কবি প্রবুদ্ধ বাগচীর কবিতা
*
নির্জনতা ডাকবাক্সে
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

১.
সারাদিনের ধুলোয়
যেসব পঙক্তিগুলো হারিয়ে যায়
ফের তারা অন্ধকারে
ফিরে আসে

স্বাভাবিক।

পৃথক বুঝি না।
তবু এই অন্ধকার
কিছু অর্থময়।

২.
ঘর নেই,
শুধু এই পোড়োবাড়ি।
তারই ফাটল দিয়ে
বাজারদর ওঠানামা করে।

তক্ষকের চুপ-ডাক
ঝোপ ঝাড় থেকে।

ঘর নেই,
এই পোড়োবাড়ি ফাটল শেখায়।

৩.
শিশুটি মায়ের কাছে যেতে চায়। স্বাভাবিক।
মা- ও তার সেমিনারে। নারীবাদ।
অগোছালো বাবা এসে কাছে নেয় খুব।
নাছোড় কান্না থেকে একটা দুটো
তারা খসে। খসে না কি?

শিশুটি বোঝে না কিছু। নারী মানে।
সে শুধু মা-কেই চায়। কাঁদে।

৪.
ভয় ভয়
ছাদে এসে ঝুঁকে দেখি
শিরায় আটকে আছে কাঁপজ্বর

তাহলে বিভাস মানে
এরকমই দৃশ্য, গাণিতিক

সবাই আবছাভাবে শিহরণ
দেহ মানে প্রকৃতই
অন্য কোনও ভয়. . .

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বাসযাত্রা : একটি অনুভব
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী


কেউ কেউ পার্ক স্ট্রিট।

বাকিরা হাজরা মোড়ে
বাস পালটে যে যার আশ্রয়ে।

তারপর
বাসের ভেতরে আর কেউ নেই।

একা আমি
এবং মেয়েটি ----

ছুটন্ত জানলা ছেড়ে
ফুরিয়েছে ভ্রমণ সীমানা।
এইবার
অন্যপথে হাঁটা :

“তাড়াতাড়ি চলো”

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ব্যক্তিগত
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

সেই আসে সেই যায় শুধু
আকাশে আয়না ভাঙে
কোন সাগরের নিঃশ্বাস লেগে
দেহ ভেসে যায় বানে?

নদী ঠিক জানে মোহানা কোথায়
আমরা অর্বাচীন
প্রথাগত সুখে ভাগাভাগি করি
নিতান্ত উদাসীন !

বলো তো স্বগতে, ঠিকানা খোঁজায়
কতটুকু আছো থেমে?
তুমি আসো আর চলে যাও ,বৃথা
নিজেরই জ্যামিতি ভেঙে !

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ভুল শব্দ
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

কিছুক্ষণ পরেই যেন ঝলসে যাবে চিতা।
এমনই তো মনে হয়। ভুল শব্দ।
ভ্রষ্ট তপস্যার ভারে ঝুলে এল রাত।
নিঃসাড় ভুবন।

তুমি তো তোমার কথা রাখতে চেয়েছিলে।
নাভিমূলে শীর্ণ প্রপাত। প্রস্থহীন বজ্রের মতন।
দু ফোঁটা ঝর্ণা জলে তোমার মুখশ্রী এসে দেখা দিক।
কেঁপে যাক দুঃসহ হাওয়া ----
লালসা নিবিড় সিঁথি গড়ে দিল ভুল শব্দ

এভাবে কি চেনা জায়
কোথায় অন্যায় ছিল
কতদূর অহংকার?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মুখোমুখি
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

তোমাদের মতো জোয়ান বয়সে
আমরা মাইল মাইল হাঁটতে পারতাম, হে
বুঝলে ব্রাদার,
তোমাদের মতো জোয়ান বয়সে
আমরা পাথর চিবোতে পারতাম,
তোমাদের মতো জোয়ান বয়সে, আমরা…
তোমাদের মতো জোয়ান বয়সে, আমরা …

ক্লান্তি আর অবিশ্বাসের চিকন কাঁকড়
আমাদের ভাতের ভেতর,
সময়ের হাওয়ার রং শ্মশানের মতো কালো

আমাদের মতো বয়সে আপনারা দেখেছেন
কীভাবে সমস্ত দীর্ঘশ্বাস পাথর হয়ে যায়?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
রাত্রিকালীন
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

ভেসে যাক, পূর্ণ রাত
জেগে জেগে ক্ষয় চোখে
আত্মঘাত, ঘুম

তলিয়ে যাবার আগে
স্মৃতি নেই, জোনাকি বিলাস
এমন আঁধার পথে
কানামাছি, অলীক অতীত

ফিরে যাও খোলাপাতা।
নেমেছে সতর্ক বৃষ্টি
নিঃসাড় ঘাসের ভেতর।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সঙ্ঘ পরিবার ২
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

জানি না কীসের সাথে কীসে মিল দিলে
ছাপা হবে সবগুলি কবিতার খাতা
অথবা তত্ত্ববাদী সম্পাদক গালাগালিসহ
বাড়ি বয়ে দিয়ে যাবে লেখাশুদ্ধ খাম
পদবী উচ্ছন্নে দিয়ে যদি লিখি অমুক কুমার
রাস্তার দুপাশ জুড়ে গাছ কাটে যারা
তাদের ধ্মক দিয়ে বলে উঠি, গাছ নয়
আগাছা সরাও --- জানি সেটা প্রোপাগান্ডা হবে
এবং সেসব কথা, এমনকি শুনবে না মার্ক্সবাদী পার্টি !
তবুও লিখতে চাই ছন্দে ভরা সন্ত্রাসের কথা
কিভাবে পাথর ছুঁড়ে মারা হয় প্রথাভাঙ্গা ঘরে
গির্জার সমবেত প্রার্থনার পর গ্রামের মানুষ
যাতে দেখতে পায়, পুড়ে যাচ্ছে পঞ্চায়েত, পাড়া
সাংবাদিক ছবি তোলে লেখা হয় কভার ফিচার
সব পার্টি বনধ ডাকে, খেপে যায় সঙ্ঘ পরিবার।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সঙ্ঘ পরিবার ৩
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে মোমবাতি জ্বালি,
আর মোমের শিখার পাশে থরথর করে কাঁপে
প্ররোচিত অন্ধকার --- এর নাম সত্যি কথা বলা !
সত্যি কেমন ভাবে লেপটে থাকে অক্ষরের খাঁজে
সে যদি দেখত কেউ, বিনাবাক্যে থম মেরে
যাকে বলে, ‘নীরবতা বজায় রাখুন, ধূমপান মানা’
আর সব কী কী যেন বেদবাক্য বলে যায়
সত্য কাম, ধূর্ত দিনের পাশে মুখচোরা রাত্রি যেন
বেমানান রামরাজ্য পোখরানের গায়ে
যেমন কীর্তন বসে সায়েন্স সিটিতে
এখানেই ঘাপটি মেরে বসে আছে ভারতাত্মা
এখানেই অল্প সুদে অন্ধকার দিয়ে থাকি ধার

উঠো গো ভারত লক্ষ্মী চেয়ে দেখ্যা হত্যার বর্ণমালা
কী দারুণ বানিয়েছে সঙ্ঘ পরিবার !

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সঙ্ঘ পরিবার ৪
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

যা খুশি লিখতে পারো, লিখতে পারো প্রতিবাদী ভাষা
লিখো না ধর্ম নিয়ে, ওটা বড় সেন্সিটিভ ইসু,
বরং নিরপেক্ষ থাকো এককোণে চুপি চুপি
ভাবো, কারা এই নিয়ম বানালো আর কারাই বা
ধর্ম নিয়ে লুকোচুরি খেলে আর অস্ত্র নামিয়ে রেখে
দূর থেকে মেপে যায় সাফল্যের সিঁড়ি
কত আর ভালো লাগে রক্তপাত এবং নির্মাণ
তাছাড়া সমস্ত কিছু ঠিক ঠাক মিলে যাবে
তেমন মাথার দিব্যি, কে কবে কোথায় দিয়েছে
সুতরাং এই ভালো --- খোলাখুলি বলো
ধর্ম মানে ছলা কলা ধর্ম মানে নীতি ছারখার
ধর্ম নিয়ে জুয়ো খেলে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাসপাতালে, একদিন
কবি প্রবুদ্ধ বাগচী

যে শিশুটি স্তন্যপান করছে
সে জানে না
একদিন সে-ও তার শিশুর মুখে
দুধ তুলে দেবে।

কাছেই দাঁড়িয়ে এক চপলা কিশোরী
সে এখনো রক্ত দেখেনি ---
জানে না কীভাবে এসে
তার মধ্যে জমা হবে প্রাণবীজ

শুধু যে
বৃন্তখানি গুঁজে দেয়
শিশুটির মুখে ---
সেই জানে
স্তন্যদান, যন্ত্রণা
পূর্বাপর ইতিহাস।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর