*
কবি যশোধরা রায়চৌধুরীর সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের কবিতা
গণধর্ষণের পর
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

একটি মেয়ে কাটা ধানখেতে একা পড়ে আছে | গর্ত, জমা জল |
একটি মেয়ে, আধপোড়া, পড়ে আছএ বেদনা বিহ্বল |
একটি মেয়ে, ধর্ষিতাও | ঘর থেকে বেরিয়েছে ভোরে
একটি মেয়ে, বালিকা বললেই চলে, কিন্তু গ্রামে নারী বলা চলে |

ধর্ষণের এই সংজ্ঞা তবু সয়ে গিয়েছে সবার
নারীত্বের এই সংজ্ঞা তবু সহ্য হয়
বাইরে বেরোবার জন্য আমরা যদি দায়ী করতে পারি
ঘরে ঘরে পায়খানা-না-থাকাকে : তাও উন্নয়ন উপযুক্ত লাগে

ধানখেত, বিহ্বলতা, আমাদের দীর্ঘশ্বাস, খুন---
সবকিছু মিলেমিশে তাও বেশ কবিতা লেখার মত ছিল ...

কিন্তু তারপর যা হল
আমাদের কবিতারা ঝলসে গেল ... পুড়ে গেল নিজেরাই, শুনে
উঠতি নেতার ঘরে পাইপগানের দণ্ড ঢুকে গেল জননীর দ্বারে
স্তুপিকৃত শাড়ী আর ছেঁড়া চুল, রক্তমাখা সালোয়ার, ইস্কুলের জামা
দলা দলা রক্ত আর হাসপাতালে শুয়ে থাকা মেয়েদের বিবর্ণ বর্ণনা ...

আমরা যারা নারীবাদী, থ হলাম, চুপ হলাম, একেবারে চুপ

নিজের নিঃশ্বাস শব্ দে আজ জেগে উঠি ত্রাসে, বিছানায় হাতড়ে চলি কিছু
দলা দলা রক্ত যেন গড়াচ্ছে আমার এই ফুলকাটা গুর্জরী চাদরে

যৌবন খোয়ানো, রোগা, গালবসা, শ্রমজীবী অসংখ্য মেয়ের
শরীরে "ধর্ষণ" কত মোহহীন লাগে বলে

আমরা যারা নারীবাদী, একেবারে স্তব্ ধ  হয়ে গেছি
কবিতা লেখার কথা ভুলে ...


.                     **************         

.                     
                                                       সূচিতে . . .     
.             
                   অন্যান্য সিঙ্গুরের কবিদের সূচির পাতায় ফেরত . . .     
.          
                         সিঙ্গুরের কবিতার মূল সুচির পাতায় ফেরত . . .       

এই কবিতাটি মে-আগষ্ট ২০০৭ এর "পর্বান্তর" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল |

মিলনসাগর
দেশে যখন বন্যা হয়েছিল
কবি যশোধরা রায়চৌধুরী

দেশে যখন বন্যা হয়েছিল
আমার মায়ের তবু তো ছিল ঘর
ঘরের মধ্যে অন্ধকার, ঘরের মধ্যে মেঘ
তবুও মাকে দেখেছি অকাতর

সেলাই করেছিল আমার মা
অন্তহীন কাঁথায় পরিপাটি
ফোঁড়ের পরে ফোঁড়ের পরে ফোঁড়
তৈরি হয়ে উঠেছে বিছানাটি

দেশে যখন বন্যা হয়েছিল
সবাই তখন চেঁচিয়ে পাড়া মাথায়
তুলেছিল আর ফুঁসছিল সব রাগে
আমার মায়ের অত সময় কোথায় ?

মা তো তখন ছিন্ন শাড়িগুলি
জুড়ে জুড়ে নীরব প্রতিরোধে
গড়ে তুলছে শরৎশেষের চাদর
শীতে যাতে ঘুমাই নিরাপদে

দেশে যখন যুদ্ধ হয়েছিল
বৃদ্ধ এক শিল্পী একা একা
পুরনো সব ছড়িয়ে রাখা ছবি
শেষ করেছে, এমনি ফেলে রাখা

দেশে যখন যুদ্ধ হয়েছিল
সবাই তখন চেঁচিয়ে পাড়া মাথায়
তুলছিল, আর ফুঁসছিল সব রাগে
শিল্পীর আর অত সময় কোথায়

রাজা যখন মাথাটি কেটে নিয়ে
শিল্পীটির বন্ধুদের লাশ
পাঠিয়ে দেন শিল্পীটির কাছে
শিল্পী শুধু ফেলেন দীর্ঘশ্বাস

এও কি কোন মহৎ প্রতিবাদ ?
ধিক্কারে তো হলই পাড়া মাত
শিল্পী জানে কাজই প্রতিবাদ
শিল্পী জানে, শিল্প চাষ আবাদ

মানুষ মরে মানুষ চলে যায়
কেউ কি জানো কাজের আয়ু কত
শিল্পী জানে কাজের আয়ু ঢের
মায়ের হাতে বোনা কাঁথার মত

মায়ের স্নেহ রোঁয়ায় রোঁয়ার ধরা
নাতিপুতির বিছানাময় ওম
শিল্পী আছে নিজের কাজে মিশে
শান্ত হয়ে, নীরবে, সক্ষম ...

.        **************          
.                                                               
সূচিতে . . .    
.                           
অন্যান্য সিঙ্গুরের কবিদের সূচির পাতায় . . .     
.                              
সিঙ্গুরের কবিতার মূল সুচির পাতায় . . .       

এই কবিতাটি "লুব্ধক" পত্রিকায় ২৫শে বৈশাখ ২০০৭ এর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল |

মিলনসাগর
*