চারণকবি মুকুন্দদাসের কবিতা ও গান
যে কোন গানের উপর ক্লিক করলেই সেই গানটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
ছেড়ে দেও কাঁচের চুড়ী বঙ্গনারী
চারণকবি মুকুন্দদাস
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।


ছেড়ে দেও কাঁচের চুড়ী বঙ্গনারী,
কভু হাতে আর প'রো না |
জাগ গো জননী ও ভগিনী,
মোহের ঘুমে আর থেকো না ||
কাঁচের মায়াতে ভুলে শঙ্খ ফেলে,
কলঙ্ক হাতে আর প'রো না |
তোমরা যে গৃহলক্ষ্মী ধর্মসাক্ষী,
জগত্ ভ'রে আছে জানা |
চটকদার কাঁচের বালা ফুলের মালা,
তোমাদের অঙ্গে শোভে না ||
বলিতে লজ্জা করে প্রাণ বিদরে,
কোটি টাকার কম হবে না |
পুঁতি কাঁচ ঝুটো মুক্তায় এই বাংলায়,
নেয় বিদেশী কেউ জানে না ||
ঐ শোন বঙ্গমাতা শুধান কথা,
জাগ আমার যত কন্যা |
তোরা সব করিলে পণ মায়ের এ ধন,
বিদেশে উড়ে যাবে না ||
আমি অভাগিনী কাঙ্গালিনী,
দু'বেলা অন্ন জোটে না |
কি ছিলেম, কি হইলেম, কোথায় এলেম,
মা যে তোরা চিনলি না ||

.                                 ****************                                   
.                                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
আমি গান করিতাম গাইতে দিলে গান
চারণকবি মুকুন্দদাস
১৯০৮-১৯০৯ সালে ইংরেজ সরকার রাজদ্রোহের অপরাধে কবিকে সুদূর দিল্লী সেন্ট্রাল জেলে তিন বছরের
জন্য সশ্রম কারাদণ্ডের সময়ে রচিত | ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে
নেওয়া।

আমি গান করিতাম গাইতে দিলে গান |
সে গানে মাতিয়ে দিতাম প্রাণ ||
গলাটা বেশ করে সেধে,
সুরটা নিতাম পঞ্চমে বেঁধে |
তানে প্রাণ উঠত রে মেতে,
সবার দিল-দরিয়ায় বইত রে উজান ||
দিতাম একটা এমন অট্টহাস,
জগত্টার কেটে যেত পাশ |
ঝড়ের মত বইত রে বাতাস,
উড়িয়ে নিত কাল মেঘখান ||
সুখ-রবি কিরণ ছড়াত,
সব ঘুমের মানুষ চমকে উঠত ;
এ মুকুন্দ একাই পারত,
জগত্ ধরে দিতে একটা টান ||

.                                 ****************                                   
.                                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
ছল চাতুরী কপটতা মেকী মাল আর চলবে ক'দিন?
চারণকবি মুকুন্দদাস
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।


ছল চাতুরী কপটতা মেকী মাল আর চলবে ক'দিন?
হাড়ি মুচির চোখ খুলেছে, দেশের কি আর আছে সেদিন ||
খেতাবধারী হোমরা চোমরা, নেতা বলেই মানতে হবে,
মনুষ্যত্ব থাক কি না থাক, তাঁর হুকুমেই চলবে সবে |
সত্যকে পায় দলবি তোরা আসন চাইবি বিশ্ব জোড়া ;
হবে না তা নবীন যুগে হোস না তোরা যতই প্রবীণ ||
সংবাদপত্রে উচ্চস্তম্ভে নাম ঠেকিয়ে টেক্কা নিবি,
মুস্কিল আসান করতে হলে কংগ্রেসের দোহাই দিবি |
ভণ্ডামী আর করবি কত হলি না কেউ কাজে রত |
মনে রাখিস স্বদেশ ব্রত, কর্মী হবে কর্মেতে লীন ||
নেতারাই দেশ জাগাত সবাই তাঁদের বলত চারণ |
এখন আপনা বেঁচে মালসী পাড়ায়, যোগান তাঁরা ভোটের দাদন |
তোদের পতন এতই গভীর ভবলেও তা করে স্থবির |
দেশ হাসালি রূপ দেখালি প্রতিভারে করলি মলিন ||
দেশের কাছে পড়লি ধরা আর দাঁড়াবার উপায় নাই,
আমরা ভাই বাউল চারণ মুক্তিমন্ত্র ছড়িয়ে বেড়াই |
গাড়ো সাঁওতাল বাগ্দি মেথর রয়েছে ওদের ভিতর |
মাতৃমন্ত্রের সাধক তারা, তারাই ভারত করবে স্বাধীন ||
পল্লী মায়ের শ্মশান বুকে বসে যাবে আবার ধ্যানে
কুণ্ডলিনী জাগবে সেদিন তোদেরি অজপার টানে |
ভারতের ভাগ্য-রবি ধরবে সেদিন নূতন ছবি,
জগতের অমানিশায় পূর্ণচন্দ্র উঠবে সেদিন ||

.                                 ****************                                   
.                                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
আমি এক ধর্ম-অনুরাগী
চারণকবি মুকুন্দদাস
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।


আমি এক ধর্ম-অনুরাগী ||
বাপ আমার গুষ্টি পোষেন, আমি হলেম সর্বত্যাগী
আমি লেখাপড়ায় অষ্টরম্ভা, কথা বলি লম্বা লম্বা ;
বাপকে ডাকি 'ওল্ড ফুল' বলে মা বেটি অভাগী,
ঘরের গিন্নীর ঝাঁটা খেয়ে আমি হয়েছি বিরাগী ||
তাই কাবু হয়ে গেছি গলে তাইতে দেশের সেবায় লাগি ||
শুনলে হরি নামাবলী অমনি আমি কেঁদে ফেলি,
কীর্তনে লাফাই আমি সারারাত্রি জাগি ||
লোকে বলে আঃ কি ভক্ত, আঃ কি অনুরাগী,
আমি কিন্তু যা করি তাই, সবই আমার নামের লাগি ||
শুনলেন তো আমার পরিচয়,
এদেশে আমার মত প্রায় সমুদয়,
তাই মুকুন্দ কেঁদে কেঁদে কয়,
সারা বাংলা খুঁজে পেল না সে তাহার দুঃখের একটা ভাগী ||

.                                 ****************                                   
.                                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
বল ভাই মেতে যাই বন্দেমাতরম্
চারণকবি মুকুন্দদাস
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।


বল ভাই মেতে যাই বন্দেমাতরম্
বন্দেমাতরম্ , বন্দেমাতরম্ , বন্দেমাতরম্ |
ভারত সন্তান, নিয়ে মায়ের নাম,
হও আগুয়ান, নাচবে এ প্রাণ,
নাম মধুরম্ ;
বন্দেমাতরম্ , বন্দেমাতরম্ , বন্দেমাতরম্ |
নাম গানে, এ মরা প্রাণে,
জ্বলছে আগুন, জ্বলিবে দ্বিগুণ,
নামই রুদ্রম্ ;
বন্দেমাতরম্ , বন্দেমাতরম্ , বন্দেমাতরম্ |
আসবে প্রাণে বল, মায়ের নাম কর সম্বল,
দেল্ দরিয়ায় উঠবে তুফান,
মন্ত্র গভীরম্ ;
বন্দেমাতরম্ , বন্দেমাতরম্ , বন্দেমাতরম্ |

.                                 ****************                                   
.                                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
দেখলেম ভাই জাতি কুলবিচারে
কাঙ্গাল হরনাথের একটি গানকে নতুন রূপে ঢেলে চারণকবি মুকুন্দদাস গেয়েছিলেন  
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।

দেখলেম ভাই জাতি কুলবিচারে |
ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য শূদ্র হিন্দু মুসলমান,
কালেতে ছাড়ে না কারে ||
যতক্ষণ রাস্তার উপরে ততক্ষণ জাত বিচারে,
খেয়াঘাটে গেলে পরে, এক নৌকায় সব চড়ে,
খেয়ার কড়ি ঘাট মাঝিতে সমান আদায় করে---
ঐ মাঝির সনে যান সুহৃদ পিরীত,
মাঝি সুহৃদে দুই একজন ছাড়ে ||
রেলগাড়ী আর স্টীমার তাতে জাতি যায় না রে |
মুসলমান ভাইতে আমাদের হুঁকার জলটি মারে |
আর এক বিচার বাংলা দেশের লোক-আচারে,
নমঃ কামায় না শ্রুত্রের নাপিতে,
মুসলমান কামাইতে পারে ||
দেখলেম ভাই শ্রীক্ষেত্রেতে, সবে খায় একত্রেতে,
মুসলমান জাতি মাত্র যেতে নাহি পারে |
দাস মুকুন্দ বলে হ'ল না রে বিচার---
কি হয় শেষে মোর কপালে ||
ভারতের ধর্মালয়ে হাকিমেরা বিচার করে,
দুই পক্ষের সাক্ষী শুনে সূক্ষ্ম বিচার করে,
সত্য মিথ্যা দেখেন তারা আইন অনুসারে---
কিবা হিন্দু কি মুসলমান---
সকলই এক গারদে ভরে ||

.                                 ****************                                   
.                                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
স্বরাজ
চারণকবি মুকুন্দদাস
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।

স্বরাজ স্বরাজ করিস তোরা,
স্বরাজ কি রে গাছের ফল?
অবহেলে তায় পেড়ে খাবি তোরা,
পরপদলেহী ভীরুর দল ||
ধনির দুয়ারে ধরনা দিয়ে সেবরাজ তোরা ভিক্ষা চাস,
কপট বৈরাগ্যের মুখোশ পরিয়া,
ভাইয়ের কাছে ভাই করিস ছল---
কী করে স্বরাজ মিলিবে বল ||
পারিস যদি রে হতে বীরাচারী,
সোমরস আবার করিতে পান ;
রক্তগঙ্গার পূণ্য সলিলে, পূজিতে মায়ের মুরতিখান |
রুধিরাসক্তা পানেতে মত্তা,
মা আজ ছেলের রক্ত চান---
দিতে হবে তাই মনে রাখিস ভাই,
স্বরাজ পথের যাত্রীদল ;
মরণ দিয়েই বরণ করিতে,
হইবে তোদের মুক্তিফল ||

.                                 ****************                                   
.                                                                                                
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
বান এসেছে মরা গাঙে খুলতে হবে নাও
চারণকবি মুকুন্দদাস
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।

বান এসেছে মরা গাঙে খুলতে হবে নাও |
.                তোমরা এখন ঘুমাও!
কত যুগ গেছে কেটে দেখেছ কত স্বপন
এবার বদর বলে ধর বৈঠা জীবন-মরণ পণ |
দমকা হাওয়ার কাল গিয়েছে---
.                ফাগুন বইছে পাল খাটাও ||
অবহেলে থাকলে বসে কাঁদতে হবে সারা জীবন ;
যুগ-যুগান্তরের তপস্যাতে, মিলছে এমন লগন |
.                পারের মাঝি হাল ধরেছে---
.                মিছে পরের মুখ তাকাও ||

.                ****************                                   
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
আমি গাইব কি আর শুনবে কে রে
চারণকবি মুকুন্দদাস
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।

আমি গাইব কি আর শুনবে কে রে,
আছে কি আর কারো কান ?
আমি দেশ-বিদেশে ঘুরে ঘুরে কত ভাবের গাইনু গান ;
এ গান শুনলে না কেউ, বুঝলে না কেউ
কোন্ সুরেতে ধরছি তান ||
আমরাই নাকি বিশ্বমাঝে বিশ্বপতির শ্রেষ্ঠ দান,
আমরাই আজ উপোস করে
দিন কাটাচ্ছি থাকতে মোদের ক্ষেতের ধান ||
পাব কি আর এমন ছেলে দেশের লাগি কাঁদে প্রাণ,
ভব-সাগরে বইছে হাওয়া কাল সাগরে ডাকছে বান,
তোরা এখন হাল ছেড়ে দে পার হয়ে যাক্ (ভারতবাসীর) তরীখান ||

.                ****************                                   
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
কৃষ্ণনাম বড়ই মধুর
চারণ-কবি মুকুন্দ দাস
॥ মুকুন্দদাস-রচিত প্রথম সঙ্গীত॥
ডঃ জয়গুরু গোস্বামী সম্পাদিত “চারণকবি মুকুন্দদাস”, ১৯৭২ থেকে নেওয়া।
মুকুন্দদাস রচিত প্রথম সঙ্গীত। ১৩০৮ বঙ্গাব্দের বসন্ত ঋতুতে নিজের মুদি দোকানে বসে
যজ্ঞেশ্বর তথা মুকুন্দদাসের রচিত এই প্রথম সঙ্গীতই তাঁর ভবিষ্যৎ নাম প্রচারের সর্বপ্রথম
গোপনাভিব্যক্তি।

কৃষ্ণনাম বড়ই মধুর
যে লয় সে বড়ই চতুর |
নামের আছে এমনি শক্তি
এই নামাভাষে হয় রে মুক্তি
যে লয় নাম করে ভক্তি
হয় রে তার মায়ামোহ দূর  |
( আমার ) এই কৃষ্ণনামের মহিমা
সদাশিব তার আছে নিশানা |
শিব ত্যজিয়ে কৈলাস বাসনা
শ্মশানে নামেতে বিভোর |
এই কৃষ্ণনামের মাধুরী
আমি যাই বলিহারী,
এ মাধুরী জানে কেবল ব্রজনাগরী
যাদের প্রাণে যুগল কিশোর
গোঁসাঞ রামানন্দের বাণী,
শোন মুকুন্দ তোরে বলি
তুই পেয়ে এমন সাধের যোগী
হরেকৃষ্ণ ভজলি নারে মূঢ় |”

.                ****************                                   
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর