কবি সুব্রত চক্রবর্তীর কবিতা
*
মৃত্যু-তুমি-অতিথি
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী

চিরজীবিত -তুমি-চিরঞ্জীবী
তুমি মহান, এই শৃন্বন্ত বিশ্বে
তোমার জন্মদিন আছে -- মৃত্যুদিন নেই ;
সব গাছ-যেমন ছিল তেমনিই  আছে
ঘর-ভরা জিনিস -- আসবাব-পত্র
ব্যবহৃত জিনিস  -   অব্যবহৃত ঔষধ-পত্র
কিছু শুকনো ফল --- ফারাক করেছে
            “ক্যালেন্ডার”
পার্থক্য শুধু অতীত -- আর বর্তমানের
ঘড়িটা -- বড় বে-খেয়ালি চলছে নিজ মনে
.          বিরাট-শূণ্যতার জন্ম-চারদিকে ;
.          বর্ষণ করো-ফোঁটা-ফোঁটা, অমৃতের বৃষ্টিধারা।
.                 মাথা সব-ভিজিয়ে দাও।
.          করো বে-পরোয়া, আশীর্বাদ যদি পাই অমৃতের স্বাদ।
.          আসুক শান্তি-মৃন্ময়ীর দূরন্ত মধুর বিকাশে।

এই আকাশ-ফুল-বিশ্ব-প্রকৃতির আছে অদৃশ্য-আকর্ষণ।
মোরা কেউ নই “অভিমন্যু”  শুনতে পাইনি শ্লোক , জঠরের মাঝে ।
.                    পৃথিবীতে, আমার দিনটি আছে জানা--
.             মৃত্যু যখন অনিবার্য্য, হয় যেন যন্ত্রণা ছাড়া।
            বাতাস তখনো রোখা যায়কি ছেঁড়া তমসুকে ?
.              সু -পক্ক “ফলরাজ” বৃন্ত-চ্যুত হয় প্রকৃতির নিয়মে
.                       হাজার ঘষলেও, জ্বলে না ভিজে-শলাই।
              ছাদের জলটা যে নলে পড়ে, সেটাও আকাশের--
বিশ্ব কবির-প্লানচেট-- আগমন বহু মহারথীর
সত্যি কি ? সেটাও জানা গুরুদেবের  ---  ----    ----- ----
নিঝুম-গভীর রাতে, দূর হতে ভেসে আসে
জ্যোত্স্না মাখা- মায়াময়ী বাঁশির সুর।
.             সেটাও-অন্যের সুরে।
“পথের-পাঁচালি”  “আরণ্যক” – “দেবযান”-- পুই মাচা--
পড়ে আছে, সব-প্রান্তলিপি --একাকার হয়ে।
ছুটে বেড়ায়, বিভূতিবাবু, গভীর রাতে ম়ত স্ত্রীর-সন্ধানে।
.              “হ্যালুমিনেশ্ ন” সবার জানা।

ধরায়-এসেছি মোরা অর্থোপার্জনের -- যন্ত্র হয়ে।
.       অর্থই-অনর্থের মূল--সেটাও সবার জানা --
তাই-মৃত্যু, যখন অনিবার্য্য-- হয় যেন যন্ত্রণাছাড়া।
.        আচ্ছা--মৃত্যু, তোমার কেন, মৃত্যু হয় না  --- ?
.              জীবন, আছে বলে ---হয়তো এটা অনেকের অজানা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বড় দিনের ভাবনা
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী (জন্ম ১.১০.১৯৬৪)। রচনা ৯ই পৌষ. ১৪২৭।

হে মৃত্যু -- অদৃশ্য দানব - তুমি ভাষাহীন।
.              ভুলে - ভেদাভেদ ;
এসো না, এক সাথে বসে, “সাপ-লুডো” খেলি।
তুমি করেছ ধ্বংস, সভ্যতা -- মানোনি সংস্কার --
লুম্বিনীর -রাজপুত্রের, চিতা-ভষ্ম মিশরের “মমি”
.                ফসিল -কংকাল
.             আজ-তোমার, বড় অহংকার।
.         মহেঞ্জোদাড়ে -- হরপ্পা, আর সিন্ধু-সভ্যতা।
.                      সব নিদর্শন- আজ জাদুঘরে।
        জীবনের সাথে, তুমি করো না দোস্তি ?
.                      শান্তির-দূত যেন না মরে।
রবীন্দ্রনাথ - রামকৃষ্ণ -বিবেকানন্দ -বিদ্যাসাগর --
সকলেই, আজ প্রাণহীন -- তুমি নিয়েছো কেড়ে ;
অন্ধ তুমি দেখো কতো,  অর্ধনগ্ন “যিশু”
.      আজও “আস্তাবলে” আছে পড়ে।
এই উন্মাদের-পৃথিবী কখনো কি, তাদের কথা ভাবে ?
জন্মদিনে ফুল--মৃত্যুদিনে মালা--বড়দিনে কেক কাটে।
এখনোও আছে,  হাজার “যিশু” শান্তির কথা ভাবে ----
আলো-আঁধারিতে “জুডাস” এসে তাদের ক্রুশবিদ্ধ করে।

.            মানুষ-ভালোবাসে ঈশ্বরকে -- কেনো- তা তুমি জানো ?
.            মৃত্যু যেনো না, আসে দুয়ারে -- এটা নিশ্চয়ই তুমি মানো।
.       তুমি,  ফিরিয়ে দাও ? সেই সব মহাপুরুষের জীবন--
.        স্বদেশী -- বিদেশী নাই বিচার-
.                    রবে-শেলি-বায়রণ-টেনিসন।
আমি, পাই না- “মৃত্যুভয়”-- তাই দু-বাহু উপরে তুলি।
হে মৃত্যু -- অদৃশ্য দানব-- তুমি ভাষাহীন --ভুলে ভেদাভেদ
.                     এসো না--একসাথে বসে,
.                     “সাপ-লুডো” খেলি।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
খড়ি কুড়ানির মেয়ে
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী (জন্ম ১.১০.১৯৬৪)।

তুমি-মাটি হয়ে যাও-- মনে হলে, গাছ হও--
জল হও--পাহাড় হও-- ধু-ধু ফাঁকা, মাঠ হয়ে যাও।
তোমার, কান আছে প্রাণ-আছে মুখ আছে ;
তুমি, শুনবে-নড়বে-না, চড়বে না- বলবে না।

সকলে, তোমার- আবার-কেউ তোমার নয়।
খড়ি কুড়ানির-মেয়ে ছিলে, ‘তুমি’।
দুধে-আলতায়, মেশানো ছিলো -- গায়ের রং।
ঝর্ণার জল--তরঙ্গের মত ছিল-গলার আওয়াজ।
বড় লোকের-মেয়েরা,  হিংসে করে বলতো--
সাত পাড়ার মধ্যে, তুমিই “সুন্দরী”।

ঠিক -- আমি, খড়ি কুড়ানির, মেয়ে বলছি।
দেশ-ঘর-বাড়ি, বাবা-মা হারানো “একা”।
আপনজন-বেঁচে খাকলে কাছের মানুষ
মরে গেলে-গয়ায় “পিণ্ডি”।
ভূত-তাড়াতে-পুরুত ডেকে, “শান্তি-স্বত্যয়ন” }

আচ্ছা -- সেই নদী -গাছ পালা--কোথায় ?
কোথায়-সেই গাভীন-পুরুষ্ট-কালো মেঘ।
যা, ঝেঁপে ঝেঁপে বৃষ্টি নিয়ে আসতো ;
এখানে--পেয়েছি, ধু ধু ফাঁকা চর-মানুষ নেই,
কিন্তু, পেয়েছি মোলায়েম, সরেস-মাটি।
একেবারেই কুমারী-ছোঁয়া পায়নি, লাঙ্গলের ফালের।
শুনতে পেলাম-মাটির ভাষা, চর আমায় ডাকছে।
যেন-নিচু গলায় বলছে ;  আমায় ‘বীজ’ দাও ?
গর্ভের-ভেতরটা ছটপট করছে-ফসল ফলাবে বলে।

কিন্তু কি এমন হলো-- শুরু হলো, মারকাট সন্দেহ।
কাটারি--ভোজালি--বল্লম--ত্রিশুল-- এলো হামলা বাজ।
দেশ কোথায় ?  ধর্ম - কী ?  কোন জাত-তুই বিদেশী ?
না আমি বিদেশী নই -- এই আমার দেশ।
.               “এই আমার-মা।”

শুনে রাখ পূর্বে ছিলাম-- ছিলাম- পশ্চিমে--দক্ষিণে।
ঘুরছি-ফিরছি, তাড়া খাচ্ছি-- তাই, ভাবছি- তোরা ভুল।
.                  আগে--মোরা মানুষ
.                   পৃথিবীটাই “সবার দেশ”।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সত্যি--ভাবনা
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী (জন্ম ১.১০.১৯৬৪)। রচনা ৩০.১২.২০২০।

আমি-ছুটে বেড়াবো-
.          জানি, হাঁফিয়ে যাবো।
.                তাও-ছুটবো !
পাথর-কাঁকড়, মেশানো-রাস্তায়-ছুটছি।
শিশিরে ভেজা-ঘাসের উপর, আছে পায়ের ছাপ।
মাটিতে শুকিয়ে, যাওয়া-বালুর-চর।
জেলেদের বোনা জাল, ভেঙ্গে যাওয়া-ডিঙ্গি।
শুকোতে দেওয়া, বালু মাখা সামুদ্রিক মাছ ।
ঝড়ে-পড়া-শুকনো নারকেল
পড়ে থাকা, লবণে ভরা ঝাউ গাছ।
চিংড়ি-লাল-কাঁকড়ার, ছড়ানো বিছানা।
বাংলার খাঁড়ি-সৈকত-সাগরের-দুধ-ফেনা জল ।
দীঘা-মন্দারমণি-পুরী -চট্টগ্রাম--
.             সব পিছনে ফেলে -- --- ----   -- ;
থামিয়ে দেবো-পৃথিবীর গতি ? দিন-রাত, একাকার
.              হয়ে যাবে।
“মাধ্যাকর্ষণ”-নেবো কেড়ে -- এবার-সবাই “কার্পাস” তুলো।
বানিয়ে নেবো-বড়ো “এ্যাকো্রিয়াম” ।
বাইরে থেকে -পাঠাবো “প্রাণ-বায়ু”
হবো সবাই, রঙ্গিন মাছ- লেজ দুলে গুঁতো গুঁতি করো।
তেত্রিশ-কোটি-দেব-দেবীর বড় অলৌকিক ভাণ্ডার।
মরে গেলো, ছবি হলো--আবার নাকি “নরক”।
পাপ-অনাচারে, চিত্র গুপ্তের কাছে খাতা হবে বিচার
টগবগ-ফুটছে তেল, সাঁতলানো হবে মাংস --
যদি বাঁচতে চাও ! স্বামীর-চিতায় বসে কাড়ো ।
শাস্ত্রের ষড়যন্ত্র -- একই চিতায় “ডবল” ছাই।
রামমোহন-তুমি পাগল, এদের কে বোঝাবে !
পলেস্তরাবিহীন -পৃথিবীর রংটা, বড়ো ঘোলাটে।
আচ্ছা একটা--অন্য পৃথিবীর কথা ভাবা যায় না ?
পরিস্কার-আকাশ, রোগ-নেই-ব্যাভিচার নেই।
অভাব নেই--- তাহলে আমি থামবো ?
আছে কি ----
“মিরাকিউরলের” -- মতো আশ্চর্য ওষুধ
তাহলে-একটি “বড়িই” যথেষ্ট।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অমৃতের শহীদ
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী (জন্ম ১.১০.১৯৬৪)। রচনা ৭ই চৈত্র, ১৪২৭।

কষ্টিপাথরের মতো,  কালো মজবুত শরীর
মরার আগে লিখে, শেষ জবানী --
.         অথচ “অক্ষরজ্ঞানহীন”
.            হলো সে “আত্মঘাতী”,

পার্টির নামাবলী গায়ে চড়িয়ে,
এক পিঠ, রোদ মেখে
ফাগুনের, আগুন গায়ে লাগিয়ে
আমৃত্যু, সুখের খোঁজে
চলছে সদল-বলে।
জানে না, আবাহন - বিসর্জন।

এক ঝাঁক গাড়ী ছুটছে -- গ্রামের পথে--
গণতন্ত্রের বড়ো উত্সব, ভোটের প্রচারে।
পাল্লা দিয়ে ছুটছে-ধূলো, শুকনো-পাতা-ছেঁড়া কাগজ।
সব শেষে, আদল - গায়ে --কিছু উত্সুক শিশু ;
সবাই কম-বেশী কল্প-তরু
ফুটছে উন্নয়নের ফুলঝুড়ি।
দাতা-কর্ণের ছড়াছড়ি সবখানে ;
অক্ষরজ্ঞানে- আছে সন্দেহ --
ভাষা-জ্ঞানে, নেই সংস্কৃতি --
ভাষণে প্রবাহিত বিষ-ধর-‘বাস্তু-সাপের বিষ’।

হাল্লার-মাঠের বস্তির ‘মরদ’ তুই --
বাড়ীতে ছেলে-পুলে, আছে ঘর-ভরা  সংসার।
তোর কথায় পোষ-মানে, শ-পাঁচেক মানুষ।
তুই নুনের পুতুল হয়ে, মাপতে গেছিস নদীর জল ?
মস্তিষ্ক-প্রসূত, বিষের নজর ডেকে আনলো বিপদ ;

.                  অন্ধ কি দেখতে পায় ?
.            কালা কি শুনতে পায়  ?
.            নিরক্ষর, কি লিখতে-পড়তে পারে ?
.            ঠিক-বেঠিক আর জানবি, কোথা থেকে।

তেজপাতা-আমলকি-জামরুল --স্বর্ণচাপার ডালপালা--
.            জানে তোর, মৃত্যু বৃত্তান্ত।
আর একান্তই জানে,  গোয়ালের “জাবর কাটা” গরু।

কষ্টিপাথরের মতো, কালো মজবুত শরীর।
মরার আগে লিখে, শেষ জবানী --
.         অথচ- “অক্ষরজ্ঞানহীন”
.          হলো সে “আত্মঘাতী”
.                 এটা কি সম্ভব ?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হিতে-বিপরীত
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী। রচনা ১৬ই কার্ত্তিক ১৪২৭।

বৃথা দুঃখ গড়িয়া লইয়া -- অসহনীয়, মর্ম্মদাহে --
.           কেন, নিরর্থক দহিয়া -মরো ?
প্রকৃত, দুঃখিত হইবার--অতৃপ্ত কারণ,
.            তুমি নিজে, খুঁজিয়া- বাহির করো।
উত্তেজকতার -- মুখস পরিয়া হারাইয়া,  কান্ডজ্ঞান --
যাহাকেই সম্মুখে দেখো, যাহারই প্রশংসা শুনো --
.            তাহাকেই, করো তুমি-অপমান।
কি-সে তোমার, সুখ --  কিসে তোমার, দুখ
অপরে মানে না -- তোমায়
তবে--নিজ দোষে, পুড়াইছো  নিজ মুখ ?
চাহে না, যারা--তোমাকে মানিতে।
মানিয়াও তোমায়--পারে না জানিতে,
.       এই--খাঁটি “সত্য” কথা --
.            মনের ফলকে, লিখিয়া লও।
যদি-আমি, নিজ জ্ঞানে মাকে অখণ্ড-হৃদয়ে,
.        ভালোবাসিয়া থাকি।
কাঁদিলেই “স্তন” বাহিয়া “পায়োধারা” আমায়
       কখনো দিয়েছে কি ফাঁকি ?
যদি আমি হারাইয়া ফেলি-- আত্মীয়- চরিত্র
.        ব্যক্তিত্ব-বৈচিত্রের গভীরতা।
আমার লেখা “শ্রুতি- সুখদ” বোধগম্য পরিশুদ্ধ
.         হইলেও পাবে শুধু আদিমতার-নীরবতা
সভ্যতার, অপমৃত্যু-- অন্তরে গভীর জট,
.         নাই সুচিন্তিত -- “অন্বীক্ষা”  --
তুমি, যে হও ---তোমার কাছে, সমাজ-সময়-প্রকৃতি
.         নেবে না, কোন সুচিন্তিত দীক্ষা।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
উপলব্ধি
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী ( শ্যাম )
রচনা ইং-১৬ই আগষ্ট ২০১২।

অবগাহন--করে রক্তিম “মলম”---
পোড়া, ক্ষতের ভেতরে নেমে।
মেঘেরা জানে কি ?  হাতে রয়ে যায়--
.             “মৃত্যুবাজ”
বর্ষার-বারিধারা, থেমে গেলে ;
গ্রিলের ফাঁকে, হাত আঁকড়ায়---
ছাদে রাখা-বাহারি লতা।
অনাদরে, বড় হওয়া মেয়ে--হয় দুঃখী
খোঁজে শুধু একটু--ভালোবাসা।
বাথ--টবের জলে দাঁড়িয়ে, করো তর্পণ--
হাতে নিয়ে, এক মুঠ তিল-হরতকি।
নদীতে যেয়ে-কি লাভ বলো ?
আমি অর্ধাঙ্গিনী আমি যে প্রিয়-সখী।

নদীর দিকে, ছুটে যাই-একমনে অংক কষি-বালুকা-বেলায়।
হঠাত্ , শৃঙ্গাররত-হড়পা বান এসে, সব হিসাহ মাটিতে মেশায়।
বিদ্যুতের-তাঁরে ছোটে কঠিন-শক্তি ;
আগুন ধরিয়ে দেয় শহরে---
জ্বলন্ত মোম ছঁড়ায়, অপাপবিদ্ধ আলো ।
প্রবেশ করে, গা-ঘিন-ঘিন ঘরের ভেতরে।

নদীর ও পারে, চলছে অরণ্য-দিগন্ত রেখা দিয়ে ;
এসো, কাঠুরে --এসো কাঠ চোর, সাহেব আছে যে দাঁড়িয়ে ?
তুমি, কে হে-নবীন এই জঙ্গলে--গা ভরা সুন্দর গন্ধ।
চাই মেহগিনি-শাল-সেগুন, তুমি এখানে বন্ধ।

এসো, সবাই ধরি মুক্তির গান- সাথে থাকে যেন “কোরাস”।
এ কেমন স্বাধীনতা, পেয়েছি মোরা-সব কিছুই যেন “ফোকাস”।
স্বদেশটাই, হয়েছে, ডাকাতে ভরা--চিনি না আসল-নকল।
টাকা-দিলেই পাবে, চাঁদের মাটি রইবে না আর ধকল।

কোথায়-বিশ্বায়ন শহুরে জীবন-প্রাণ ভয়ে কেন ভীত ?
ফোনে-ফোনে শুধু, আসছে খবর কত পরিজন হয়েছে মৃত।
কে, উত্তম-কে অধম-শুরু হয়েছে, মৃত্যুর হাহাকার।

শুনবি পরে এই মড়কেই বেঁচে ছিল---
.       হাজার-হাজার “যাযাবর”।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অনতি-অতীত
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী ( শ্যাম )
রচনা ইং-- ১৯ / ০৬ / ২০২১।

সুন্দর, এক ঘর আছে-- “মা” নেই তাতে।
বলো না, কী লাভ হলো-সে ঘর থাকার ;
তোমার দেওয়া-আশীর্বাদ পেয়ে গেছি, সাথে--
তাই ভাবি না--অন্য কোথা যাবার।

ফুলগুলো, সব শুকিয়েছিলো- কেউ ছিল না পাশে--
এখনো, দেখি ছোট্ট মেয়ে-ঘরটি সাজায়।
দোলন-চাঁপা, হাস্ নোহানা, সাঁঝ-বিকেলে ফোটে--
পথ হারানো, দেশে এখন কে-শাঁখ বাজায় ?
চোখ, ভরা ঘুম-নিয়ে, জেগেছি অনেক রাত।
ভোরের সময় তাঁরারা হারায় আলো।
ফেলে আসা-অতীতে ডুবিয়ে দিয়েছি হাত,
এখন পালিয়ে, কোথায় বাঁচি বলো।

মন যে বড়ো ব্যাকুল--লাগেনা আগের মতো --
জীবন পথের জটিলতায় চিন্তা জাগে কতো।

হঠাত্ -- কঁড়া নাড়ার শব্দে লাফ দিয়ে উঠে দেখি ;
.           একমুখ --- হাসি নিয়ে-দাঁড়িয়ে আছে,
.           মোদের হারিয়ে যাওয়া “মা”---একি ?
.           বললো, আমায় মুচকি হেসে
.           তোরা--কেমন আছিস সুখে ?
.                       শুধাই --আমি
.                        চমকে -উঠে,
.            বাইরে কেনো --ভেতর বসো।
.            তোমার নিজ- ঘরে এসে।

শোন -    আমি রাখি সবার খোঁজ।
.            আসতে আছে  ধাঁধা।
.                সবাই মিলে-ভালো থাকিস্ ,
.             বন্ধ রাখিস কাঁদা।

হালকা-হাওয়ায়, শুনিয়ে যাবো-ঘুম ভাঙ্গানো গান।
ঘূণ-ধরা এই সমাজের বুকে-হারাস-না, নিজ মান।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বিষাদের উত্সব
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী ( শ্যাম )
রচনা ইং-১২ / ১০ / ২০২১।

পুজোর-আর দিন কয়েক বাকি।
কেমন-একটা অদ্ভুত জ্বর--
মনে হয়, সারাদিন ঘুম পাড়িয়ে রাখবে।
হিমোগ্লোবিন, ফাইভ-পয়েন্ট-ফাইভ-পটাসিয়াম----
সুদাম, ছুটছে রাস্তায়--দাদা, আমার বৌ দুর্গা ;
চেনা-জানা, পরিচিত মুখ এখন সব অচেনা।
কি হয়েছে সুদাম ? বাবু-আপনার বাড়িতে অনেক কাজ করেছি।
এই দেখুন, ডাক্তার বাবুর কাগজ--একটা উপায় করুণ।
কুলেখারা--গুলঞ্চ--কুলেরণ, চালিয়ে যাও।  আর আমার ড্রেনটা---
দিন-শেষ, সূর্য ডুবে যায়-- হয় না কোন উপায় ;
বার্ধক্যের বিষাদ বুকে নিয়ে---হাঁপিয়ে চলে সুদাম।

এক চোখ ঘুম নিয়ে -- আলো চাল ( আতপ ) কিছুটা ফুটিয়ে রেখে--
অবসন্ন শরীর নিয়ে --হাজির হয় দুর্গা, প্রতিদিনের রাস্তায়----
এ-কি “দুর্গা” পূজোর দিন--বাড়ি-ভরা মানুষ, তুমি, আসোনি চারদিন।
দিদি, আমি অসুস্থ -- দেখুন এই ডাক্তারের কাগজ।
তিন বাড়ি-চার বাড়ির, একই কথা তুমি চলে যাও।
তোমার গা ভরা জ্বর --তুমি অসুস্থ- -বলছে তোমার কাগজ
আমার টাকা, বোনাস--শাড়ি ? ওসব পরে হবে ;
নানা--পদের রান্নার দিকে চেয়ে,
তার, আলো-চালের, ভাতের-কথা মনে পরে।
জীবনে কত পদের রান্না করেছি- এই চার বাড়িতে ;
আজ, অসুস্থ শরীর--স্বাদহীন জিভ্ --অন্য স্বাদের কাছে নত হয়
পায়ের তলায় কাঁপছে মাটি- ভীষণ ঘুরছে মাথা
বোতাম-হীন ছেঁড়া-ময়লা জামা--শিশু দুটির গায়
         এই, পূজার সময়।

.        ভেতরে বুঝি ভোগ ফুটছে--এক্ষুনি, পড়বে ডাক।
.        যেই ভাবা, অমনি চিত্কার -- কে আছিস, আগে ওদের, বের করে দে।
.        দৌড়ে পালিয়ে যায়, শিশু দুটি অন্য মণ্ডপে।
.        ঝল্ সে ওঠা আলো -- চারদিকে মাইকের চিত্কার--
.        ধুনুচির ধোঁয়া সরে গেলে-- ওরা বলে দেখ ;
.        আজ নবমী -- ঠাকুরের নাম দুর্গা --মার নামও দুর্গা।
.        ঠাকুর, কেন পান্তা খাবে-- পান্তাতো আমাদের খাবার।

বাইরে জটলা -ভেঙ্গে গেছে শিশুমন- সুদাম নির্বাক।
পাঁচ-ছয় দিনের পান্তা, মুখে লাগিয়ে--
দেবী দুর্গার আগে দুর্গা চলে গিয়েছেন --
পায়নি বোনাস চায়নি অন্য পদের হরেক রান্না ;
হঠাত্ উন্মাদের মতো, মন্দিরের দিকে ছুটে চলে সুদাম।

.        মা, ওদের বিচার-বুদ্ধিতে আগুন ধরিয়ে দাও।
.        আমাদের জ্ঞানের দরকার নেই--আশীর্বাদ লাগাও।
.        আমরা ভাত চাই না ক্ষিদে কেড়ে নাও।
.        আমরা ধর্ম চাই না-- ধার্মিক এনে দাও।
.        আমরা মাল চাই না -- মালিককে চাই।
       আমরা ইমারত চাইনা-- তুমি ছাতা ধরে থাকো।
.        আমরা প্রভু হতে চাই না-- ভক্ত করে রাখো।
ওরা, বাইরে জলপ্রপাত -- ভেতরে মরুভূমি --
.        এটা তুমি মনে রেখো ?

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হারানো-অতীত
কবি সুব্রত চক্রবর্ত্তী ( শ্যাম )
ইং - ০৮/ ০৭/ ২০২১।

চৈত্রের-দুর্মর-দুপুরে, চলছি, পেছনের পানে--
পায়ের পরিশ্রমে, হেঁটেছি --অনেক খানি পথ।
এসেছি, অনেক দূর-- ঐ যে “কন্টাই তোলা”।
যেখানে, ঝোলানো আছে- আমার প্রিয়- ছোট্ট-বেলা।
জামরুল -হেতাল-তাল-চালতা--
আছে, অসংখ্য শালুক-ভরা ডোবা।
ছোট্ট নদীটা, বাঁক খেয়ে চলে গেছে--সীমান্তে।
নোঙর-করা আছে, রহিম চাচার ভাঙ্গা নৌকা ।
ঐ যে-- প্রাচীন,  অশোক ফলের গাছ !
জড়িয়ে থাকা, অশ্বথ্ব-বট-পাশে-“শিব তলা”।

হাতে-ফুলের “সাজি” -- চুপ করে, ইশারায় ডাকছে কে ?
চমকে উঠি-- “মল্লিকা” ভেঙ্গে যায়--নিঃসঙ্গতার ফাঁস।
মাড় দেওয়া -অবাধ্য শাড়িটা--ওর শুনছে না কথা।
“স্যার” , আপনি-- না, আমায় বাংলা শেখাতেন।

স্কুলটা -- বেশ বড় হয়েছে --
পুরানো ‘পুলটাও’  দেখি-- পাকা হয়েছে।
স্যার -আগে না, ওটা কাঠের ছিলো-- জানি।
বৃক্ষদের প্রেতাত্মারা ঘুরে বেড়ায় তাই পাকা হয়েছে।
“মল্লিকা “-- হঠাত্ চৈত্রের-ঝড়ে, সব পাল্ টে গেলো।
চারদিকে -নষ্ট হওয়া পাখীর ডিম--
সদ্য-ফোটা শাবক নিয়ে মায়ের, চিত্কার ;
ধুলোর ঝড়ে, পরাগের মিষ্টি ছোঁয়া উধাও --
অল্প জলে, আমের মঞ্জরী--সাথে ভাসমান-তেজপাতা।
শুক্ নো বাঁশপাতা  থেকে চুইয়ে পড়ছে জল।

নদীর বাঁকে, পুরানো “গাজন” তলায়---
কিসের চিল্-চিত্কার ?  ছেলে-পুলের দৌড়-ঝাঁপ।
লাল-কাঁকড়া-হয়েছে জড়ো, নতুন বত্সরের নতুন জলে।
মল্লিকা--ধুতি পরা ভদ্রলোক , ওখানে কে দাঁড়িয়ে ?
মনে হয় --“শচীন স্যার” -- খবরদার প্রণাম না ?
তুই “বামন” হতে পারি, শিক্ষা গুরু কিন্তু “আমি আত্মজ”।
গুরু দ্রোন--পরশুরাম-  একলব্য-কর্ণ-ভুলিস না “মহাকাব্য”।
মনে--ভাবি, স্যার- এখনও ------ ?

এক ধামা, পোকা-রেশনের চাল-দেখছেন ফিরোজা বিবি।
শুকোতে দেওয়া, জামা-কাপড়ের  জলে মুখ-ভাসে--
এক মুখ দাঁড়ি --- আরে “রহিম” চাঁচা ?
চোখে অশ্রুজল -- “খোকাবাবুর”   দেশটাতো এমন ছিলো না  ?

ফরাসে ধুলোর স্তর--নাম করা “মল্লিক-বাড়ি”।
ইঁদুরের-অবাধ-আনা-গোনা-- যেখানে সেখানে।
শুকনো দুটি বই -- অক্ষর হলদে হয়ে আছে।
বিদেশী পেপার-ওয়েট -- ঘূনে ধরা তানপুরা ----
এখানে, গান শুনিয়েছে -- ‘অতুলপ্রসাদ’,  ‘বেগম-আখতার’  
.                               এমন কি ‘নজরুল’।
মনে হয় -- আসেননি “গওহরজান”।
কেউ সশরীরে নয়-- সব রেকর্ডে ধরা।

মাথা ঘুরছে, রাস্তাগুলো--গুটিয়ে আসছে, বলছে ফিরে আয় ;
স্যার -- এ যে, সবুজ ঘাসে --একপাল ছাগল-সাথে--নানা রংয়ের শাবক  
.        তুমি জানো না --মল্লিকা -- মৃত্যুদেবতার কাছে---
        কুড়োতে .চেয়েছি প্রেম, আমার মাকে নিয়েছে কেড়ে ?     
.         ছাগল-ছানার জন্ম শুধু বৃথা
        মৃত্যু--লেখা নিষ্ঠুর নিষ্ঠুর কঁসাইয়ের হাতে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর