প্রিয় সুতনুকা, বৎসরের পরে দেখলাম তোমায়, সেই সে হরিণ আঁখি, কাজলের রেখা গিয়েছে মুছে, গুছিয়ে পরা শাড়ির আঁচলে খোকার কাজলের দাগ। তখন নির্মেদ ছিলে তুমি, যেন পটুয়ার আঁকা পটের সে ছবি ; - আজ সেই সুগঠিত মধ্যমায় চর্বির আস্ফালন। মনে পড়ে, সেদিনের কথা ? সেই যে সেদিন কলেজ বাঙ্ক করে ময়ূরাক্ষীর ধারে..? সেদিন তোমার চোখে ভীরুতা ছিল, আমাকে চেপে ধরেছিলেন হঠাৎ, ভেবেছিলাম এ দৃঢ় আলিঙ্গন শিথিল হবে না কোনোদিন, আমিও বেঁধেছিলাম দু'বাহুর ডোরে। কাল বলে একটা জিনিস যে আছে খবর রাখতাম না তার, ভাবতাম দিন যাবে এমনি করেই ; হঠাৎ সে ঝড় এলো এলোমেলো হাওয়া, উড়ে গেল তিল তিল করে বাঁধা বাসা। মুরুব্বিরা বলল, চাকরি তো করে না ও, বেকার বাউন্ডুলে। প্রতিবাদ করোনি তুমিও, - হয়তোবা পারোনি। শুভ ক্ষণে শুভ লগ্নে বেজে উঠল সানাইয়ের সুর, মধুবন্তীর আলাপে ভরে উঠল দিগ্বিদিক। এদিকে আমার কুঁড়েঘরে বাজপড়া কদমের নিচে মারোয়ায় বেজে ওঠে বাঁশি ; সে সুর আটকে থাকে সন্ধ্যার গুমোট বাতাসে। 'কি নেই কি নেই' এর সঙ্গে 'সব আছে'র অসম লড়াই, কে জিতল কে হারল তা জানে নাকো কেউ। এখন আর কবিতা আসে না মনে, বাঁশি আছে পড়ে বাক্সের গহন অন্ধকারে। মোড়ের মাথায় চায়ের দোকান, টিমটিম করে আলো জ্বলে। কি নেবেন? ছেলের জন্য দুধ? পয়সা লাগবে না ম্যাডাম। শুধু বসে যান দু'দণ্ড গরীবের ছোট্ট এ আশ্রয়ে, গাড়ি এলে যাবেনই তো চলে, - চলে যাব আমরা সবাই।
কালী বলতে তোমরা কি বোঝ জানি না, আমি বুঝি ছোট্ট ন্যাংটা মেয়ে ঘুরে বেড়ায় আমার আশে পাশে ;- শাসন বারন কোনকিছুই মানে না। ফাগুন মাসে কুল পেড়ে খায় বোশেখ মাসে লবণ মেখে আম বার করে জিভ চাটে আমের আঁটি ; কালো বলে কালীই তো তার নাম। যখন আমি আপনমনে লিখি পিছন হতে ছোট্ট দুটি হাত জড়িয়ে ধরে এসে; 'ছাড় নারে মা, এখন কত কাজ ;' - - বলি আমি তখন মুচকি হেসে। খেলতে গিয়ে পাড়ার দুষ্ট ছেলে যখন তাকে দেয় কখনো গালি মেয়ে আমার কেঁদে এসে পড়ে, কালো বরন হয় যে আরো কালি। ধুলোমাখা কালোকেশে জট বেঁধে যায়, খুলে পড়ে যত্নে বাঁধা বেণী আর যেই যা বলুক তারে সে তো আমার এই দু'চোখের মণি। চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে ঠোঁটদুখানি রক্তে ভিজে ওঠে মেয়ের আমার তবুও মুখে হাসি, - - কালোয় যেন হাজার আলো ফোটে। রুক্ষকেশে গুঁজে জবার কলি মেয়ে আমার কালি। তাই তো তার দেখতে মুখের হাসি সমস্ত সুখ অক্লেশে দিই বলি। এ কালি আজ সবার ঘরে ঘরে, হয়তো আছে অবহেলায় পড়ে ; এই কালি-ই লক্ষ্মী দশভূজা, তবে কেন অবহেলার সাজা? বদলেছে যুগ, - - এ যুগ আমার কালীর তার আলোতেই উঠবে জ্বলে প্রদীপ দীপাবলীর॥
আমাকে ক্ষেপিয়ে বেড়ায় নাম না জানা কত অর্কিডের সারি, আগুনের মত লাল কেউ, কেউ বা নীল, কেউ সাদা পরী; কেউ দোলে শ্রাবণ বাতাসে অবিশ্রান্ত বাদল ধারায় কারোর বুকে উন্মত্ত সুবাস, কারোর ডালে পাখি গান গায়। সবচেয়ে লাজুক যেটি, ফুটেছে আজই বাগানের কোণে, হলুদ বর্ণ তার পাঁপড়ির পাশে মাতাল ভ্রমর একমনে - নেচে চলে হাজারো মুদ্রায়। কখনো কখনো কাটে তাল; চেয়ে থাকি অলস নয়ণে, দূরে ওড়ে বকেদের পাল - অসীমের সীমান্ত ছাড়িয়ে। দিন যায় যৌবনও শেষ হয়ে আসে, ফাঁকা ঘর, আমি নেই, বাতাস ঝিমোয় ; ভ্রমরটা আজও নাচে নতুন কোন অর্কিডের পাশে॥
যাও হে ফিরি যাও হে হর আবার এস বছর পরে কবি সুব্রত মজুমদার
যাও হে ফিরি যাও হে হর আবার এস বছর পরে ততদিন নয় ওহে ভোলা প্রাণের উমা থাকুক ঘরে। মাঝে যদি আসো ভোলা লয়ে কাঁথা বাঘছালা, ইঁদুরের কাটিবে ছালা সর্প খাবে ধরে গরুড়ে। ঘর জামাই হলে পরে তোমারে রাখিব ঘরে, ছেলের মতো রইবে গৃহে প্রাণ জাগিবে পাষানপুরে। তুমি নাকি মৃত্যুঞ্জয় আশুতোষ সদাশয় ! তোমার বিরহ কি প্রাণে সয়? উমা তাই শ্মশানে ফেরে। তোমার জন্যে হল কালি পরে কৃত্তি মেখে কালি, মায়ের প্রাণে এসকলি সয় বল কেমন করে। সুব্রত বলে শোন মেনকা, হয় মা তেঁতুল ফুলেই বাঁকা, ও পাগলে কি যায় মা রাখা সংসারের খাঁচায় বন্দি করে? কালের কোলে বসে কালি মেয়ে যে তোর মহাকালি, মহাব্যোমে জটামেলি (প্রলয়ে) গ্রাসিছে মা জগতে।