মিলন সেনগুপ্তর কথা --- একাত্তরের চিঠি গ্রন্থের  
মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিপত্রের মধ্যে  জয়নাল আবেদিন  
নামের মুক্তিযোদ্ধার দুইটি চিঠি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তাঁর গ্রামের নাম ঢাকা জেলার বেজগাঁও। আমার  
পূর্বপুরুষের ভিটেও ছিলো এই মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল  
আবেদীনের গ্রাম বেজগাঁওয়ে। ঢাকা জেলার বিক্রমপুর
পরগণার বেজগাঁও গ্রাম। গ্রামসূত্রে এক নিকটজনকে
দেখে আমার সেই গ্রাম ও আমার পিতা-ঠাকুরদা সম্বন্ধে
জানা সামান্য কিছু কথা এখানে জানাচ্ছি।

আমার পিতা স্বর্গীয় বেণীমাধব সেনগুপ্তর কাছে শুনেছি
যে আমাদের পূর্বপুরুষের ভিটা ছিলো ঢাকা  জেলার  
বিক্রমপুর পরগণার বেজগাঁও গ্রামে। আমার ঠাকুরদা  
স্বর্গীয় ডাঃ শশীমোহন সেনগুপ্ত ছিলেন তখনকার দিনের
এলোপ্যাথি ডাক্তার। একবার কলেরার প্রকোপের সময়ে
একজন রোগীকে তাঁর  দরজার সামনে রেখে চলে  যায়
তাঁর  বাড়ীর লোক। তাঁর নাম ছিল ইয়াসিন। শশীমোহন
তাঁর ডিসপেনসারিতেই তাঁকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে  
তোলেন। ছেলেটি তাঁর বাড়ীতে আর ফিরে যান নি এবং
আমার পিতামহকে “বাবা” বলে সম্বোধন করতে থাকেন।
বর্ষার দিনে যখন গ্রাম প্লাবিত হতো, তখন তিনি ডাঃ  
শশীমোহনের, রোগীর বাড়ী কল-এ যাবার নৌকার চালক
হিসেবে কাজ করতেন এবং জল নেমে গেলে পদ্মার চরে
শাক-সবজীর চাষ করতেন।

এল ১৯৪৭এর দেশভাগের মর্মান্তিক সময়। বাড়ীর   
ছেলেরা কর্মসূত্রে কলকাতা, পোর্টব্লেয়ার ও অন্যান্য শহরে
কর্মরত থাকার দরুণ ইয়াসিনই  পুত্রের  ন্যায়   
শশিমোহনকে আশ্বস্ত করেন ভারতে না গিয়ে সেখানেই
থেকে যেতে। কিছুকাল পরে একদল অপরিচিত ভিন্ন
ভাষী লোকের উপদ্রব শুরু হলো। ঘটতে থাকলো
অভাবনীয় সব ঘটনা। জুতো পায় দিয়ে গৃহে প্রবেশ করে
পছন্দসই  জিনিষ তুলে নিয়ে যেতে লাগলো। সে ছোট
জিনিষপত্র হোক বা বড় টেবিল চেয়ার। এরা বাংলা
ভাষায় কথা  বলতো না। তখন ইয়াসিনই নিজের
অপারগতার কথা জানিয়ে  শশীমোহনকে  বলেন যে এই
লোকজন ভারত থেকে এসেছে। এরা তাদের কোনো কথা
শোনে না,  বোঝেও  না এদের ভাষা। শেষ পর্যন্ত
ইয়াসিনের কাছেই সেই বাড়ী গচ্ছিত রেখে আমার
পিতামহ সপরিবারে, স্ত্রী কিরণবালা দেবী ও কনিষ্ঠা কন্যা
ত্রিবেণী দেবীকে নিয়ে ভারতে চলে যাওয়া স্থির করেন।
ইয়াসিন দায়িত্ব নিয়ে তাঁদের পদ্মার স্টীমারে তুলে
দিয়েছিলেন।

ভারতে ডাঃ শশীমোহন ওঠেন তাঁর জামাতা, বর্ধমান
মহারাজার নায়েব হরেন্দ্রচন্দ্র সেনগুপ্ত ও কন্যা যমুনা
সেনগুপ্তর বাড়ীতে, দার্জ্জিলিং-এ। সেখানেই তিনি তাঁর
শেষ জীবন কাটান মানুষের সেবায়, বিনামূল্যে চিকিৎসা
দান করে।

আমার পিতা স্বর্গীয় বেণী মাধব সেনগুপ্ত - ম্যাট্রিক পাশ
করে বেজগাঁও গ্রামের ইস্কুলেইর পণ্ডিতের চাকরিতে  
যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি  
দার্জ্জিলিং-এ বার্ড কোম্পানির চাকরি নিয়ে সেখানে চলে
যান। তারপরে কিছুকাল কলকাতার অফিসে কাজ করে
তিনি ১৯৪৬ সালে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট
ব্লেয়ার শহরের মেরিন ডিপার্টমেন্টে সরকারী চাকরিতে  
যোগ দেন। কর্মজীবনের শেষ পর্যন্ত সেখানেই থেকে,
আন্দামান  নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের লেফটেনান্ট গভর্নরের  
প্রাইভেট  সেক্রেটারির পদে অবসর গ্রহণ করেন।

৫০-এর দশকে তাঁর লেখা প্রবন্ধাবলী ভারতের বিভিন্ন  
প্রথম সারির পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দেশ,   
যুগান্তর,
Amrita Bazar  Patrika,  Hindustan  
Times, Illustrated Weekly of India
সহ ভারতের  
প্রথম শ্রেণীর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর বিভিন্ন
লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন...

আমার পিতা-পিতামহ ও পূর্বপুরুষের সূত্রে বাংলাদেশের
সঙ্গে আমার নাড়ির টান তো রয়েছেই। আমার ব্যক্তিগত
জীবনেও এই মুক্তিযুদ্ধ আমাকে নাড়া দিতে ছাড়ে নি!

আমি তখন স্কুলে পড়ি, আমাদের স্কুল “সৈনিক স্কুল  
পুরুলিয়া”-তে। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থেকে,
“শোনো একটি মুজিবরে কণ্ঠস্বরের থেকে”-এর মতো  
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে রচিত গানগুলি সারা বাংলার কোণে
কোণে মানুষ গাইতে ও মাইকে বাজিয়ে শোনাতে শুরু
করেছিলো। সেই উন্মাদনা যা আজও ভুলতে পারিনি।  
৭১ এর তৃ
তীয়ার্ধে ৩টে ভারতীয় সেনাবাহিনীর  
রেজিমেন্ট, শিবির ফেলেছিলো আমাদের স্কুলে।  
ভারতের পশ্চিম সীমান্তে ইয়াহিয়া খানের যুদ্ধ ঘোষণার  
পরে পরেই তাঁরা বাংলাদেশের দিকে রওনা হয়ে যান।
মিলিটারি স্কুল হওয়ার দরুণ, স্কুলে তাঁদের শিবির
চলাকালীন ছাত্রদের সঙ্গে তাঁরা প্রতিদিন সকাল-বিকেল
শরীর-চর্চা
(PT Physical Training) এবং খেলাধূলা  
করতেন। তাঁরা আমাদের আধুনিক অস্ত্রে ট্রেনিং  
দেওয়াও শুরু করেছিলেন। এমন কি তাঁরা আমাদের  
স্কুলের বিভিন্ন  অনুষ্ঠানাদিতে অংশ গ্রহণও করতেন।
বলাবাহুল্য   তাঁদের সঙ্গে আমরা বেশ পরিচিত হয়ে
পড়েছিলাম,  কোনো এক আত্মীয়তার সূত্রে।
তারপর ১৬ই ডিসেম্বর এলো যুদ্ধ শেষে, লেফটেনেন্ট
জেনারেল জগজীত সিং অরোরার সামনে পাক বাহিনীর  
আত্মসমর্পণের খবর। হলো স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনা।
১৯৭২ সালের হোলী বা দোলের কিছুদিন আগে সেই
ভারতীয় সেনার  রেজিমেন্টগুলি একে একে বাংলাদেশ
থেকে ফিরে এসে স্কুলে ফের শিবির ফেলেছিলো। আমরা
বিস্ময়ে চেয়ে ছিলাম তাঁদের দিকে --- যুদ্ধজয়ী
সেনা! কিন্তু ততধিক  হৃদয়-বিদারক ছিলো আমাদের
চেনা-পরিচিত বহু  সৈন্যদের মুখ না দেখতে পাওয়া!
তাঁরা যে শহীদ  হয়েছিলেন যুদ্ধে! সে এক আপনজন-
হারানো বেদনার  অনুভূতি। এসব কি কখনো ভোলা
যায়?

তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা আমাদের
মতো, অনেক ভারতবাসীর কাছে একটি অতি আপন,
অবিস্মরণীয় ঘটনা হয়েই রয়েছে এবং থাকবে। আমি
নিজেকে ভীষণ সৌভাগ্যবান মনে করছি কারণ এ  
জীবনেই আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে,
মূলতঃ কবি গণসঙ্গীতকার রাজেশ দত্তর উত্সাহে,  
গবেষণায় এবং দৃঢ় চেষ্টায় এই কাজ করার সুযোগ
পেলাম।


---মিলন সেনগুপ্ত। মিলনসাগরের পরিচালক॥
























.
ডাঃ শশীমোহন সেনগুপ্ত।
মিলন সেনগুপ্তর ঠাকুরদা। বেজগাঁও এর
বাড়ীতে তোলা একটি ফটো থেকে এই ছবিটি
এঁকেছিলেন মিলনসেনগুপ্ত। ছবিটি বড় করে
দেখতে ছবির উপর ক্লিক করুন।
শ্রী বেণীমাধব সেনগুপ্ত।
মিলন সেনগুপ্তর পিতা। জলপাইগুড়ির
বাড়ীতে তাঁকে বসিয়ে ছবিটি এঁকেছিলেন
মিলন সেনগুপ্ত। ছবিটি বড় করে দেখতে
ছবির উপর ক্লিক করুন।
লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজীত সিং অরোরা
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে, ঢাকায়, এনার
সামনেই ৯৩০০০ হানাদার পাক বাহিনী
আত্মসমর্পণ করেন। স্কুলের ছাত্র ১৪ বছরের
মিলন সেনগুপ্তর এক পত্রের উত্তরে তিনি তাঁর
এই স্বাক্ষরিত ছবিটি পাঠিয়েছিলেন ৭১-এর
যুদ্ধের পরে পরেই। ছবিটি বড় করে দেখতে
ছবির উপর ক্লিক করুন।
ফীল্ড মার্শাল এস.এচ.এফ.জে. মানেক শ
১৯৭১ এর ইন্দো-পাক নির্ণায়ক যুদ্ধ, পাকিস্তান
কে জনমের মতো দ্বিখণ্ডিত করে দেওয়া
যুদ্ধের সেনাপতি। স্কুলের ছাত্র ১৪ বছরের
মিলন সেনগুপ্তর এক পত্রের উত্তরে
তিনি তাঁর এই স্বাক্ষরিত ছবিটি
পাঠিয়েছিলেন ৭১-এর যুদ্ধের পরে পরেই।
ছবিটি বড় করে দেখতে ছবির উপর ক্লিক
করুন।