'হুলিয়া' কবিতাটি মুক্তিযুদ্ধের আগে রচিত
হলেও এই কবিতাটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের
প্রাক-পটভূমিকা ও ঘটনাবলীর প্রেক্ষিতে
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নির্বাচন করা
হয়েছে।
১৯৭০ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রেমাংশুর রক্ত চাই'-তে
প্রকাশিত 'হুলিয়া' কবিতাটি প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ স্বয়ং
লিখেছেন --- "প্রথম কোথায় ‘হুলিয়া’ কবিতাটি প্রকাশিত
হয়েছিল, তার সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়নি, আগেই বলেছি। এ
প্রসঙ্গে কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা তাঁর স্মৃতি থেকে বলেছেন,
আমার কণ্ঠে ওই কবিতা তিনি ১৯৬৯ সালে প্রথম ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একটি অনুষ্ঠানে শুনেছিলেন
। ওই অনুষ্ঠান কলা ভবনের ২০১৩ নম্বর কক্ষে হয়েছিল
এবং বাংলা বিভাগের প্রধান প্রফেসর মুহম্মদ আবদুল হাই
ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিলেন। আমারও এ রকম
একটা অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়ে। কিন্তু ওই অনুষ্ঠানে আমি
কোন কবিতাটি পড়েছিলাম, তা মনে পড়ে না। হতে পারে
‘হুলিয়া’।
পরে কবিতাটি 'জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বই' পত্রিকায় প্রকাশিত
হয়। আমার জানা মতে সেটি ছিল ‘হুলিয়া’ কবিতার পুনর্মুদ্রণ
। ২১ জুলাই ১৯৭০ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে তরুণ কবিদের
কবিতা পাঠের একটি আসর বসেছিল। ওই আসরে আবদুল
মান্নান সৈয়দ, আবু কায়সার, হুমায়ুন কবির, আবুল হাসান,
মহাদেব সাহা, সানাউল হক খান, দাউদ হায়দার প্রমুখ কবি
কবিতা পাঠ করেছিলেন। ওই আসরে আমি ‘হুলিয়া’ পাঠ করি
। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ওই আসরে উপস্থিত ছিলেন।
ওই কবিতাটি শোনার পর তিনি 'দৈনিক পূর্বদেশ' পত্রিকায়
তাঁর জনপ্রিয় কলাম ‘তৃতীয় মত’-এ ‘হুলিয়া’ সম্পর্কে এ রকম
মন্তব্য করেন :
‘গত মঙ্গলবার ঢাকার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত একটি
কবিতা পাঠের আসরে উপস্থিত ছিলাম। কয়েকজন তরুণ
কবি কয়েকটি বিস্ময়কর উজ্জ্বল কবিতা পাঠ করেছেন এই
আসরে। শ্রাবণ-সন্ধ্যায় এমন কবিতার আসর ঢাকায়
আজকাল দুর্লভ। ভেবেছিলাম, অধিকাংশ তরুণ কবি এই
আসরে এমন কবিতা পাঠ করবেন, যার মূল কথা হবে —
সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এই জীবনের কলরব।
‘কিন্তু তা নয়। এই আসরে একটি সুস্থ, সাম্প্রতিক কণ্ঠ
শুনলাম একটি কবিতায়। কবিতার নাম সম্ভবত 'হুলিয়া'।
কবির নাম নির্মলেন্দু গুণ। ফেরারী নায়ক গ্রামে ফিরেছেন।
তার শৈশব ও কৈশোরের অতি-পরিচিত খাল-বিল, মাঠ-ঘাট,
পথ সবই তার কাছে বহুবার দেখা ছবির মতো। অথচ কেউ
তাকে চিনতে পারছে না। যেমন তাকে চিনতে পারেনি
স্টেশনের গোয়েন্দা পুলিশ এবং টিকিট চেকার। নায়ক ফিরে
এলো মায়ের কাছে, সংসারের প্রাত্যহিক দাবির কাছে। কিন্তু
সবকিছু ছাপিয়ে সকলের কণ্ঠেই একটি প্রশ্ন — দেশের কী
হবে? শেখ সাহেব এখন কী করবেন? কবিতার নায়ক জবাব
দেয়…আমি এসবের কিছুই জানি না — আমি এসবের কিছুই
বুঝি না
‘জানি না কবিতাটির আখ্যান সংক্ষেপে বর্ণনা করতে পেরেছি
কি না। দীর্ঘ কবিতা। তাতে শুধু কবিতার স্বাদ নয়,
সাম্প্রতিক রাজনীতির যুগ-জিজ্ঞাসাও বেশ স্পষ্ট। এ যেন
বাংলার ক্ষুব্ধ তারুণ্যের স্বগতোক্তি। এই জবাবের চাইতে বড়
সত্য এই মুহূর্তে জন-চেতনায় আর কিছু নেই।’
[ দ্র: 'তৃতীয় মত' —আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, পূর্বদেশ, ২৪
জুলাই ১৯৭০]
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ওই কলামটি তখন খুবই
জনপ্রিয় ছিল বলে ওই কলাম পাঠ করে অনেকেই আমার
‘হুলিয়া’ কবিতার খোঁজ করেন। ওই কবিতাটি আমার কবি-
স্বীকৃতি লাভেই শুধু সহায়তা করেনি, আমার প্রথম
কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক পাওয়ার ব্যাপারেও সহায়ক হয়েছিল।
ওই কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরই 'খান ব্রাদার্স অ্যান্ড
কোং-'এর মালিক মোসলেম খান তাঁর পুত্রদের ‘হুলিয়া’র
কবিকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।...... একদিন বিউটি
বোর্ডিংয়ে ঢোকার পথে মোসলেম খান সাহেবের সঙ্গে আমার
পরিচয় হয়। তিনি আমাকে ‘হুলিয়া’ কবিতাটির জন্য প্রশংসা
করেন এবং আমাকে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি
তৈরি করতে বলেন। জীবনানন্দ দাশের কাব্যসমগ্র প্রকাশ
করার কারণে ওই প্রকাশনীটি তখন সুধীমহলের, বিশেষ করে
কবিমহলের সুনজরে পড়েছিল।.... খান ব্রাদার্স নিজ থেকে
আমার কবিতার বই প্রকাশ করতে আগ্রহী হওয়ায়, আমি খুব
খুশি হই। আমার জেনারেশনের কবিদের মধ্যে এমন
সৌভাগ্য হয় আমারই প্রথম। বঙ্গবন্ধু কবি হিসেবে আমাকে
আগে থেকেই জানতেন। তাঁকে উৎসর্গ করে রচিত আমার
প্রথম কবিতা ‘প্রচ্ছদের জন্য’ প্রকাশিত হয় 'সংবাদ'-এর
১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর সংখ্যায়।কবিতাটি তিনি যে পাঠ
করে খুব আনন্দ পেয়েছিলেন এবং গর্ব বোধ করেছিলেন, সে
কথা আমি জেনেছিলাম রণেশ দাশগুপ্তের মুখে। ঊনসত্তরের
গণ-অভ্যুত্থানের পর জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর একদিন
(সম্ভবত সংবাদ কার্যালয়ে) তাঁর সঙ্গে দেখা হলে তিনি
ঘটনাটির কথা আমাকে বলেছিলেন। পরে এক সময়
আওয়ামী লীগের অগ্রজতুল্য নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর
কাছেও শুনেছিলাম। আগরতলা ও গোলটেবিলের চাপে
হয়তো তিনি আমার কথা ভুলে গিয়েছিলেন। গাফ্ফার
ভাইয়ের কলাম পাঠ করার পর আমার কথা নতুন করে তাঁর
মনে পড়ে। তিনি আমার সঙ্গে ‘হুলিয়া’ নিয়ে আলাপ করার
আগ্রহ প্রকাশ করেন।
[ তথ্য: আবিদুর রহমান, সম্পাদক, 'দি পিপল']
বিস্তারিত তথ্যের জন্য আবিদুর রহমানের সন্ধান করা যেতে
পারে। আবিদ ভাই আমাকে তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে
যেতে বললেও, আমি, 'আজ যাব, কাল যাব' করে বঙ্গবন্ধুর
বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারটিকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছিলাম।
এক পর্যায়ে আবিদ ভাই রণে ভঙ্গ দেন। আমি বঙ্গবন্ধুকে দূর
থেকেই দেখব, কখনো তাঁর কাছে যাব না, তাঁর সঙ্গে
ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হব না বলেও মনে-মনে স্থির করি।
আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রেমাংশুর রক্ত চাই' প্রকাশিত হয়
১৯৭০ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত
হয় পাকিস্তানের ইতিহাস পাল্টে দেওয়া সেই নির্বাচন।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ তো বটেই, সমগ্র পাকিস্তানের মেজরিটি
পার্টির নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। কিন্তু মুজিবের হাতে
ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ব্যাপারে পাকিস্তানের সামরিক
শাসক প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ও
পাকিস্তানের অসামরিক নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে
গোপন মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে ‘আমার ভায়ের
রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ পাড়ি দিয়ে আসে একাত্তরের
অগ্নিঝরা মার্চ। পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে রোপিত হয়
বাংলাদেশের রক্তবীজ। বাংলাদেশের নতুন পতাকা নিয়ে
আসে ২ মার্চ। জাতীয় সংগীত ও স্বাধীনতার ইশতেহার
নিয়ে আসে ৩ মার্চ। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির
সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’— বঙ্গবন্ধুর এই
অমর কবিতা নিয়ে আসে ৭ মার্চ। আমি মন্ত্রমুগ্ধবৎ মঞ্চের
পশ্চিম পাশে সাংবাদিকদের জন্য সংরক্ষিত আসনে বসে
বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণটি শ্রবণ করি। ফিরে এসে 'দি
পিপল গ্রুপ' থেকে প্রকাশিত বাংলা সাপ্তাহিক 'গণবাংলা'র
জন্য ৭ মার্চের ওপর একটি কবিতাও লিখেছিলাম। সেদিনই
সন্ধ্যায় 'গণবাংলা'র টেলিগ্রামে সেই কবিতাটি ছাপা হয়।
অসহযোগ আন্দোলনের ইতিহাসে মহাত্মা গান্ধীর একক-
কৃতিত্বে ভাগ বসিয়ে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলন।
শুরু হয় ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অর্থহীন
আলোচনা-আলোচনা খেলা।এককাট্টা হয়ে বাংলার মানুষ
বঙ্গবন্ধুর পেছনে দাঁড়ায়। পাকিস্তান দিবসে তিনি তাঁর নিজের
বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়ান। গাড়িতে বাংলাদেশের
জন্য অনুমোদিত লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েই তিনি ইয়াহিয়া
ও ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেন। তাঁর সাহস, দূরদৃষ্টি
ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখে আমার প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
পাকিস্তানিদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার
সংবাদে আমি অন্তরে পুলকিত বোধ করি। বুঝতে পারি,
ইয়াহিয়া-ভুট্টো নন, ধৈর্যের অগ্নি-পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবই জয়ী হতে চলেছেন। ‘হুলিয়া’ কবিতায় একটি
পঙক্তি ছিল, ‘শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?’ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব
সম্পর্কে আমার এই সংশয়-যুক্ত পঙক্তিটি আমি মনে মনে
আমার ‘হুলিয়া’ কবিতা থেকে প্রত্যাহার করি। আমার মনে
এই প্রত্যয় জন্মায় যে সাতই মার্চের জনসভায় প্রদত্ত চার-শর্ত
নয়, তাঁর মুক্তি ও স্বাধীনতার কৌশলী ঘোষণাটিই শেষ পর্যন্ত
কার্যকর হতে চলেছে। ভাবি, আর বিলম্ব করা ঠিক হবে না।
তিনি যে ভুল করছেন না, এই প্রয়োজনীয় কথাটা আমার দিক
থেকে তাঁকে বলা দরকার।
কাছে যাওয়ার সুযোগ পেলে আমি বঙ্গবন্ধুকে এই কথাটাই
বলব, এই মনে করে সন্ধ্যার দিকে আমি ছাত্রলীগের নেতা
সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ভিপি সৈয়দ আহমদ ফারুকের
সঙ্গে বত্রিশ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাই। ১৯৭১ সালের মার্চ
মাসে যে-বাড়িটি পরিণত হয়েছিল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির
সবচেয়ে প্রিয়ভবনে। কিন্তু তখন বড় বেশি দেরি হয়ে
গিয়েছিল। দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত খালেদ ভাইয়ের (প্রভু
খালেদ চৌধুরী, তখন এপিএনে কর্মরত ছিলেন) সঙ্গে লনে
দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলি। বঙ্গবন্ধু সেদিন আর বাইরে
বেরিয়ে আসেননি। তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়া বা কথা বলা
তো দূরের কথা, তাঁকে একনজর দেখার সুযোগও আমার হয়
না। তাঁর প্রেস সচিব আমিনুল হক বাদশা জানান যে বঙ্গবন্ধু
হাইকমান্ডের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসেছেন। তিনি
আজ বাইরে বেরোবেন না।
আমি গাড়ি-বারান্দার ছাদের ওপর দাঁড়ানো বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ
হাসিনাকে দেখতে পাই। হাজার মানুষের ভিড়েও আমাকে
চিনতে পেরে তিনি মৃদু হাত নাড়েন। সেই হাত নাড়ার অর্থ
আমার কাছে স্পষ্ট হয় না। তবু আমি তাঁর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর
সঙ্গে পরিচিত হওয়ার কথা একবার ভেবেছিলাম, কিন্তু
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারও মাধ্যমে পরিচিত হতে আমার মন শেষ
পর্যন্ত সায় দেয়নি। আমি রাত ১০টার দিকে বিফল মনোরথ
হয়ে ফিরে আসি।
বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত
হওয়ার অপরাধে ওই রাতেই তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে
বন্দী হন। তারিখটি ছিল ২৫ মার্চ ১৯৭১।"
[ '২৫ মার্চ রাতে আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে
গিয়েছিলাম' -- লেখক : কবি নির্মলেন্দু গুণ ]
সূত্র: দৈনিক 'প্রথম আলো', এপ্রিল ০২, ২০১০।
ইবেঙ্গলিলাইব্রেরি.কম