কবি বারীন্দ্রকুমার ঘোষ  বা সংক্ষেপে বারীন ঘোষ ইংল্যাণ্ডের রাজধানী লণ্ডনের নরউড এর
কাছে অবস্থিত ক্রয়ডন এ জন্ম গ্রহণ করেন | পিতা ডঃ কৃষ্ণধন ঘোষ ছিলেন প্রথিতযশা চিকিত্সক এবং
ডিস্ট্রিক্ট সার্জেন | মাতা স্বর্ণলতা দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের রাজনারায়ণ বসুর কন্যা এবং সম্ভবত উনিশ
শতকের একজন প্রতিষ্ঠিত কবি | তাঁর মেজদা মনমোহন ঘোষ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতার
প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজীর অধ্যাপক এবং কবি | সেজদা ছিলেন বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ যিনি পরে ঋষি
অরবিন্দ নামে খ্যাত হন | বারীন ঘোষের মাসী ছিলেন
কবি লজ্জাবতী বসু

১৮৯৮ সালে বিহারের দেওঘর থেকে, বারীন এনট্র্যান্স পরীক্ষা পাশ করে ১৯০১ সালে পাটনা কলেজে
ভর্তি হন কিন্তু তাঁর প্রথাগত শিক্ষা অসমাপ্ত থেকে যায় | এর পর কিছুকাল তিনি তাঁর মেজদা মনমোহন
ঘোষের কাছে কাটিয়ে, গুজরাতের বরোদায়, সেজদা অরবিন্দ ঘোষের কাছে চলে যান | সেখানে
অরবিন্দের  বিপ্লবের ভাবনায় প্রভাবিত হয়ে, বন্দুক চালানো অভ্যাস করেন | এর পর তিনি অরবিন্দের
নির্দেশে চলে আসেন কলকাতায় এবং যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি বাঘাযতীন নাম খ্যাত হয়েছিলেন, এর
সাথে মিলে বিপ্লবী দল গঠন ও পরিচালনার কাজে লেগে পড়েন | দুজনে মিলে কলকাতায় বাংলার তরুণ
বিপ্লবীদের নিয়ে গড়ে তোলেন স্বদেশী আন্দোলনের মূল সংঘটন "অনুশীলন সমিতি" | ১৯০৬ সালে শুরু
করেন “যুগান্তর” সাপ্তাহিক পত্রিকা, যা ব্রিটিশ বিরোধী পত্রিকা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে |

তাঁর নেতৃত্বে কলকাতার মানিকতলার মুরারীপুকুরে, তরুণ স্বদেশীদের বোমা তৈরি করার প্রশিক্ষণ দেওয়া
শুরু হয় | মানিকতলার মুরারীপুকুরের সেই জায়গাটি এখন “
বোমার মাঠ” নামে খ্যাত | সেখানে বারীন
ঘোষদের বাগানবাড়ী ছিল | কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যার জন্য অতি গোপনীয়তার সঙ্গে নির্বাচিত করা হয়
দুই তরুনকে - প্রফুল্ল চাকী এবং ক্ষুদিরাম বোস |

১৯০৮ সালের ৩০শে এপ্রিল বিহারের মজঃফরপুরে, নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী ইংরেজ পুলিশ অফিসার -
কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যার চেষ্টায় ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম বোস এবং প্রফুল্ল চাকী | দুর্ভাগ্যবশত কিংসফোর্ড
সেদিন ঐ ফিটন গাড়ীতে ছিলেন না | ছিলেন ইংরেজ মা ও মেয়ে, মিসেস ও মিস কেনেডি | প্রফুল্ল চাকীর
ছোঁড়া বোমায় ওই দুই ইংরেজ নারী মারা যান | কিশোর ক্ষুদিরাম ধরা পড়েন বিহারের  তত্কালীন
"ওয়াইনি" অধুনা "পুশা রোড" রেল স্টেশনে | বিহারের "মোকামাঘাট" রেল স্টেশনে, প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়ার
ঠিক আগের মুহুর্তে নিজের মাথা লক্ষ্য করে নিজের পিস্তল থেকে গুলি চালান কিন্তু তখনই তিনি মারা যান
নি | তাঁকে হাস্পাতালে নিয়ে সারিয়ে তোলার চেষ্টা হয় | জ্ঞান ফিরলে হাসপাতালের বেড-এই তিনি নাকি
তাঁর মাথার ব্যান্ডেজ খুলে ক্ষতের ভিতর আঙুল ঢুকিয়ে ঘিলু বার করার চেষ্টা করেন এবং মারা যান | এর
পর ব্রিটিশ সরকার এক সাংঘাতিক বর্ব্বরতার কাজ করে | প্রফুল্ল চাকীর সনাক্তকরণের জন্য ভাগলপুর
থেকে কলকাতা অবধি তাঁর মৃতদেহ বয়ে আনার ঝামেলা এড়ানোর জন্য তারা প্রফুল্ল চাকীর মাথাটা কেটে
কলকাতায় নিয়ে আসে | সনাক্তকরণের পর প্রফুল্লচাকীর মাথাটিকে নাকি ফ্রীস্কুল স্ট্রীটের থানার উঠোনে
পুতে দেওয়া হয় |

এই মামলায় ক্ষুদিরামের উকিল ছিলেন দেশপ্রেমিক আইনজীবী কালিদাস বসু | পরে বিচার চলাকালীন,
ক্ষুদিরাম দুঃখ প্রকাশ করেন দুজন নারীকে তাঁরা অজান্তে হত্যাকরে ফেলেছিলেন বলে, কিন্তু কিংসফোর্ডকে
মারার কথায় বলেন যে সুযোগ পেলে তিনি ওই কাজ আবার করবেন |

ক্ষুদিরামের মাতা ও পিতার অকাল মৃত্যুর পর তিনি কিছুদিন তাঁর দিদি অপরূপা দেবীর গৃহে আশ্রয়
পেয়েছিলেন | স্বদেশী করে বলে সরকারী চাকুরে জামাইবাবু অমৃতলাল রায় তাঁকে অন্যত্র ব্যবস্থা করতে
বলেন | সেই সময় তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাঁর পাতানো দিদি, মেদিনীপুরের উকিল সৈয়দ আবদুল
ওয়াজেদ এর বোন (
এই স্নেহময়ী মহিয়সী নারীর নামটি আমাদের জানা নেই) | ফাঁসির আগে ক্ষুদিরামের শেষ ইচ্ছা
প্রথমে ছিল এই যে - তিনি বোমা বানাতে পারেন, অনুমতি পেলে ওটা সবাইকে শিখিয়ে যেতে চান!
বলাবহুল্য সে ইচ্ছা এককথায় বাতিল করে দিয়ে আবার জানতে চাওয়া হয় যে তাঁর শেষ ইচ্ছা কি | এবার
ক্ষুদিরাম জানান যে তাঁর দিদিকে দেখতে খুব ইচ্ছে করে | দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয় নি কারণ
ইচ্ছা থাকলেও স্বামীর অমতে অপরূপা দেবী ভাই ক্ষুদিরামকে দেখে যেতে পারেন নি | কিন্তু সেদিন তাঁর
ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন তাঁর পাতানো মুসলমান দিদিটি | তিনি সব বাধা কাটিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন
মজঃফরপুরে ক্ষুদিরামের সাথে দেখা করতে |

এমন যে দেশে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে স্নেহ-ভালবাসার দৃষ্টান্ত রয়েছে, সে দেশে কী করে কথায় কথায় রায়ট
লাগে, কথায় কথায় দেশ ভাগ হয়, আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে তা বুঝে উঠতে পারিনি আজও! ক্ষুদিরাম বোস ও
প্রফুল্ল চাকীর প্রসঙ্গ এখানে আপাতভাবে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও আমরা মনে করছি যে এই ঘটনাবলী বারীন
ঘোষের জীবনের অবিচ্ছেদ্দ অংশ | তিনি না থাকলে কি এই ইতিহাস রচিত হোতো?

ক্ষুদিরামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১১ই অগাস্ট ১৯০৮ তারিখে | তিনি হাসতে হাসতেই ফাঁসির মঞ্চে
উঠেছিলেন | এ কথা আমরা দুটি সংবাদ পত্রের খবর থেকে জানতে পারি----

.        মজঃফরপুর, ১১ই আগস্ট---অদ্য ভোর ছয় ঘটিকার সময় ক্ষুদিরামের ফাঁসি হইয়া গিয়াছে | ক্ষুদিরাম দৃঢ় পদক্ষেপে প্রফুল্ল
চিত্তে ফাঁসির মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয় | এমন কি তাহার মাথার উপর যখন টুপি টানিয়া দেওয়া হইল, তখনও সে হাসিতে ছিল |
.                                                                অমৃতবাজার পত্রিকা - ১২-৮-১৯০৮

.        Khudiram Bose was executed this morning,...it is alleged that he mounted the scaffold with his body
erect. He was cheerful and smiling.                                             The Empire - 12.8.1908
(এটি সরকারী মুখপত্র)

এই মামলার সূত্র ধরে ২ মে ১৯০৮ তারিখে ধরা পড়েন বারীন ঘোষ, কারণ তাঁদের ছোঁড়া বোমা ওই বোমার
মাঠেই
তৈরী হয়েছিল বলে পুলিশ মনে করে | সেই মামলায় (আলিপুর বোমা মামলা বা Alipore Bomb Case),
বারীন ঘোষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় যা পরে জাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বদল করা হয় | এই মামলায় এঁদের হয়ে
লড়েছিলেন বিখ্যাত
ব্যারিস্টার ও কবি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ | এই মামলা চলাকালীন স্বীকারোক্তিতে
বারীন্দ্রকুমার ঘোষ সম্পূর্ণ দায় নিজের উপর তুলে নিয়েছিলেন | ১৯০৯ সালে বারীন ঘোষকে “
কালাপানি” --
আন্দামানের সেলুলার জেলে দ্বীপান্তরিত করা হয় | অরবিন্দ ঘোষ বেকসুর খালাস পান | ১৯২০ সালে
“জেনারেল য়্যামনেস্টির” ফলে বারীন ঘোষ মুক্তি পান |

কলকাতায় ফিরে তিনি প্রথমে সাংবাদিকতার জীবন শুরু করেন এবং পরে ১৯২৩ সালে পণ্ডিচেরীতে গিয়ে
সেজদা ঋষি অরবিন্দের আশ্রমে যোগদান করেন | ১৯২৯ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন এবং
সাংবাদিকতার জীবন পুনরায় শুরু করেন | ১৯৩৩ সালে তিনি শৈলজা দেবীর সাথে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন |
ঐ বছরই তিনি
“The Dawn of India” নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন | এর পর তিনি
ইংরেজী দৈনিক পত্রিকা
“The Statesman” এ যোগ দেন | ১৯৫০ সালে তিনি বাংলা পত্রিকা "দৈনিক বসুমতী“-
র সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন |

তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে তাঁর রাধাকৃষ্ণের আধ্যাত্মিক প্রেমের কবিতার সংকলন “দ্বীপান্তরের
বাঁশী” এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে “পথের ইঙ্গিত”, “আমার আত্মকথা”, “অগ্নিযুগ”, “ঋষি
রাজনারায়ণ”,
“The Tale of My Exile”, “শ্রী অরবিন্দ” প্রভৃতি | পণ্ডিচেরীর শ্রী অরবিন্দ আশ্রম-এর মতে তাঁর
সাহিত্যকর্ম অনেক পরে দেশবাসীর সামনে এসেছে | আমরা,
মিলনসাগরে, তাঁর "দ্বীপান্তরের বাঁশী" কাব্যগ্রন্থ
থেকে ১৫টি কবিতা তুলে দিলাম |

১৯২২ সালে বাংলার কাব্যাকাশে,
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ধূমকেতুর মতো উত্থান হয়, তাঁর
"অগ্নিবীণা" কাব্যগ্রন্থের প্রকাশের মধ্য দিয়ে |  এই কাব্যগ্রন্থটি নজরুল উত্সর্গ করেছিলেন এই
বারীন ঘোষকেই | সেই কাব্যগ্রন্থে নজরুল তাঁকে সম্বোধন করেছেন ... "
ভাঙা বাংলার রাঙা যুগের আদি
পুরোহিত সাগ্নিক বীর
" বলে | তাঁকে উত্সর্গ করা কবিতাটি শুরু হয় এমন করে . . .

.        অগ্নি ঋষি! অগ্নি-বীণা তোমায় শুধু সাজে |
.        তাই ত তোমার বহ্নি-রাগেও বেদন-বেহাগ বাজে ||....

বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষ এবং তাঁর মতো মানুষ যাঁরা আমাদের দেশমাতৃকার শৃঙ্খল-মোচন-কল্পে জীবন
বাজি রাখতেও  পিছপা হননি, তাঁদের ঋণ আমরা, যারা আজ স্বাধীন ভারতের স্বাধীন মানুষ, কোনোদিন
শোধ করতে পারবো না | এই পাতায় তাঁর কবিতা তুলে, তাঁকে আগামী প্রজন্মের মাঝে নিয়ে যাওয়াই
আমাদের মূল উদ্দেশ্য | আমরা তাঁকে এভাবে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলী জানাতে পেরে, নিজেদেরকে ধন্য মনে
করছি |


উত্স :  বাঙলার মণীষা, সম্পাদনা সুধীরকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, মানিক মুখোপাধ্যায়, জীবিতেশ চক্রবর্তী
.         http://www.andamancellularjail.org   
.             
http://www.indianetzone.com      
.             
http://www.sriaurobindoashram.org     


এই ওয়েব সাইটে কবি বারীন্দ্রকুমার ঘোষের মূল পাতায় যেতে হলে এখানে ক্লিক্ করুন..
.          
http://www.milansagar.com/kobi/barin_ghosh/kobi-baringhosh.html



আমাদের যোগাযোগের ঠিকানা :-   
মিলনসাগর       
srimilansengupta@yahoo.co.in      
.