বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর "ফণি মনসা"
থেকে কয়েকটি কবিতা
*
ফণি মনসা , কাজী নজরুল ইসলাম

.                        সব্যসাচী                                                        

ওরে ভয় নাই আর, দুলিয়া উঠেছে হিমালয়-চাঁপা প্রাচী !
.        গৌরীশিখরে তুহিন ভেদিয়া জাগিছে সব্যসাচী !
.                    দ্বাপর যুগের মৃত্যু ঠেলিয়া
.                    জাগে মহাযোগী নয়ন মেলিয়া,
.        মহাভারতের মহাবীর জাগে, বলে ‘আমি আসিয়াছি !’
.        নব-যৌবন-জলতরঙ্গে নাচে রে প্রাচীন প্রাচী !


.        বিরাট্ কালের অজ্ঞাতবাস ভেদিয়া পার্থ জাগে,
.        গান্ডীব ধনু রাঙিয়া উঠিল লক্ষ লাক্ষারাগে !
.                       বাজিছে বিষাণ পাঞ্চজন্য,
.                     সাজে রথাশ্ব, হাঁকিছে সৈন্য,
.        ঝড়ের ফুঁ দিয়া নাচে অরণ্য, রসাতলে দোলা লাগে,
.        দোলায় বসিয়া হাসিছে জীবন মৃত্যুর অনুরাগে !


.        যুগে যুগে ম’রে বাঁচে পুনঃ পাপ দুর্মতি কুরুসেনা,
.        দুর্যোধনের পদলেহী ওরা, দুঃশাসনের কেনা !
.                     লঙ্কাকান্ডে কুরুক্ষেত্রে,
.                     লোভ -দানবের ক্ষুধিত নেত্রে,
.        ফাঁসির মঞ্চে কারার বেত্রে ইহারা যে চির-চেনা !
.        ভাবিয়াছ, কেহ শুধিবে না এই উত্পীড়নের দেনা ?


.        কালের চক্র বক্রগতিতে ঘুরিতেছে অবিরত,
.        আজ দেখি যারা কালের শীর্ষে, কাল তারা পদানত !
.                      আজি সম্রাট্ কালি সে বন্দী,
.                      কুটীরে রাজার প্রতিদ্বন্দ্বী !
.        কংস-কারায় কংস-হন্তা জন্মিছে অনাগত
.        তারি বুক ফেটে আসে নৃসিংহ, যারে করে পদাহত !



.        আজ যার শিরে হানিছে পাদুকা কা’ল তারে বলে পিতা,
.        চির-বন্দিনী হ’তেছে সহসা দেশ-দেশ নন্দিতা !
.                       দিকে দিকে ঐ বাজিছে ডঙ্কা,
.                       জাগে শঙ্কর বিগত-শঙ্কা !
.        লঙ্কা-সায়রে কাঁদে বন্দিনী ভারত-লক্ষ্মী সীতা,
.        জ্বলিবে তাঁহারি আঁখির সুমুখে কা’ল রাবণের চিতা !



.        যুগে যুগে সে যে নব নব রূপে আসে মহাসেনাপতি,
.        যুগে যুগে হ’ন শ্রীভগবান্ যে তাঁহারি রথ-সারথি !
.                      যুগে যুগে আসে গীতা-উদ্গাতা
.                      ন্যায়-পান্ডব-সৈন্যের ত্রাতা !
.        অশিব-দক্ষযজ্ঞে যখনই মরে স্বাধীনতা-সতী,
.        শিবের খড়ে, তখনই মুন্ড হারায়েছে প্রজাপতি !


.        নবীন মন্ত্রে দানিতে দীক্ষা আসিতেছে ফাল্গুনী,
.        জাগো রে জোয়ান !  ঘুমায়ো না ভুয়ো শান্তির বাণী শুনি !
.                     অনেক দধীচি হাড় দিল ভাই,
.                       দানব দৈত্য তবু মরে নাই,
.        সুতা দিয়ে মোরা স্বাধীনতা চাই, ব’সে ব’সে কাল গুণি !
.        জাগো রে জোয়ান ! বাত ধ’রে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি’ !



.        দক্ষিণ করে ছিঁড়িয়া শিকল, বাম করে বাণ হানি’
.        এস নিরস্ত্র বন্দীর দেশে হে যুগ-শস্ত্রপাণি !
.                      পূজা ক’রে শুধু পেয়েছি কদলী,
.                     এইবার তুমি এস মহাবলী !
.         রথের সুমুখে বসায়ো চক্রী চক্রধারীরে টানি’,
.        আর সত্য সেবিয়া দেখিতে পারি না সত্যের প্রাণহানি !



.        মশা মেরে ঐ গরজে কামান-----‘বিপ্লব মারিয়াছি !’
.        আমাদের ডান হাতে হাতকড়া, বাম হাতে মারি মাছি !
.                        মেনে শত বাধা টিকটিকি হাঁচি,
.                       টিকি দাড়ি নিয়ে আজো বেঁচে আছি !
.        বাঁচিতে বাঁচিতে প্রায় মরিয়াছি, এবার সব্যসাচী,
.        যা হোক একটা দাও কিছু হাতে, একবার ম’রে বাঁচি !

.                   **************



.                                                                             
পরে  

মিলনসাগর
*
ফণি মনসা , কাজী নজরুল ইসলাম

দ্বীপান্তরের বন্দিনী


আসে নাই ফিরে ভারত-ভারতী ?
.             মা’র কতদিন দীপান্তর ?
পুণ্য বেদীর শূন্যে ধ্বনিল
.           ক্রন্দন----‘দেড় শত বছর !’-----



সপ্ত-সিন্ধু তের নদী পার
.          দীপান্তরের আন্দামান,
রূপের-কমল রূপার কাঠির
.          কঠিন স্পর্শে যেখানে ম্লান,
শতদল যেথা শতধা ভিন্ন
.          শস্ত্র-পাণির অস্ত্র-ঘায়
যন্ত্রী সেখানে সান্ত্রী বসায়ে
.          বীণার তন্ত্রী কাটিছে হায়,
সেখান হ’তে কি বেতার-সেতারে
.           এসেছে মুক্ত-বন্ধ সুর ?
মুক্ত কি আজ বন্দিনী বাণী ?
.           ধ্বংস হ’ল কি রক্ষ-পুর ?
যক্ষপুরীর রৌপ্য-পঙ্কে
.           ফুটিল কি তবে রপ-কমল ?
কামান গোলার সীসা-স্তূপে কি
.            উঠেছে বাণীর শিশ-মহল ?


শান্তি-শুচিতে শুভ্র হ’ল কি
.            রক্ত সোঁদাল খুন-খারাব ?
তবে এ কিসের আর্ত আরতি,
.            কিসের তরে এ শঙ্খারাব ?------
সাত সমুদ্র তের নদী পার
.            দীপান্তরের আন্দামান,
বাণীযেথা ঘানি টানে নিশিদিন,
.            বন্দী সত্য ভানিছে ধান,
জীবন-চুয়ানো সেই ঘানি হ’তে
.            আরতির তেল এনেছ কি ?
হোমানল হ’তে বাণীর রক্ষী
.           বীর ছেলেদের চর্বি ঘি ?
হায় শৌখিন পূজারী, বৃথাই
.           দেবীর শঙ্খে দিতেছ ফু’,
পুণ্য বেদীর শূন্য ভেদিয়া
.           ক্রন্দন উঠিতেছে শুধু !



পূজারী, কাহারে দাও অঞ্জলি ?
.           মুক্ত ভারতী ভারতে কই ?
আইন যেখানে ন্যায়ের শাসক,
.           সত্য বলিলে বন্দী হই,
অত্যাচারিত হইয়া যেখানে
.           বলিতে পারি না অত্যাচার
যথা বন্দিনী সীতা-সম বাণী
.           সহিছে বিচার-চেড়ীর মার,
বাণীর মুক্ত শতদল যথা
.            আখ্যা লভিল বিদ্রোহী,
পূজারী, সেখানে এসেছ কি তুমি
.             বাণী-পূজা উপচার বহি’ ?
সিংহেরে ভয়ে রাখে পিঞ্জরে,
.             ব্যাঘ্রেরে হানে অগ্নি-শেল,
কে জানিত কালে বীণা খাবে গুলি,
.             বাণীর কমল খাটিবে জেল !
তবে কি বিধির বেতার-মন্ত্র
.             বেজেছে বাণীর সেতারে আজ,
পদ্মে-রেখেছে চরণ-পদ্ম
.             যুগান্তরের ধর্মরাজ ?
তবে তাই হোক ! ঢাক’  অঞ্জলি,
.             বাজাও পাঞ্চজন্য শাঁখ
দীপান্তরের ঘানিতে লেগেছে
.            যুগান্তরের ঘুর্ণিপাক !


.                   **************



.                                                                             
পরে  

মিলনসাগর
*
ফণি মনসা , কাজী নজরুল ইসলাম

.                সত্য--কবি

অসত্য যত রহিল পড়িয়া, সত্য সে গেল চ’লে
বীরের মতন মরণ-কারারে চরণের তলে দ’লে |
যে-ভোরের তারা অরুণ-রবির উদয়-তোরণ-দোরে
ঘোষিল বিজয়-কিরণ-শঙ্খ আবার প্রথম ভোরে,
রবির ললাট চুম্বিল যার প্রথম রশ্মি-টীকা,
বাদলের বায়ে নিভে গেল হায় দীপ্ত তাহারি শিখা !
মধ্য গগনে স্তব্ধ নিশীথ , বিশ্ব চেতনা-হারা,
নিবিড় তিমির, আকাশ ভাঙিয়া ঝরিছে আকুল ধারা !
গ্রহ শশী তারা কেউ জেগে নাই, নিভে গেছে সব বাতি,
হাঁক দিয়া ফেরে ঝড়-তুফানের উতরোল মাতামাতি !

কেহ দুর্দিনে বেদনা-শিখায় বিজলী-প্রদীপ জ্বেলে
কাহারে খুঁজিতে কে তুমি নিশীথ-গগন-আঙনে এলে ?
বারে বারে তব দীপ নিভে যায়, জ্বালো তুমি বারে বারে,
কাঁদন তোমার সে যেন বিশ্বপিতারে চাবুক মারে !
কি ধন খুঁজিছ ? কে তুমি সুনীল মেঘ-অবগুন্ঠিতা ?
তুমি কি গো সেই সবুজ শিখার কবির দীপান্বিতা ?
কি নেবে গো আর ? ঐ নিয়ে যাও চিতার দু’মুঠো ছাই !
ডাক দিয়োনাক’, শূন্য এ ঘর, নাই গো সে আর নাই !
ডাক দিয়োনাক’, মূর্ছিতা মাতা ধূলায় পড়িয়া আছে,
কাঁদি’ ঘুমায়েছে কান্তা কবির, জাগিয়া উঠিবে পাছে !
ডাক দিয়োনাক’, শূন্য এ ঘর, নাই গো সে আর নাই,
গঙ্গা-সলিলে ভাসিয়া গিয়াছে তাহার চিতার ছাই !

আসিলে তড়িৎ-তাঞ্জামে কে গো নভোতলে তুমি সতী ?
সত্য-কবির সত্য জননী ছন্দ সরস্বতী ?
ঝলসিয়া গেছে দু’-চোখ মা তার তোরে নিশিদিন ডাকি’,
বিদায়ের দিনে কন্ঠের তার গানটি গিয়াছে রাখি’
সাত কোটি এই ভগ্ন কন্ঠে ; অবশেষে অভিমানী
ভর-দুপুরেই খেলা ফেলে গেলে কাঁদায়ে নিখিল প্রাণী !
ডাকিছ কাহারে আকাশ-পানে ও ব্যাকূল দু’হাত তুলে ?
কোল মিলেছে মা শ্মশান-চিতায় ঐ ভাগীরথী-কূলে !

ভোরের তারা এ ভাবিয়া পথিক শুধায় সাঁঝের তারায়,
কাল যে আছিল মধ্য গগনে  আজি সে কোথায় হারায় !
সাঁঝের তারা সে দিগন্তের কোলে ম্লান চোখে চায়,
অস্ত-তোরণ-পার সে দেখায় কিরণের ইশারায় !
মেঘ-তাঞ্জাম চলে কার আর যায় কেঁদে যায় দেয়া,
পরপার-পারাপারে বাঁধা কার কেতকী-পাতার খেয়া ?
হুতাশিয়া ফেরে পূরবীর বায়ু হরিৎ-হুরির দেশে
জর্দা-পরীর কনক-কেশর কদম্ব-বন শেষে !
প্রলাপ প্রলাপ প্রলাপ কবি সে আসিবে না আর ফিরে,
ক্রন্দন শুধু কাঁদিয়া ফিরিবে গঙ্গার তীরে তীরে !

‘তুলির লিখন’ লেখা যে এখনো অরুণ-রক্ত-রাগে,
ফুল্ল হাসিছে ‘ফুলের ফসল’ শ্যামার সব্ জি-বাগে,
আজিও ‘তীর্থরেণু ও সলিলে’ ‘মণি-মঞ্জুষা’ ভরা,
‘বেণু-বীণা’ আর ‘কুহু-কেকা’-রবে আজো শিহরায় ধরা,
জ্বলিয়া উঠিল ‘অভ্র-আবীর’  ফাগুয়ায় ‘হোমশিখা’,-----
বহ্নি-বাসরে টিট্ কারি দিয়ে হাসিল ‘হসন্তিকা’,-----
এত সব যার প্রাণ-উত্সব সেই আজ শুধু নাই,
সত্য-প্রাণ সে রহিল অমর, মায়া যাহা হ’ল ছাই !
ভুল যাহা ছিল ভেঙে গেল মহাশূন্যে মিলালো ফাঁকা,
সৃজন-দিনের সত্য যে, সে-ই র’য়ে গেল চির আঁকা !

উন্নত শির কালজয়ী মহাকাল হ’য়ে জোড়পাণি
স্কন্ধে বিজয়-পতাকা তাহারি ফিরিবে আদেশ মানি !
আপনারে সে যে ব্যাপিয়া রেখেছে আপন সৃষ্টি -মাঝে,
খেয়ালী বিধির ডাক এলো তাই চ’লে গেল আন কাজে !
ওগো যুগে-যুগে কবি, ও-মরণে মরেনি তোমার প্রাণ,
কবির কন্ঠে প্রকাশ সত্য-সুন্দর ভগবান !
ধরায় যে-বাণী ধরা নাহি দিল যে-গান রহিল বাকী
আবার আসিবে পূর্ণ করিতে, সত্য সে নহে ফাঁকি !
সব বুঝি ওগো, হারা-ভীতু মোরা তবু ভাবি শুধু ভাবি,
হয়ত যা গেল চিরকাল তরে হারানু তাহার দাবি !

তাই ভাবি, আজ যে শ্যামার শিস্ খঞ্জন-নর্তন
থেমে গেল, তাহা মাতাইবে পুনঃ কোন্ নন্দন-বন !
চোখে জল আসে, হে কবি-পাবক, হেন অসময়ে গেলে
যখন এ-দেশে তোমারি মতন দরকার শত ছেলে !
আষাঢ়-রবির তেজোপ্রদীপ্ত তুমি ধূমকেতু-জ্বালা,
শিরে মণি-হার, কন্ঠে ত্রিশিরা ফণি-মনসার মালা,
তড়িৎ-চাবুক করে ধরি’ তুমি আসিলে হে নির্ভীক,
মরণ-শয়নে চমকি’ চাহিল বাঙালী নির্নিমিখ্ !
বাঁশীতে তোমার বিষাণ-মন্দ্র রণরণি’ ওঠে, জয়
মানুষের জয়, বিশ্বে দেবতা দৈত্য সে বড় নয় !

করোনি বরণ দাসত্ব তুমি আত্ম-অসন্মান,
নোয়াওনি মাথা, চির-জাগ্রত ধ্রুব তব ভগবান,
সত্য তোমার পর-পদানত হয়নিক’ কভু., তাই
বলদর্পীর দন্ড তোমায় স্পর্শিতে পারে নাই !
যশ-লোভী এই অন্ধ ভন্ড সজ্ঞান ভীরু-দলে
তুমিই একাকী রণ-দুন্দুভি বাজালে গভীর রোলে !
মেকীর বাজারে আমরণ তুমি র’য়ে গেলে কবি খাঁটি,
মাটীর এ-দেহ মাটী হ’ল তব সত্য হ’ল না মাটী !
আঘাত না খেলে জাগে না যে-দেশ, ছিলে সে-দেশের চালক,
বাণীর আসরে তুমি একা ছিলে তূর্য-বাদক বালক !

কে দিবে আঘাত ? কে জাগাবে দেশ ? কই সে সত্যপ্রাণ ?
আপনারে হেলা করি’ করি মোরা ভগবানে অপমান !
বাঁশী ও বিষাণ নিয়ে গেছ, আছে ছেঁড়া ঢোল ভাঙা কাঁসি,
লোক-দেখানো এ আঁখির সলিলে লুকানো রয়েছে হাসি |
যশের মানের ছিলে না কাঙাল, শেখোনি খাতির-দারী,
উচ্চকে তুমি তুচ্ছ করোনি, হওনি রাজার দ্বারী !
অত্যাচারকে বলনিক’ দয়া, ব’লেছ অত্যাচার,
গড় করনিক’ নিগড়ের পায়,  ভয়েতে মাননি হার |
অচল অটল অগ্নিগর্ভ আগ্নেয়গিরি তুমি
উড়িয়া ধন্য ক’রেছিলে  এই ভীরুর জন্মভূমি !
হে মহা-মৌনী, মরণেও তুমি মৌন মাধুরী পিয়া
নিয়েছ বিদায়, যাওনি মোদের ছল-করা গীতি নিয়া !
তোমার প্রয়াণে উঠিল না কবি দেশে কল-কল্লোল,
সুন্দর ! শুধু জুড়িয়া বসিলে মাতা সারদার কোল !
স্বর্গে বাদল মাদল বাজিল, বিজলী উঠিল মাতি’,
দেব-কুমারীরা হানিল বৃষ্টি-প্রসূন সারাটি রাতি !
কেহ নাহি জাগি’, অর্গল-দেওয়া সকল কুটীর দ্বারে
পুত্রহারার ক্রন্দন শুধু খুঁজিয়া ফিরিছে কারে |

নিশীথ-শ্মশানে অভাগিনী এক শ্বেত-বাস পরিহিতা,
ভাবিছে তাহারি সিঁদুর মুছিয়া কে জ্বালালো ঐ চিতা !
ভগবান ! তুমি চাহিতে পার কি ঐ দু’টি নারী পানে ?
জানি না, তোমায় বাঁচাবে কে যদি ওরা অভিশাপ হানে !

.                   **************



.                                                                             
পরে  

মিলনসাগর
*
ফণি মনসা , কাজী নজরুল ইসলাম

সত্যেন্দ্র-প্রয়াণ-গীতি

চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল এসেছিল পথ ভুলে,
.           ওগো           এই গঙ্গার কূলে !
দিশাহারা মাতা দিশা পেয়ে তাই নিয়ে গেছে কোলে তুলে
.           ওগো            এই গঙ্গার কূলে ||
.            চপল চরণ বেণু-বীণে তা’র
.            সুর বেঁধে শুধু দিল ঝঙ্কার,
.            শেষ গান গাওয়া হ’লনাক’ আর,
.                   উঠিল চিত্ত দুলে,
তারি ডাক-নাম ধ’রে ডাকিল কে যেন অস্ত-তোরণ-মূলে,
.            ওগো              এই গঙ্গার কূলে ||


ওরে এ ঝোড়ো হাওয়ায় কারে ডেকে যায় এ কোন্ সর্বনাশী,
বিষাণ কবির গুমরি’ উঠিল,               বেসুরো বাজিল বাঁশী !
.               আঁখির সলিলে ঝল্ সানো আঁখি
.             কূলে কূলে ভ’রে উঠে থাকি’ থাকি’
.              মনে পড়ে কবে আহত এ-পাখী
.                       মৃত্যু-আফিম-ফুলে,
কোন্ ঝড়-বাদলের এমনি নিশীথে প’ড়েছিল ঘুমে ঢুলে |
.                 ওগো             এই গঙ্গার কূলে ||

তার ঘরের বাঁধন সহিল না সে যে চির বন্ধন-হারা,
তাই ছন্দ-পাগলে কোলে নিয়ে দোলে জননীর মুক্তধারা !
.                  ও  সে           আলো দিয়ে গেল আপনারে দহি’,
.                        অমৃত বিলালো বিষ-জ্বালা সহি,
.               শেষে শান্তি মাগিল ব্যথা-বিদ্রোহী
.                        চিতায় অগ্নি-শূলে !
পূনঃ      নব-বীণা-করে আসিবে বলিয়া এই শ্যাম তরুমূলে  |
.                   ওগো           এই গঙ্গার কূলে ||


.                   **************



.                                                                             
পরে  

মিলনসাগর
*
ফণি মনসা , কাজী নজরুল ইসলাম

অন্তর-ন্যাশনাল-সঙ্গীত    

জাগো---
.        জাগো অনশন-বন্দী, ওঠ রে যত
.        জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত !
যত        অত্যাচারে আজি বজ্র হানি’
হাঁকে        নিপীড়িত-জন-মন-মথিত বাণী,
সব        জনম লভি’ অভিনব ধরণী
.                        ওরে ওই আগত ||


আদি        শৃঙ্খল সনাতন শাস্ত্র-আচার
মূল        সর্বনাশেরে,  এবে ভাঙিব এবার!
.        ভেদি’                দৈত্য-কারা
.        আয়                সর্বহারা !
কেহ        রহিবে না আর পর-পদ-আনত ||



কোরাস্ :

.         নব ভিত্তি’ পরে
নব        নবীন জগৎ হবে উথ্বিত রে !
শোন্        অত্যাচারী ! শোন্ রে সঞ্চয়ী !
.        ছিনু সর্বহারা, হব সর্বজয়ী !
.                        এই সংগ্রাম-মাঝ,
ওরে        সর্বশেষের এই সংগ্রাম মাঝ,
নিজ        নিজ অধিকার জুড়ে দাঁড়া সবে আজ !
এই        অন্তর-ন্যাশনাল-সংহতি’ রে !
.        হবে নিখিল-মানব-জাতি সমুদ্ধত ||


.                   **************



.                                                                             
পরে  

মিলনসাগর
*
ফণি মনসা , কাজী নজরুল ইসলাম

পথের দিশা

চারদিকে এই গুন্ডা এবং বদ্ মায়েশির আখ্ ড়া দিয়ে
রে অগ্রদূত, চ’লতে কি তুই পারবি আপন প্রাণ বাঁচিয়ে ?
পারবি যেতে ভেদ ক’রে এই চক্র-পথের চক্রব্যূহ ?
উঠবি কি তুই পাষাম ফুঁড়ে বনস্পতি মহীরুহ ?
আজকে প্রাণের গো-ভাগাড়ে উড়ছে শুধু চিল-শকুনি,
এর মাঝে তুই আলোক-শিশু কোন্ অভিযান ক’রবি, শুনি ?
ছুঁড়ছে পাথর, ছিটায় কাদা, কদর্যের এই হোরী-খেলায়
শুভ্র মুখে মাখিয়ে কালি ভোজপুরীদের হট্টমেলায় !
বাঙ্ লা দেশও মাত্ ল কি রে ? তপস্যা তার ভুল্ লো অরুণ ?
তাড়িখানার চীত্কারে কি নাম্ ল ধূলায় ইন্দ্র বরুণ ?
ব্যাগ্র-পরাণ অগ্রপথিক, কোন্ বাণী তোর শুনাতে সাধ ?
মন্ত্র কি তোর শুনতে দেবে নিন্দাবাদীর ঢক্কা-নিনাদ ?

নর-নারী আজ কন্ঠ ফেড়ে কুত্সা-গানের কোরাস্ ধ’রে
ভাবছে তারা সুন্দরেরই জয়ধ্বনি ক’রছে জোরে ?
এর মাঝে কি খবর পেলি নব-বিপ্লব-ঘোড়সওয়ারী
আসছে কেহ ? টুট্ ল তিমির, খুল্ ল দুয়ার পূব-দুয়ারী ?
ভগবান আজ ভূত হ’ল যে প’ড়ে দশ চক্র ফেরে,
যবন এবং কাফের মিলে হায় বেচারায়  ফির্ ছে তেড়ে !
বাঁচাতে তাই আস্ ছে কি রে নতুন যুগের মানুষ কেহ ?
ধূলায় মলিন, রিক্তাভরণ, ,সিক্ত আঁখি, রক্ত দেহ ?
মস্ জিদ আর মন্দির ঐ শয়তানদের মন্ত্রণাগার,
রে অগ্রদূত, ভাঙতে এবার আসছে কি জাঠ কালাপাহাড় ?
জানিস যদি, খবর শোনা বন্ধ খাঁচার ঘেরাটোপে,
উড়ছে আজো ধর্ম-ধ্বজা টিকির গিঁঠে দাড়ির ঝোপে !

নিন্দাবাদের বৃন্দাবনে ভেবেছিলাম গাইব না গান,
থাকতে নারি দেখে শুনে সুন্দরের এই হীন অপমান |
ক্রুদ্ধ রোষে রুদ্ধ ব্যথায় ফোঁপায় প্রাণে ক্ষুব্ধ বাণী,
মাতালদের ঐ ভাঁটিশালায় নটিনী আজ বীণাপাণি !
জাতির পরান-সিন্ধু  মথি’ স্বার্থ-লোভী পিশাচ যারা
সুধার পাত্র লক্ষ্মীলাভের ক’রতেছে ভাগ বাঁটোয়ারা,
বিষ যখন আজ উঠল শেষে তখন কারুর পাইনে দিশা,
বিষের জ্বালায় বিশ্ব পুড়ে, স্বর্গে তাঁরা মেটান তৃষা !
শ্মশান-শবের ছাইয়ের গাদায় আজকে রে তাই বেড়াই খুঁজে,
ভাঙন-দেব আজ ভাঙের নেশায় কোথায় আছে চক্ষু বুজে!
রে অগ্রদূত, তরুণ মনের গহন বনের রে সন্ধানী,
আনিস খবর, কোথায় আমার যুগান্তরের খড়্গপাণি !


.                   **************



.                                                                             
পরে  

মিলনসাগর
*
ফণি মনসা , কাজী নজরুল ইসলাম

হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ

মাভৈঃ মাভৈঃ এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণ,
সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান গোরস্থান !
.        ছিল যারা চির-মরণ আহত,
.        উঠিয়াছে জাগি’ ব্যথা-জাগ্রত,
খালেদ আবার ধরিয়াছে অসি, অর্জুন ছোঁড়ে বাণ !
জেগেছে ভারত, ধরিয়াছে লাঠি হিন্দু-মুসলমান !

মরিছে হিন্দু, মরে মুসলিম এ উহার ঘায়ে আজ,
বেঁচে আছে যারা মরিতেছে তারা, এ-মরণে নাহি লাজ !
.        জেগেছে শক্তি তাই হানাহানি,
.        অস্ত্রে অস্ত্রে নব জানাজানি !
আজি পরীক্ষা -----কাহার দস্ত্ হয়েছে, কত দরাজ !
কে মরিবে কাল সন্মুখ-রণে, মরিতে কা’রা নারাজ !

মূর্চ্ছাতরের কন্ঠে শুনে যা জীবনের কোলাহল,
উঠিবে অমৃত গদেরী নাই আর, উঠিয়াছে হলাহল !
.        থামিস্ নে তোরা, চালা মন্থন !
.        উঠেছে কাফের, উঠেছে যবন ;
উঠিবে এবার সত্য হিন্দু-মুস্ লিম মহাবল |
জেগেছিস তোরা, জেগেছে বিধাতা, ন’ড়েছে খোদার কল !
আজি ওস্তাদে সাগ্ রেদে যেন শক্তির পরিচয় !
মেরে মেরে কাল করিতেছে ভীরু-ভারতের নির্ভয় !
.        হেরিতেছে কাল,----কব্ জি কি মুঠি
.        ঈষৎ আঘাতে পড়ে কি-না টুটি’
মারিতে মারিতে কে হ’ল যোগ্য, কে করিবে রণ-জয় !
এ ‘মক্ ফাইটে’ কোনো সেনানীর বুদ্ধি হয়নি লয় !

ক’ ফোঁটা রক্ত দেখিয়া কে বীর টানিতেছে লেপ-কাঁথা !
ফেলে রেখে অসি মাখিয়াছে মসী বকিছে প্রলাপ যা-তা !
.        হায়, এই সব দুর্বল-চেতা,
.        হবে অনাগত বিপ্লব-নেতা !
ঝড় সাইক্লোনে কি করিবে এরা !   ঘূর্ণিতে ঘোরে মাথা ?
রক্ত-সিন্ধু সাঁতারিবে কা’রা-----করে পরীক্ষা ধাতা !

তোদেরি আঘাতে টুটেছে তোদের মন্দির মস্ জিদ্,
পরাধীনদের কুলষিত ক’রে উঠেছিল যার ভিত !
.        খোদা খোদ যেন করিতেছে লয়
.        পরাধীনদের উপাসনালয় !
স্বাধীন হাতের পূত মাটি দিয়া রচিবে বেদী শহীদ !
টুটিয়াছে চূড়া ? ওরে ঐ সাথে টুটেছে তোদের নিদ !

কে কাহারে মারে, ঘোচেনি ধন্দ, টুটেনি অন্ধকার,
জানে না আঁধারে শত্রু ভাবিয়া আত্মীয়ে হানে মার !
.        উদিবে অরুণ, ঘুচিবে ধন্দ,
.        ফুটিবে দৃষ্টি, টুটিবে বন্ধ,
হেরিবে মেরেছে আপনার ভায়ে বন্ধ করিয়া দ্বার !
ভারত-ভাগ্য ক’রেছে আহত ত্রিশূল ও তরবার !

যে লাঠিতে আজ টুটে গম্বুজ, পড়ে মন্দির চূড়া,
সেই লাঠি কালি প্রভাতে করিবে শত্রু-দুর্গ গুঁড়া !
.        প্রভাতে হবে না ভায়ে-ভায়ে রণ,
.        চিনিবে শত্রু, চিনিবে স্বজন !
করুক কলহ-----জেগেছে তো তবু----বিজয়-কেতন উড়া !
ল্যাজে তোর যদি  লেগেছে আগুন, স্বর্ণলঙ্কা-পুড়া !


.                   **************



.                                                                             
পরে  

মিলনসাগর