ত-রস নিবিড়ে প্রকীর্ণ তোমার সৃষ্টির বৃত্তান্ত। মাতৃত্বের যে গর্ভে
দশ মাস লালিত - পরম স্নেহ-মমতায় ভ্রূণ থেকে মানব শরীরে প্রত্যাবর্তন,
বিস্মৃতির অতলে বিলীন কি সেই স্মৃতি - প্রাণনাশী কঠোর প্রসব যন্ত্রণার অবশান্তে-
স্নেহশিলা নারীর কোলে ভূমিষ্ঠ তুমি নবজাতক - একদিন প্রথম প্রস্ফুটিত হলো চির
বন্ধনের প্রথম গর্বিত, পবিত্র সম্বোধন ...... মা।
সেই স্তনসুধা আহারান্তে-আজকের তুমি পরিপূর্ণ এক যৌবনলব্ধ মহাবলি পুরুষ,অথচ -
অজ্ঞানতায় কবলিত, উদভ্রান্ত, দিকভ্রান্ত, পাপকর্মের আহ্বানে নিমজ্জিত কামনার ক্লেদার্ত
কাদায় নিমজ্জিত।
মাতৃত্বের স্বরূপ বিস্মৃত,চেতনা ও আত্মশুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে যুগের দূষিত হওয়ায় গা
ভাসিয়ে ধর্ষণ সিক্ত দুহাতে খুলে দাও নরকের দ্বার।

আজ তুমি ও তোমরা বিত্ত্বের,ক্ষমতার,শক্তির দম্ভে সন্ত্রাসে মোড়া অসহনীয় ভয়ে ভরা-
নারীর  আবরণকে বেআব্রু করে,নারীত্ব আর মাতৃত্বকে ভুলুণ্ঠিত করে অট্টহাস্যে ফেটে
পড়ছো নির্লজ্জ্ব, কুৎসিত কাপৌরুষে। ভবিষ্যৎ সোচ্চারিত হবে, জনতার রোষানলে  
ক্ষমাহীন বিচারের কাঠগোড়ায় তোমাদের তুলবেই ইতিহাস। কঠোর দণ্ডই বিচারের
ফলাফল, আগামীর প্রাপ্য।
চরম ঘৃনার চতুর্দিক ময় উচ্চারিত হচ্ছে একটিই স্লোগান আজ - ধিক নরাধম, পামর,
নরকের কীট  শত ধিক।
অকৃতজ্ঞ ,অমানবতা,অপবিত্র, অমার্জনীয় অপরাধে
তোমাদের শেষ পরিচয়  - মাতৃত্বের অভিশপ্ত গর্ভস্রাব।
সহস্র নারীর অভিশাপ বয়ে অতিক্রম করবে দুঃসহ, যন্ত্রণাময় অনন্ত অগ্নিপথ।
যে যোনিতে তোমার সৃষ্টি,পূর্ণতায় অবতরণ, নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপূর্বক সেই
যোনিতেই বলপূর্বক  গমন,বলাৎকরণে। তুমি অস্পৃশ্য,,ক্ষমাহীন, যুগান্তর ব্যাপিয়া নরকে-
নিমজ্জিত থাকো, ব্যর্থতা আর অনুশোচনায় জরাজীর্ণ হোক তোমার পঙ্কিল মনুষ্য জীবন।

দেখতে কি পাবো মানস চক্ষে নারীর উত্তোরন,
মুগ্ধ কি হবো দর্শে খড়্গহস্তে মাতৃশক্তির মহা জাগরণ?
আর কতকাল রইবি মাগো দাসত্বের শৃঙ্খলে?
সংস্কার ভেঙে,রক্তচক্ষ্যে জ্বালা তোর বহ্নিঅনলে-
কাপুরুষ যাক পুড়ে যাক,ভস্ম হোক ত্রিনয়নি দাবানলে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গদ্যে-পদ্যে
কবি প্রবীর কুমার চৌধুরী
রচনা ১০.১২.২০২১

পেটের ভেতর আগুন জ্বলে
           ল্যাংটা শিশু আওয়াজ তোলে
ষড়যন্ত্রের  ফিসফিসানি
            চেঁচাও  নারী  যত অভিমানী।

এমন করেই সাজাও দেখি
            শায়ক বিধুক কুটিল প্রাণে
ক্রোধ বহ্নির  লেলিহান আঁখি
             অগ্নিশিখাও আজ শিরস্থানে ।

রুধীর ধারায় লিখতে বাকি
             সম্প্রীতি সুখের  বিস্তর ফাঁকি
শ্রীমুখে কেবল মিথ্যা শ্লোগান
             জাল-জালিয়াত হচ্ছে  মহান।

পথে মৃত্যু ডাকে দুহাত মেলে
             অস্ত্র তোলে  আজ নিশান ভুলে
স্বপ্নও ঘুমিয়ে গভীর খাদে
            খুলবই মুখোশ প্রতিবাদে ।

গাইতেও  গান দেয়না ওরা
               ভক্তির মাধুকরি ক্ষত  করে
নারী-নেশার কাঙালে ভরা
               জন্মযোনি শুধু কামড়ে মরে।

ছন্দবাণী খুঁজে কোথায় পাবো
               আখরহীন  সব  অন্তমিলে
জানি জানি তখনি পূর্ণ হবো
                জীবন গদ্য - পদ্য তুমি  ছুঁলে।

ছড়িয়ে আছে ও জড়িয়ে আছে
                 সাহস  ভরেই  ডাকবো কাছে
দার খুলে ভাঙবো পরিহাস
                 গড়বো নবরূপে  ইতিহাস।
.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর