শর্মিষ্ঠা সেনের কবিতা
*.
দয়া ও ঝরা পাতা


যা দিলে তা পাবার কথা ছিলই না কখনো,
অযোগ্যতায় "অতিরিক্ত" মানুষকে তা দেওয়া
মানুষ তো নয়, হাড় মাংসের পুরনো অভ্যাস
"জীবনযাপন" বৃহৎ-কথা, দিন কাটানো তবু
একরকমের ক্লেদ-গ্লানি-ক্ষয়, দাম কি দেবে তার ?
মুণ্ডহীনের মাথায় ব্যথা পোড়ানো সম্মান
"সম্মান" না আত্ম-আদর নিজেই খুঁজে মরি
ভালবাসা প্রেম না ঘৃণা, দেহ না সৌরভ
পালিয়ে-যাওয়া জীবন নাকি জীবনে পা রাখা
দয়া তোমার নির্দয়তার বিরাট গোলকধাঁধা |


আলো-আকাশ, রাত তারার
সীমাহীন সুখ দিন কাবার
পুরনো পাতারা আজ ফেরার
বৃষ্টি ঝাপ্সা দূর-পাহাড়
সোনালী স্বপ্ন স্বর্গদ্বার
যা-ছিল পিছনে, চাই না আর
সামাহীন সুখ দাও আবার
তৃপ্তি বৃষ্টি মুষল ধার !

.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
মৃত্যু থেকে

অসম্ভব শব্দ  ক'রে বোমা ফাটে
বোমা নয়, শান্তি বুঝি ওই---
চেতনা থেকে বর্তমান খ'সে যায়
বর্তমান থেকে স্মৃতি-
অতীতের সুখী মুখ সব |
অতীত আর বর্তমান, চেনা আর অ-চেনার মাঝে
নিরালম্ব ঝুলে থাকি আমি ;
ত্রিশঙ্কুর অবস্থায় দেখি
যুবকের অন্ধ চোখ ম্লান,
তারি 'পরে মৃত্যুনীল ছায়া যেন কার ---
দুহাতে মৃত্যুর পুঁজি-ঠোঁটে মৃত্যু দোলে,
অতীত না, স্মৃতি না, চেতনাও নেই---
তবুও হাঁটে সে দেখি থসে পড়া পায়ে
তবুও হাঁটছে সে যে স্বপ্ন সেতু গ'ড়ে ---
জীবনের অপর-পারে ও বুঝি যাবে
তুবড়ির রঙীন ফুল ফোটা মরুদ্যানে |  

.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
যন্ত্রণা

অনিঃশেষ চোরা স্রোতে কেবলই ডুবন্ত বাড়িঘর |
সঁপে দিয়ে দুঃখ-সুখ
দিন, রাত্রি, কামনা অবাধ
একমাত্র সর্বনামে ; মধ্যম পুরুষ
একক বচনে কাঁপে সহস্র মনন
অথচ বিক্ষোভ দংশে উদ্যত সাপিনী |

সিংহাসনে মোহ নেই শপথ তোমার
[ যদিও তুমিও পলাতক ---
শ্রদ্ধা, প্রেম, ভালবাসা,
স্নেহ, বত্সলতা --- সকলি "একদা"--- ]
তবু এখনো ভরসা
অতীত অসৎ নয় ---
পুরাতন ছুঁয়ে থাকা নীলাভ বেদনা !

তাহলে বিক্ষোভ কেন স্রোতমুখগামী ?
চোরা-স্রোত কেন টানে
বিলোল পাতালে ?
সঁপে দেওয়া দুঃখ-সুখ দিন-রাত্রি তবে
লুপ্ত একাকার কেন অথৈ-ঘূর্ণিতে ?

ঘূর্ণা-স্রোতে বিশ্লেষিত হিমরাত্রি জাগে |
রাত্রি চায় ধ্রুবকথা
প্রবাদের মতো ;
রাত্রি রাখে অকৃত্রিম সৃজনেরও দাবি ---
অমোঘ যদিও তার ঝঞ্ঝার আবহ
জানি সুখ তনীয়ান ক্রম-চোরা-জলে ;
সৃজনে তবুও দুঃখ অমৃতের মতো
জনয়িত্রী তৃপ্তমুখ যন্ত্রণাসায়রে ||  

.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
প্রথমোক্ত

    || ১ ||
চন্দনের এক বৃক্ষ ছিল তাহার দেহে
জানতে না তাও সুরভিতে মগ্ন হলে
ছুঁতেই পাতা ভুলভুলাই-তে পথ হারালে
দেহ-মনের সুদূর পারে কূল দ্যাখো না
ভাসলে জখন ঝর্না হ'লতাহার প্রাণ-ও
চম্ কে  চেয়ে তোমার চোখে নিবেদিত
লাস্য তাহার হাস্যমতী কান্না তুমি
তার বেণীতে জড়িয়ে দিলে হাজার ব্যথা
আপনাকে সে ভীষণ খেলায় মাতিয়ে দিল ...
আতসবাজি ছড়িয়ে গেল আকাশ-হৃদে ...
চিতায় নাচে আত্মহারা চিত্ত তাহার
তুমিই প্রথম ! তুমিই তাকে আগুন দিলে ||


     || ২ ||
লেলিহান হল শান্ত সে দীপ একদিন ছিল,
চৌকাঠ মেয়ে গন্ গনে  পায়ে তখন ডিঙালো
জ্বলজ্বলে চিতা নদীও তখন ছুঁতে ভয় বাসে
আগুন জ্বেলেছে বাতাসে আকাশ স্ফুলিঙ্গ ধরে
অস্তি-পোড়ানো রাত্রি এসেছে কী উত্সাহেতে
চন্দন-বায়ে অগুরু-বাষ্পে চরাচর ভরে
তোমার আগুনে গর্ভিনী-মেয়ে অগ্নি-গর্ভে
গর্বিনী হবে ||


    || ৩ ||
দুর্বলতা ছিলই তাহার মুক্তকেশে
কান্না ছিল লুকিয়ে এমন বজ্রবেশে
জানতে তুমি ; --- জানতে ব'লেই প্রবল আবেগ
জড়িয়ে নিলে তোমার হাতের এসরাজে আর
ঝন্ ঝনাঝন্ বাজল তখন হাজার সুরে
মনটি তাহার ময়ূর হ'ল পেখম তুলে
সাতরঙা সেই সূর্যসাক্ষী দ্বিপ্রহরে
তীব্র রোদের চুম্বনে সে আপন-হারা
ঢেউ তোলে আর ছন্দে নাচে পাগলা-ঝোরা

পাগলী আমার, পাগল হাওয়ার মুক্তো-দিনে
সুখ দোলে কি মলিন বুকে ময়ূরকণ্ঠী
রঙীন সূতোয় তুষার-শুভ্র কন্থাখানি
ভরিয়ে তোলো করুণ-ফুলে অমোঘ প্রেমে ...
পাথরে যে ফুল ফোটে না নবীন কিশোর
আঘাত লেগে প্রস্তরী-সুখ বহুলদীর্ণ ...

মর্মে হাসে বিদ্ধ-বিহগ কী অনায়াস
তোমার প্রেমে তীব্র দহন মুক্তকেশী
কান্না লুকায় বরফ-কঠিন কৃষ্ণ-রাতে
লোকসমুখে হাঁটছে দ্যাখো হৃতবজ্রা
তুমিই প্রথম --- তুমিই তাকে লজ্জা দিলে ||  

.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
অকালে

আমি তখন অস্তাচলের দিকে,
পায়ে পায়ে ভাঙছি স্মৃতিপথ,
গড়ছি ভেঙে দীর্ঘ ছায়াটিকে
অবশ হাতে ; নিদ্রাবিহীন রাত |

হঠাৎ তুমি দুয়ারে দিলে নাড়া
হৃদয় ব্যাকুল --- "এ কী গো বিস্ময় !"
তোমার বুকে আকাশ কেঁদে সারা,
মৃত্যু কাঁপে চারটি চোখের তারায় |

বন্ধ দুয়ার খুলেই দেখি আলো
মেঘলা আকাশ ঢাকতে পারে নি তো !
তোমার আঙ্গুল ছুঁয়েই কেন বল
প্রবীণা-স্মৃতি ভাঙলো অবিরত ?

.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
বিজ্ঞাপন

আমরা প্রতিনিয়ত একে অপরকে দেখিয়ে দিতে চাই
আলোর ঝলকানি, নব্য-ইলেকট্রিক্যাল গ্যাজেট,
বাথরুমের টাইল, ফরাসী ফার্নিচারের লেটেস্ট মডেল,
আধুনিকতম ল্যাপটপ, জাপানি গাড়ির কারিকুরি |
--- আসলে বিজ্ঞাপনটাই বড় কথা |
বিজ্ঞাপনটা জানিয়ে দেয় :
বড় ভাল আছি |
বড় সুখে আছি এ তিন-ভূবনে |
বিজ্ঞাপনটাই বলে, সুখ কিনবে ? --- এসো হাঁ মুখ খুলেছি
আর আমরা ক্রমশ পিচ্ছিল হই ---
ভিনিসিও কাঁচের পাত্রে সোনালী বিকেল ঢালি ;
এ-ওর কাঁধে মাথা রাখতে গিয়ে দেখি
আটকে গেছে পা ; আর মাটি নাচছে তাথৈ, তাথৈ...
আমরা আরো বড় রঙীন উল্লাসে খুঁজি নতুন বিজ্ঞাপন
ডিজাইনার পোশাক-এ শরীর খুলি
ক্রিস্টালে মুড়ে ফেলি প্যালেসিও বাড়ি
পার্শি জাজিমে অতি যত্ম করে জুতো রাখি
আমাদের সুখের বিজ্ঞাপন হ্যান্ডনোট বিলি করে ---
শরীর নেবে ? সঙ্গে মনও ?

বিলিতি এশট্রে তে আমাদের ছেলেবেলা পুড়ছে |


.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
১৯শে সেপ্টেম্বর ২০০৭

ছোট ছোট বিষফুলে ভরে উঠেছে আকাশ, পাহাড়,
.                           গাছপালা
আজ সন্ধ্যার ভিজে অন্ধকার
ঝিঁ ঝি পোকার গানে বিষাক্ত সুর
আচ্ছন্ন করছে রাত্রির নৈঃশব্দ-কে |

নদী-মানুষ, তুই বড় একা !
কী হবে আলোর কান্না কেঁদে ?
তোর তো কূল মানেই স্রোত
তোর, তো নিঃসীম
.             বিপদ সংকুলতা !

বরং ঘূর্ণি তোল তোর বুকের ভিতরে
.             ঘাসফুল-রং
কিছু বিষের ঘূর্ণি |
আকাশ তোকে নীলাক্ত-বিষ ধার দেবে,
পাহাড় দেবে দুর্গমতার অভ্যাস ;
গাছেরা ঝড় তুলুক তোকে দিতে আসন্ন সন্ধ্যায়
.             বিষাক্ত ফিস্ ফিস্,
কথা-কাটাকাটি ঝগড়া |
নদী-মানুষ, ঘূর্ণি তোল তোর স্রোতে,
তোর বুকের বিষাক্ত তিমিরে
.             ঝাঁপ দিক যত
.             অপদেবতার দল |


.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
ও বুড়ো তোর ঘর কই?

ছাদের কর্নিশে এক বুড়ো চিল ---
ইতস্ততঃ একা ঘাড় তুলে, ঘাড় গুঁজে
তাপ নেয় শিতের রোদের |
বয়স্ক পালকে রং খয়েরের গোলা ---
রোদের ডানায় তার ঝিম
ঝিম ধরে চোখের পাতায় ;
আলস্য ঝরিয়ে রাখে
বন্ধুরা উড়ে গেলে আনন্দ-শাখায় |
হে চিল! হে বুড়ো চিল!
একদিন উড়েছিলে কতদিন আগে?
ডানায় সোনালি আশা
মসৃণতা ছিল ;
দীপ্ত চোখে বর্শা :
ছিল তীক্ষ্ণ হিংসা-বিষ!
ছিল শিকার ছিনিয়ে নেওয়া ধারালো আশ্লেষ |
সবই কি ভুলেছ আজ বৃদ্ধ শীতে এসে?
ছাদের কার্নিশ আঁকড়ে
আশ্রয় কি খোঁজো?
আশ্রয় কি পাবে আর
পিছলে পা রেখে?
বুড়ো চিল, ঝিমোও এখন |
তাপ নাও শীতের, রোদের |


.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
নেমে যাব পাতালে যদিও     

হে সন্ন্যাসী, তাপস কঠোর,
কোন্ দুরাশার জালে ভাসাও তোমার ভেলা?
মর্ত্যের দীপশূণ্য, রবশূণ্য, জনশূণ্য কোণে
কার লাগি করিছ যাচ্ঞা হোমবহ্নি জ্বালি?
হে নির্মম প্রাণ যতি,
তুমি কি মানুষ নও? মানুষীর স্নেহ, প্রেম
ভালবাসাবাসি
তোমার পায়ের প্রান্তে
লুটিয়ে রয়েছে যত ছেড়ে ফেলা বসনের মত |
আত্মশ্রাদ্ধ-শুদ্ধাচারী তপোমগ্ন তুমি
অকরুণ!

আমার জীবন হে মহাপ্রাণ,
সন্ধ্যা নামে ক্লান্ত যোদ্ধার কপালে স্নেহস্পর্শ হেন ;
দিনমান গত হলে স্মৃতিকে প্রদীপ জ্বালি
দেবতার আরাধনা করি |
নৈবেদ্য সাজাই :
ক্লান্ত স্বর, যুযুধান প্রাণ, ব্যথার্ত হৃদয়,
যত প্রেম, অপবিত্র যত কানাকানি
গ্লানির কালিমা, বহুধাদীর্ণ সত্তা,
ঈর্ষা, অবিশ্বাস ---
কামনার শিহরণ, বিকীর্ণ মিতালি
আর
আত্মার ভ্রুকুটি ---
যতদূর দেখা যায় ---
ষোড়শোপচারে
সাজাই নৈবেদ্য তাঁর
থরে থরে থরে...
আমি সেথা একা নই ;
কোলাহলে, কূজনে, কলতানে
আছে নানা স্বর মিশে
বহু মানুষের গীতি বাজে |

তাপস পথিক,
তোমার করুণা জানি সান্ত্বনার মত
আমার গুঞ্জন গানে স্পর্শ দিয়ে জানাবে :
ভাল থাকো |
আমার কল্লোলজল-নৈরাশ্য অপ্রেমে
আশিস জানাবে তুমি
তপঃ কর ছুঁয়ে :
কল্যাণ হোক ; ঈশ্বরকে ধ'রে রেখো
জীবনের পথে |

শুধুই কল্যাণ প্রভু? শুধু আশীর্বাদ?
তোমার ওষ্ঠে শুধু কৃতঘ্ন আশিস?
নিদাঘ দুপুর, কান্না, কোলাহল,
শ্রেণীকক্ষ, ভালবাসা, ব্যাকুল মিলন,
আমায় দিলে না ব'লে এক ফোঁটা মুক্তো অভিমান
সেই তীব্র অপ্রাপ্তির ব্যথা
সেই সুনিবিড় সুখ
পুঞ্জ রক্তপল
সবকিছু মুছে দেব?
অপ্রেম? যন্ত্রণা?
সাদা লেখা, ঝলমলে লেখা ---
ভিজে হাতে সব মুছে পরম করুণাময় ঈশ্বরের আরাধনায়
লেখা হবে --- "ওঁ"!
আমার আকুল আত্মা, বিক্ষিপ্ত চেতন
শান্তি পাবে ; জপ করবে : ওঁ! ওঁ! ওঁ?
তোমার আশিস ভরা গৈরিক উত্তরী
সরাও যতীশ! বড় বিষন্ন বিকেল!
বড় দীর্ঘ-রাত এই বিজন, বিফল!
আমার অসহ্য হ'ল
করুণা তোমার |
আমি তো মানুষ!
নেমে যাব --- পাতালে যদিও
তবু পৃথিবীর পথে প্রেম, ঘৃণা, ব্যথায়, আঘাতে
মানুষের হাতে হাত রেখে
রক্তঋণ মানুষের মেটাতে মেটাতে
পিতার, মায়ের, বোন, বন্ধু ও শত্রুরও বটে!
আমি ভুলিনি এখনও তাকে
যে আমাকে অপ্রেমে টেনেছে |


.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    
*.
শ্রীতমা     

বেকায়দায় হাত পড়েছিল রুদ্রবীণার তারে
তাতেই খান্-খান্ হয়ে ভেঙে পড়ল সুর
ছড়িয়ে পড়ল ঘর
পেরিয়ে উঠোন --- খিড়কি-পুরুর ---
অথৈ পথে |
যত সুর --- তত ব্যথা |

ওগো ভয়ঙ্কর সুর,
আমায় নিয়ে এখন লোফালুফি খেলছে
আকাশজোড়া বিদগ্ধ তামস

সেই আমার সূর্যভেজা মাঠ
পেরিয়ে জাহান্নামের গলিতে
এককযাত্রা |

এই জ্যোত্স্নাহীন হাতে জলনিমগ্ন আমি
তুলে ফেলেছি একশো-আটটা নীল পদ্ম |
আমার বেণীবদ্ধ চুল এখন সরীসৃপ
ওই সর্বনাশের সলমন-বুকে
আমি ছোবল দিয়েছি নিবিড় প্রেমে আর
কী আশ্চর্য!
মাটির কান্নামোছা শঙ্খও সেই মুহুর্তে
বেজে উঠেছে --- ওঁ |
রুদ্রবীণার ঝঙ্কারে আকাশলীন তামস
হঠাৎ পূর্বদিগন্তের সার্চলাইটে
জবাকুসুমসঙ্কাশ মহাদ্যুতিময়
দিন |


.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .