কবি গুরুদাস পাল - জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার উপকণ্ঠে, মেটিয়াবুরুজের নিকটে বদরতলা অঞ্চলে।
সে বছরের শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কবি গুরুদাস
 পালের পরিবার,
অনেক পুরুষ আগে হুগলী নদীর ওপারের পোদড়া-পাঁচপাড়া থেকে বদরতলায় এসে বসবাস শুরু করেন।
তাঁদের পারিবারিক জীবিকা হয়তো কোনো কালে ছিল মৃৎশিল্প,
 কিন্তু পিতা মনোহর পাল ছিলেন তরজা
শিল্পী। জীবিকার জন্য কাজ করতেন ক্লাইভ জুট মিলে। মাতা কুসুমকুমারী দেবী কবিকে গভীরভাবে
প্রভাবিত করেছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর এলাকার মহিলা সমিতির নেত্রী এবং মেয়েদের নিয়ে মিছিল করে
মনুমেন্টের (শহীদ মিনার) পাদদেশেও গিয়েছেন। ১৯৪৮-৫১ সালে যখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি
(CPI)
নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল, সেই সময়ে পার্টির বহু নেতা ও কর্মী তাঁদের বাড়ীতে আশ্রয় নিতেন, মিটিং হোতো,
বাড়ীর মেয়েরা চুপি চুপি খিচুড়ি রান্না করতেন, আবার রাত পোহাবার আগেই নেতা-কর্মীরা নিঃশব্দে চলে
যেতেন। এই মহিয়সী নারী কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হবার আগেও ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের
চেতনায় আলোড়িত হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যু কবির জীবনে বিরাট শুন্যতা সৃষ্টি করেছিল।  কবিরা ছিলেন
চার ভাই তিন বোন। তিনি ছিলেন ভাইদের মধ্যে তৃতীয়।

কবি গুরুদাস পালের প্রথাগত বিদ্যা মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত। প্রথমে স্থানীয় কৈলাস ফ্রি প্রাইমারি স্কুল ও পরে
মেটিয়াবুরুজের হাইস্কুলে তিনি কয়েক বছর পড়েছিলেন।  

পিতা তরজা শিল্পী থাকার সুবাদে কবির সঙ্গে ছোটোবেলা থেকে তরজা শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় ছিল। প্রথম
দিকে তিনি তরজার ওতোর-চাপান আঙ্গিকে গান করেছেন। কিন্তু ১৯৩৩ সালে, সম্ভবত মুদিয়ালি হরিসভার
এক অনুষ্ঠানে
মুকুন্দদাসের যাত্রা পালা “পথ” শুনে তিনি প্রভাবিত হয়ে পড়েন চারণ কবির চারণ গানের
ধারায়। তার সঙ্গে গুরুদাস পাল ব্যবহার করেছিলেন খ্যামটা, পাঁচালি এবং রাগাশ্রিত সুরও।
মুকুন্দদাস
এবং পরে
কবিয়াল রমেশ শীলকে স্মরণে রেখেই লোক আঙ্গিকের এই কাঠামোকে তিনি রাজনৈতিক
চেতনার আশ্রয় হিসাবে বিকশিত করেছিলেন।
মুকুন্দদাসের গানে এতই প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি
সেই গান সর্বত্র গাইতে শুরু করেন। শ্রোতাদের ওই গান শোনার চাহিদা পূরণ করতে গিতে মনের মধ্যে কবি
হবার বাসনা জেগে ওঠে। তারপরেই তাঁর এলায় কবিয়াল হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
মুকুন্দাস
রমেশ শীল ছাড়াও তাঁকে প্রভাবিত করেন কবিয়াল দাশরথি রায়ের (দাশু রায়) পাঁচালি গান। পাঁচালির  
যমক অনুপ্রাস এবং খ্যামটা ও কীর্তনের সুরকে গ্রহণ করে কখনো কখনো তীব্র ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গির সঙ্গে
মিশিয়ে গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নিজস্ব শৈলী।

কবি, জীবিকার জন্য মেটিয়াবুরুজের আক্রা ফটকে চালাতেন একটি চা-পান-বিড়ির দোকান! এই দোকাটিও
আদতে তাঁর নিজের ছিল না! সেটি ছিল কাঞ্চনতলার খালধাড়ির পঞ্চু মণ্ডলের সম্পত্তি। পঞ্চু মণ্ডল এম.এ.এম.
সি. কোম্পানিতে চাকরি পাবার পর গুরুদাস পালের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা ক’রে, কোনো স্বত্ব না রেখেই,
কবির জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে ওই দোকানটি দিয়ে দেন। চা-বিক্রি ও বিড়ি বাঁধার কাজের ফাঁকেই
চলতো গান বাঁধার কাজ। কবি ছিলেন অকৃতদার। প্রথমে পৈতৃক বাড়ীতেই ভাইদের সঙ্গে থাকতেন, মাঝে
মামা বলাই পালের বাড়ীতে ছিলেন কিছু কাল। পরে, কাছেই, খোলার চালের একটি দু-কামরার বাড়ী করে
নেন। তাঁর ছোট ভাই প্রফুল্ল পাল, সপরিবারে তাঁর সাথেই থাকতেন। তাঁর আক্রা ফটকের চায়ের দোকান
থেকেই ১৯৬৮ সালে তাঁকে অসুস্থ ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় নিয়ে ভর্তি করা হয় কলকাতার বেলেঘাটা আই.ডি.
হাস্পাতালে। সেখানেই ১৩.১২.৬৮ তারিখে, মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দারিদ্র ও অসুস্থতা কবি গুরুদাস পালের নিত্য সঙ্গী ছিল। জীবনযাত্রার প্রয়োজনে কখনো পার্টি এবং  
গণনাট্য সংঘের সঙ্গীদের কাছেই বাধ্য হয়ে অতিসামান্য আর্থিক সাহায্যের আবেদন করেছেন। রেবা
রায়চৌধুরী কোনো এক অনুষ্ঠানে তাঁকে শীতে কাঁপতে দেখে তাঁর গায়ে পরিয়ে দিয়েছিলেন সজল
রায়চৌধুরীর একটি কোট। তাঁর আর্থিক সুরাহার জন্য, তাঁর বন্ধু ও গুণগ্রাহী
সলিল চৌধুরী নাকি একবার
তাঁকে বম্বেতে আসতে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর জন্মস্থান বদরতলা ছেড়ে যেতে রাজি হন নি।

১৯৫১ সালে “বরযাত্রী” চলচিত্রে “পুঁঠি মাছ ডাঙায় উঠে ফুট কাটে” গানটি তিনি নিজেই গেয়েছিলেন।
পারফরমার হিসেবেও কবি ছিলেন উল্লেখযোগ্য। একবার মঞ্চে উঠলে মঞ্চকে ভরিয়ে দিতে জানতেন  
গুরুদাস পাল। রেবা রায়চৌধুরী তাঁর “জীবনের টানে শিল্পের টানে” বইটিতে কবির গান সম্বন্ধে লিখেছেন . . .

“গুরুদাস পালের গান যিনি শুনেছেন, কোনোদিনই তাঁকে ভুলতে পারবেন না। গাইতে গাইতে ধুয়ায় ফিরে সমে এসে ছোট্ট রুগ্ন
শরীরটা ধনুকের ছিলার মতো ছিটকে উঠত।”

১৯৩৬-৩৭ সালে কবির পরিচয় হয় জনপ্রিয় কমিউনিস্ট নেতা নিত্যানন্দ চৌধুরীর সাথে। তিনিই কবিকে
পরিচিত করিয়েছিলেন সাম্যবাদী চিন্তার সঙ্গে। ১৯৩৯ সাল থেকেই কবি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য
ছিলেন। ১৯৪৮-৫১ সালে যখন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি
(CPI) নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল তখন গণনাট্যের
শিল্পীরাও ক্রমশ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তিনি সম্ভবত মোট দুবার জেল খেটেছিলেন। তাঁর নিজের
কথায় তাঁর একটি যাত্রার নাটক লেখার পরে সেটা অভিনিত হবার পর দিনই কংগ্রেস সরকার তাঁকে জেলে
বন্দী করে। ছাড়া পান ১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে। সেই সময়ে তিনি আত্মগোপন ক’রে “সনাতন মণ্ডল”
ছদ্মনামে গান লিখতে থাকেন। এই সময়েই তাঁর “কলকাতার খবর” গানটি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।  
এরপর ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর মাসে , একটি মিছিল যখন বন্দীমুক্তির আওয়াজ তুলে মনুমেন্ট থেকে
প্রেসিডেন্সি জেলের দিকে যাচ্ছিল, তখন আচমকা পুলিশ মিছিলটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, বহু মানুষকে  
আহত ক’রে ১২৫ জন কে গ্রেপ্তার করে। কবি ছিলেন সেই আহত বন্দীদের মধ্যে। তাঁর মাথা ফেটে রক্ত
পড়ছিল। মতান্তরে সেবার নাকি তিনি জেলগেট ভাঙতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। ওই মিছিলে নাকি কবি মা
কুসুমকুমারী দেবীও ছিলেন।

১৯৫১ সালে গণনাট্যের কর্মী হিসাবে উত্তরবঙ্গের বহু জায়গায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। কোচবিহারে খাদ্যের
দাবিতে আন্দোলনের মিছিলের উপরে পুলিশ গুলি চালালে, স্কুল-ছাত্রী বন্দনা-কবিতা-বকুলের মৃত্যু হয়। সে
নিয়েও কবি গান রচনা করে ঘুরে ঘুরে গেয়েছেন। মৃত্যুর মাত্র একমাস আগেও, ১৯৬৮ সালের  নভেম্বর
মাসে, জলপাইগুড়ির ভয়াবহ বন্যার পর গান বেঁধে ত্রাণ সাহায্য তোলার জন্য, কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়
ঘুরেছেন।

পাঁচের দশকের শেষ থেকে ছয়ের দশক জুড়ে পার্টির ভিতর যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব এবং বিভাজনের প্রক্রিয়া
চলছিল, সেই সময়ে রচনা করেছিলেন “বাবারে ও বাবারে কোন দিকে বা যাই”!

তাঁর জীবন প্রবাহিত হয়েছে অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে। পাঁচের দশকের শেষদিকে নানা কারণে
গণনাট্য আন্দোলন তার সর্বব্যাপি প্রভাব হারায়। কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও অন্তর্দ্বন্দ্ব বাড়ছিলো।
বদরতলায় পার্টির নেতৃত্বে যারা ছিলেন তারা গুরুদাস পালকে তাঁর ন্যায্য গুরুত্ব দেন নি। সেখানে গণনাট্য
সংঘের পাশ কাটিয়ে তখন “প্রগতি সংঘ” তৈরী হয়ে গেছে। এই সব ঘটনার ফলে লোকসংস্কৃতির জগতে
গণনাট্য যে আশার সঞ্চার করেছিল, তা বিঘ্নিত হয়। হয়তো তাই, মৃত্যুর আগে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে
কিছুটা আশাভঙ্গের সুরেই বলেছিলেন . . .

“যে সকল প্রতিভাবান গণশিল্পী একেবারে শোষিত শ্রেণী থেকে এসেছিলেন, যাঁরা গণসংস্কৃতির সত্যিকারের বনিয়াদ, তাঁদেরো আমরা
ধরে রাখতে পারলাম না। বর্তমান সমজব্যবস্থার যাঁতাকলে কে কোথায় কীভাবে পীষ্ট হচ্চেন তার খবর রাখার আগ্রহও আমাদের
নেই। অন্ধ দোতারাবাদক টগর অধিকারী অভাবের জ্বালায় নাকি পাগল হয়ে গেছে। সহযোদ্ধা নিবারণ পণ্ডিত, বিখ্যাত গম্ভীরা গায়ক
বিশু পণ্ডিত, এঁরা---শোষক শ্রেণীর কৃপার দানকে ঘৃণাভরে বারে বারে প্রত্যাখান করেও  আদর্শের  পতাকা ঊর্ধ্বে ধরে রেখেছিলেন
জানি। কিন্তু তারপর ? তারপর আর জানি না। কে কার খবর রাখে ?”
 

আশাভঙ্গ সত্ত্বেও কবি সংগ্রাম ছাড়েন নি।


আমরা
মিলনসাগরে  এই কবির কবিতা ও গান তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে আমাদের
এই প্রচেষ্টাকে সার্থক মনে করবো। আগামী বছর কবির শতবর্ষ।  

কবি গুরুদাস পালের মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন

উত্সঃ  মালিনী ভট্টাচার্য এবং প্রদীপ্ত বাগচী, কবিয়াল গুরুদাস পাল,
.         প্রকাশক - লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ,
.         পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ২০০০ সাল   


আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রকাশ - ১৪.০৪.২০১২
...