শর্মিষ্ঠা সেনের কবিতা
*.
*.
বান্ধবীকে---     
(এই কবিতাটি পোর্টব্লেয়ারের রবীন্দ্রবাংলা বিদ্যালয়ের প্রক্তনী সংসদের পত্রিকা
"রবির আলো"-র প্রথম সংখ্যায় (জানুয়ারী ২০১১) প্রকাশিত হয়েছিল )


--নীট ফল তবে কী?
--রক্তচাপ ; চিনি!
--অভূতপূর্ব সেই অভিজ্ঞতা, না?
--রাত্রি জাগরণ--অবিশ্রাম--রাত্রি জাগরণ
--আমার জীবনও তবে স্বপ্নসাধ--?
--দেখ' না স্বপ্ন যত পয়সা লাগে না
--দেখেছি তো-- স্বপ্নহা জীবনও দেখেছি
তারও পরে ডানা-মেলা রোদ্দুর ছুঁয়েছি
তারও পরে...
--বৃক্ষ তুমি কার?
--যে আমাতে নীড় বাঁধে, জল দেয় -- তার!
যে আমাকে ব্যথা দেয়, প্রাচীন সেতুতে বাঁধে
দূরনিরীক্ষ---
তার!


.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
ছৌ     
(এই কবিতাটি পোর্টব্লেয়ারের রবীন্দ্রবাংলা বিদ্যালয়ের প্রক্তনী সংসদের পত্রিকা
"রবির আলো"-র প্রথম সংখ্যায় (জানুয়ারী ২০১১) প্রকাশিত হয়েছিল )


মুখ আর মুখোশের পার্থক্য খুঁজতে খুঁজতে
এতটা পথে হেঁটে এসে দেখছি : আসলে
প্রি-স্কুলের পরাটাই শেখা হয় নি |

মানুষে আর পুতুলে প্রধান পার্থক্য যে প্রাণের --
সেটাই জানা হয় নি এ পর্যন্ত |
কত "দীর্ঘবরষ - মাস" গেল |

পূর্ব দিল্লী থেকে যমুনার ফিতে নীচে রেখে
প্রতিদিন যাতায়াতে তবু
লড়াই-উদ্দত-ফণা সবুজ ঘাসের মাটি খুঁজে
নেমে আসে সহিষ্ণু
স্বার্থপর নির্জনতা জুড়ে |
বিস্রস্ত বিদ্বেষ
বিষ-যোনি-ফেনা হয়ে ছড়িয়ে ছড়িয়ে যায়
নিস্তব্ধ দুপুরে |

দু মুঠো ভাতের গন্ধে বিপ্রতীপ ঘৃণারা ঝিমোয়
উঠোনে চাটাই ছেঁড়া
কাদা-পায়ে চাদর জোটে নি |
অথচ অলক্ষ্যে তার মুখোশেরা
ছৌ-নাচে মাতে
শীতের দুপুর ছোটো
রাত্রিরা গ্রাস করে তাকে |


.      *************
.                                                                              সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*.
স্বগতঃ
(এই কবিতাটি পোর্টব্লেয়ারের রবীন্দ্রবাংলা বিদ্যালয়ের প্রক্তনী সংসদের পত্রিকা
"রবির আলো"-র প্রথম সংখ্যায় (জানুয়ারী ২০১১) প্রকাশিত হয়েছিল )

রক্ত উত্তাল হলে তর্জনী ঠেকাই ওষ্ঠে বলি,
চুপ যা!
হৃৎপিণ্ডে আগুনের ফুলকি লেগে দাউ - দাউ
জ্বলে উঠলে আ-নাভি, পুড়ি,
ব্যথায় নীলাভ আমি
বলে উঠি
একটি কবিতা!
*   
গল্প গুলো গড়ে উঠতেই যে-টুকু সময় লাগে
তারপর ঘর ভাসে
অথৈ বন্যায়
ঝড়ের তাণ্ডব
ঘূর্ণি তোলে ঐশ্বরিক প্রতিদিনে |
*  
তুমি ও তখন আলগোছে তুলে নাও
গন্ধরাজ
বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে তর্জনী বসিয়ে
তুড়ি বাজাও
ঔদাস্যে কি?
রাতেরা সর্পিল হয় |
*  
শৈশবের মাঠে ঘাসদল
মেঠো রোদ্দুর
খালি পায়ে হাঁটা
শৈশবে জোছনা প্রচুর!
*   
বাংলা মানেই পিপাসার জল বাংলা মানে পণ!
বাংলা মানেই মার বুক থেকে
প্রথম বর্ণমালা উচ্চারণ |
বাংলা মানেই এক মুঠো রং বাংলা প্রাণের হাসি,
ওই মন ছুঁয়ে বাংলায় বলা, "তোমাকেই ভালোবাসী!"
*
নদীরা সব ঘরে ফিরছে শীতসন্ধ্যায়
সূর্যডোবা - আলো - আঁধারিতে
যত "ঢেউ-চিনি"-র গল্প!
*      
জলে ফেনা বিছিয়ে মরে যাওয়া ঢেউ
তবু ফণা তোলে উদ্বেল আষাঢ়ে
তোমার - আমার - তাদের আবেগপনা
ভ্রুকুটি করে পড়ন্ত বিকেলে |


.      *************       
.                                                                                             সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*.
২৯শে ডিসেম্বর, দিল্লী
কবি শর্মিষ্ঠা সেন        

দাউ দাউ আগুনে জ্বলতে জ্বলতে
চলে গেলে জ্বলন্ত রমণী
আগুনের হ্রেসা ঝরছে তোমমার গলায়
তোমার জ্বলন্ত গ্রীবা দেখেই
প্রতিবাদ লিখেছিলেন
কবিতা মল্লিকা!

চলে যেতে যেতে
অগ্নিস্রাবে জাগিয়ে গেলে
বহু কণ্ঠস্বর
শির-ছেঁড়া,
অগ্নিগর্ভা নারী
আমাকে চেতনা দাও

ঘুমঘোরে ছিঁড়ে গেছে স্মৃতি মনোহর
ভাঙা কাচের টুকরো
ঝরছে --- ছড়িয়ে যাচ্ছে
দিগ্বিদিক
মস্তিষ্কের খাতায় টাইপ হচ্ছে
আগুন
শ্মশানে পুড়ছে মেয়ে
চুল্লির আগুন
তোমার নরম প্রেম
অবিশ্বাস
পোড়ে না তো
প্রতিবাদ

তোর মৃত্যু রেখে যায়
আশির-যন্ত্রণা

.     *************
      
.                                                                                       সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*.
গোপাদিকে --- বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও
যাকে ‘শ্রীচরণেষু’ বলিনি কখনও
(ডঃ গোপা দে-র অকালপ্রয়াণে)
কবি শর্মিষ্ঠা সেন        

রোদ বৃষ্টি ঝড়ে
আবার তামাটে হয় আমার পৃথিবী
শীতার্ত হৃদয়
আবার পশম খোঁজে নরম শাখায়
অশ্রুপূর্ণ আকুল-ঈক্ষণ
ফিরে আসে বুমেরাং
ছবির ফ্রেমের কাচে

তুমি চলে গেছ
তাও পাঁচ মাস
গর্ভবতী ভাবনার আদর্শলিপিতে
অ-আ-ক-খ শিখি
মূক আমি
কর্মযোগী
ধনঞ্জয় দার্শনিক বাচনে মুখর

কুরুক্ষেত্র প্রাসঙ্গিক
শোক-পরিহার অতএব কর্তব্য
‘জীর্ণবাস’ তুলে রাখি
দেওয়ালে বই-এর তাকে
শিল্পচিহ্ন ---
লাস ভেগাস চা-চামচ,
ঘাসঘড়ি
শাড়ি
সিঙ্গাপুরী ড্রাগন
কি মাথার পশম ---

তোমাকে সেদিন-লেখা মোবাইলের সেন্টবক্সে
ওয়ার্কশপ – খবরের পাশে
অবলীলায় ঢুকে পড়ে
তোমার ক্রিমেশনের
দিন, ক্ষণ, স্থান ---

যুযুধান কথারা
সামানার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে আজ
একা ও অনেকে,
তবু অসহায়
অভিযোগ কার প্রতি কতটুকু ছিল
কোন কোন অবস্থানে
তোমার খড়্গধারণ
অনিবার্য ছিল
ইত্যাদি আরও . . .

হে মন, ভ্রমতি ইব,
কুরুক্ষেত্রে সমবেত
রুদ্ধবাক সেনারা আমার
জন্মিলে মরিতে হবে ---
বিশ্বরূপ কর্তব্য নিঠুর
কোবল অবস্থাতুম
ন সকোমি

ধনঞ্জয়,
এই ধনু রাখি
.   *************
      
.                                                                                       সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*.
রং
কবি শর্মিষ্ঠা সেন        

যে বলে, সে রং চেনেনা
যে শোনে, সে রং দানে
বলেছিল, ‘ধূসর’! শ্রেতার
সবুজ হল দুই কানে।

কানকে বলো, ‘পোড়ো জমি---’
চোখকে বোলো, ‘না ---’
ভাতের মাদক গন্ধে মাতায়
ফসলে আলপনা।

অনেক মিথ্যা সীমায় বাঁধে
সূর্যসাক্ষী বেলা
বৈশাখী রাত দেখায় কেবল
ভানুমতীর খেলা।


যে বলে সে রূপ চেনে না
যে শোনে সে রূপ জানে
বলেছিলে, ‘মরু।’
শ্রোতার কলস্রোতে বুক ভাঙে।

বলব বলে মুখ খুলেছি
ধরব বলে হাতে
যুদ্ধ এখন থাক্-না তবে
নতুন ভাষা পাব।

.   *************       
.                                                                                       
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*.
রাণীর স্বপ্ন
কবি শর্মিষ্ঠা সেন        

কাচের ওপারে সীমাবন্দী জলের উচ্ছ্বাস
জলজ ঘাস, ঢেউ, জলবুদ্বুদ, মাছ
সবই থাকে, যেন অ্যাকোরিয়াম।
হৃদ্ পিণ্ড-উজাড়-করা নীলাভ রোদ্দুরে
কারা যেন বসে থাকে
মত্সকন্যা আনাগোনা করে
কালো কেশ কালো মেঘ হয়ে
ভেসে থাখে বাক্সবন্দী জলে।

কাচঘেরা জলখেলার মত
হাতের নাগালের বাইরে দেখি
ভেসে উঠছে প্রত্ন-মেয়েবেলা
টুকরো পাথর, ঝিনুক,স্বপ্নিল শঙ্খ
সন্ন্যাসী-কাঁকড়া টুক্ করে ঢুকে পড়ছে ঘরে
নানামুখী ফুল ফুটিয়ে জেগে আছে সমুদ্র কোরাল

হাত বাড়াই অ্যাকোরিয়ামে
বাঁচি যদি রাণীর জীবন!
আমারই স্বপ্নে গড়া --- আমারই তো চিরপুরাতন।
আমারই তো প্রজাপতি --- আলো, মুক্ত রামধনু-রং
এখনও আছে তো বাকি রূপকথা
ও হিরণ্য-প্রেম!

জোনাকির বিন্দু ফোটা নিঝিম রাত্তিরে
ছন্দ খুঁজি --- গল্প খুঁজি --- সন্নিহিত
মন্দাকিনী খুঁজি। অকলঙ্ক জোছনা নামে মাথায়, কপালে
বিবেকদর্পণে দেখি ভয়ার্ত বিহ্বল
তর্জনি তুলেছে ‘তিষ্ঠ’ রুদ্র মহাকাল
সীমাবন্দী জলে ভাঙছে সমরসারণী
শব্দহীন ঝরে যাচ্ছে বালুর উচ্ছ্বাস
মেয়েবেলা চোখ টিপে একমাত্র দুয়ারে দাঁড়িয়ে
কেবলি আউড়ে যাচ্ছে --- ‘পারবে না, পারবে না ছুঁতে . . .’

.              *************       
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*.
অকাজ
কবি শর্মিষ্ঠা সেন


আমার কোনো কাজ ছিলনা
তোমায় কেবল দেখাতে চাই
এমন কোনো সাজ ছিলনা
তোমার সাথেই ডুবতে পারি
এমন দয়ের মাঝ ছিলনা
আমার সত্যি কাজ কাজ ছিলনা
আমার কোনো কাজ ছিলনা ।
তবু বসে উঠছি যখন
বার্নিশ কাঠ ঘুমন্ত খুব
উঁচু পেরেক দাঁড়িয়ে ছিল
আঁচলের এ সমুদ্র-সুখে
ঠিক গুছিয়ে হ্যাঁচকা মারল
যেন ওকেই গুণ পরিয়ে
ওরই সবটা দখল চাইল ।
আমার কিছু কাজ ছিলনা
আমার কিন্তু কাজ ছিলনা
তোমার কাছে আসব এমন
আমার কিছুই সাধ ছিলনা ।
কেবল আঁচল আর পেরেকে
কী যে এমন সন্ধি হল
সেই থেকে যে রাত্রি নামল
রাত্রি আজও ভোর হলনা॥

.              *************       
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*.
বিগত বৃক্ষ
ডঃ শর্মিষ্ঠা সেন


প্রতিদিন একটু করে ঠাঁই কমছে
মাথার উপরে সেই একফালি নীল
দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে যাচ্ছে এক একটা খবরে
উড়ে বেড়ানোর পাখি আকাশ হারাল
পঞ্চদশীও তো উত্তর-পঞ্চাশ এখন
যে-সমুদ্র হাতছানি দিয়ে ডাকত বুকের গভীরে
সে এখন সমস্ত চৈতন্য জুড়ে স্মৃতিকথা ঢেউ
কেন তুই ছেলেবেলা এমন বিষম
একা করে চলে যাস ঝাঁকড়াচুলো মেয়ে
আমি যে একা-জন্মে বহু হই তাঁদের ছায়ায়
হিজল বকুল বট অশ্বত্থ তাঁরাই
আকাশ সোনালি রোদ বাদলের আশা
তবে কেন জন্মে দিলি এত ভালবাসা
সে-খবর উড়ে যাক ভাসুক ভেলায়
আর আমি কিছুতেই হারাতে পারিনা
জীবন অচেনা লাগে যত নীল বিগত সময়
ছুঁয়ে যায় বৃক্ষশাখা একা করে দিয়ে যায় আরো
ধ্বংস-ভ্রংশ সত্তা নিয়ে আজও আমি একাকী দাঁড়িয়ে

.              *************       
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর
*.
টুকরো
কবি শর্মিষ্ঠা সেন
রচনা ২৫.০৩.২০১৩



রক্ত উত্তাল হলে
তর্জনী ঠেকাই ওষ্ঠে,
বলি--
চুপ থাক্
হৃদপিণ্ডে কান্নার
ফুলকি লেগে দাউ-দাউ
জ্বলে উঠলে
আ-নাভি ব্যথায় নীল
বলে উঠি--
একটি কবিতা



আমার কৈশোরবেলার প্রেম
ভাল থেকো তুমি
আসন্ন-সন্ধ্যার প্রথম তারাটি তুমি
ভাল থেকো

ভাল থেকো প্রেম
ক্লাস সেভেনের
বীজগণিতে
ভাল থেকো প্রেম
অস্থিরতার প্রথম সেদিনে

অবসন্ন বিকেলে আমার
উঁকি দিয়ে মিশে যেও
সন্ধ্যার বাতাসে
নিঃঝুম পুকুর-জল
রাত্রির আকাশ
হোক প্রেম
সাথীরা তোমার

ভাল থেকো. .



সঙ্গমের মুহূর্তে এত বিষ--
উদ্গীরণের লাভা
সর্বাঙ্গে ছোবল দেয়
সারা সন্ধ্যা বেপথু শরীর
হোমাগ্নি জ্বালায় স্বপ্নে
অসৃগ্ধারা ভ্রান্তি কিশোরীর
প্রার্থনায় ছিল যত রাত
পোড়ে ওরা
পুড়ে যায় কপাট খিলান আর
সেঁজুতি-উজাড় করা
নীড়

.              *************       
.                                                                              
সূচিতে . . .    


মিলনসাগর