কবি নিরুপমা দেবীর কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।  www.milansagar.com
*
প্রেমের স্বরূপ
কবি নিরুপমা দেবী


তোমার করে মোর কেমন প্রেম
জানিতে চাহ বঁধু কেন ?
পাষাণ খনি তলে গোপন হেম
পাষাণ হ’য়ে আছে যেন!

বাহিরে কোন রূপ প্রকাশ নাই
হৃদয় ভ’রে উঠে রূপেতে তাই,
গভীর কালো মেঘে          গভীর থাকে জেগে
গোপন সুধাবারি হেন!
তোমার তরে মোর কেমন প্রেম
জানিতে চাহ বঁধু কেন ?

আপন মাঝে আছে আপন সুধা
আপনি ভরে আছে সুখে
হৃদয়ে নাই এর বিষম ক্ষুধা
অনল নাই এর বুকে!

আকাশ থেকে দেখো আপনি ভরা
শূণ্য যাহা কিছু পূর্ণ করা,
আপন নীলিমায়          ঢালিয়া দিয়া যায়
ব্যাকুল ধরা অভিমুখে,
আপন মাঝে আছে আপন সুধা
আপনি ভরে আছে সুখে!

যে প্রেম আছে বঁধু তোমার তরে
সবারি আছে তাহে ভাগ,
সবারে দিয়ে সুখ জীবন পরে
পূরিবে এই মহাযাগ!

নির্ঝর ধারা দেখো আপন দানে
বাঁচায় তৃষাতুর নিখিল প্রাণে,
সবারে ভালবেসে          তবে তো পায় শেষে
সাগরে দিতে অনুরাগ,
যে প্রেম আছে বঁধু তোমার তরে
সবারি আছে তাহে ভাগ।

.        ***************  
.                                                                                                 
সূচি . . .    


মিলনসাগর
*
যৌবন প্রয়াণ
কবি নিরুপমা দেবী

আমার জীবন বন-গহনের তলে
.        ক্ষণেক দাঁড়াও মন্ত্রবলে
ওগো মোর যৌবনের পরিপূর্ণ প্রাণ,
.        কণ্ঠে নিয়ে গান,
বক্ষে নিয়ে মিলনের আশা
---ফুলময় বসন্তের মুগ্ধ ভালবাসা!
চোখে দাও প্রণয়ের হাসির কাজল,
.        রূপ দাও ঢল ঢল্
.        সর্ব্ব তনু ভরি,
মধুভরা ফুটাইয়া সহস্রমঞ্জরী ;
কেশে দাও আকূলতা অধরে লালিমা
.        প্রাণে দাও প্রেম-মাধুরিমা,
.        বুকে দাও গানে-ভোলা-মন
আমার জীবনতলে ক্ষণেক দাঁড়াও মোর হে শেষ-যৌবন!

.        ঐ সন্ধ্যা নেমে আসে
পশ্চিম গগন তলে পবনের নিশ্বাসে প্রশ্বাসে,
ঐ মুদে আসে ধীরে আলোর কমল
ঐ ছায়া সুনিবিড় শান্ত বনতল
.        ঝিল্লি মুখরিত
ঐ শেষ বিহঙ্গম সঙ্গীহারা ভীত
উড়ে যায় পশ্চিমের দূর অস্ত পারে
.        ঐ বনানীর ধারে
আঁধার ঘনায় ঘন স্নিগ্ধ ফুলবাসে
.        ---সন্ধ্যা নেমে আসে।

.        সুলগন মধুময়
এই বুঝি এল মোর বঁধুয়ার আসার সময়!
.        যদি এসে দেখে বঁধু
অঙ্গে অঙ্গ নাই মোর বসন্তের মধু---
চোখে নাই সে চাহনি মধু মাদকতা
দেহে মনে নাই আর মিলনের সে অসহ পুলকের ব্যথা ;

.        সেই কেশ সেই বেশ
.        প্রাণে সেই প্রেমের আবেশ
গানে গানে কলকথা উচ্ছ্বসিত আলিঙ্গন,
নেই সেই চোখে চোখে সুরে সুরে প্রিয়-সম্ভাষণ ;
.        যদি দেখে নব স্ফুট ফুল্ল ফুলহার
ঝরা দলে ছেঁড়া ফুল ধূলিলীন সূত্রটুকু সার ;
.        বল বল তবে
.        সে মোর কেমনতর হব ?

.        আহা তুমি থাকো থাকো
.        এ মিনতি রাখো
.        যতক্ষণ বঁধু নাহি আসে
.        আমার বুকের পাশে
বাজাও বাজাও তব প্রেমতন্ত্রী বীণ্
মিলন লগন মোর নাহি যেন কাটে সুরহীন!
.        নিভিতে দিওনা রূপবাতি
.        অন্তরের শেষ ভাতি
থামিতে দিও না গান শুধু ততক্ষণ!
আমার জীবন তলে ক্ষণেক দাঁড়ায়ে যাও হে শেষ-যৌবন!

.              ***************  
.                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
ঋতু-সম্ভার
কবি নিরুপমা দেবী

যে দিন আমারে বাঁধ তব বাহু পাশে
বুকে এসে লাগে তব বুকের স্পন্দন,
সুদীর্ঘ সঘন তব গভীর নিঃশ্বাসে
কপালে লেপিয়া যায় মধুর চন্দন।
কোমল ও-হৃদয়ের গাঢ় আলিঙ্গনে
আমার হৃদয়েউঠে রক্তের তুফান,
অধীরতা জেগে উঠে চঞ্চল পবনে
বিস্ময়ে আকাশ চাহে সুনীল-নয়ান।
কখন মুদিয়া আসে নয়ন পল্লব
কখন এ তনু হয় আবেশে বিহ্বল,
তোমার হৃদয়-তটে হৃদয়বল্লভ,
মূরছিয়া পড়ে মোর রক্ত-শতদল।
চুম্বনে আঁকিয়া দাও তপ্ত অনুরাগ
আমি জানি সেই মোর প্রাণের নিদাঘ।

.           ***************  
.                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
হোরী খেলা
কবি নিরুপমা দেবী
২/১ সাউথ রোড্, এলাহাবাদ থেকে শ্রী অনাথনাথ ঘোষ দ্বারা প্রকাশিত, প্রবাসী পত্রিকা,
চৈত্র ১৩১৪ বঙ্গাব্দ (১৯১০)।

ভাল লুকাইয়া বসি, হে লীলাচতুর,
খেল আজ হোরী খেলা! শ্যামা দিগ্বধুর
সুনীল অঞ্চল খানি ফাগে লালে লাল।
রক্ত কিশলয় শোভী শৃঙ্গক বিশাল
উন্নত, সে উত্স মুখে হ’তেছে বর্ষিত
ফল্গু চ্যুতাঙ্কুর চূর্ণ, করিয়া ব্যথিত
ধরণীর পাণ্ডু গণ্ড। আচ্ছন্ন আবিরে
অশোক কিংশুক তরু। মদমত্ত ফিরে
চঞ্চল দক্ষিণা বায়ু “হোরী হ্যায়” রবে,
উড়ায়ে বাসন্তী বাস। শ্রান্ত অলি সবে
গুঞ্জরে সখেদে কারে খুঁজি বৃথা বনে।
হেরে শুধু ফল্গু চিহ্ন ; দিগঙ্গণা গণে
“চোখ্ গেল” “চোখ্ গেল” করি “উহু” “উহু”
কুঙ্কুম আঘাতে কার কাঁদে মুহু মুহু।

.           ***************  
.                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
বৈশাখ ও জৈষ্ঠ
কবি নিরুপমা দেবী
ভারতী পত্রিকা, জৈষ্ঠ ১৩১৮ সংখ্যা (মে ১৯১১) থেকে পাওয়া।



.           ***************  
.                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
আষাঢ়ে
কবি নিরুপমা দেবী
ভারতী পত্রিকা, আষাঢ় ১৩১৮ সংখ্যা (জুন ১৯১১) থেকে পাওয়া।

নবীন ধূমল মেঘে মেদুর অম্বর।
গিরি কটিদেশ বেড়ি গর্জ্জি গুরু গুরু
নিয়ে তপোবনশির ছায় ঘনতর
আশ্রম পালিত মৃগ কাঁপে দুরু দুরু।
যজ্ঞ সাধে ত্রস্তে ঋষি পশিছে কুটীরে
হোমধূম মিশে যায় নীরদের গায়
চঞ্চল বলাকা মালা শোভে অদ্রি শিরে,
হোমধেনু সচকিতে আস্রমেতে ধায়।
রুক্ষ্ম কেশ সনে উড়ে বল্কল অঞ্চল
প্রত্যসন্ন মেঘগাত্রে রাখি নেত্র দুটি
অঙ্কেতে আশ্রিত মৃগ শাবক চঞ্চল
রুদ্রাক্ষ বলয় পড়ে শ্লথ হয়ে টুটি
মণিবন্ধ হ’তে, তপঃক্ষীণ তনুলতা
শুনে মেঘমন্দ্রে আজি আশায় বারতা।

.           ***************  
.                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
প্রাবৃট ও শরৎ
কবি নিরুপমা দেবী
ভারতী পত্রিকা, ভাদ্র ১৩১৮ সংখ্যা (অগাস্ট ১৯১১) থেকে পাওয়া।



.           ***************  
.                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*
শিবরাত্রি
কবি নিরুপমা দেবী
ভারতী পত্রিকা, চৈত্র ১৩১৮ সংখ্যা (মার্চ ১৯১২) থেকে পাওয়া।

জীবন অরণ্যে মন লুব্ধকের বেশে
ছিল মত্ত মৃগয়ায়, এবং লব্ধ ভার
স্কন্ধে সুদুর্বহ সম, দুঃখ নিশা এসে
তৃষ্ণা রক্ত যুগ্ম চক্ষে ঢালে অন্ধকার।
আশ্রয় সংসার তরু আঁকড়ি দুহাতে
ধরি আছে ভীত মনা, আর্ত্ত বিকম্পিত,
ব্যথিত নয়ন হ’তে শুষ্ক পত্র সাথে
মুহু মোহ অশ্রু ধারা হয় বিগলিত।
সে কণ্টকী বৃক্ষতলে ওগো মহেশ্বর!---
তুমি যে জাগিয়া আছ জানে না অজ্ঞান!
সে শুষ্ক পল্লব দল সে অশ্রু নির্ঝর
তোমার পূজার আজ শ্রেষ্ঠ উপাদান!
শুভা এই রাত যাহে শোক মোহ তার
পূজ রূপে পরশেছে চরণ তোমার!

.           ***************  
.                                                                           
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর