আমি যা দেখতে পাচ্ছি, তাই তো দেখছি, কিন্তু অন্য পারে অন্য দেখা আছে। অথবা দেখাও নেই, চিন্তা নেই। মন নেই বলে। হাওয়ায় ভেতরে কেউ কেঁপে ওঠাগুলি শুধু বাইরে থেকে ছড়িয়ে দিয়েছে। কম্পন এখন আমি দেখতে চাইছি, তাই দেখছি। অনিচ্ছায় দেখছি না কিছুই। চিন্তাশূন্য হয়ে আমি। মনহীন হয়ে আমি। সম্মুখে দেওয়াল রেখে শুই। . **************** . সূচীতে . . .
আমি আর আমার মা আকাশ আবিষ্কার করি বিভিন্ন সময়ে। কুলিনের মতো নয়, নিউটন বা কলম্বাসের মতো। যা ছিল আগের থেকে তা যে ছিল এই নিশ্চয়তা এ-দেখাই জন্ম দেয় তাই এই দেখা বড়ো ভালো। সকালে আকাশ দেখি ছেঁড়া ছেঁড়া কোদালে পাৎলুন, টিউবফোলানো পাম্প যেন হাওয়া ভরে দিয়ে গেছে। দুপুরের আকাশ যেন মৃতের নিসর্গ ভরা মুখ, থমথমে, ভীতিপ্রদ, ভাঙাচোরা দুর্গাদালান। তার কল্পনায় সব শিশুদের ঘুম ভেঙে যায়। বিকেলের লাল ছোপ আকাশে তাকিয়ে মনে হয় বাপের বাড়ির থেকে কেঁদে ফেরা ছোটো দু'টি পা। অথবা বিদায়দিনে নিতান্ত দেশজ মায়া দিয়ে , আলতায় রাঙানো পা'র স্থির পাথরের কথকতা । রাত্রির আকাশ দেখি তারাভরা, ছন্ন ছন্ন আলো। তারা কী খদ্যোত নাকি আমাদেরই খণ্ড ক্ষুদ্র আমি, চোখ থেকে চলকে যাচ্ছে সহজিয়া তারা-বারি- ধারা। নাকি পঞ্চানন বুড়ো রামায়ণগান গেয়ে হেঁটে, ফিরছেন খালি পায়ে কাঁকরে পায়ের তলা ছিঁড়ে, ছোপ ছোপ জমে আছে তাই-কী আকাশভরা তারা। নাকি সব ভুল দেখা বাইরে আকাশ কিছু নেই।আকাশবৃত্তির যত আলোছায়া সবই আমারই, ভেতরে গুটিয়ে আছে, মাকড়সা ও সাপের উপমা। . **************** . সূচীতে . . .
টিনের চালার নিচে বসে আছি। বাইরে শুধু বর্ষা আর হাওয়া। সম্যক অতীত বলে কিছু নেই। পূর্ণ বর্তমান বলে কিছু নেই। নিটোল আগামী বলে কিছু নেই । ত্রিস্রোতা মোহনাজল বয়ে যাচ্ছে এখন উঠোনে৷ এখন উঠোনে নামলে মেশামেশি নানা ভাবনারা, বিহ্বল করবে বলে বসে বসে দূর থেকে দেখি। বিপর্যয়ের পরে তোমার শ্যামল হাসি মুখ। ভোরের রোদের মতো কমনীয় সবার আগামী। যেন তুমি ডেকে নিচ্ছ আমাকেই খুব ভোরবেলা। নরম আদর ক'রে। চোখে চুমু দিয়ে, হাত ধরে, মরাম বিছানো রাস্তা দিয়ে হাতে হাত হেঁটে যাব। যেন তুমি আমাকেই বেছে বেছে হাতে তুলে নিলে, যেভাবে টকটকে জবা, ভোরে তোলে পাড়ার কাকিমা। যেভাবে নির্বিকল্প বিকল্পহীনের পাশাপাশি, বসে আর একীভূত হয়ে যায়, তুমিও তেমনই, অনাদি অনন্তকাল ধরে শুধু আমার প্রেমিকা। আমার নশ্বর হতে ইচ্ছে করে, লোকায়ত হয়ে যেতে ইচ্ছে করে, গ্রাম্যদোষ নিয়ে থাকি ইচ্ছে করে, বেদানুগ হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। আমার অজস্র ইচ্ছে। আমাকে শিশুর মত নাও। আমাকে প্রত্যেকদিন ব'ল তুমি -- ' তুই তো আমার বাচ্চা, কাজলের টিপ্পা দেব গালে, তার ওপর পাউডার, বাঁহাতের আঙুলে কামড়াব, পরম আলতো ক'রে। ব'ল তুমি, প্রতিদিন ব'ল--'সমূহ জগৎ মিথ্যে, নাকি প্রপঞ্চের অভিমান, এসব ভাবি না তুই আয় কোলে নেব তোকে ছেলে।' ব'ল তুমি প্রতিদিন ব'ল-- 'কোমরে ঘুনসি বাঁধব, তাতে দেব লোহার জালকাঠি এবং ছোট্টপারা তামার পয়সা বেঁধে দেব, দেখিস তোর দিকে কেউ কখনোই নজর দেবে না ৷' বৃষ্টির ভেতর দিয়ে কত কিছু মনে চলে এ'ল। অতীত, আগামী আর বর্তমান তালগোল পাকিয়ে, ব্রহ্মাণ্ডে সাঁইসাঁই করে ঘুরে যাচ্ছে, আর এই আমি, আমাকে টুকরো ক'রে মেশানোর স্থির বিশ্বাসে, ন্যাংটো হয়ে অনাবিল আলুথালু মাটির ওপরে, বিরাট শিশুর মত খেলা করব আজ, চিরদিন। . **************** . সূচীতে . . .
মণিকর্ণিকা ঘাট মড়াপোড়ার ছাই-এ পিছল হয়ে আছে। কত সামলে চলতে হয়। তুমি তো এ'সব বোঝো না, কাকেই-বা বোঝাব। আমি নিজেই বুঝি না, তাই মড়া সরিয়ে নিতে বললাম। তুমি বললে 'মড়াকেই সরতে ব'ল'। 'মড়া কী সরে' - আমার এই কথায় তুমি দৃশ্যবাস্তবতার ওপারে চলে গিয়ে আরেকটি দৃশ্যের মহিমা রচনা করলে, যা মূলত শ্রাব্য। অবশ্য আমরা যারা পাঠক দৃশ্য, শ্রাব্য, গন্ধের ভেদ করি না। আদ্যন্ত ওপার থেকে নিজের শক্তি বোঝালে। কিন্তু এবার ব'ল তো, প্রকৃতি, অবচেতনের পিছল পথে তোমাকে পিছলে যেতে দেখে যদি 'নীবিস্রংসন', 'নীবিস্রংসন' বলে চেঁচিয়ে লোক জড়ো ক'রে দিই, তাহলে ভালো হবে তো? . **************** . সূচীতে . . .
১ সাধ মিটল না ৷ আশাও পূরণ হ'ল না। কিন্তু সকলই এখনও ফুরিয়ে যায়নি। পরশুদিন বারবেলায় 'ডোনা, ডোনা' শুনছিলাম। কী বিষণ্ণ, নরম সুর। রান্নাঘরের চালা ফাঁকা ছিল না বলেই হয়তো উঠোনেই তিনটে শালিক ঝগড়া করছিল। তাদের ঝগড়া দেখে আমার কবিসম্মেলনের কথা মনে পড়ছিল, অবশ্য কাব্য-মীমাংসার কোনো কোনো অধ্যায়ের সঙ্গে অদ্ভুত মিল যে আমার চোখে পড়েনি এমনও নয়। রাজশেখর বোধহয় এই শালিকদেরই বয়সি। 'বাসাংসি জীর্ণানি' তাই অন্য বাস নিয়েছেন হয়তো কিন্তু এই বাস নেবার সময় -- 'এ পরবাসে রবে কে' গানটি কী তাঁর মনে পড়েছিল রাজেশ্বরী দত্তের গলায়। কাব্যমীমাংসা বিষয়ে এইসব অমীমাংসার কথা চিন্তা করছিলাম। নিৎসে সম্ভবত বলেছিলেন ঈশ্বরের মৃত্যুর কথা। এখন গীতার বিশ্বরূপদর্শনের প্রসঙ্গে মনে হয় যে শ্রীচৈতন্যর দাদার নামও ছিল বিশ্বরূপ। এই যে একটি বিক্ষিপ্ত চিন্তা আপনাকে আরও কোটি কোটি চিন্তার দিকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু চিন্তাশূন্য হবার কথা আবার বোধিধর্ম বেশ জোর দিয়ে বলেছিলেন বোধহয়। তাই হয়তো সকলই ফুরিয়ে ফুরায় না, আমাদের করোটির খটখট শব্দে আর রহস্যময় চক্রানুষ্ঠানে বসেছেন যিনি তাঁর মুখে তপ্ত পঞ্চাগ্নি আর চোখে পথ না ফুরানোর নয়নপথগামী ডাক। অবশ্য বায়েজের গাওয়া 'ফাইভ হানড্রেট মাইলস' গানটি নিয়েও কতভাবে ভাবা যায় যেহেতু, তাই সকলই যে ফুরিয়ে এখনও যায়নি মা এ তো জলবৎ স্বচ্ছ আর আকাশবৎ সুবিশাল।
২ জোড়া-শিবমন্দিরের চাতালটা মনে পড়তেই মনে হ'ল আর কোথায় কোথায় জোড়া- শিবমন্দির আছে, আর কোথায় চাতাল। অথবা তিনিই আর কোথায় আছেন যাঁর বাইকের পিছনের শিটে বসে জোড়া-শিবমন্দির দেখেছিলাম আমি। ভেতরেও যা তা নাকি বাইরেও। তবে কী চাতালের ভেতরেও চাতাল আছে, শিবের ভেতরেও শিব। শিবের ভেতরেও শিব আছেন, এমন অলুক্ষণে কথা দীর্ঘক্ষণ ভাবব না বাবা, ঠাকুর আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন ' ভক্তের আমি ' রাখা চাই।সেই 'আমি ' রেখেই বরং চাতালের ওপর বসি । চাতালের ভেতর চাতাল। আমার ভেতরও আমি। উফফ বড়ো গোলমেলে ব্যাপার, তবে কী রসগোল্লার ভেতর আরও রসগোল্লা হাতড়াব আমি অথবা আঙুল তুলে বলব ' শুভাশিস'দা তোমার ভেতরের জনকে দেখতে পাচ্ছি ' কিন্তু তাঁর সঙ্গে তেমন আড্ডা জমছে না যেমন জমছে বাইরের তোমার সঙ্গে জোড়া-শিবমন্দিরের বাইরের চাতালে।
৩ রানুকে লেখা ভানুদাদার চিঠিগুলি অসুখের শুশ্রূষা। ছায়াসুনিবিড় শান্তিরনীড়ে বসে লেখা সে'সব চিঠি ভোরবেলাকার আদর অথবা ঘুম ভেঙে ট্রেনের জানালার সকাল অথবা কন্যকার গায়ে বাবার স্নেহস্পর্শ। খুব ভালো দিন কাটছে। বিভূতিভূষণের মহৎ আশ্রয়ে গ্রামজীবনের ডাকে রেলের সুদূর গুঞ্জরনে নিজেকে মাঝে মাঝে একইসঙ্গে অপু - দুর্গা মনে হয়, আবার মাঝেমধ্যে রানু আর ভানুদাদাও।
৪ মরে যাবার কয়েকবছর আগে থেকেই তাঁর এমন দুরবস্থা যে কাপড়েচোপড়ে পায়খানা ক'রে ফেলে খালি আর সবাই যা তা বলে যায়। শেষে হাড়ের আদলের ওপর চামড়ার ফিনফিনে খোলশটুকুই তাঁর সম্বল ছিল। শীতের শেষে বটগাছের পাতাও ছিল একটিমাত্র আর ছিল দৃশ্যবাস্তবতার বাইরে অজস্র সম্ভাবনা। . **************** . সূচীতে . . .
স্রোত খুবলে খাচ্ছে কেউ আমি বলছি--- পাথর...পাথর... অতি অনিশ্চয় স্বপ্নে নিশ্চয়তা গেঁথে রাখা হাওয়া প্রত্যেকে নিজের দিকে থু থু ছুঁড়ে ধু ধু হয়ে যায় এ কি হাওয়া এ কি অপরাধপাথর পাথর পাথর শুধু নিরুচ্চার পাথর পাথর ঠেলবো না, মেলবো না... নিহিত ডানার কারুকাজ নারী দেখি, নাগিনীও দেখি দেখি প্রেত, দেখি অগ্নিশলাকার তাপে অন্ধকার গনগন করে দেখি কাম, দেখি অদূরচঞ্চুর ফাঁকে এঁটে থাকা দানাময় দেশ দেখি ঘাম, দেখি শ্রমজীব্য কথকতা নক্ষত্রের দানবআয়ুধ এ কী চৈত্রবিস্ফোরণ এ কি নিজের নিজের হাহাকার স্থির জলে, নিঃশ্বাসের অকুল ভাঙন থইথই এ কি থই, এ কি জারজগোত্রীয় কোনো স্থিতপ্রজ্ঞ মাতৃহন্তারক এ কী ডানা অনন্ত বিচ্ছুরিত কসমিক জ্যোতির্ময় ভাবপুঞ্জ এ কি ভ্রম নুনের পুতুল হয়ে সাগরের জলে মিশে যাওয়া ঘাম, কাম, অনুচ্চার নোনা আত্মরতি পাথর পাথর শুধু নিরুচ্চার পাথর পাথর
জল, বেদনাপরাগে লাগে জল, কোথাও লাগেনা তুমি নৈঋত মলাট, তুমি ঘিলু তুমি ঈর্ষাসহোদরা তুমি জল, তুমি অকালবোধনজাত ওলোটপালট জবাফুল তুমি মৃত্তিকার সোঁদা গর্ভে হাড় পাঁজরের হাহাকার তুমি গান, তুমি আত্মলগ্নতার চেয়ে বেশি ডুব, বেশি অভিমান তুমি ছই, তোমাকে নিপুণ ধরে শূন্যতাপাথরে ঝরাবোই আহ ! পাথর পাথর শুধু নিরুচ্চার পাথর পাথর গর্ভগৃহ ঘেঁসে ওই খসে যায় প্লাসেন্টা ও ফুল আর নয়, দুমড়ে থাকা, সোজা হও... ফেটে পড়ো এ কি ব্রহ্ম এ কি স্থির এ কি নির্লিপ্তির নগ্নতাদ্যোতনা এ কি আয়োজনহীন স্বপ্ন দোতারাবাহিত বাতুলতা এ কি আউলবাউলমাঠ দিগন্তের অত্যাশ্চর্য ঠেক সাবেকী মৃত্যুর দিকে হেলে পড়ো, উফ, মরে যাই পাথর পাথর, ধ্যাত, নিরুচ্চার পাথর পাথর জলে ঝড়ে মাটি ও কাদায় কোনো নবতম আবিষ্কার নেই অজস্র সন্ধান খোলা সম্ভাবনা ভেসে চলে যায় স্থির বলে কিছু নেই অথবা যা কিছু স্থির স্তনলগ্ন, যোনিলগ্ন, স্নায়ুলগ্ন, পায়ুলগ্ন উথালপাতাল ঢেউ, কসমিক ইঁদারায় নির্নিমেষ সন্ধানপ্রয়াস নেই, কিছু নেই, কেউ নেই অবগুণ্ঠনও নেই খুলে যাওয়া নেই তুমি মেদ মাংস রজ রক্ত রস গু-পেচ্ছাপ তুমি থুতু লালা বীর্য ঘাম লোম, কথকতা
এসব দানবগোত্রে গোত্রহীন ভেঙে পড়ি উঠি ফের, নেমে যাই, ফের উঠি, ফের নেমে যাই চরম উত্থান কিম্বা চরম পতন বলে কোনো কিছু নেই ঠেলে যাওয়া, ঠেলে নেমে যাওয়া, ফের ঠেলা, ফের নেমে যাওয়া