অনুরাধা মহাপাত্রর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
১।  ন্মভূমি                   
২।  
রিত্রাণ                  
৩।  
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের নারীদের অভিশাপ        
৪।   
১৪ই মার্চ, নন্দীগ্রাম                
৫।   
কৃষিকন্যা         
৬।   
শোকাঞ্জলি            
*
জন্মভূমি     

"এই গ্রাম আমার জন্মভূমি
এ গ্রাম ছেড়ে যাবো কেন ?"
বলেছিলেন, করুণাশ্রয় দিঠিতে তাঁর
সোনাচূড়ার আনসারুণ |

এই কথাতেই শাহেনশা---
হ্যাঁ, এই কথাতেই, উজির সব
কাটলো পা, ছিঁড়লো ধড়
কাঁপলো পাতা, বৃক্ষশাখা, পাখির ধূন
খাম্বাজের মীড় যেন
ছুঁয়েই নদী, বরোজ, খামার
লাল হল তীব্রতা, ও' স্পন্দন
উজাড় গ্রাম, বেবাক খুন

আমি তো সেই প্রহরণের শেষ তড়িৎ
আমি তো সেই ভৃঙ্গারের শেষ সরিৎ
এবং
মায়ের বুকের আদি শোণিত
রে কাফের বলছি শোন
আমি তো সেই প্রত্যালীঢ় প্রলয়কালে
ফুটে ওঠা বজ্রনাদের নীলোত্পল
যে শুধু ফোটে আগুনে আর
যে শুধু জ্বলে মৃত্তিকায়
যে শুধু জানে মুক্তি আর
যে শুধু জানে প্রণয়বাস |

.                    ******************                                        
উপরে
.                                        অন্যান্য কবিদের সূচির পাতায় ফেরত  
.                                 
সিঙ্গুরের কবিতার মূল সুচির পাতায় ফেরত
             
*
[ একটি অনুরোধ - এই সাইট থেকে আপনার ব্ লগ্ বা সাইটে, আমাদের কোন লেখা, কবিতা বা তার
অংশবিশেষ নিলে, আমাদের মূল পাতা
http://www.milansagar.com/index.html এ দয়া করে একটি
ফিরতি লিঙ্ক দেবেন আপনার ব্ লগ্  বা সাইট থেকে, ধন্যবাদ ! ]
পরিত্রাণ     

ঘুঘু লাফ দেওয়া পরিখা
এ-পারে ওপারে মাটিতে রাখি, আমার পা
তোরা শয়তান! লাফ দিতে এই পরিখা
তোদের আজ ভয়!
তোরা না কুমীর জলে? আর
তোরা তো ডাঙায় বাঘ!
লাফ তো তোদের দিতেই হবে
এটাই জেনে রাখ |

ঘৃণা, লজ্জা, ভয়!
তোদের তাতো নেই |
নেই কোনো সম্মান |
গর্ভে ধারণ করার আগেই
তোদের মায়েরা যদি পেতেন
কোনোই পরিত্রাণ!

.                    ******************                                        
উপরে
.                                        অন্যান্য কবিদের সূচির পাতায় ফেরত  
.                                 
সিঙ্গুরের কবিতার মূল সুচির পাতায় ফেরত  
*
সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের নারীদের অভিশাপ

বাঁচতে দেয় নি                    ওরা আমাদের
বাঁচতে দিচ্ছে না
না-শুকোতে                           চোখের জল
আবার দ্বিগুণ শোক
কেড়ে নিচ্ছে                            ওরাইতো!
শিশুর মুখ
সকল মুখের                            একটু ভাত
একটু শাক
উঠোনভরা ধান              আর পুকুরভরা জল
কেড়ে নিচ্ছে
ওরাই তো!                              মানুষ নয়
এই পৃথিবীর,
ওরা কোনো                            প্রাণও নয়
কেড়ে নিচ্ছে ঘুম
ঐ সুদূরে                            মাঠের কোলে
একটি শান্তি শ্বাস

তাই                                       হে ধরিত্রী
শোনো এই আমাদের অভিশাপ
বেজন্মারা                           মরুক হিক্কায়
বেজন্মারা
মরুক                                       প্রলয়ে
বেজন্মারা
মরুক                                   রক্ত উঠে
কুলাঙ্গার
মরুক                                  বজ্রপাতে |

.                                                ******************                                           
উপরে
.                                                                         অন্যান্য কবিদের সূচির পাতায় ফেরত  
.                                                                  
সিঙ্গুরের কবিতার মূল সুচির পাতায় ফেরত
এই কবিতাগুলি ১৪ই মার্চ ২০০৭ এ নন্দীগ্রামের প্রথম গণহত্যার পর প্রকাশিত কবির
কাব্যগ্রন্থ "শোকাঞ্জলি" থেকে নেওয়া হয়েছে |
১৪ই মার্চ, নন্দীগ্রাম     

হাজার বছরে আদিম মাটির শিখেছিল ওরা পাঠ
সাগরের কাছে শিখেছিল ওরা মুক্তির অক্ষর
কোনো রাজনীতি ভোলাতে পারেনি, সে পাঠের ধারাস্রোত ;
"ফাঁসি হোক আজ যত শেঠদের | ও বিদেশী সরে যাক" |
আকাশের কাছে শিখেছিল পাঠ স্বাতন্ত্র্য শক্তির
শিখেছিল ওরা হৃদয়ের স্বর --- বৃষ্টিতে, বজ্রে ;
যে কোনো খরায়, কলমিলতায়, শিখেছিল প্রাণ সেচন |
এক হাঁড়ি জল, তিন মুঠো চাল --- শিখেছিল ওরা বাঁচতে
সজনে পাতায় রাখছিল এঁকে অশ্রুর ঘন খাম্বাজ
বটবৃক্ষের নীড় ছুঁয়ে তাই আকাল উঠতো বেজে |

ওরাই জানতো শিয়রে শমন, শিয়রচিতির ফণা ;
টুঁটি ধরে ছিঁড়ে না ফেললেই, ছোবল মারবে অচেনা
ওরাই জানতো ধানভানা আর ধানসিঁড়ি পেতে
ইঁদুরের কাছে সমস্ত ক্ষণ মরণ বাঁচন জানা
দুর্ভিক্ষের প্রকৃতি কখনো লাঞ্ছনা মানতো না
ওরাই জানতো সাপ-নেউলের যুদ্ধ কীভাবে হয়,
ভিটের ভেতর কোন্ ঘুঘু চড়ে, দোয়েল কী ভেবে কয় |
ওরাই জেনেছে মাকে কখনো জয় করা যায় না
ওরাই জেনেছে কন্দমূলের, ধানের শীষের, মানুষের কাছে
স্বাধীনতা, শুধু স্বাধীনতা ছাড়া ভিক্ষা অসম্ভব!

.                    ******************                                               
উপরে
.                                              অন্যান্য কবিদের সূচির পাতায় ফেরত  
.                                       
সিঙ্গুরের কবিতার মূল সুচির পাতায় ফেরত  
*
কৃষিকন্যা     

আনাজবেচা মেয়েটিকে ডাকি, মা বলে
মাছকাটা বঁটি হাতে নারীটিকে দেখি আমি প্রচণ্ডা রূপে
প্রতিটি কৃষিকন্যাকে দেখি নরসিংহী আদ্যাশক্তি রূপে
দেখিতো বটেই --- সত্য সব আলোর উদ্ভাস |
গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে দেখি, ছোটো লণ্ঠন ক্রমে
বড় হতে হতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ব্যাপী ফেটে পড়ে আলোকশিখায় |

তোমাদের হত্যাকাম, শিল্পায়ন এ-ভাবেই
ভ্রম মনে হয় |
কাস্তে হাতে উন্মাদিনী, ভাঙাবেড়ার জানুপাড়
অর্ধবসনাকে দেখি নবদূর্গা রূপে
শিশুহত্যার পরে ধর্ষিতা মায়ের মুখে চণ্ডিকার ঘৃণা
তীব্র জলতেষ্টায় মরা গুলিবিদ্ধ পুরুষের রক্ষায়
ধেয়ে আসে রুদ্রচণ্ডারূপে
আর দেখি অনন্ত আকাশ জুড়ে আলোয় আলোয়
তাঁকে বিশ্বরূপে --- শুধু আমি নয়
সমস্ত গ্রামবাসী তাঁকেই তো দেখে |
আর ছাতামাথায়, ভ্রাতুষ্পুত্র কাঁখে ঠাকুরমার
পিছু পিছু এ-গ্রাম ও-গ্রাম ঘুরি
"মহাভারতের গ্রাম" --- ঠাকুরমা বলেন---
প্রতিটি কৃষকরমণী তবে দ্রৌপদী ও গান্ধারীই বটে!

"যেদিকে সত্য, যেদিকে ধর্ম
                  সেদিকে জয়" |
শাককুড়ুনি শাকম্ভরীকে দেখি কঞ্চির
বেড়ার গায়ে --- শুকনো রক্তমাখা শাড়ি
শাক কই? অন্ন কই?
উন্মাদিনী ঘোরে গ্রামে গ্রামে মৌন হাহাকারে

এইসব নারী তবে সসাগরা অনন্ত মৃত্তিকা
মৃত্তিকা তবে আজ নবরূপে কৃষিসাধিকা
সূর্যাস্ত ফেটে পড়ে ; আকুল ক্রন্দন আর সমস্ত শরীরের বোবা চামড়া ছিঁড়ে
সমস্ত আছড়ে পড়ে রক্তক্ষরণে
শ্মশানসদৃশ গ্রাম, পথ-ঘাট, মাঠের প্রান্তর আর চাপা আর্ত নদীজল
সূর্যোদয় দেখছে না কিশোরীরা কোনো
এ-গ্রামে জন্মেছি, বলুন, এই গ্রাম ভুলে থাকা যায়!

.                    ******************                                                      
উপরে
.                                                     অন্যান্য কবিদের সূচির পাতায় ফেরত  
.                                              
সিঙ্গুরের কবিতার মূল সুচির পাতায় ফেরত  
*
শোকাঞ্জলি     

অনন্ত মাটির দেশ, হেলেঞ্চাশেকড়ের গ্রাম
ঘেঁটুফুল, কলমিলতা, আষাঢ় শ্রাবণ
সজনেফুল, সরপুঁটি, ধানের সুঘ্রাণ
এই গ্রামে নেমে এল, অকাল শ্মশান |

এখানে এখন কোনো শৈশব নেই
এখানে এখন কেনে শাপলাও নেই
রক্তে রক্তে স্নাত হল সরস্বতী, শ্রাবস্তীর স্নান
হলদি নদী তালপাটি খেয়া খুলে রক্তের বান |

এখানে মায়ের দুধে রক্ত মাখে কারা
এখানে বপন হয় শিশুদের চোখ
এখানে মাটির নিচে পোঁতা হয় মাথা
এখানে পরেন গৌরী রক্তমাখা শাড়ি
এখানে বিরামহীন হত্যা, ভাসান |

তোমাদের কাছে যাব, শুধু তোমাদের
কোথায় বাবুইয়ের মা, উঠে এসো তুমি
কোথায় আমিনা নানি, কোলে নাও তুমি
যেরকম নিতে বুকে শৈশবে মার কোল থেকে
যেরকম কপালের ক্ষতে দিতে থেঁতে দুর্বাঘাস |

কোথায় পাষাণী তুই? তোর সঙ্গে খেলবো এবার
কোথায় ভূষণজ্যাঠা? নৌকো খুলে দাও
কোথায় অশ্বিনীর মা, বাটাভরে পান আর ভালোবাসা
নাথবিবাহের গানে ঘুম এনে দাও |
কোথায় নিশিদা তুমি, মাটির ঘরের চালা
নতুন খড়ের রঙে, নন্দীগ্রাম বীরগাথা আবার শোনাও

কোথায় বিশাল তারা, অসীম ধানের সবুজ?
হলদি নদীর জলে মায়ের চোখের রঙে পূর্ণিমার চাঁদ?
কোথায় শ্রাবণজ্যোত্সনা? ভিজে যায় স্ফুট গন্ধরাজ?
অন্ধকারে কারা যেন অভিশাপ দেয় |
আজ স্বজনই ঘাতক আর স্বজনের শবের বাহক
যেদিক তাকাই মাটি, রক্ত উপচানো মাটি, প্রিয় নন্দীগ্রাম?

অন্ধকারকে আর অভিষাপ দেব না এখন
মাটির গভীরে, ও প্রদীপ, রয়েছে যখন
আকাশকে দেখি, শুধু মাটি
জল, সে-ও মাটির প্রণয়
কলসে অক্ষর দেখি, মাটির প্রত্যয় |

তোমাকে প্রণাম করি, রক্তমাখা মাটি
তোমাকে প্রণাম করি, হেলেঞ্চাশেকড়
তোমাকে প্রণাম করি, ও হলদি নদী
তোমাকে প্রণাম করি, ভাঙাবেড়া গ্রাম
তোমাকে প্রণাম করি, রক্তমাখা ধান

তোমাকে প্রণাম করি, ও তাপসী শ্যামা
তোমাকে প্রণাম করি, গৌরী বীরাঙ্গনা
তোমাকে প্রণাম করি, স্তনছেঁড়া শিশুবুকে সোনাচূড়া গ্রাম
তোমাকে প্রণাম করি, কাস্তে হাতে, আমিনা ও অশ্বিনীর মা

অন্ধকার রূপকথা বলবে এখন |
এখনই কি ফেটে পড়বে, চৌচির লণ্ঠন?
অন্ধকার প্রতীককে ভাঙবে এখন |
এখন তো শ্মশানেই ভোর হবে!
আলো আজ প্রাণময় পট হবে, মাটির গড়ন |

.                    ******************                                          
উপরে
.                                          অন্যান্য কবিদের সূচির পাতায় ফেরত  
.                                   
সিঙ্গুরের কবিতার মূল সুচির পাতায় ফেরত  
*