কবি লক্ষ্মীমণি দেবী -  সম্বন্ধে আমাদের কাছে যা তথ্য আছে তা অত্যন্তই অপ্রতুল। তবুও সেই
তথ্যগুলি এইরকম . . .

কলিকাতা বামাবোধিনী সভা হতে প্রকাশিত, বামাবোধিনী পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায়, তাঁর অনেকগুলি রচনা
প্রকাশিত হয়েছিল। পরে, ১৮৭২ সালে ঐ সভা থেকে প্রকাশিত হয় বামারচনাবলী। এই সংকলনে ছিল
বামাবোধিনী পত্রিকার পূর্ব প্রকাশিত, বামাদের রচিত গদ্য ও পদ্য সংগ্রহ। এই সংকলনে যে সকল মহিলারা
লিখেছিলেন, তাঁরা যে সকলেই আসলে মহিলা এবং ছদ্মনামে কোনো পুরুষ নন, একথা সংকলনের ভূমিকায়
দেওয়া আছে। তাঁরা তা যাঁচাই করে তবেই লেখা ছাপিয়েছিলেন। সেকথা স্পষ্টভাবে তাঁরা জানিয়েছিলেন।

বামারচনাবলীতে লক্ষীমণি দেবী রচিত গদ্য-পদ্য মিলিয়ে যে রচনাগুলি পাওয়া গিয়েছে তা মূলত তত্কালীন
নারীসমাজের প্রতি কিছু উপদেশ। যেমন কেন নারীদের শিক্ষালাভ করা উচিত, কেন নারীদের  প্রিয়ভাষন
করা উচিত, পরাধীনতার কি কষ্ট ইত্যাদি।

এছাড়া পাওয়া গেছে পদ্যে তাঁর একটি ভ্রমণকাহিনী। কবিতাটির নাম “বিদেশ ভ্রমণ”। যদিও তিনি খুব
সন্তর্পণে নাম ধাম এড়িয়ে গেছেন, তবু তা থেকে আমরা তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে অল্প হলেও একটি
ধারনা করে নিতে পারি। যেমন . . .

১। লক্ষ্মীমণি দেবীর জন্ম তাঁর কবিতা প্রকাশের (১৮৭২) এর অন্তত ২০ থেকে ৩০ বছর আগে হয়েছিল ধরে
নেওয়া যেতে পারে। উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি।

২। তিনি অতি শিক্ষিত একটি পরিবারের সদস্যা ছিলেন, যেখানে সেই যুগেও নারীদের শিক্ষার চল ছিল।

৩। তাঁর রচনাকালে রবীন্দ্রনাথের মহীরুহ আকারে আবির্ভাব হয় নি। তাঁর রচনাশৈলীতে  যে রবীন্দ্রনাথের
প্রভাব নেই তা বলাইবাহুল্য।

৪। তিনি অবস্থাপন্ন বাড়ীর মহিলা ছিলেন। কারণ সেই সময়ে যথেষ্ট বিত্তশালী না হলে কারো পক্ষে দীর্ঘ
ভ্রমণ সহ তীর্থে ঘোরা সম্ভব ছিল না। তিনি তাঁর বর্ণনায় জানিয়েছেন যে সেবার তাঁরা রেলযোগে যাত্রা শুরু
করে,  কাশী – এলাহাবাদের কুম্ভমেলা – আগরা – মথুরা – বৃন্দাবন – কানপুর প্রভৃতি জায়গা ভ্রমণ
করেছিলেন।

৫। লক্ষ্মীমণি দেবী প্রখর ব্যক্তিত্বের মহিলা ছিলেন। তিনি দেবতা ছাড়া মানুষকে নত হয়ে প্রণাম করতে
চাইতেন না। তার জন্য তাঁকে নানা কটুবাক্যও শুনতে হয়েছে।

৬। তিনি এই যাত্রা করেছিলেন তাঁর কিছু “সঙ্গিণীদের” সঙ্গে। তাঁর স্বামী বা পরিবারের কোনো উল্লেখ এই
কবিতায় আমরা পাই না। তবে কুম্ভে গিয়ে মাথা মুণ্ডনের কথা যখন উঠেছিল, তখন প্রশ্ন উঠছে তিনি কি
সেই সময়ে বিধবা ছিলেন ? এমন তো নয় যে তিনি অবিবাহিত ছিলেন ? কিন্তু তাঁর অন্যান্য সঙ্গিণীদের
মতো মুণ্ডন করাতে রাজি হন নি। যার জন্যও তাঁকে গঞ্জনা সইতে হয়। কিন্তু দক্ষিণভারতে  তিরুপতি
মন্দিরে দেখা গেছে অবিবাহিতা, সধবা, বিধবা সবাই মাথা মুণ্ডন করেন। উত্তরভারতে, এলাহাবাদের কুম্ভে,
হিন্দু সধবা ও অবিবাহিতাদেও মাথা মুণ্ডন প্রথা চালু ছিল কিনা তা আমরা জানিনা। কোনো পাঠক যদি
আমাদের এ বিষয়ে আলোকপাত করেন তো খুব ভাল হয়।

বামারচনাবলীতে অন্যান্য লেখিকা ও কবির, যেমন
স্বর্ণলতা বসু,  রমাসুন্দরী দেবী, ক্ষীরদা মিত্র, কুমারী
রাধারাণী লাহিড়ী, যোগমায়া দেবী, মধুমতি গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রীমতী অ মো বসু, শ্রী ভাবিনী দেবী, বিন্ধ্যবাসিনী
দেবী, জগদ্দল বাসিনী, শ্রীমতী জয়কালী, কামিনী দেবী, রঘুমণি দেবী, শ্রীরামমতি, স্বর্ণপ্রভা বসু, শ্রীমতী
উপেন্দ্রমোহিনী সহ বহু অনামা নারী কবি প্রমুখাদের রচিত গদ্য-পদ্য মিলিয়ে যে রচনাগুলি পাওয়া গিয়েছে
তা মূলত তত্কালীন নারীসমাজের প্রতি কিছু উপদেশ ও আধ্যাত্মিক সহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে পদ্য ও গদ্যের
মাধ্যমে আলাপচারিতা।

লক্ষ্মিমণি দেবীর রচনা আর কোনো পত্রিকায় ছাপানো হয়েছিল কিনা আমরা জানিনা। তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ
প্রকাশিত হয়ছিল এমন কথাও আমরা শুনিনি। কিন্ত যা পেলাম তাও আমরা মনে করছি আগামী প্রজন্মের
কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরী। এই অতি আধুনিক মনস্কা, তাঁর যুগের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা নারী,
এমন সময় কলম ধরেছিলেন যখন এ দেশে নারীদের শিক্ষার অধিকারই প্রতিষ্ঠিত হয় নি। তিনি তাঁর গদ্য ও
পদ্যের মধ্যদিয়ে নারীজাতিকে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন শিক্ষা লাভ করতে।

আমরা
মিলনসাগরে  কবি লক্ষ্মীমণি দেবীর কবিতা তুলে আগামী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিতে পারলে
আমাদের এই প্রচেষ্টা সার্থক মনে করবো।

কবি লক্ষ্মীমণি দেবীর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন


উত্স - বামারচনাবলী, প্রথম ভাগ, ১১ মাঘ ১৩৭৮ (১৮৭২)

আমাদের ই-মেল -
srimilansengupta@yahoo.co.in     


এই পাতা প্রকাশ - ২৯.০৪.২০১৩
...