১৯১৬ সালে ময়মনসিংহের কবি চন্দ্রকুমার দে প্রথম সেই এলাকার প্রচলিত পালাগান বা গাথাগুলি সংগ্রহ করেছিলেন | আচার্য দীনেশচন্দ্র সেনের উত্সাহে তা পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় | এই সমস্ত পালা ময়মনসিংহ গীতিকা নামেই পরিচিতি লাভ করে | ১৯৬৬ নাগাদ ক্ষিতীশ মৌলিক (প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা) এই ময়মনসিংহের পালাগুলির আরও একটি সম্পাদিত রূপ প্রকাশ করেন | প্রকাশিত হবার পরেই এই গাথাগুলি রসিক সমাজে প্রভূত সমাদর লাভ করে | কাব্যগুণ, সরলতা, বাংলার পল্লিজগতের সুর, রস, ও ঘ্রাণে সমৃদ্ধ এই সকল পালা, বাংলার লোক সাহিত্যের এক নতুন দিক খুলে দেয় | এর প্রাচীনতা নিয়ে পণ্ডিতেরা এখনও সহমত পোষণ করতে পারেন নি | লোক সাহিত্য বলা হলেও এই পালাগুলির বিশেষ বিশেষ কবিদের লিখিত রচনা | তাই এগুলি কোন সমাজের সাধারণ সম্পত্তি নয় | লোকমুখে ফিরে ফিরে, সংগ্রাহক, সম্পাদক এবং প্রকাশকদের হাত পড়ে যে এগুলি নিজের প্রাচীনতা ও স্বকীয় বিশিষ্টতা অনেকটাই হারিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন - "বাংলা প্রাচীন সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য প্রভৃতি কাব্যগুলি ধনীদের ফরমাসে ও খরচে খনন করা পুষ্করিণী ; কিন্তু ময়মনসিংহ গীতিকা পল্লী হৃদয়ের গভীর স্তর থেকে স্বত উচ্ছ্বসিত উত্স, অকৃত্রিম বেদনার স্বচ্ছ ধারা | বাংলা সাহিত্যে এমন আত্ম-বিস্মৃত রসসৃষ্টি আর কখনো হয়নি |" মৈমনসিংহ গীতিকা গুলিতে হিন্দু ও মুসলমান দুটি সংসকৃতিই দেখতে পাওয়া যায় | এদের বৈশিষ্ট হল এই যে প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে প্রধানত ধর্মাশ্রিত হলেও এদের উপর ধর্মের প্রভাব খুবই অল্প | এগুলি এধিকাংশই প্রণয়মূলক | এদের মধ্যে ফুটে উঠেছে পূর্ববঙ্গের পল্লী-জীবনের অপূর্ব আলেখ্য | এই পল্লী-জীবনের পটভূমিকায় বর্ণিত হয়েছে নায়ক নায়ীকাদের প্রেম ভালবাসা | এই গীতিকাগুলির মধ্যেই আমরা পেয়েছি ষোড়শ শতকের প্রথম বাঙালী মহিলা কবি চন্দ্রাবতীকে যাঁর নিজের জীবনই কিংবদন্তী হয়ে "চন্দ্রাবতী" পালায় পর্যবসিত হয়েছে | তাঁর লেখা রামায়ণ কথা একটি এমন রচনা যেখানে রামের গুণগানের বদলে সীতাদেবীর দুঃখ দুর্দশাই তিনি বর্ণনা করেছেন | একজন নারীর দৃষ্টিতে এই মহাকাব্য রচণা স্বাভাবিকভাবেই পণ্ডিত সমাজে অবাঞ্ছিত বলেই তাকে দুর্ব্বল ও অসমাপ্ত সাহিত্য আখ্যা দিয়ে সরিয়ে রাখা হয়েছিল |
এখানে আমরা মৈমনসিংহ গীতিকার পালাগুলি থেকে অংশবিশেষ করে তুলে ধরছি | উত্স: সুখময় মুখোপাধ্যায় এবং সুখেন্দু শেখর গঙ্গোপাধ্যায় এর সম্পাদিত গন্থ ময়মনসিংহ-গীতিকা