কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর পরিচিতির পাতায় . . .
স্বাধীনতা
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
রচনা ১৫.০৮.২০২৪। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

আমার ভালোবাসার রঙিন ইচ্ছে-ঘুড়ি
যেদিন নির্ভয়ে আকাশপথে উড়াল দেবে
তাকেই বলব স্বাধীনতা।

আমার প্রিয় রূপটান,অলঙ্কার,পোষাক
তোষামোদিকে পরোয়া না করে
যেদিন ব্যক্তিত্বের ছুরিতে ঝলসে উঠবে
তাকেই বলব স্বাধীনতা।

আমার পোষাক ঝাঁপিয়ে পড়া
বৃষ্টিতে ভিজে গেলে
হাজার লোলুপ দৃষ্টিপাতের
শিকার যেদিন হব না
তাকেই বলব স্বাধীনতা।

এই হাত বদলের দেশ স্বাধীনতা
আমার জন্য নয়।
নিস্তব্ধ রাতের শহরের দৃশ্য-গন্ধ-শব্দরা
যেদিন আমার সই হবে
সেদিন দেশ স্বাধীনতার স্বাদ ভাগ করে নেব
হে “পুরুষ”, তোমার সঙ্গে!

*********************









*
এক প্রেমিকের বয়ান
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
রচনা ২১.৭.২০২৫। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

আমার হাতের ছোঁয়ায় ছোট ছোট কুঁড়ি
লাল ফুলে ছেয়ে গেলে
সেই রাঙা জবার রঙে তোমার রক্তদাগ মুখ
আমি দেখতে পাই।
অস্তগামী সূর্যের লাল টিপ তুলে এনে
প্রেমিকার কপালে পরানোর ভাবনা খানখান হয়ে যায়
আমি দেখতে পাই তোমার রক্তে ভাসা যোনিদ্বার।
বসন্তে শিমুল-পলাশের রক্তিম শোভায়
‘আহা’বলে ওঠা থমকে যায় —-
আমি দেখতে পাই তোমার রক্ত জমাট কণ্ঠনালী।
লিপগ্লসে লাল তোমার ঠোঁট মনে পড়লে
আমি দেখতে পাই তোমার স্তনবৃন্তের রক্তকামড়!

প্রিয়তমা আমার!
নতুন প্রেমকে বরণ করার মুগ্ধতা
ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় —-
তোমার আর্তনাদ ভেসে আসে —- ‘মাগো’!

তোমার ঐ যন্ত্রণা-চিৎকার ভুলতে
আমি আজ হাঁটি মিছিলের সাথে।

*********************









*
জীবন-ঘট
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
রচনা ০৭.০৬.২০২৫। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

চলতি পথের পাথর নুড়ি
ডাস্টবিনের ঐ ছেঁড়া ঘুড়ি
এক্কা দোক্কা খামে মুড়ে
কিম্বা শখের পকেটে ভরে
বয়সকে যেই ভুলি
যাচ্ছেতাই এক পাগলা হাওয়া
অনেককিছু চাওয়া না চাওয়া
অমনি আমায় ছোঁ মেরে নেয়
একজঙ্গল বৃক্ষ সে দেয়
বাহারি রঙ তুলি।

সিফন সুতোয় রঙের টানে
নিঝুম রাতের মন কেমনে
শীতল ভোরের আজান গানে
সে রঙ খোঁজে হরেক মানে
ঈশ্বরী চান পট—
পাথর নুড়ি ছু মন্তরে
চৈতন্যের ওম চাদরে
সূচি শিল্পের কথা ফুঁড়ে
ভালো-মন্দের তেল-সিঁদুরে
পাতল জীবন-ঘট।

*********************









*
চিত্ত আজ ভয়শূন্য নয়
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
রচনা ১৩.০৭.২০২৫। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

অন্তর বিকশিত হল না বলেই
অন্তরতর হারিয়ে যান প্রতি বাইশে শ্রাবণে
প্রতি পঁচিশে বৈশাখে —- নিত্যকার অহংযাপনে।
বাংলাভাষার মৃত্যুশয্যা দেখতে দেখতে
মেরুদণ্ডে নামে আতঙ্ক —- নামে ভয়।
আমি ও তুমি কি ভাবে বাঁচাব
তাঁর বোধের অনুরণন আর গীতবিতান!
দীপ জ্বলে যায়, ধূপও পোড়ে —
তবু জীবনের আলো, জীবনের সুবাস
চেতনার নিভৃতে হয়ত জাগাবে না আর
অমৃতগানের বিস্ময় !
দূরে প্রসারিত তাঁর দুটি চোখে
তাই কি বেদনা এত!

এখন কৃষ্ণপক্ষ
দুঃস্বপ্নের এই রাতেও তুমি আর আমি
বাংলা ভাষার বৃক্ষমূলে জলছড়া দিই
আরো আরো প্রাণতৃষ্ণায় গেয়ে উঠি—
‘আমার যে সব দিতে হবে ‘---
সব দিতে হবে।

*********************









*
সবটুকু রূপকথা নয়
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
রচনা ১২.০৮.২০২৫। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

মেয়েটা চেয়েছিল ঝর্ণা হতে
চেয়েছিল অরণ্য হতে আর চেয়েছিল
পাখির মতো দুরন্ত দুটো ডানা।
রাজার বাড়ির প্রহরার একগুঁয়ে পাথর
দুর্বার গতিতে ঠেলে বেরোবে সেই ঝর্ণা
অরণ্যের সবুজ গভীর মন পেতে দেবে
রাজার কঠিন হৃদয়তলে
রাজবাড়ির বিষ-বাতাসে শ্বাসরুদ্ধ হতে হতে
দুরন্ত দুটো ডানা মেলে দেবে আকাশের দিকে।
রাজা বুঝলেন না এতসব গূঢ়তত্ত্ব— বললেন ‘বেয়াদবি চলবে না'
মেয়ে শুনল না —
হুকুম এল নির্বাসনের।

ভিনদেশে চলল মেয়ে
ঝর্ণা হয়ে, অরণ্য হয়ে,পাখির দুরন্ত ডানা হয়ে
বাঁচবার নেশায়।
সে দেশের রাজা দেখলেন মেয়ের মহিমা-কথা
তাঁর মাথা ছাড়ায়—
তখনই ঝর্ণার গতি শৃঙ্খলে বাঁধার এল হুকুম।

সেই থেকে শৃঙ্খলের সঙ্গে ঝর্ণার লড়াই বাড়ল,
অরণ্যের সবুজ ডালপালা কিছু সেই ঘর্ষণে ঝরল
পাখির ডানাও আকাশের পথ ভুলল মাঝে মাঝে।

মেয়েটা থামল না তবু।
আর থামল না বলেই
লাল-নীল-হলুদ ওষুধের বিধান তাকে
ডেকে নিল।

মেয়ে এখন জানে— এরাই শেষ হাতিয়ার তার
ক্ষত থাকে থাক, বাঁচবে সে আবার
ঝর্ণা হয়ে, অরণ্য হয়ে,
পাখির দুটি ডানার আলিঙ্গন বয়ে।

*********************









*
দ্রৌপদী
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কবির 'আগামী বসন্তে' কাব্যগ্রন্থের কবিতা। রচনা ০৫.০১.২০২৩। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

প্রাগৈতিহাসিক হাতের টানে
ক্রমশঃ খুলছে দ্রৌপদীর শাড়ি।
সে নয় কারো কন্যা বা কন্যাসমা,
নয় রাজবধূ,নয় স্ত্রী,মেধাদীপ্ত নারী নয়,
নয় কোনও বন্ধু—
‘দ্বিতীয় লিঙ্গ’ মাত্র —- এই তার সত্য পরিচয়।
কত অনায়াসে তাকে ছুঁড়ে দেওয়া যায় লালসার জঞ্জাল যত!
একুশ শতক আজও কাঁপে নারকীয় কৌরব-উল্লাসে।

প্রেমের অঙ্গ থেকে পৈশাচিক হাতের টানে
আজও খুলে যেতে থাকে
দ্রৌপদীর বিশ্বাস-ভরসা-মায়াময়-মেধাদীপ্ত শাড়ি
সুসজ্জিত সাজে মননে মেধায় বাগ্মিতা আর আধুনিকতায়
ঢাকা পড়ে যায় লুণ্ঠনকারীর আদিম জৈবিক হাত।

শুধু ইতিহাস ধূপ হয়ে জ্বলে—
ধোঁয়ার কুণ্ডলীর অবয়বে রূপ পায়
ছিনিয়ে নেওয়া দ্রৌপদীর শাড়ি!
দগ্ধ হতে হতে দ্যুতসভায় প্রতিবাদী আগুন ছড়ায়
সেই সব সমবেত নারী —

নাম যার ‘দ্রৌপদী'!

*********************









*
সখ্য
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কবির 'আগামী বসন্তে' কাব্যগ্রন্থের কবিতা। রচনা ১০.০৯.২০২৩। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

আমার জীবন দিয়ে
সাজিয়েছি তোকে মেঘ
কখনও আঁধার কখনও আলোয়
কখনও সাদা কখনও কালোয়
কখনও সোহাগে কখনও বা নোনা জলে—

তোকে ঘিরে আজও
জীবন তেমনই সুঘ্রাণ —
বৃষ্টির ছাঁটে যেন শিউলির স্নান,
দূরে যাস যদি ফুল ঝরে টুপটুপ
কাছে এলে ফের বোবা কান্নারা চুপ

তোতে-আমাতে এ কী কাণ্ডটা বলব তো!

বল না আমায়
এ কেমন খেলা তোর?
ভাঙলে আবার মিলে যায় সব জোড়—
এখন বুকে বৃষ্টির রাত ডাকে
ঘুমোতে দিবি কি কড়ে আঙ্গুলের ফাঁকে?

*********************









*
আগুনপাখি
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কবির 'তুমি ডাক দিয়েছ বলেই' কাব্যগ্রন্থের কবিতা। রচনা ১৭.১২.২০১৯। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

চতুর্দিকে ঘিরছে তোমায় অগ্নিবলয়
মাঝখানেতে উড়ছ তুমি আগুনপাখি
আগুন-তাতে পুড়ছ তুমি যখন-তখন
তোমার চোখেও পুড়ে যাওয়া অগ্নিপতন।

দগ্ধ রোদে পুড়ছে যখন শ্যামলিমা,
মগজ-ঘিলু শব্দে ফাটে আগুন চিতায়,
আগুন বুকে সারাজীবন পুড়ছে প্রদীপ,
আগুন-বালু যখন পোড়ায় শান্ত ঝিনুক—

আমি তখন তোমায় ডাকি আগুনপাখি,
বারুদ বুকে তোমার মুঠোয় বাক্স থাকি
আমার কাছে পুড়তে তোমার ইচ্ছে করে?
আমি তো নই অন্তবিহীন অগ্নিশিখা।

ঠিক করেছি আমি তোমায় পোড়াব না।
আগুন বুকে জ্বলব আমি আগুন পোকা,
ঘুমভাঙা এক অন্ধকারে দেখবে আমায়—
বলো, চন্দন-ধূপ তুমিও হবে অন্ধকারে?

*********************









*
বেজেছে মেঘেরা সবাই
কবি সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কবির 'তুমি ডাক দিয়েছ বলেই' কাব্যগ্রন্থের কবিতা। রচনা ০৩.০৪.২০২০। মিলনসাগরে প্রকাশ ২১.৯.২০২৫।

শব্দ তখনো পায়নি মেঘের সাড়া,
গুহার পাথরে নির্জীব ঘুম
শ্যাওলার স্তরে ঢেকে
ফসিল ছিল যে কারা।

শিল্পীর হাতে কাঁপে নি বীণার ধ্বনি,
বন্ধ দুয়ারে আঘাত দিয়ে যে
অনুভব গেছে ফিরে
কে যেন সে কথা শোনে নি।

ইন্দ্রিয়সুখে গর্জে নেমেছে আঘাত,
ভোরের জবার রঙ ভরে নিয়ে
সূর্য ওঠে নি কোনো
কেঁদেছে জলপ্রপাত।

শব্দ সেদিন পেয়েছে মেঘের সাড়া,
বেদনার তারে ছড় টেনেছিল
ছন্দ-ভরানো এস্রাজ
দূরে ছিল ফসিলেরা।

বর্ণমালাকে ডাক পাঠিয়েছে তারাই,
শিল্পী বেজেছে শব্দ বেজেছে
হৃদি বেজেছে যে তাই —
বেজেছে মেঘেরা সবাই।

*********************