ভূমিকা
রাজেশ দত্ত

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে
মিলনসাগরের বিনম্র ও সশ্রদ্ধ নিবেদন -- ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও
গানের দেয়ালিকা’। এই দেয়ালিকায় আমরা একাত্তরের
মুক্তিযুদ্ধের সময় রচিত ও সম্প্রচারিত প্রায় সাতশো কবিতা ও
গান সংকলিত করেছি। যে সকল কবিতার আবৃত্তি এবং গানের
ভিডিও বা অডিও লিংক সংগ্রহ করতে পেরেছি, সেগুলি  
সংশ্লিষ্ট কবিতার পাশে রাখা হয়েছে। এই কবিতাচয়নের মধ্যে
রয়েছে রণাঙ্গন থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা ৫১টি অনুপম
কাব্যোপম অমূল্য পত্রগাথা এবং ১৯৭১-এর ৭ মার্চ, ঢাকার
রমনায় অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী
উদ্যান) শেখ মুজিবর রহমানের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ, যাকে
কবি নির্মলেন্দু গুণ 'অমর কবিতা' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও গানের আহরণে আমরা একটি নির্দিষ্ট
রূপরেখা অনুসরণ করেছি। কবিতা বাছাইয়ে আমাদের
স্বনির্ধারিত সেই নির্বাচন-রীতি প্রিয় পাঠক-পাঠিকাদের অবগতির
জন্যে তুলে ধরছি।

(১) এই সংকলনে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে রচিত ও
সম্প্রচারিত কবিতা ও গানের সাথে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের
সময়কাল থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রাকপর্বে রচিত
কবিতাবলিও সংকলিত হয়েছে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ‘বিজয়
দিবস’ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরের
কালপর্বে লেখা কবিতা-গানও আমরা এখানে নির্বাচন করেছি।
একাত্তর-বাহাত্তরের পরবর্তী সময়ে বিগত পাঁচ দশকে অগণিত
খ্যাতনামা ও অখ্যাত কবি-গীতিকারদের কলমে মুক্তিযুদ্ধের
স্মৃতিচারণা এবং গৌরবগাথা নিয়ে বিপুল সংখ্যক কবিতা ও গান
রচিত হয়েছে, যেগুলির মধ্যে বহু লোকপ্রিয় কবিতা-গান রয়েছে।
কিন্তু ‘মিলনসাগর’-এর সীমিত পরিসরের সীমাবদ্ধতার জন্যে
আমরা সেই সব কবিতা, গানগুলি অধিকাংশই আমাদের
বাছাইয়ের তালিকা থেকে বাদ রেখেছি।

(২) ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘ নয়মাস
ধরে বীর মুক্তিসেনাদের দুর্বার ও অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের মধ্য
দিয়ে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ অর্জিত হয় বাংলাদেশের বহু
আকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই
গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস যেমন লিখে শেষ করা যায় না, তেমনই
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে রচিত অজস্র কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস,
প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও স্মৃতিকথার সংখ্যাও অপরিমেয়। একদিকে
যেমন, বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতা অকুতোভয়ে পাকিস্তানি
হানাদারদের বিরুদ্ধে বন্দুক-বোমা হাতে নিয়ে প্রবল পরাক্রমে
সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত
হয়েছিল সমরাঙ্গন, অন্যদিকে তেমনই কলম হাতে একদল
গণসাংস্কৃতিক সেনানী মুক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে স্বাধীনতার চেতনায়
দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে আত্মনিবেদন করেছিলেন। তাঁদের
অগ্নিবর্ষী কলমে ও কন্ঠে, তাঁদের প্রাণোদ্দীপ্ত কবিতায় ও গানে
উজ্জীবিত হয়েছিল বাংলাদেশ। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে
‘কণ্ঠযোদ্ধা’ ও ‘শব্দসৈনিক’ হিসেবে তাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা
রয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এগারোটি সেক্টরের পাশাপাশি
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর ছিল, ‘বারো নম্বর সেক্টর’ নামে যা
সুপরিচিত -- ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। এই বেতার কেন্দ্রের
স্টুডিওতে বিভিন্ন শব্দসৈনিকদের রচিত, সুরারোপিত ও রেকর্ড
করা গানগুলির সম্প্রচারের সাথে সাথে ১৯৫২ সালের ভাষা
আন্দোলনের সময়কাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচারী
ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে যে-সব গণসংগীত রচিত
হয়েছিল, সেগুলিও পুনঃপ্রচার করা হয়। এছাড়াও উনিশ শতকের
শেষার্ধ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ,
রজনীকান্ত, নজরুল, চারণকবি মুকুন্দদাস, মোহিনী চৌধুরী প্রমুখের
ও আরো অনেকের লেখা স্বদেশি গান, লোককবিদের
দেশাত্মবোধক গান, বিশ শতকের চারের দশকে কমিউনিস্ট
আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত ‘আইপিটিএ’ বা ‘ভারতীয়
গণনাট্য সংঘে’র গান, ছয়ের দশকের গোড়ায় ‘চীন ভারত যুদ্ধে’র
পটভূমিকায় রচিত গণসংগীত, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ও সংহতিতে
এপার বাংলার কবি-গীতিকারদের কথায়, সেকালের স্বনামধন্য
সুরকারদের সুরে এবং খ্যাতনামা শিল্পীদের গাওয়া সমকালীন
গান-ও  পুনঃপ্রচারিত  হয়েছিল  ‘স্বাধীন  বাংলা  বেতার  কেন্দ্র’
থেকে। আমরা এই সংকলনে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে
সম্প্রচারিত এই সকল ঐতিহাসিক গানগুলি বিশেষ গুরুত্ব
সহকারে সংকলিত করেছি।

(৩) ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে শুধু বাংলাদেশের কবি-
সাহিত্যিকরাই নন, পশ্চিমবঙ্গের কবি-সাহিত্যিকেরাও তাঁদের
কলম ধরেছিলেন। বিপুল সংখ্যক গদ্যসাহিত্যের পাশাপাশি
কবিতা রচনার মাধ্যমেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সমর্থন
জানিয়েছিলেন তাঁরা। মুক্তিযুদ্ধকালে এপার বাংলার এমন কোনও
পত্রিকা পাওয়া যাবে না, যেখানে প্রত্যহ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
সম্পর্কে কিছু না কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছে। কবিতায়,
কথাসাহিত্যে, ভাষ্যে — পশ্চিমবঙ্গের কবি-সাহিত্যিকেরা তাঁদের
অকুণ্ঠ সমর্থন ও সংহতি ব্যক্ত করেন। আমরা এই সংকলনে
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় এপার বাংলার প্রথিতযশা কবিদের
কবিতাও নির্বাচন করেছি।  

(৪) মুক্তিযুদ্ধের সংহতিতে জোয়ান বায়েজ, জর্জ হ্যারিসন,
অ্যালেন গিন্সবার্গ প্রমুখ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কবি-
গীতিকারদের রচিত কবিতা ও গান সংকলিত করেছি।

(৫) ভারতের দক্ষিণ আসামের তিনটি জেলা (কাছাড়, হাইলাকান্দি,
করিমগঞ্জ)-এর সাধারণ অভিধা ‘বরাক উপত্যকা’। বাংলাদেশের
সীমান্তবর্তী এই ‘বরাক উপত্যকা’ ১৯৭১-এ এক অনন্য ভূমিকা
পালন করেছিল। একদিকে তারা বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে
আশ্রয়, ত্রাণ ও সেবা দিয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছিল প্রশিক্ষণ
ও অস্ত্র। অন্যদিকে, এই উপত্যকার সাধারণ মানুষজন গানে-
কবিতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে সংহতি ও
সহমর্মিতার এক অনবদ্য ইতিহাসের জন্ম দেয়। প্রায় ১৫ জন
লোককবির কবিতায় ও কবিগানে করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি,
বদরপুর, শিলচরের জনজীবনকে মুখরিত করেছিল। আমাদের
এই সংকলনে বরাক উপত্যকার কবিতাও আহরণ করেছি।

(৬) ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বীর মুক্তিসেনাদের লেখা ৮৬টি চিঠির একটি
ঐতিহাসিক সংকলন গ্রন্থ -- ‘একাত্তরের চিঠি’। ‘দৈনিক প্রথম
আলো’ ও ‘গ্রামীণ ফোন’-এর উদ্যোগে চিঠিগুলো সংগ্রহ করা হয়।
সংকলনটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৪১৫ বঙ্গাব্দের চৈত্রে (ইংরাজি
২০০৬ সালের মার্চে)। এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ‘প্রথমা প্রকাশন’
থেকে। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সালাউদ্দীন আহমদ ছিলেন
সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি। সম্পাদনা পরিষদের অন্যান্য
সদস্যবৃন্দ ছিলেন -- মেজর জেনারেল (অব.) আমিন আহম্মেদ
চৌধুরী, রশীদ হায়দার, সেলিনা হোসেন ও নাসিরউদ্দীন ইউসুফ।
কমিটিকে সহায়তা করেন সাজ্জাদ শরিফ, সাইফুল আজিম প্রমুখ।
এছাড়াও প্রথম ‘একাত্তরের চিঠি’ সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করেন
আমিনুল আকরাম। ‘একাত্তরের চিঠি’ বইটির প্রচ্ছদ তৈরি করেন
স্বনামধন্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। অলংকরণ করেন অশোক
কর্মকার। সম্পাদনা পরিষদের পক্ষে এর ভূমিকা লেখেন বিশিষ্ট
সাহিত্যিক রশীদ হায়দার। ‘একাত্তরের চিঠি’র বেশির ভাগ চিঠি
মা’কে লেখা। চিঠিগুলো পড়ে মনে হয়, ‘মা’ ও ‘স্বদেশ’ যেন একই
শব্দ, সমার্থক। “পত্রলেখকদের মধ্যে যেমন রুমির মতো পরিচিত
মুক্তিযোদ্ধা আছেন, তেমনি আছে অনেক অপরিচিত নাম।
বইয়ের বেশির ভাগ চিঠিই মুক্তিযোদ্ধারা লিখেছিলেন তাঁদের
মাকে। চিঠিগুলোতে মা–মাটি–মাতৃভূমি মিলেমিশে একাকার হয়ে
গেছে। সেসব পড়তে পড়তে পাঠক আবেগে ভাসবেন। কখনো
কাঁদবেন, কখনো ফেটে পড়বেন ক্ষোভে।”  [তথ্যসূত্র: " ‘একাত্তরের
চিঠি’র ৩৯তম মুদ্রণ : প্রেরক–প্রাপকের রক্তে রচিত কথামালা"
(‘প্রথম আলো')] ‘একাত্তরের চিঠি’ বইটি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের
৫১টি চিঠি নির্বাচিত করে আমরা সংকলিত করেছি।

আমরা এই সংকলনের বহুসংখ্যক কবিতা ও গানের কথা এবং
মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা ‘একাত্তরের চিঠি'গুলি আবৃত্তি ও গানের
অডিও রেকর্ডিং শুনে শুনে লিপিবদ্ধ করেছি। তাই অনিচ্ছাকৃত
ভুল-ত্রুটি অনুগ্রহ করে মার্জনা করে দেবেন। সহৃদয় পাঠক-
পাঠিকারা আমাদের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করে দিলে, আমরা
তাঁদের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ থাকব। দেয়ালিকার প্রতিটি
পাতার বাঁদিকের নীচে ফেসবুকের একটি চিহ্ন আছে, সেখানে
ক্লিক করে আপনারা ‘মিলনসাগর’-এর ফেসবুক পেজে ‘মুক্তিযুদ্ধের
কবিতা ও গানের দেয়ালিকা’র পোস্টে পৌঁছে যাবেন। সেখানে
‘কমেন্টস’ কলমে এই সংকলন বিষয়ে আপনাদের সুচিন্তিত ও
মূল্যবান মতামত জানালে বাধিত হব। আমাদের
এই দেয়ালিকাকে আরও সমৃদ্ধ, পরিমার্জিত, পরিশীলিত ও
সুষমামণ্ডিত করতে আপনাদের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।

আমরা বিশেষভাবে ঋণস্বীকার করি ‘মুক্তিযুদ্ধ ই-আর্কাইভ’ এবং
‘আর্কাইভ ডট অর্গ’ ওয়েবসাইটের। আন্তরিক কৃতজ্ঞতায় তিনটি
বইয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য:-- (১) ‘স্বাধীন বাংলা বেতার
কেন্দ্রের ইতিহাস’ -- লেখক: ড. জাহিদ হোসেন প্রধান, (২) ‘স্বাধীন
বাংলা বেতার কেন্দ্র ও শব্দসৈনিক’ – লেখক: বিপ্রদাশ বড়ুয়া
এবং (৩) ‘মুক্তিযুদ্ধে বরাক উপত্যকার কবিতা ও কবিগান’ --
লেখক: চৌধুরী শহীদ কাদের। দেয়ালিকার পরিশিষ্ট বিভাগে
আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে নির্মিত কয়েকটি মূল্যবান তথ্যচিত্র
এবং বাংলাদেশের দূরদর্শনে সম্প্রচারিত ‘স্বাধীন বাংলা বেতার
কেন্দ্রে’র লোকপ্রিয় ‍শিল্পীদের কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের গান ও
স্মৃতিচারণার ভিডিও রেখেছি।

এই দেয়ালিকার পরিকল্পনা, সৃজন ও রূপায়ণে আমাদের দুই
সংকলকের স্বদেশভূমির প্রতি অনিবার্য ‘নাড়ির টান’ রয়েছে।
বাংলাদেশেই  ছিল  আমাদের দু’জনের  পূর্বপুরুষদের  আদি  
নিবাস। সাতচল্লিশের দেশভাগে আমাদের পিতৃপুরুষেরা ‘ছিন্নমূল’
হলেও, আজও আমরা অন্তরের অন্তহীন আবেগে, অচ্ছেদ্য
প্রাণের বন্ধনে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছি পদ্মাপাড়ের বাংলার
সাথে। এছাড়াও আমরা চাই, বাংলাভাষী মানুষের অখণ্ড
জাতিসত্তার চেতনার পুনরুজ্জীবনে সারা বিশ্বের আপামর
বাঙালিকে, বিশেষত নবীন প্রজন্মকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ
বিষয়ক বইপত্র বেশি করে পড়ার জন্যে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত
ইতিহাস  আরও  বিস্তারিতভাবে  জানার জন্যে আগ্রহী করে
তুলতে। মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও গান যদি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইপত্র
পঠন-পাঠনে বাঙালিদের উদ্বুদ্ধ করে তুলতে পারে, তাহলে
আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।

“বাংলাদেশ আগুন লাগা শহর আর লক্ষ গ্রাম / বাংলাদেশ দুর্গময়
ক্রুদ্ধ এক ভিয়েতনাম।” -- প্রখ্যাত কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের লেখা
‘বাংলাদেশ একাত্তরে’ শীর্ষক এই কবিতার মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ্বের
অগ্নিগর্ভ দিনগুলিতে বাংলাদেশের দুর্নিবার ও দুর্দম সংগ্রামী
রূপটি উজ্জ্বল হয়ে পরিস্ফুট। এমন তেজোদৃপ্ত বীরত্বপূর্ণ
মুক্তিসংগ্রামের রক্তস্নাত পথে স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশের সংখ্যা
খুবই অল্প। আমরা বাঙালিরা সেই বিরল গৌরবময় স্বাধীনতা
সংগ্রামের ইতিহাসের উত্তরাধিকারী, যাদের পূর্বজ বীর
মুক্তযোদ্ধারা দীর্ঘ নয়মাস ব্যাপী আপোসহীন রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র
সংগ্রামে তিরানব্বই হাজারেরও বেশি বর্বর হানাদার,
গণহত্যাকারী, ধর্ষক পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দেশীয়
দোসর কুখ্যাত রাজাকারদের শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে প্রকাশ্যে
ও আনুষ্ঠানিকভাবে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করানোর মাধ্যমে
স্বাধীনতার বিজয় পতাকা উড়িয়েছিলেন। এই
সুমহান 'স্বাধীনতা'র গরিমা শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা দুনিয়ার
বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তামাম বাঙালির
তথা ভারতীয়দেরও গর্ব। কারণ, একথা অবিসংবাদিতভাবে
সত্য যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক এই বিজয়ের
প্রকীর্তি ভারতীয় সেনা জওয়ানদেরও, যাঁরা রণক্ষেত্রে
মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অদম্য সাহস ও বীরত্বের
অতুলনীয় নজির রেখেছিলেন। অকাতরে রক্ত ঝরিয়েছিলেন, প্রাণ
বিসর্জন দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘুচে গেছিল দু'দেশের
সীমান্তের কাঁটাতার। পদ্মা-গঙ্গা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিল।
ওপার বাংলার নিপীড়িত ও বাস্তুহারা অসহায় শরণার্থীরা দলে
দলে আশ্রয় নিয়েছিলেন এপার বাংলায়। গভীর সমব্যথা ও
সমানুভূতিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তাঁদের পাশে
দাঁড়িয়েছিলেন এপার বাংলার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে
শিল্পী, সাহিত্যিক, ছাত্র-যুবক, বুদ্ধিজীবীরা। সে-সময় বাংলাদেশ
থেকে আগত উদ্বাস্তু শরণার্থীদের ত্রাণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের
জন্যে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের ও ভারতের বহু
খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী ও চলচ্চিত্র শিল্পীরা সারা ভারতের বিভিন্ন
স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে ‘ফান্ড রেইস’ করতেন।
কলকাতার বেশ কিছু বাড়ি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল
বাংলাদেশ স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে। যেমন, ৮ নং থিয়েটার
রোডের (বর্তমানে শেক্সপিয়র সরণি) একটি বাড়ি, যা এখন
পরিচিত ‘অরবিন্দ ভবন’ নামে। ’৭১-এ প্রবাসী ‘বাংলাদেশ
সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতাতে। সেই সরকারেরই প্রধান
কার্যালয় ছিল বাড়িটি। এছাড়াও ৩/১ ক্যামাক স্ট্রিটের বাড়িটি
থেকে ত্রাণ ব্যবস্থা দেখা হত। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাড়িটি ছিল
৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে। এই বাড়ি থেকেই পরিচালিত হত
‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। এরকম আরও অনেক ঐতিহাসিক
বাড়ি ছড়িয়ে আছে মহানগর জুড়ে, যেগুলি সেই সময়ে দুই
বাংলার নিবিড় আত্মীয়তা ও মৈত্রীর নীরব সাক্ষী। এই যুগ
সন্ধিক্ষণে শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় বিভেদের কলঙ্ক মুছে দিতে দুই
বাংলার বাঙালিরা জেগে উঠেছিলেন মহামিলনের নবজাগরণের
নবারুণোদয়ে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে ‘ডিভাইড অ্যান্ড
রুল পলিসি’ অখণ্ড বাংলার মাটিতে যে বিভেদ ও বিদ্বেষের
বিষাক্ত বীজ রোপণ করেছিল, ইতিহাসের কালের প্রবাহে
এদেশেরই একদল মুষ্টিমেয় কায়েমী স্বার্থের ষড়যন্ত্রকারীরা সেই
বীজে জলসিঞ্চন করে বিষবৃক্ষে পরিণত করেছিল। সনাতনী হিন্দু
ব্রাহ্মণ্যবাদী ও কট্টর ইসলামি মৌলবাদীদের চক্রান্তে ধর্মের নামে
ভেদাভেদে বিপন্ন হয়েছিল বাঙালির অখণ্ড জাতিসত্তা। এই
হাতেগোনা কুটিল কুচক্রীদের রাজনৈতিক চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে
ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয়ে সাধারণ বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের
মধ্যে দেখা দেয় পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, ঘৃণা, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব
ও হানাহানি --- যার শেষ পরিণতি সাতচল্লিশের দেশভাগের
বীভৎস ক্ষতের যন্ত্রণায় আর লক্ষ কোটি বাস্তুহারা মানুষের
মর্মন্তুদ কান্নায়। বাঙালিকে এই ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির
‘পাপ’-এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে বারবার। ১৯৫২ সালের
একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের শহিদদের
রক্তে, ১৯৬১ সালের উনিশে মে অসমের বরাক উপত্যকায়
১১জন ভাষাসৈনিকের আত্মবলিদানে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে লাখো
শহিদের শোণিতধারাতেও সেই ঐতিহাসিক ‘পাপ’-এর স্খালন
হয়নি। তাই আজ একুশ শতকেও ‘নাগিনীরা চারিদিকে
ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’।  ধর্মীয় মৌলবাদী রাজনীতির
মেরুকরণে কুটিল কুচক্রী হানাদাররা বাঙালির অখণ্ড জাতিসত্তার
ঐক্যকে বিনষ্ট করতে আজও বাংলার ভাষা, কৃষ্টি ও মিলনের
ঐতিহ্যের উপর আঘাত হানতে সমুদ্যত। এই বিভেদকামী
‘দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে',
তাদের আজ মুক্তিযুদ্ধের গরিমাদীপ্ত ইতিহাসকে স্মরণ করে
কাঁটাতারের বিভাজন উপেক্ষা করে এপার-ওপারের বেড়া
ডিঙিয়ে বাঙালির এক ও অভিন্ন জাতিসত্তার একতাকে রক্ষা
করতেই হবে, নয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাঙালির সমূহ বিপদ
প্রত্যাসন্ন।

মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে পদ্মা-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র -- সব নদীর স্রোতের
কল্লোলে ধ্বনিত হোক বাঙালির মিলনমন্ত্র, অখণ্ড জাতিসত্তার
শপথে, সংকল্পে ও দৃঢ় অঙ্গীকারে অটুট ও সুদৃঢ় হোক বাঙালির
ঐক্য।

রাজেশ দত্ত
২২শে ফাল্গুন ১৪২৮
৭ই মার্চ ২০২২

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ











.