॥ ভূমিকা ও "নীলের গীত" প্রবন্ধ॥
ভূমিকা
ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত, কেদারনাথ মজুমদার সম্পাদিত “সৌরভ” পত্রিকার
ফাল্গুন ১৩২৫ (ফেব্রুয়ারী ১৯১৯) সংখ্যায় সংগ্রাহক রাজেন্দ্রকুমার মজুমদার শাস্ত্রী,
বিদ্যাভূষণ এর “নীলের গীত” প্রবন্ধটি আমরা এখানেই তুলে দিয়েছি, নীচে। এই
দেয়ালিকায় এই প্রবন্ধে পাওয়া চারটি গানও তোলা হয়েছে।

হরিশ মুখার্জী তাঁর হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকায় নীলকরদের অত্যাচার সম্বন্ধে গুরুত্ব
দিয়ে লিখে যেতেন। সিপাহী বিদ্রোহ শেষ হতেই নীল চাষীদের কথাই তাঁর পত্রিকার
প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর চেষ্টাতেই ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন
নীলচাষীদের পক্ষ অবলম্বন করেন।

১৯৬০ সালে যখন নীলচাষীদের বিদ্রোহ বিরাট আকার নিয়েছিল তখন ইংরেজ
ম্যাজিস্ট্রেটরা গ্রামের পর গ্রাম থেকে দলে দলে চাষীদের ধরে এনে জেলে পাঠাতে
লাগল। এই সময়ে কলতায় চাষীদের প্রতিনিধিরা হরিশচন্দ্রের পরামর্শ ও সাহায্য
নিতে আসতেন। তাঁদের জন্য হরিশচন্দ্রের দ্বার সর্বদাই খোলা থাকতো। তিনি নীল
কমিশনের কাছে নীল চাষীদের পক্ষে সাক্ষ্যদানও করেন।

নীলদর্পণ নাটকে রচয়িতা
দীনবন্ধু মিত্র, নীলচাষীদের উপর নীলকর সাহেবদের
অত্যাচারকে সর্বসমক্ষে তুলে ধরে ছিলেন। পুলিশের সতর্কতা সত্বেও "ন্যাশনাল
থিয়েটারের" ব্যানারে নাটকটি চারবার অভিনীত হয়। নীলচাষীদের উপর
অত্যাচারের অভিনয় দেখতে বসে
, অত্যাচারী নিলকরের ভূমিকায় অর্ধন্দুশেখর
মুস্তাফির অভিনয় দেখে
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উত্তেজিত হয়ে মঞ্চে অভিনেতাদের
দিকে তাঁর চটি খুলে
ছুঁড়ে মেরেছিলেন! সেই চটিজুতাকে অভিনয়ের পুরস্কাররূপে  
তাঁরা গ্রহণও করেছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায় তুলনা  করে লেখেন যে Uncle
Tom's Cabin
আমেরিকায় দাসপ্রথা নির্মূলে যে ভূমিকা নিয়েছিল, নীলদর্পণ নাটক
ভারতে নীলচাষীদের উপর ব্রিটিশদের অত্যাচার নির্মূলে একই ভূমিকা পালন
করেছিল।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই নাটকের ইংরেজী অনুবাদ করলে রেভারেন্ড জেমস লং
তা প্রকাশিত করেন। ইংলিশম্যান ও হরকরা পত্রিকার স্বত্বাধিকারীগণ এবং
নীলকরগণের পক্ষে মানহানির মামলা করা হয় বিচারক স্যার মর্ডণ্ট ওয়েল্সের
এজলাসে। বিচারক ওয়েল্সের দুর্নাম ছিল যে তিনি বাঙালীদের প্রতি বিদ্বেষ
পোষণ করতেন এবং মনে করতেন ও বলতেন যে বাঙালী মিথ্যেবাদী ও বর্বর
জাতি। ১৮৬১ খৃষ্টাব্দের ২৪ জুলাই তারিখে, এই মামলায় বিচারক ওয়েল্স লং
সাহেবকে এক মাসের কারাবাস ও ১০০০টাকা জরিমানার শাস্তি প্রদান করেন। এই
জরিমানার ১০০০ টাকা দিয়েছিলেন
কালীপ্রসন্ন সিংহ

এই দেয়ালিকার প্রচ্ছদে রয়েছে সেই সময়ে আঁকা নাল চাষ ও নীল কারখানার ছবি
এবং উপরোক্ত পাঁচজন নমস্য ব্যক্তি...
১।
হরিশচন্দ্র মুখার্জী - Hindoo Patriot পত্রিকার প্রতিবাদী সম্পাদক॥  
২। দীনবন্ধু মিত্র - নীলদর্পণ নাটকের রচয়িতা॥
৩।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত - নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজীতে অনুবাদক ॥
৪।
রেভারেণ্ড জেমস লং - নীলদর্পণ নাটকের প্রকাশক॥
৫।
কালীপ্রসন্ন সিংহ - জেমস লং এর জরিমানার টাকার দাতা॥

ব্যাকগ্রাউণ্ডে বামে উপরে-নীচে - নীল কারখানার ছবি সৌজন্যে scroll.in    researchgate.net
ব্যাকগ্রাউণ্ডে ডাইনে উপরে-নীচে - নীল চাষের ছবি সৌজন্যে commons.wikimedia.org   

মিলনসাগরে প্রকাশ - ২৭ জুলাই ২০২২॥

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

নীলের গীত
শ্রীরাজেন্দ্রকুমার মজুমদার শাস্ত্রী, বিদ্যাভূষণ।

এক সময় ভারতীয় নীল ইয়ুরোপ প্রভৃতি দেশে রপ্তানী করিয়া ব্যবসায়ীগণ বিলক্ষণ
লাভ করিতেন। সে সময় বাঙ্গালায় যত নীলের চাষ হইত বেহার প্রদেশে তদপেক্ষা
বেশী নীল চাষ হইত। বর্ত্তমানে বেহারে নীলের চাষ অনেক কমিয়া গিয়াছে।  
জর্ম্মানির সঙ্গে প্রতিযোগীতায় ভারতীয় নীলের ব্যবসায় হটিয়া গিয়াছিল। নীলের
অত্যাচারে বাঙ্গালা যখন টলমল করিতেছিল তখন বেহারও কম অত্যাচারিত
হইতেছিল না। নীলকরেরা ক্রমে যখন জমিদার হইয়া বাঙ্গলা ও বেহারের মাটীতে
শিকড় গাড়িয়া বসিলেন তখন অত্যাচারের মাত্রা অসহ্য হিয়া উঠিয়াছিল। স্বর্গীয়
দীনবন্ধু মিত্র তাহার “নীলদর্পণে”চোখে আঙ্গুল দিয়া এ সকল কাহিনী বিলক্ষণ বিবৃত
করিয়াছেন।  আমাদের  দেশীয়  লোকের  সহায়তায়ই  নীলকরেরা অত্যাচার
করিতেন। দেশীয় লোকেরাও এই উপায়ে যথেষ্ট লাভ করিত। যখন নীলের চাষ এ
দেশ  হইতে উঠিয়া গেল, অনেক সাহেবই জমিদারী বিক্রয় করিয়া চলিয়া গেলেন,
তখন দেশের লোকের ঘাম দিয়া জ্বর ছাড়িল, তাহারা নিরাপদ হইল মনে করিল।  
সাহেবেরা বাঙ্গালা হইতে উঠিয়া গেলেন কিন্তু বেহারে তাহাদের আড্ডা অনেক দিন
পর্য্যন্ত রহিয়া গেল। তাহারা আকের চাষ করিয়া সে প্রদেশে বিলক্ষণ লাভ  
করিয়াছিলেন। পরে তাহারা অনেকেই সে ব্যবসায়ও পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া
গেলেন।

জমিদারদের সঙ্গে নীলকরদিগের খুব  লড়াই  হইত।  উহাকে  এদেশীয়েরা  সাজ
কহিত। হাঙ্গামার অপর নাম সাজ। যখন এদেশ হইতে অস্ত্র আইনের সাহায্যে
আগ্নেয়াস্ত্র উঠিয়া গেল তখন এদেশে সাজ হইত বাঁশের সাহায্যে। বাঁশ দিয়া লাঠি,
হলঙ্গা, সড়কী, রায়বাঁশ প্রস্তুত করিয়া প্রতিপক্ষের সহিত সংগ্রাম হইত।
আঠারবাড়ীর স্বর্গীয় শম্ভুচন্দ্র রায় বড় বড় লম্বা বাঁশের অগ্রভাগ সূক্ষ্ম করিয়া
তাহাদিয়া সংগ্রাম করিতেন, তাই তাহার নাম হইয়াছিল “রায় বাঁশ”। এই “রায়
বাঁশের” নাম এখনও অনেক লোকের মুখে শুনা যায়। “রায় বাশের” আগা সরু করা
হইত ; উহা দ্বারা প্রতিপক্ষের লোক জনকে ক্ষত বিক্ষত করিয়া ফেলা যাইত। "রায়
বাঁশের” আগায় লৌহ ফলক আটিয়া দিয়া তাহা দিয়াও, প্রতিপক্ষকে জখম করা
যাইত। অপর লোকেরাও যখন হাঙ্গমা করিত তখনও সকলে “রায়বাঁশ” ব্যবহার
করিত। সুপারি গাছ কাটিয়া একপ্রকার দণ্ড প্রস্তুত করা হইত, তাহার আগা সরু
থাকিত। উহা দ্বারাও মানুষকে জখম করার বিলক্ষণ সুবিধা ছিল, উহাকে হলঙ্গা
বলে। দেশে এখন শান্তি স্থাপিত হইয়াছে বলিয়া এসকল অস্ত্রের ব্যবহার একরূপ
লোপ পাইয়াছে কিন্তু তাহার স্মৃতিটা এখনও মানুষের হৃদয়ে জাগিয়া রহিয়াছে।

নীলের কারখানায় ও তাহার কার্য্যে যাহারা গাফিলি করিত তাহাদিগকে মালখানায়
নিয়া আটক করিয়া বেত্র দণ্ড দেওয়া হইত। মাল থাকিত বলিয়া উহাকে মালখানা
কহিত না। কয়েদীরা আটক থাকিত বলিয়াই উহাকে মালখানা কহিত। তারপর
উহাদিগকে তৈয়ার ও কার্য্যে স্বীকৃত করিয়া বড়ি গোদামে নীলের উপর তক্তা জাত
করিবার কাজে নিযুক্ত করা হইত। এ কাজে বড় পরিশ্রম তাই সাধারণতঃ অপরাধী
গণকেই এই কাজে দেওয়া হইত। বড়ি গোদাম অর্থে বড় গোদাম ও ছোটি গোদাম
অর্থে ছোট গোদাম। ছোটি গোদামে যাহারা কাজ করিত তাহারা নীল বাক্সবন্দি ও
প্যাককরা প্রভৃতি কার্য্যেই রত থাকিত। নীলকরেরা সরকারী উচ্চ কর্ম্মচারী দিগকে
খুব খাতির করিতেন। তাহারাও নীরকর দিগের সাতখুন মাপ করিতেন। সুতরাং
নালিশ করিয়াও সাধারণ লোকে ফল পাইত না। এদিকে মাঝে মাঝে জেলার সদর
হইতে সাহেবেরা নীল কুঠিতে আসিয়া আমোদ প্রমোদ করিতেন,  তখন  দেশের
লোক মনে করিত কোম্পানী বাহাদুর নিজেই বুঝি নীলের চাষা করিতেছেন, আর
প্রতিবাদ  করিয়া ফল কি হইবে,  রাজার  হুকুম, প্রজাদেরত  কাজ করিয়া দিতেই
হইবে। ইত্যাদি মনে করিয়া মনকে প্রবোধ দিয়া নীলের কাজে লাগিয়া যাইত। নীল
প্রস্তুতের সময় সারি ও জারীগান হইত, তাহাতে মানেজার সাহেব ও দেওয়ানজী
প্রভৃতিকে গালাগালি করিয়া গান করিলেও তাহারা কিছু বলিতেন না। তাহা শুনিয়া
হাসিতেন এবং আমোদ উপভোগ করিতেন। নীলের কাজের সময় যে সকল গান
হইত তাহার কয়েকটি নিম্নে প্রদান করিলাম।

ইহা ব্যতীত অনেক অশ্লীল গানও হইত। সাহেব, দেওয়ানজী বা অপর কর্মচারীরা
কোন স্ত্রীলোক আনিয়া আমোদ প্রমোদ করিলে এই সকল গানে হাটের মাঝে হাড়ি
ভাঙ্গিয়া দিত।  সাহেব  বা  দেওয়ানজী  এই সকল গানে বিরক্ত হইতেন বোধ হইত
না। সরকার এই সকল গান প্রস্তুত করিয়া বেগারদের সঙ্গে গাইত, কখন কখন গ্রাম্য
লোকেরাও গান প্রস্তুত করিয়া দিত।

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ


মিলনসাগর
১০ই শ্রাবণ ১৪২৯
২৭ই জুলাই ২০২২

নীলের গানের দেয়ালিকার মূল পাতায় ফিরতে
এখানে ক্লিক করুন . . .    


ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ








.