কবি সুব্রত মজুমদারের কবিতা ও গান
*
বৈশাখের তপ্তবেলা তথাগত পৌঁছিলা কুশীনগরের সন্নিকটে
কবি সুব্রত মজুমদার

বৈশাখের তপ্তবেলা তথাগত পৌঁছিলা কুশীনগরের সন্নিকটে,
আনন্দে ডাকিয়ে বলে, "দেহ আর নাহি চলে, বিশ্রাম করিব এই পথে।
আনন্দ বলিল, "স্বামী, আর কিবা আছে দামী তোমা হতে এ ধরার পরে ! "
প্রভু কন," শোন তবে আজিকে নির্বাণ হবে, নাহি রব আর এ সংসারে।
এ দেহ নশ্বর জেনো তার শোক কর কেনো, পীড়া হল নির্বাণ কারণ
কুণ্ডেরে না কর হেলা,  ভালোবেসে পরশিলা করিয়ে অতীব যতন।
যদি কিছু থাকে মনে প্রশ্ন কর এইক্ষণে, সময় আর নাহিক অধিক,
দয়া করো ভালবাসো সকল অবিদ্যা নাশো, মধ্যপথে চলাই সঠিক। "
চলে রবি অস্তাচলে দূর দিগচক্রবালে উড়ে চলে মরালের দল
নির্জন অরণ্যপরে জ্যোৎস্নারাশি ঝরে পড়ে, ভিক্ষুগণ উদ্বেল চঞ্চল।
হেনকালে শালতলে ভগবান শয্যা নিলে সুভদ্র নামেতে ভিক্ষু এক
নানা সংশয় তার জিজ্ঞাসিল বারবার, কৌতূহল করিয়া উদ্রেক।
বুদ্ধ কন," এই দিনে লুম্বিনীর উদ্যানে এসেছিনু মায়াদেবী কোলে,
দুঃখ ব্যাধি মৃত্যু জ্বরা ত্রিতাপে ব্যাকুল ধরা, তাই জীর্ণ সবকিছু ফেলে - -
একান্ন বৎসর ধরে নানা দেশ ঘুরে ঘুরে তপ করে এই জানি সার
অষ্টাঙ্গিক মার্গ ধর্ম জেনো মূল আর্য্যকর্ম  বাকি হল সমস্ত অসার।"
শান্ত থাকি কিছুক্ষণ আনন্দেরে বুদ্ধ কন, "সংঘ হল এবে আমার ছাড়া।
বয়স্ক ভিক্ষুরে মান আর দিয়ো সন্মান 'ভন্তে' বলে দিও যেন সাড়া ;
এ ধরায় জন্মে যাহা অবশ্য বিনাশে তাহা আত্মা হল অজর অমর,
নিজের প্রজ্ঞা আলো অন্তরের মাঝে জ্বালো উদ্ভাসিত হউক অন্তর।"
এই বলি তথাগত চিত্ত করি সমাহিত যোগবলে ত্যাজিলেন কায়,
দেহ যেন শূন্য তরী নিশ্চল রহিল পড়ি জ্যোৎস্নাময় শালতরুছায়॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
গগন মা থাল
গুরু নাকজী মহারাজ কৃত।
ভাবানুবাদ - কবি সুব্রত মজুমদার

আকাশ থালায় তোমার আরতি রবিশশী দীপ জ্বলে,
তারকামণ্ডল মোতির সে মালা তোমার চরণতলে।
চাঁদ দেয় আলো বহে গো সমীর
জগৎ সবিতা হরয়ে তিমির
রুপ রস আর গন্ধে মদীর তোমার করুণা ঢালে॥
কেমনে হে প্রভু করি গো আরতি-
কোনভাবে গড়ি তোমার মুরতি?
অনাহত ভৈরবী বাজে নিতি, কোন হৃদয়ের তলে?
সাহসে কি আছে এই ভবমাঝে-
তোমার মূর্তি গড়ি কোন লাজে?
সবার হৃদয়ে সে জ্যোতি বিরাজে একই আকাশতলে॥
আঁধারেতে জ্যোতি গুরুর আকার
আরতি করিয়ে এক ওঙ্কার,
গুরু চরণকমল ধর বারবার মন অলি বস সে কমলে॥
আনন্দে ভরে পিপাসা হরে
কৃপাজল নানক পানকরে
তোমার নামের ভাষার আখরে সুব্রত কথা বলে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
যাও হে গিরি ত্বরা করি চতুর্দোলা সাজায়ে
কবি সুব্রত মজুমদার

॥ গান॥

যাও হে গিরি ত্বরা করি চতুর্দোলা সাজায়ে,
এনো উমা হররমা ভোলায় ভাঙে মজায়ে॥
ভাঙ খেয়ে সে নাচে তা-তা-থৈ,
আমার উমার খবর নেওয়ার সময় গো তার কই?
হ'ল গিরিবালা হাড়ের মালা রূপ যে কালোয় লুকায়ে॥
শুনেছি গো নারদবচন মায়ের আমার জোটে না বসন,
দিগম্বরী হয়ে উমা তাইতো বেড়ায় নাচিয়ে॥
মায়ের রং হল কালো, কেশ জটায় ঘিরিল,
দুটি নাতি সোনারও চাঁদ খিদেয় মরে কাঁদিয়ে॥
যাও গিয়ে বলো ভোলারে যেন কাজ কিছু করে,
নইলে আর না পাবে উমা, বেড়াবে হে কাঁদিয়ে॥
(ও মা) শিব কি রয় একা, উমা শক্তিস্বরূপা,
যেখানে শিব সেথা গৌরী সুব্রত কয় হাসিয়ে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
তারা কেমনে তরিবি দাসে?
কবি সুব্রত মজুমদার

॥ গান॥

তারা কেমনে তরিবি দাসে?
অদৃষ্টের পাশে সবকিছু নাশে
দেহ হীনবল মরি গো তরাসে,
অন্নগত প্রাণ নাহি পরিত্রাণ
রঙ্গমঞ্চে ফিরি নিত্য নানা বেশে।
যা ছিল আপন সব হয় পর,
দুখের সাগরে ঘিরিল অন্তর,
রিপুগণে মিলে শুধু নিরন্তর
গোধূমের সম পিষে।
হায় গিরিবালা, একই তব লীলা
সলিলে আগুন লাগে,
ত্রিগুণেরই নাথ ধুলায় লুটায়
দ্বারে দ্বারে ভিখ মাগে।
যার ঘরে লক্ষ্মী স্বয়ং অন্নপূর্ণা
তার নাই ভাত, কেমনে অপর্ণা?
তবু, সুব্রত নরাধম ও পদ ছাড়ে না
ও পদে ত্রিতাপ নাশে॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
এসো সুন্দর নবঘনশ্যাম
কবি সুব্রত মজুমদার

॥ গান॥

এসো সুন্দর নবঘনশ্যাম।
এসো গোপীজনরঞ্জন মদনমোহন চঞ্চল নয়নাভিরাম।
এসো জগতের হরি হর দুখো-জ্বালা,
এসো রাধামনরঞ্জন চিকনকালা,
এসো কদম্বমঞ্জরী মেখে কালো গায়ে,
মদনমোহন জিনি কাম।
এসো হে মাধব এসো ননীচোরা,
রাইকমলিনী পরে এসো হে ভ্রমরা,
এসো মধুসূদন বিপদভঞ্জন
রাধারে লয়ে বাম।
এসো এসো হে সখা, ভুলি সব জ্বালা
হৃদয়েতে এসো চিকনকালা,
ময়ূরপুচ্ছ শিরে গলে বনমালা,
নবীন বঙ্কিমঠাম।
বুকেতে এসো হে, হে পরাণপ্রিয়,
তব চন্দনবাস মোর অঙ্গেতে দিয়ো,
যা কিছু আছে সখা সবই মোর নিয়ো,
তুমি - প্রাণসখা প্রাণের আরাম।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নির্বাণষটকম্
আদি শঙ্করাচার্য্য কৃত
অনুবাদ কবি সুব্রত মজুমদার।

না আমি মনোবুদ্ধি অহঙ্কার চিত্ত না কর্ণ না নাসা না জিহ্বা না চক্ষু।
না আমি ব্যোম ভূমি না তেজঃ না বায়ু চিদানন্দরূপী সদাশিব আমি॥ ১॥
না আমি প্রাণ সংজ্ঞা না আমি পঞ্চবায়ু না সপ্তধাতু আমি না পঞ্চকোশ।
না বাক্-পাণি-পাদ না উপস্থ না পায়ু, চিদানন্দরূপী সদাশিব আমি॥ ২॥
না দ্বেষ-রাগ না লোভ-মোহ-মদ না মাৎসর্য্য।
না ধর্ম না অর্থ না কাম না মোক্ষ, চিদানন্দরূপী সদাশিব আমি॥ ৩॥
না পূণ্য না পাপ না সুখ না দুঃখ না মন্ত্র না তীর্থ না বেদ না যজ্ঞ।
না ভোজন না ভোজ্য না আমি ভোক্তা, চিদানন্দরূপী সদাশিব আমি॥ ৪॥
না আছে মৃত্যু না আছে শঙ্কা না জাতিভেদ না জন্ম না মাতা।
আমি না বন্ধু না আমি মিত্র, না আমি গুরু না আমি শিষ্য, চিদানন্দরূপী সদাশিব আমি॥ ৫॥
আমি নির্বিকল্প নিরাকার ব্যপ্ত, ইন্দ্রিয় আমি জগৎ সম্পৃক্ত।
না আছে আসক্তি না চাহি হে মুক্তি, চিদানন্দরূপী সদাশিব আমি॥ ৬॥

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর