. দূরের কোন স্টেশনে এসে নেমেছি---- . অজানা সব রাস্তা-ঘাট . অচেনা সব মানুষজন . আমাকে তবু এখন থেকে এ তল্লাটে থাকতে হবে . একা আমার এই বিজন
. বিকেলবেলা তাকিয়ে আছে বিষাদ নিয়ে . কে তুমি ভাই, প্রশ্ন করে ঝরা-পাতার হাওয়া . যাবেন কোথা, জানতে চায় রিকশঅলা . কোথায় যাব জানি না, তবু যাওয়া
. জানি না একা থাকব, না কি . থাকতে হবে আরও পাঁচের সাথে . দিন তো যাবে দিনের হাটে . জানি না ঘুম আসবে কিনা রাতে
. মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে, হ্যালো হ্যালো . তাকেও আর পাই না ডেকে ডেকে . এখানে খুবই খারাপ নেটওর্য়াক ----- . ছেলে-মেয়ের কন্ঠস্বর ক্রমশ ক্ষীণ . ঝাপসা হয়ে আসছে ঘরবাড়ি . সকল আমি হারাই থেকে থেকে
. বাড়িতে গিয়েছিলাম, গিয়ে . দেখি যে সব বদলে গেছে . নতুন রঙ লেগেছে তার গায়ে . নতুন সব নতুন সব নতুন চারিদিকে . নতুন চলা নতুন পায়ে পায়ে
. সকলে তারা বলছে হেসে, হাই . পুরাতনকে ছাড়ুন, বস্ . এই নতুনে আপনাকেও নতুন করে চাই
. আবার তাই ফিরে এলাম এ তল্লাটে----- . এখানে আমি থাকতে চাইনি তো . এখানে আমি থাকতে চাইছি না . তবুও কেন এই বিজনে ফেরা
. সামনে, দূরে তেমনি ঠায় . বিষাদ-মাখা সূর্য তারা . আঁধার দিয়ে ঘেরা
কামারশালায় লেগেছে আগুন তেলেগু ভাষায় রচনা - কবি চেরাবান্ডা রাজু। বাংলা অনুবাদ - কবি বিপুল চক্রবর্তী। কবি শঙ্খ ঘোষের সুপরামর্শ এবং সক্রিয় সহ-সৃষ্টিতে, প্রথমে ১৯৮০ সালে ও পরে ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত, “ঢেউয়ে ঢেউয়ে তলোয়ার” কাব্য গ্রন্থের কবিতা। ইংরেজি তর্জমা - কবি ভারভারা রাও, কে ভি আর এবং জগন্মোহন। কবিতাটির শেষে এই কবিতাটির ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু তথ্য আমরা তুলে দিয়েছি।
কামারশালায় লেগেছে আগুন প্রতিটি হাপর ফুঁসছে আগুনে আগুন জ্বালো, সাথি, জ্বালো প্রতীক্ষা ক'রে থেকো না কখন . ভোরের সুর্য উঠছে।
পড়োশি তোমার নেমে গেছে মাঠে রুখা শুখা মাটি চষতে তুমিও লাঙল ধরো, সাথি, ধরো চলে গেলে ফিরে পাবে না সময় . বোসো না হিসেব কষতে।
উর্বরা জমি চাই যে তোমার চাই উপযোগী সার ঠাঁই চাই মাথা গোঁজার জন্য গরুর গাড়ির চাকা দুটিও যে . বদলানো দরকার।
বজ্র নিনাদে জাগছে তরাই আকাশ মেঘাছন্ন চোখ রাখ সেই অশনি ঝলকে লাঙলের ফালে শান দাও, এই . লড়াই বাঁচার জন্য।
শিকারি চিলেরা নামছে ক্রমশ কাড়তে তোমার গ্রাস নামাও তাদের তীরের ফলায় তোমার হাতেই হোক, সাথি, হোক . তাদের সর্বনাশ।
ছেলেরা জোয়ান হয়েছে, কিন্তু কীবা আসে-যায় তাতে সংগ্রাম ছাড়া আসে না সুদিন মিথ্যে স্বপ্ন দেখো নাকো সাথি, . থেকো নাকো নিদ্রাতে।
ভোটের বয়স হলো তো মেয়ের বিয়ে হলো কই তার? ক'আনা বাঁচালে মজুরির থেকে? রোদে জলে খেটে পেলে যে কেবল . মহামারী, হাহাকার।
প্রভুরা তোমার শোনায় তোমাকে কানুনের ছেঁদো কথা বাঁচার দাবিতে নেমেছ যখনই দেখেছ তো তুমি এসেছে পুলিশ . ভুয়ো এই স্বাধীনতা।
জোতছার জমি দিয়েছে তোমাকে বানিয়েছে ক্রীতদাস মহাজন ঋণ দিয়েছে, বদলে লুটেছে তোমার ইজ্জত, সাথি, . প্রিয়াকে করেছে গ্রাস।
দাতা সরকার দাদা ব'নে আজ ধরেছে তোমার কান ঠেলছে সকলে মৃত্যুর দিকে মরবে কি তুমি? কখনো না, সাথি, . গাও লড়াইয়ের গান।
কামারশালায় লেগেছে আগুন প্রতিটি হাপর ফুঁসছে আগুনে আগুন জ্বালো, সাথি, জ্বালো প্রতীক্ষা ক'রে থেকো না কখন . ভোরের সূর্য উঠছে।
কামারশালায় লেগেছে আগুন কবিতাটির ইতিহাস--- কামারশালায় লেগেছে আগুন কবিতাটি এবং তা যে গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল তার ইতিহাস আমরা আগামি প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ করে দিচ্ছি---
কবি শঙ্খ ঘোষের সুপরামর্শ এবং সক্রিয় সহ-সৃষ্টিতে, প্রথমে মার্চ ১৯৮০ সালে ও পরে সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে প্রকাশিত, চেরাবাণ্ডারাজু‘র কয়েকটি গান কবিতার বাংলা রূপান্তর “ঢেউয়ে ঢেউয়ে তলোয়ার” --- কাব্য গ্রন্থের কবিতাগুলি বাংলায় রূপান্তরিত করেছিলেন কবি সমর সেন, কবি শঙ্খ ঘোষ, কবি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যয়, কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্য, কবি সব্যসাচী দেব, কবি সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি বিপুল চক্রবর্তী, কবি তন্ময় শিকদার এবং কবি প্রদীপ গোস্বামী।
তার মধ্যে এই “কামারশালায় লেগেছে আগুন” কবিতাটির রূপান্তর করেছিলেন কবি বিপুল চক্রবর্তী। তাঁর সাথে আলাপচারিতায় জানতে পারি যে কবি শঙ্খ ঘোষের সুপরামর্শ এবং সক্রিয় সহ-সৃষ্টিতেই, প্রথমে ১৯৮০ সালে ও পরে ২০০৮ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। তিনি আরো বলেন যে কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর এই রূপান্তর ও “তরাই” ইত্যাদি কিছু বিশেষ শব্দের প্রয়োগে যার-পর-নাই প্রীত হয়েছিলেন।
এই গ্রন্থে প্রকাশিত কবি বিপুল চক্রবর্তীর রূপান্তরিত এই কবিতাটিতেই সুর দিয়ে গাইতেন কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক।
১৯৮০ সালে প্রকাশিত “ঢেউয়ে ঢেউয়ে তলোয়ার” কাব্য গ্রন্থের নিবেদন থেকে --- “এ-বইটি প্রথম ছাপা হয়েছিল ১৯৮০ সালে। “বিপ্লবী লেখক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের প্রস্তুতি সম্মেলনের আহায়ক পরিষদ পরিচালিত সংহতি প্রকাশনী” থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল বইটি। প্রকাশক হিসেবে নাম ছিল মনোরঞ্জন বিশ্বাসের। সংগঠকদের মধ্যে প্রধান একজন ছিলেন দেবব্রত পাণ্ডা। প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন প্রবীর সেন। ঠিক হয়েছিল যে, বইটির কিছু বিপণন যদি সম্ভব হয়, তবে ব্রেন-টিউমারে আক্রান্ত চেরাবাণ্ডারাজুর চিকিৎসার জন্য অর্পিত হবে প্রাপ্ত অর্থ। ছেপে বেরোবার দু'মাসের মধ্যেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল দু'হাজার কপি। যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য তাই পাঠানো গিয়েছিল চিকিৎসার জন্য।
কবির চিকিৎসার জন্য এ-শহরে আরো নানা আয়োজন চলছিল তখন। রবীন্দ্রসদনে একটি নাটক করেছিলেন “চারণদল”। হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর তাঁর “মাস সিঙ্গার্স”-গোষ্ঠী গেয়েছিলেন গান।
পীড়িত মানুষটিকে শেষ পর্যন্ত অবশ্য বাঁচানো যায়নি। এই সংকলন মুদ্রিত হবার দু'বছরের মধ্যেই (২ জুলাই ১৯৮২) মৃত্যু হয় তাঁর।
অনুবাদের ভিত্তি ছিল তখনও-পর্যন্ত-অমুদ্রিত কিছু ইংরেজি তর্জমা। সে-তর্জমা করেছিলেন ভারভারা রাও, কে ভি আর এবং জগন্মোহন। মূলও অবশ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছিল। পরে, ১৯৮৩ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় Sword Song --- Selected Poems of Cherabandaraju।
প্রায় সাতাশ বছর পর আরো একবার ছাপানো হয়েছে এই সংকলন। প্রথম সংস্করণে কবির নাম লেখা হয়েছিল “চেরবান্দারাজু”। কিন্তু পরে জানা গেছে নামটির ঠিক-ঠিক উচ্চারণ “চেরাবান্ডারাজু”। নামটি তাই পালটানো হলো। পালটানো হলো 'লড়ে নিতে হবে, কবিতার একটি লাইন।”