কবি সুব্রত মজুমদারের কবিতা ও গান
*
দেখা
কবি সুব্রত মজুমদার

প্রিয় সুতনুকা,
বৎসরের পরে দেখলাম তোমায়,
সেই সে হরিণ আঁখি, কাজলের রেখা গিয়েছে মুছে,
গুছিয়ে পরা শাড়ির আঁচলে খোকার কাজলের দাগ।
তখন নির্মেদ ছিলে তুমি,
যেন পটুয়ার আঁকা পটের সে ছবি ; -
আজ সেই সুগঠিত মধ্যমায়  চর্বির আস্ফালন।
মনে পড়ে, সেদিনের কথা ?
সেই যে সেদিন কলেজ বাঙ্ক করে ময়ূরাক্ষীর ধারে..?
সেদিন তোমার চোখে ভীরুতা ছিল,
আমাকে চেপে ধরেছিলেন হঠাৎ,
ভেবেছিলাম এ দৃঢ় আলিঙ্গন শিথিল হবে না কোনোদিন,
আমিও বেঁধেছিলাম দু'বাহুর ডোরে।
কাল বলে একটা জিনিস যে আছে খবর রাখতাম না তার,
ভাবতাম দিন যাবে এমনি করেই ;
হঠাৎ সে ঝড় এলো এলোমেলো হাওয়া,
উড়ে গেল তিল তিল করে বাঁধা বাসা।
মুরুব্বিরা বলল, চাকরি তো করে না ও, বেকার বাউন্ডুলে।
প্রতিবাদ করোনি তুমিও, - হয়তোবা পারোনি।
শুভ ক্ষণে শুভ লগ্নে বেজে উঠল সানাইয়ের সুর,
মধুবন্তীর আলাপে ভরে উঠল দিগ্বিদিক।
এদিকে আমার কুঁড়েঘরে বাজপড়া কদমের নিচে
মারোয়ায় বেজে ওঠে বাঁশি ;
সে সুর আটকে থাকে সন্ধ্যার গুমোট বাতাসে।
'কি নেই কি নেই' এর সঙ্গে 'সব আছে'র অসম লড়াই,
কে জিতল কে হারল তা জানে নাকো কেউ।
এখন আর কবিতা আসে না মনে,
বাঁশি আছে পড়ে বাক্সের গহন অন্ধকারে।
মোড়ের মাথায় চায়ের দোকান, টিমটিম করে আলো জ্বলে।
কি নেবেন? ছেলের জন্য দুধ?
পয়সা লাগবে না ম্যাডাম।
শুধু বসে যান দু'দণ্ড গরীবের ছোট্ট এ আশ্রয়ে,
গাড়ি এলে যাবেনই তো চলে, -
চলে যাব আমরা সবাই।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমার কালী
কবি সুব্রত মজুমদার

কালী বলতে তোমরা কি বোঝ জানি না, আমি বুঝি ছোট্ট ন্যাংটা মেয়ে
ঘুরে বেড়ায় আমার আশে পাশে ;-  শাসন বারন কোনকিছুই মানে না।
ফাগুন মাসে  কুল পেড়ে খায় বোশেখ মাসে লবণ মেখে আম
বার করে জিভ চাটে আমের আঁটি ; কালো বলে কালীই তো তার নাম।
যখন আমি আপনমনে লিখি পিছন হতে ছোট্ট দুটি হাত জড়িয়ে ধরে এসে;
'ছাড় নারে মা, এখন কত কাজ ;' - - বলি আমি তখন মুচকি হেসে।
খেলতে গিয়ে পাড়ার দুষ্ট ছেলে যখন তাকে দেয় কখনো গালি
মেয়ে আমার কেঁদে এসে পড়ে, কালো বরন হয় যে আরো কালি।
ধুলোমাখা কালোকেশে জট বেঁধে যায়, খুলে পড়ে যত্নে বাঁধা বেণী
আর যেই যা বলুক তারে সে তো আমার এই দু'চোখের মণি।
চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে ঠোঁটদুখানি রক্তে ভিজে ওঠে
মেয়ের আমার তবুও মুখে হাসি, - - কালোয় যেন হাজার আলো ফোটে।
রুক্ষকেশে গুঁজে জবার কলি মেয়ে আমার কালি।
তাই তো তার দেখতে মুখের হাসি সমস্ত সুখ অক্লেশে দিই বলি।
এ কালি আজ সবার ঘরে ঘরে, হয়তো আছে অবহেলায় পড়ে ;
এই কালি-ই লক্ষ্মী দশভূজা, তবে কেন অবহেলার সাজা?
বদলেছে যুগ, - - এ যুগ আমার কালীর
তার আলোতেই উঠবে জ্বলে প্রদীপ দীপাবলীর॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
অধর তোমার
কবি সুব্রত মজুমদার

অধর তোমার কোন লালিমায় লাল হল ?
প্রথম চুমু দেওয়াই কি মোর কাল হল !
জানলে আগে লাজের ঘটা
কইত কে আর প্রেমের কথা ;
তোমার লাজের লালিমাতে অস্তরবি লাল হল।
খোঁপার ঘ্রাণে মিথ্যে আমায় বশ করো,
মন ভূলাতে মিথ্যে আমার যশকরো,
কাজল কালো চোখের তারা
করলো আমায় তন্দ্রাহারা ;
রাত্রি জেগে তাকিয়ে রই, - তাও মেটে কি আশ কারো ?
যাচ্ছ তুমি আলতা পায়ের ছাপ ফেলে
পায়ের নূপুর বাজছে মধুর সুর তুলে।
দূর্বাঘাসে জলের  কণা
যাচ্ছে নাকো মাণিক গণা
হেমন্ত আজ এল যেন পথ ভূলে।
নীলাম্বরীর নীল মিশেছে রক্তরবির লাল ঠোঁটে
বক্ষবাঁধন ভেদ করে তাই অচল নগের বাঁধ টুটে।
পদ্মিনী লো তোর 'বাসে
মন মধুকর ওই আসে,
গুঞ্জনে তার বিভোর হয়ে কমলিনীর ঘুমছুটে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বেঁচে থাকা
কবি সুব্রত মজুমদার

অদ্ভুত নিস্তবদ্ধতা পৃথিবীর বুকে,
লোভে মত্ত হায়নার দল
ছিঁড়ে খায় শিশুদের শব।

রাত্রদিন অলীক স্বপন,
যা নাই তার কথা ভাবা;
যা আছে তার কণ্ঠনালী
ছিন্নকরা শাণিত ছোরায়,
ঘরে ঘরে তার আর্তরব।

মূর্খেরা আনন্দে বাঁচে
কশাইয়ের খাঁসির মতন,
এরপর তার পালা তবু,
আমপাতা করে রোমন্থন।

চোখবুজে নিত্যদিন বাঁচা
কশাইয়ের আমপাতা খেয়ে,
সঙ্গীর মূক-আর্তনাদে
রোমাঞ্চে পুলক লাগে গায়ে।

বিজ্ঞ যারা বসে বসে ভাবে
কর্মহীন অলস বিমুখ,
দাবি তোলে - অধিকার চাই,
হায়নারা শান্তিতে বাঁচুক।

তারা তো যায় না চলে,
যায়নাকো হায়নাদের ঠাঁই !
কশাইয়ের পেটের কথা ভেবে
যায়নাকো ছুরির তলায় ।

রাত্রদিন ফেরে লুশিফার
আলো নিয়ে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার,
দূর করে দিই অহরহ,
এ যে পাপ, চরম ঘৃণার।

প্রমিথিউসের মতো আর
তাই তো আসে কেউ ফিরে, -
হাতে নিয়ে জ্ঞানের মশাল,
ভয় তাই দ্বারে দ্বারে ফেরে।

আমি জাগি রোজ অন্ধকারে
সে আলোর খোঁজে,
যে আলোতে ভ্রম যাবে মিশে
অতীতের অন্ধকার দেশে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আজ বসন্তে
কবি সুব্রত মজুমদার

রক্তপায়ে পলাশ এল বসন্তে আজ মোর দ্বারে,
ছড়িয়ে দিল রঙিন বসন গগনতলের প্রান্তরে ।
পরাগ ছোটে মত্ত ঘোড়া লাগাম ছাড়া লক্ষ্যহীন
কলির বুকে ঘুমায় সুখে মত্ত অলি রাত্রদিন।
কোন অতনুর তনুর পরশ লেগেছে সই হৃদমাঝে,
মহুল বনে, পিয়াল সনে অভিসারে তাই সাজে।
আজ ফাগুয়ার ফাগের রঙে কালোবরণ নাইকো আর
কাজল চোখে মহুল নেশা দিগ্বিদিকে রংবাহার।
অভিসারের সার গিয়েছে ভিজল রঙে নীলবসন,
চোখের তারার ঈশারাতে ঘায়েল হল মীনকেতন।
উড়ছে পরাগ বেহাগ রাগে ভুলেছে সে রাত্রদিন,
হাসছে শিমুল দুলছে দোদুল মন পবনের বাজছে বীণ।
আয় গো সখি এমন সময় হোরির রঙে মাতিয়ে দি',
অধর পরে চুম্বনেরই একটা সে দাগ লাগিয়ে দি'।
সে দাগ মধুর বৃন্দাবনে শ্যামের গালে আঁকছে রাই,
ভ্রমর আঁকে কলির গালে, তোর অধরে আঁকতে চাই।
ফাগের ধুলো উড়িয়ে দিয়ে মনের বন্ধ দরজা খোল্,
নিত্য মোদের হোরিখেলা কালকে হোরি আজকে দোল।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
উত্তরের পথে
কবি সুব্রত মজুমদার

উদ্যাম আদিম আতঙ্ক আর উৎস হতে উৎসারিত স্নেহ
মিলেছিল একসাথে, প্রকৃতির যেথা পন্নগেহ
অবিরাম আলোকধারায় করেছিল স্নান।
একদিন সেইপথ ধরে হৃদয়ের যত হাসিগান
বেজেছিল যেসুরে হঠাৎ সে আমার উত্তরবঙ্গ তুমি।
তোমার  চোখের ইশারায় আমারে চিনেছি আজ আমি।
যুবতীর উদ্ধত স্তনের মতন পাহাড়ের চূড়া বনানীর মাঝে
আকাশচুম্বন করে ফেরে। জ্যোৎস্নামাখা দামালেরা নাচে
চায়ের ঝোপের ফাকে প্রহত মূরজার তালে তালে।
বিস্তীর্ণ উপত্যকার বৃক্ষরাজি ঝর্ণার শব্দের সাথে মিলে
নিয়ে চলে দূর স্বপ্নলোকে।
চন্দ্রের আলোকে - -
ছায়া পড়ে হ্রদের জলে জলখেতে আসা শ্বাপদের যত,
মৃদুমন্দ বাতাসেরা গেয়ে চলে গান। মৃত্যুর মতো
রাত্রি আসে পেঁচার চিৎকারে ভর করে।
চেয়ে থাকে জোনাকিরা আলো মেখে, - অরণ্যের পরে
কেউ যেন গেয়ে যায় ঘুমপাড়ানিয়া গান মায়ের মতন।
ঘুম আসে, জেগে থাকে বনস্থলি বুকে নিয়ে আগামীর সবুজ স্বপন।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমাকে ক্ষেপিয়ে বেড়ায়
কবি সুব্রত মজুমদার

আমাকে ক্ষেপিয়ে বেড়ায় নাম না জানা কত অর্কিডের সারি,
আগুনের মত লাল কেউ, কেউ বা নীল, কেউ সাদা পরী;
কেউ দোলে শ্রাবণ বাতাসে অবিশ্রান্ত বাদল ধারায়
কারোর বুকে উন্মত্ত সুবাস, কারোর ডালে পাখি গান গায়।
সবচেয়ে লাজুক যেটি, ফুটেছে আজই বাগানের কোণে,
হলুদ বর্ণ তার পাঁপড়ির পাশে মাতাল ভ্রমর একমনে -
নেচে চলে হাজারো মুদ্রায়। কখনো কখনো কাটে তাল;
চেয়ে থাকি অলস নয়ণে, দূরে ওড়ে বকেদের পাল -
অসীমের সীমান্ত ছাড়িয়ে। দিন যায় যৌবনও শেষ হয়ে আসে,
ফাঁকা ঘর, আমি নেই, বাতাস ঝিমোয় ; ভ্রমরটা আজও নাচে নতুন কোন অর্কিডের পাশে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আজও বেশ মনে পড়ে
কবি সুব্রত মজুমদার
স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির দ্বারা নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদনের প্রতিবাদে রচিত।

আজও বেশ মনে পড়ে
পাঁচিলের একধারে
ছিল বুড়ো বটগাছ একখান,

নারকেল মহুয়ার
সবুজ সে সংসার
স্মৃতিতে এখনও অম্লান।

পড়লাম পেপারে
খুব বড় ব্যাপারে
ছোট্ট সে সবুজের নেই ঠাঁই।

হবে খিল দরজা
'ও সবুজ মর যা !'  
তোকে নিয়ে ভাববার লোক নাই।

পুড়ছে অ্যামাজন
পুড়ছে দরদী মন,
তত বাড়ে করাতের শব্দ,

এইভাবে হল শেষ
রইলো না অবশেষ,
কলের কুঠারে কাল জব্দ।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যাও হে ফিরি যাও হে হর আবার এস বছর পরে
কবি সুব্রত মজুমদার

যাও হে ফিরি যাও হে হর আবার এস বছর পরে
ততদিন নয় ওহে ভোলা প্রাণের উমা থাকুক ঘরে।
মাঝে যদি আসো ভোলা লয়ে কাঁথা বাঘছালা,
ইঁদুরের কাটিবে ছালা সর্প খাবে ধরে গরুড়ে।
ঘর জামাই হলে পরে তোমারে রাখিব  ঘরে,
ছেলের মতো রইবে গৃহে প্রাণ জাগিবে পাষানপুরে।
তুমি নাকি মৃত্যুঞ্জয় আশুতোষ সদাশয় !
তোমার বিরহ কি প্রাণে সয়? উমা তাই শ্মশানে ফেরে।
তোমার জন্যে হল কালি পরে কৃত্তি মেখে কালি,
মায়ের প্রাণে এসকলি সয় বল কেমন করে।
সুব্রত বলে শোন মেনকা, হয় মা তেঁতুল ফুলেই বাঁকা,
ও পাগলে কি  যায় মা রাখা সংসারের খাঁচায় বন্দি করে?
কালের কোলে বসে কালি মেয়ে যে তোর মহাকালি,
মহাব্যোমে জটামেলি (প্রলয়ে) গ্রাসিছে মা জগতে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
দেখেছি তোমাকে স্বপনচারিনী বিদ্যুন্মালা গলে
কবি সুব্রত মজুমদার

দেখেছি তোমাকে স্বপনচারিনী বিদ্যুন্মালা গলে
মদির নয়ন চপল চরণ কিঙ্কিণী রব তোলে।
সন্ধ্যা তারার মালিকা গলায়  চাঁদের মুকুট শিরে
পাকা কেঁদুরির মতন ওষ্ঠে জ্যোৎস্নার হাঁসি ঝরে।
সন্ধ্যার যত হংসবলাকা আপন কুলায় ফেরে
তাদের শুভ্র পালক তোমার সকল অঙ্গ ঘিরে।
বেলির গুচ্ছ নীবিবন্ধন রসনা কমলদল
কমলপত্রে শিশিরের মতো আঁখি করে টলমল।
স্বপনের ঘোরে দেখেছি তোমায় তমসা নদীর কূলে,
সবুজ পাড়ের আশমানী শাড়ি দখিনা হাওয়ায় দোলে।
লাল শালুকের মালা পরে গলে ঢেউ তুলে কালো জলে
হে মৃগনয়ণা ভাবো কার কথা এলাইয়ে এলোচুলে।
ঝিঁঝিঁ ঝঙ্কারে শিঞ্জন তুলে বেলির সুবাস ছড়ায়ে
স্বর্ণলতার মতন প্রেয়সী অঙ্গে রহ গো জড়ায়ে।
তোমায় দেখেছি দ্বারকার কূলে দেখেছি গিরিকন্দরে
ইলোরার রুপে ধৌলির স্তুপে দেখেছি হৃদয় মন্তরে;
তোমারে হেরিয়া রচে কালিদাস মন্দাক্রান্তা ছন্দ,
ভিঞ্চির তুলি তোমার সুষমা আঁকে দিয়ে তার আনন্দ।
বৈজুর সুরে বীণাঝঙ্কারে বিরহীর অভিমানে
তুমি আছ প্রিয়া, আছ চিরকাল হৃদয়ের নিধুবনে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর