কবি সবিতা রায় বিশ্বাসের কবিতা
*
রবিঠাকুর কবিঠাকুর
কবি সবিতা বিশ্বাস

রবিঠাকুর আমি এখন খুবই ছোট ক্লাস ওয়ানে পড়ি
রাতের বেলা স্বপ্ন দেখি যাচ্ছি স্কুলে পুলকারেতে চড়ি
অর্ক দীপ টিটো পাপাই নিমো বান্টি পুপু মিশা মিতুল
ঝগড়া ভুলে সবাই মিলে খুব হাসছি অঙ্ক হলে ভুল

সকাল হলে ভাল্লাগে না ঘরের মাঝে বন্দী হয়ে থাকি
তাইতো আমি সারাটা দিন একমনেতে তোমায় শুধু ডাকি
কাকাই বলে তোমার নাকি বুদ্ধি বেশি সবার কথা ভাবো
বলে দাও না রবিঠাকুর কবে আবার স্কুলবাড়িতে যাবো?

পেনের কালি লাগলে ড্রেসে বকতো মিস কান মলত মা
কাঁদলে পরে চোখ মুছিয়ে আদর করে বলতো মামন খা
বদলে গেছে বাড়ির লোক ঠাম্মি দাদু বাবা কাকাই কাকি
জানো ঠাকুর মা আজকাল বকে ভীষণ কেমন করে থাকি?

বাবার নাকি চাকরি নেই মুখ গুমরে কাকাও থাকে বাড়ি
কাকি বলেছে এমন হলে কেমন করে চড়বে ভাতের হাঁড়ি?
রবিঠাকুর কবিঠাকুর একটা কিছু উপায় তুমি করো
করোনা নামে দুষ্টু রাক্ষসটাকে ঘাড় মটকিয়ে ধরো

শুনেছি আমি ওটাই নাকি সব কিছু সর্বনাশের মূলে
ফিরিয়ে দাও সবার কাজ আমার স্কুল দাও আবার খুলে
রবিঠাকুর তোমার পায়ে দিলাম আমি নয়নতারা ফুল
ছোট্ট বলে আমার কথা রাখতে তুমি কোরোনা যেন ভুল

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গৌতম বুদ্ধ
কবি সবিতা বিশ্বাস

শুদ্ধোধন পিতা তোমার যশোধরা মাতা
সিদ্ধিলাভে সিদ্ধার্থ জগতের ত্রাতা
নিশীথরাতে চন্ন সাথে ছাড়ি পুত্র জায়া
তেয়্যাজিলে রাজ্যপাট পিতা মাতা মায়া

বোধিদ্রুমতলে বসি হল মহাজাগরণ
সার্থক তুমি ছিঁড়ে ফেলে মোহ আবরণ
সকলেরে বেঁধে নিলে একাগ্র ভক্তিতে
মহাগুরু বোধিসত্ত্ব তোমার শক্তিতে

অমৃতবচন দানে দিলে অন্তহীন সুখ
আত্মনিয়ন্ত্রণে ঘোচালে সব জ্বালা দুখ
উন্মত্ত পৃথ্বীরে শান্তি করে দান
অমৃতবাণী শোনায়ে করলে প্রাণবান

খুলে দিয়ে রুদ্ধদ্বার ঘোষিয়া শঙ্খধ্বনি
এলে তুমি অমিতাভ বাজিল তব আগমনি
বিধর্মী বলে আঘাতিলে পরধর্মী কভু
নিজ ধর্মের অপমান তুমি শেখালে প্রভু

ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্রমুষ্টি হেনে
বিশ্ব উজালে তুমি জ্ঞানের আলোক এনে
মহামৈত্রীর বার্তা দিয়ে গৌতম বুদ্ধ
মাতা পিতা জীব প্রেমে বিশ্ব করলে শুদ্ধ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দেশের নাম ভারতবর্ষ
কবি সবিতা বিশ্বাস

যে পথটা শিমুল পলাশের পাপড়ি ঝরে লাল হবার কথা ছিল
সেই পথে আজ রক্তের আল্পনা আঁকা
ওই যে পাখিটা খাবার খুঁজতে খুঁজতে খুঁটে খাচ্ছে শস্যদানা
তার ঠোঁটে লেগে আছে রক্ত
যে চারাগাছটা নতুন পৃথিবী দেখবে বলে উঁকি মারছে
পাথরের আড়াল থেকে, তার পাতায় রক্তের ছিটে
রক্ত-রক্ত-রক্ত—
গরম রক্ত, ঠান্ডা রক্ত
ঠান্ডা রক্ত জমাট বেঁধে আছে লাশের শরীরে
খোলা চোখে বিস্ময় ! আমায় মারলে কেন ?

আড়ালে কেন কবিতা? এগিয়ে এসো, উত্তর দাও
ওই শিশুটির চোখের কোণে টলটল করছে মুক্তোদানা
মুছিয়ে দাও কবিতা, হাসি ফোটাও শিশুর মুখে
তুমি পারবে কবিতা, তুমিই পারবে
তুমি ছাড়া আর যারা আছে, তারা কেউ আগুনে ঘি ঢালবে,
কাঠ দিয়ে উস্কে দেবে আগুনটাকে
কেউ রড আনবে মাথা ফাটানোর জন্যে, আনবে পিস্তল, অ্যাসিড, বোমা
ওসব দেখে তোমাকে ভয় পেলে চলবে না
এগিয়ে যেতে হবে দৃঢ় পায়ে
তোমার গর্জনে পিছু হঠতে বাধ্য হবে কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা অন্যায়, অত্যাচার

তুমিই পারবে কবিতা সাম্যকে আবার ফিরিয়ে আনতে
পারবে গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলা দেশকে
ঠিক পথের সন্ধান দিতে, নতুন দিশা দেখাতে  
ভুললে চলবে না এ দেশ তোমার, এ দেশ আমার, এ দেশ সবার

সাম্যের মৈত্রীর ভালবাসার

এ দেশের নাম ভারতবর্ষ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
স্বাধীনতা আমার
কবি সবিতা বিশ্বাস

স্বাধীনতা আমার ঊষার আলো
সাতটি ঘোড়ার রথ
বিজয় মিছিলে একসাথে চলা
লক্ষ যোজন পথ

স্বাধীনতা আমার দামাল ছেলে
সুকান্ত নজরুল
সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতা
দুরন্ত বুলবুল

স্বাধীনতা আমার বিনয় বাদল
দিনেশ ক্ষুদিরাম
সূর্যসেনের বিপ্লবী সাথি
প্রীতিলতা তার নাম

স্বাধীনতা আমার রবিঠাকুর
সোনার বাংলা গান
দ্বিজেন্দ্রলালের ধনধান্য
জুড়ায় সবার প্রাণ

স্বাধীনতা আমার বটের ঝুরি
শিউলি ফুলের বাস
ঢ্যাং কুড়া কুড় ঢাকের বোলে
চামর দোলানো কাশ

স্বাধীনতা আমার মায়ের স্নেহ
আদর আঁচল পাতা
ইচ্ছে মতন কবিতা লেখার
খেয়াল খুশির খাতা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন
কবি সবিতা বিশ্বাস

জন্মদিন আসে পিতার একটি বছর পরে
সতেরোই মার্চ শাঁখ বাজে সব বাঙালির ঘরে
আঁধার কেটে সকাল আসে নতুন সূর্য ওঠে
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে শিমুল পলাশ ফোটে

গাছের শাখায় কোকিল ডাকে কৃষ্ণচূড়া ঝরে
এমন দিনে শেখ মুজিবকে সবার মনে পড়ে
মায়ের কোলে এসেছিলেন টুঙ্গিপাড়া গ্রামে
মাতা সায়েরা বাবা লুত্ফর ডাকতো খোকা নামে

ছোটো খোকা কাটতো সাঁতার বাইগার নদীর জলে
ময়না পাখির ছানা পুষতো মজার খেলার ছলে
বাসতো ভালো ছোটদেরকে করতো খুব আদর
শিশুদিবসে তার নামেতে মাজারে চড়াই চাদর

রাধাচূড়া পাপড়ি ছড়ায় জন্মদিনটি এলে
দুই বাংলার জল বাতাসে তাঁরই পরশ মেলে
জন্ম হল বাংলাদেশের জাতির পিতার জন্য
মহান নেতা শেখ মুজিব ধন্য তুমি ধন্য।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বদমাশ বেড়ালটা
কবি সবিতা বিশ্বাস

পুশি রানি খুশি হয় পেলে মাছ জ্যান্তো
সাথে চাই কুচো বড়ি তিন থালা পান্তো
রাতদিন ছোঁক ছোঁক খালি করে হামলা
বাড়ি বাড়ি টেনশন হাঁড়ি কড়া সামলা

ভয়ে থাকে ভোলা কাকা এই বুঝি ঢুকলো
খোলা পেলে সন্দেশ গোঁফ নেড়ে শুঁকলো
পুলি খায় পিঠে খায় মন দেয় পায়েসে
চুক চুক চুক চুক দুধ খায় আয়েশে

সারাদিন টই টই গ্রাম জুড়ে শঙ্কা
নচ্ছার বেড়ালের তাতে লবডঙ্কা
ক্ষেপে গিয়ে সাজু চাচা বলে ওঁচা বিল্লি
তোকে আজ পাঠাবোই রাজধানী দিল্লি

বদমাশ বেড়ালটা শয়তান মিচকে
দাগী চোর মোটে নয় হাতটান ছিঁচকে
ফ্যাঁচ করে হেসে দিয়ে মারে এক লম্ফ
ছোটাছুটি সার হয় মিছে জগঝম্প।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বন্ধু ছেলেবেলা
কবি সবিতা বিশ্বাস

সুঁড়কি গুড়োর হলুদ আর সাদা বালির নুন
কিম্ভূত সেই ঝোলের স্বাদ অদ্ভুত তার গুণ
সেসব কথা মনে আছে তোর বন্ধু ছেলেবেলা
কাঁচ পোকা টিপ বেড়া বিনুনি এক্কাদোক্কা খেলা
কাঠের ঢেঁকি মাটির জাঁতা হাঁড়িকুরি খুন্তি হাতা
আরও কি সব আবোল তাবোল ছাতার মাথা
পদ্য লেখার লুকোনো খাতা অবন খুড়োর বই
সেসব কিছুই হারাসনি তো সত্যি বল তুই
পাড়া ঘুমোলে এখন ও কি রাজপুত্তুর আসে ?
টগ্ বগা বগ্ ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ কানে ভাসে ?
হাড় মটমটি রাক্ষসী রানির হাঁউ মাঁউ খাঁউ  
বাঁশবাগানে কাঁদতো বসে দুই শকুন ছাউ
সকাল হলেই গোল্লাছুট কাশের বন পাড়ি
অবাক চোখে চেয়ে দেখতাম অপু দুর্গার গাড়ি
দুপুরবেলা বেতের ছড়ি হারু পন্ডিতের ঘুম
ঈশান কোণ আঁধার করে মেঘের গুড়ম্ গুম্
ছেলেবেলা বন্ধু আমার রাগ করিস না ভাই
পুরনো সেই দিনগুলোকে ফিরে পেতেই চাই
চুপিচুপি তুই আর আমি চল্ যাই এইবেলা
ডুগ্ ডুগা ডুগ্ ডুগ্ ওই ডাকছে চড়ক মেলা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আয় নদী ফিরে আয়
কবি সবিতা বিশ্বাস

চেনো নাকি নদীটাকে মাথাভাঙা নাম
ভেঙে গেছে মাথা তার নেই আর দাম
কোল জুড়ে উচ্ছল ছলছল চূর্ণী
বয়ে যেত কলকল দুরন্ত ঘূর্ণি

নেই আর নেই সেতো কালো পচা জল
থেমে গেছে মাছেদের সব খলবল
পচা পাঁক পলি জমে শীর্ণ শরীর
চঞ্চলা ঢেউ নেই হয়ে গেছে স্থির

বুক খুঁড়ে চাষী ভাই ধানবীজ বোনে
চাতকের মতো জেলে বসে দিন গোনে
কাঠি জাল খেপ জাল খাপরার চালে
গাব মাখা নৌকোটা পড়ে থাকে ঢালে

কাতরায় ইছামতী খুঁজে ফেরে পথ
ঝড় তুলে চলে যায় চার চাকা রথ
আয় নদী ফিরে আয় ভুলে অভিমান
মাঝি ভাই ধরো তুমি ভাটিয়ালী গান।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঠামির গল্প
কবি সবিতা বিশ্বাস

ঠামি তখন দাঁত ফোকলা একটু কুঁজো
থাকতো বসে কাঁথাটা মুড়ে সন্ধ্যেবেলা
আমরা সব ভাইবোনেরা পড়ার শেষে
কাগজ কেটে চোর পুলিশ করছি খেলা

ডাকতো ঠামি আয়রে কাছে গল্প বলি
একযে রাজা একযে রানি থামোনা ঠামি
ওসব কথা সত্যি নয় | ভাল্লাগে না
মুখের পরে বলেই দিত কুচুটে বামি

আমি ছিলাম সবার বড় বুদ্ধি বেশি
বেশতো তবে সে গল্পটা বলোনা শুনি
তুমি তখন অনেক ছোটো ডাকাত এলো
লাল ফেট্টি মাথায় বাঁধা চোখটা ধুনি

ফোকলা মুখে ফুটল হাসি,শোনাই তবে
মারলো ঢেঁকি দমাস জোরে দরজা হাট
থালা বাসন সোনা গয়না গুছিয়ে নিয়ে
তেলের পরে পা পিছলিয়ে পুকুর ঘাট

তারপরে সে কান্ড হল পাসনে ভয়
জলের তলে খেঁজুর কাঁটা সাজিয়ে রাখা
এদিক যেতে ওদিক যেতে লাগছে খোঁচা
বড়শি গেঁথে ডাকাত তোলে রক্ত মাখা

আমি তখন দুচোখ বুজে মায়ের কোলে
ঘুমিয়েছিলাম | এসব কথা শুনেছি পরে
সত্যি যদি দেখতে হত সেই দৃশ্য
ভয়ের চোটে তোদের ঠামি যেতই মরে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
জয় জগন্নাথ
কবি সবিতা রায় বিশ্বাস

আজকে যাবো রথের মেলায় মায়ের হাত ধরে
বায়না করে আয়না ফিতে আনবো ঝোলায় ভরে
মেলা বসেছে ধরমপুরে হাটখোলার মাঠে
ছিঁচকাদুনি বৃষ্টি এলে ভিজতে হবে ছাঁটে

কচুপাতার ছাতামাথায় রুমকি আমি ভাই
মাখুক পায়ে খানিক কাদা তবুও যাওয়া চাই
পথের পাশে ফোটেই যদি সন্ধ্যামনি ফুল
পরাগ ছিঁড়ে বাঁশি বাজাবো পরবো কানে দুল

মেলার মাঠে পৌঁছে গেলে দুদ্দাড়িয়ে ছুট
হুড়মুড়িয়ে কুড়িয়ে নেবো জগন্নাথের লুট
সবার সাথে গলা মেলাবো জয় জগন্নাথ
ভক্তিভরে জোড় করবো ছোট্ট দুটি হাত

পাঁপড়ভাজা জিলিপি আর কাঁচাগোল্লা খেয়ে
নাগরদোলা চড়ব ঠিক বায়না করে চেয়ে
ঝিকমিকোবে আলোর মালা নামবে যেই সাঁঝ
মায়ের সাথে রথের মেলা যাবোই যাবো আজ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর