ভজ পতিত উদ্ধারণ শ্রীগৌরহরি কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯১৬ সালে প্রকাশিত, হরিলাল চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীপদরত্ন-মালা”, ৭০-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এই পদটিতে গোবিন্দ দাস ও নরোত্তম দাস, দুজনেরই ভণিতা রয়েছে। ব্রজমোহন দাস তাঁর “বৈষ্ণব সেবা আরতি ও কীর্ত্তন পদাবলী ও নিত্যক্রিয়া পদ্ধতি” গ্রন্থে জানিয়েছেন যে এই গোবিন্দ দাস ছিলেন ঈশ্বর পুরীর শিষ্য।
কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য অবতার চৌত্রিশ পদাবলী কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত, জগবন্ধু ভদ্র সংকলিত, মৃণালকান্তি ঘোষ সম্পাদিত, পদাবলী সংকলন ”শ্রীগৌরপদ-তরঙ্গিণী”, (প্রথম সংস্করণ ১৯০২), ৩৬৩-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। বৈষ্ণবগণের কার্ত্তিকমাসের নামসংকীর্ত্তন। এই পদটি যে কোনো দশকর্মা- ভাণ্ডারে প্রাপ্ত "শ্রীশ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম" পুস্তিকায় "চৌত্রিশ পদাবলী" নামে খ্যাত।
॥ যথারাগ॥
ক, কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য অবতার। খ, খেলিবার প্রবন্ধে কৈল খোল করতাল॥ গ, গড়াগড়ি যান প্রভু নিজ সংকীর্ত্তনে। ঘ, ঘরে ঘরে হরিনাম দেন সর্ব্বজনে॥ ঙ, উচ্চৈঃস্বরে কাঁদে প্রভু জীবের লাগিয়া। চ, চেতন করান প্রভু কৃষ্ণনাম দিয়া॥ ছ, ছল ছল করে আঁখি নয়নের জলে। জ, জহত পবিত্র কৈল গৌরকলেবরে॥ ঝ, ঝল ঝল মুখ যেন পূর্ণ শশধর। ঞ, এমত ত দেখি নাই দয়ারসাগর॥ ট, টলমল করে অঙ্গ ভাবেতে বিভোল। ঠ, ঠমকে ঠমকে চলে বলে হরিবোল॥ ড, ডোরহি কৌপীন ক্ষীণ কোটির উপরে। ঢ, ঢলিয়া ঢলিয়া পড়ে গদাধরের ক্রোড়ে॥ ণ, আন পরসঙ্গ গোরা না শুনে শ্রবণে। ত, তান মান গান রসে মজাইয়া মনে॥ থ, থির নাহি হয় প্রভুর নয়নের জল। দ, দীনহীন জনেরে ধরিয়া দেয় কোল॥ ধ, ধেয়াইয়া পূরব পিরীতি পরসঙ্গ। ন, না জানি কাহার ভাবে হইলা ত্রিভঙ্গ॥ প, প্রেমরসে ভাসাইয়া অখিল সংসার। ফ, ফুটল শ্রীবৃন্দাবন সুরধুনী ধার॥ ব, ব্রহ্মা মহেশ্বর যারে করে অন্বেষণ। ভ, ভাবিয়া না পান যাঁরে সহস্রলোচন॥ ম, মত্তমাতঙ্গ-গতি মধুর মৃদু হাস। য, যশোমতি মাতা যাঁর ভুবনে প্রকাশ॥ র, রতিপতি জিনি রূপ অতি মনোরম। ল, লীলা লাবণ্য যাঁর অতি অনুপম॥ ব, বসুদেবসুত সেই শ্রীনন্দনন্দন। শ, শচীর নন্দন এবে বলে সর্ব্বজন॥ ষ, ষড়ভুজ রূপ হৈলা অত্যাশ্চর্য্যময়। স, সাবধান প্রাণনাথ গোরা রসময়॥ হ, হরি হরি বল ভাই কর মহাযজ্ঞ। ক্ষ, ক্ষিতিতলে জন্মি কেহ না হৈয় অবিজ্ঞ . এ চৌত্রিশ পদাবলী যে করে কীর্ত্তন। . দাস নরোত্তম মাগে তাহার চরণ॥
টীকা - এই পদ ও পরবর্ত্তী চারিটী পদ, বৈষ্ণবেরা কার্ত্তিকমাসে নামসংকীর্ত্তনরূপ দ্বারে দ্বারে খঞ্জরি ও করতাল সহ গান করিয়া থাকেন, অতএব আমরা এই পাঁচটী পদ এই স্থানে গ্রহণ করিলাম।---জগবন্ধু ভদ্র, মৃণালকান্তি ঘোষ, গৌরপদ-তরঙ্গিণী, ৩৬৩-পৃষ্ঠা॥
সেই পাঁচটি পদ হল - প্রেমদাসের “অশেষ গুণের নিধি গৌরাঙ্গসুন্দর”, নরোত্তম দাসের “কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য অবতার”, শচীনন্দনের “জয় জয় গৌরহরি শচীনন্দন”, দ্বিজ হরিদাসের “ভাদ্রকৃষ্ণা-অষ্টমীতে দেবকী উদরে” এবং নরোত্তম দাসের “প্রণমহ কলিযুগ সর্ব্বযুগসার”।
যখন কৃষ্ণ জন্ম নিল দৈবকী উদরে। মথুরাতে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করে॥ বসুদেব রাখি এল নন্দের মন্দিরে। নন্দের আলয়ে কৃষ্ণ দিনে দিনে বাড়ে॥ শ্রীনন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন। ১ যশোদা রাখিল নাম যাদু বাছাধন॥ ২ উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল। ৩ ব্রজবালক নাম রাখে ঠাকুর রাখাল॥ ৪ সুবল রাখিল নাম ঠাকুর কানাই। ৫ শ্রীদাম রাখিল নাম রাখাল রাজা ভাই॥ ৬ ননীচোরা নাম রাখে যতেক গোপিনী। ৭ কালসোনা নাম রাখে রাধা-বিনোদিনী॥ ৮ কুব্জা রাখিল নাম পতিত-পাবন হরি। ৯ চন্দ্রাবলী নাম রাখে মোহন-বংশীধারী॥ ১০ অনন্ত রাখিল নাম অন্ত না পাইয়া। ১১ কৃষ্ণ নাম রাখে গর্গ ধ্যানেতে জানিয়া॥ ১২ কণ্বমুনি নাম রাখে দেব-চক্রপাণি। ১৩ বনমালী নাম রাখে বনের হরিণী ॥ ১৪ গজদন্তী নাম রাখে শ্রীমধুসূদন। ১৫ অজামিল নাম রাখে দেব নারায়ণ॥ ১৬ পুরন্দর নাম রাখে দেব শ্রীগোবিন্দ। ১৭ দ্রৌপদী রাখিল নাম দেব দীনবন্ধু॥ ১৮ সুদাম রাখিল নাম দারিদ্র-ভঞ্জন। ১৯ ব্রজবাসী নাম রাখে ব্রজের জীবন॥ ২০ দর্পহারী নাম রাখে অর্জ্জুন সুধীর। ২১ পশুপতি নাম রাখে গরুড় মহাবীর॥ ২২ যুধিষ্ঠির নাম রাখে দেব যদুবর। ২৩ বিদুর রাখিল নাম কাঙাল ঈশ্বর॥ ২৪ বাসুকি রাখিল নাম দেব-সৃষ্টি-স্থিতি। ২৫ ধ্রুবলোকে নাম রাখে ধ্রুবের সারথি॥ ২৬ নারদ রাখিল নাম ভক্ত প্রাণধন। ২৭ ভীষ্মদেব নাম রাখে লক্ষ্মী-নারায়ণ॥ ২৮ সত্যভামা নাম রাখে সত্যের সারথি। ২৯ জাম্বুবতী নাম রাখে দেব যোদ্ধাপতি॥ ৩০ বিশ্বামিত্র নাম রাখে সংসারের সার । ৩১ অহল্যা রাখিল নাম পাষাণ-উদ্ধার॥ ৩২ ভৃগুমুনি নাম রাখে জগতের হরি। ৩৩ পঞ্চমুখে রামনাম গান ত্রিপুরারি॥ ৩৪ কুঞ্জকেশী নাম রাখে বলী সদাচারী। ৩৫ প্রহ্লাদ রাখিল নাম নৃসিংহ-মুরারি ॥ ৩৬ বশিষ্ঠ রাখিল নাম মুনি-মনোহর। ৩৭ বিশ্বাবসু নাম রাখে নব-জলধর॥ ৩৮ সম্বর্ত্তক রাখে নাম গোবর্দ্ধনধারী। ৩৯ প্রাণপতি নাম রাখে যত ব্রজনারী॥ ৪০ অদিতি রাখিল নাম অরাতি-সূদন । ৪১ গদাধর নাম রাখে যমল-অর্জ্জুন॥ ৪২ মহাযোদ্ধা নাম রাখে ভীম মহাবল। ৪৩ দয়ানিধি নাম রাখে দরিদ্র সকল॥ ৪৪ বৃন্দাবনচন্দ্র নাম রাখে বৃন্দাদূতী । ৪৫ বিরজা রাখিল নাম যমুনার পতি॥ ৪৬ বাণীপতি নাম রাখে গুরু বৃহস্পতি। ৪৭ লক্ষ্মীপতি নাম রাখে সুমন্ত্র-সারথি॥ ৪৮ সন্দীপনী নাম রাখে দেব অন্তর্যামী। ৪৯ পরাশর নাম রাখে ত্রিলোকের স্বামী॥ ৫০ পদ্মযোনি নাম রাখে অনাদির আদি। ৫১ নট-নারায়ণ নাম রাখিল সম্পাতি॥ ৫২ হরেকৃষ্ণ নাম রাখে প্রিয় বলরাম। ৫৩ ললিতা রাখিল নাম দূর্ব্বাদল শ্যাম॥ ৫৪ বিশাখা রাখিল নাম অনঙ্গমোহন। ৫৫ সুচিত্রা রাখিল নাম শ্রীবংশীবদন॥ ৫৬ আয়ান রাখিল নাম ক্রোধ-নিবারণ। ৫৭ চন্ডকেশী নাম রাখে কৃতান্ত-শাসন॥ ৫৮ জ্যোতিষ্ক রাখিল নাম নীলকান্তমণি। ৫৯ গোপীকান্ত নাম রাখে সুদাম-ঘরণী ॥ ৬০ ভক্ত গণ নাম রাখে দেব জগন্নাথ। ৬১ দুর্ব্বাসা রাখেন নাম অনাথের নাথ॥ ৬২ রাসেশ্বর নাম রাখে যতেক মালিনী । ৬৩ সর্ব্বযজ্ঞেশ্বর নাম রাখেন শিবানী ॥ ৬৪ উদ্ধব রাখিল নাম মিত্র-হিতকারী। ৬৫ অক্রূর রাখিল নাম ভব-ভয়হারী ॥ ৬৬ গুঞ্জমালী নাম রাখে নীল-পীতবাস। ৬৭ সর্ব্ববেত্তা নাম রাখে দ্বৈপায়ন ব্যাস ॥ ৬৮ অষ্টসখী নাম রাখে ব্রজের ঈশ্বর। ৬৯ সুরলোকে নাম রাখে অখিলের সার॥ ৭০ বৃষভানু নাম রাখে পরম-ঈশ্বর। ৭১ স্বর্গবাসী নাম রাখে সর্ব্ব পারাত্পর॥ ৭২ পুলোমা রাখেন নাম অনাথের সখা। ৭৩ রসসিন্ধু নাম রাখে সখী চিত্রলেখা॥ ৭৪ চিত্ররথ নাম রাখে অরাতি-দমন। ৭৫ পুলস্ত্য রাখিল নাম নয়ন-রঞ্জন॥ ৭৬ কশ্যপ রাখেন নাম রাস-রাসেশ্বর। ৭৭ ভান্ডারীক নাম রাখে পূর্ণ শশধর॥ ৭৮ সুমালী রাখিল নাম পুরুষ-প্রধান। ৭৯ পুরঞ্জন নাম রাখে ভক্তগণ-প্রাণ॥ ৮০ রজকিনী নাম রাখে নন্দের দুলাল। ৮১ আহ্লাদিনী নাম রাখে ব্রজের গোপাল ॥ ৮২ দেবকী রাখিল নাম নয়নের মণি। ৮৩ জ্যোতির্ময় নাম রাখে যাজ্ঞবল্ক্য মুনি॥ ৮৪ অত্রিমুনি নাম রাখে কোটি চন্দ্রেশ্বর। ৮৫ গৌতম রাখিল নাম দেব বিশ্বম্ভর॥ ৮৬ মরীচি রাখিল নাম অচিন্ত্য-অচ্যুত । ৮৭ জ্ঞানাতীত নাম রাখে সৌনকাদি-সুত॥ ৮৮ রুদ্রগণ নাম রাখে দেব মহাকাল । ৮৯ বসুগণ নাম রাখে ঠাকুর দয়াল॥ ৯০ সিদ্ধগণ নাম রাখে পুতনা-নাশন । ৯১ সিদ্ধার্থ রাখিল নাম কপিল তপোধন॥ ৯২ ভাগুরি রাখিল নাম অগতির গতি। ৯৩ মত্স্যগন্ধা নাম রাখে ত্রিলোকের পতি॥ ৯৪ শুক্রাচার্য্য রাখে নাম অখিল-বান্ধব। ৯৫ বিষ্ণুলোকে নাম রাখে শ্রীমাধব॥ ৯৬ যদুগণ নাম রাখে যদুকুলপতি। ৯৭ অশ্বিনীকুমার নাম রাখে সৃষ্টি-স্থিতি ॥ ৯৮ অর্য্যমা রাখিল নাম কাল-নিবারণ। ৯৯ সত্যবতী নাম রাখে অজ্ঞান-নাশন॥ ১০০ পদ্মাক্ষ রাখিল নাম ভ্রমর-ভ্রমরী । ১০১ ত্রিভঙ্গ রাখিল নাম যত সহচরী ॥ ১০২ বঙ্কচন্দ্র নাম রাখে শ্রীরূপমঞ্জরী । ১০৩ মাধুরী রাখিল নাম গোপী-মনোহারী ॥ ১০৪ মঞ্জুমালী নাম রাখে অভীষ্ট পূরণ। ১০৫ কুটিলা রাখিল নাম মদনমোহন ॥ ১০৬ মঞ্জরী রাখিল নাম কর্ম্মবন্ধ-নাশ। ১০৭ ব্রজবধূ নাম রাখে পূর্ণ অভিলাষ॥ ১০৮
দৈত্যারি দ্বারকানাথ দারিদ্য-ভঞ্জন। দয়াময় দ্রৌপদীর লজ্জা-নিবারণ॥ স্বরূপে সবার হয় গোলোকেতে স্থিতি। বৈকুন্ঠে বৈকুন্ঠনাথ কমলার পতি॥ রসময় রসিক নাগর অনুপম। নিকুঞ্জবিহারী হরি নবঘনশ্যাম॥ শালগ্রাম দামোদর শ্রীপতি শ্রীধর। তারকব্রহ্ম সনাতন পরম-ঈশ্বর॥ কল্পতরু কমললোচন হৃষীকেশ। পতিত-পাবন গুরু জ্ঞান উপদেশ॥ চিন্তামণি চতুর্ভূজদেব চক্রপাণি। দীনবন্ধু দেবকীনন্দন যদুমণি॥ অনন্ত কৃষ্ণের নাম অনন্ত মহিমা। নারদাদি ব্যাসদেব দিতে নারে সীমা॥ নাম ভজ নাম চিন্ত নাম কর সার। অনন্ত কৃষ্ণের মহিমা অপার॥ শতভার সুবর্ণ গো কোটি কন্যাদান। তথাপি না হয় কৃষ্ণ নামের সমান॥ যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি । নামের সহিত আছে আপনি শ্রীহরি॥ শুন শুন ওরে ভাই নাম সংকীর্ত্তন। যে নাম শ্রবণে হয় পাপ বিমোচন॥ কৃষ্ণনাম হরিনাম বড়ই মধুর। যেই জন কৃষ্ণ ভজে সে বড় চতুর॥ ব্রহ্মা-আদি দেব যারে ধ্যানে নাহি পায় । সে ধনে বঞ্চিত হলে কি হবে উপায়॥ হিরণ্যকশিপুর উদর-বিদারণ। প্রহ্লাদে করিলা রক্ষা দেব নারায়ণ॥ বলীরে ছলিতে প্রভু হইলা বামন। দ্রৌপদীর লজ্জা হরি কৈলা নিবারণ॥ অষ্টোত্তর শতনাম যে করে পঠন। অনায়াসে পায় রাধা-কৃষ্ণের চরণ॥ ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণ কর নন্দের নন্দন। মথুরায় কংস-ধ্বংস লঙ্কায় রাবণ॥ বকাসুর বধ আদি কালিয় দমন। নরোত্তম কহে এই নাম সংকীর্ত্তন॥
নন্দঘোষ খুইলা নাম শ্রীনন্দনন্দন। যশোদা রাখিলেন নাম যাদু বাছাধন॥ উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল। ব্রজবালক নাম রাখে ঠাকুর রাখাল॥ সুবল রাখিলা নাম ঠাকুর কানাই। শ্রীদাম রাখিলা নাম রাখালরাজা ভাই॥ ননীচোরা নাম রাখে যতেক গোপিনী। কেলেসোনা নাম রাখে রাধা বিনোদিনী॥ কুব্জা রাখিলা নাম পতিতপাবন হরি। চন্দ্রাবলী থুইলা নাম মোহন বংশীধারী॥ অনন্ত রাখিলা নাম অন্ত না পাইয়া। কৃষ্ণনাম রাখে গর্গ ধ্যানেতে জানিয়া॥ কণ্বমুণি নাম রাখে দেব চক্রপাণি। বনমালী নাম রাখে বনের হরিণী॥ গজহস্তী নাম রাখে শ্রীমধুসূদন। অজামিল নাম রাখে দেব নারায়ণ॥ পুরন্দর নাম রাখেন দেব শ্রীগোবিন্দ। কুন্তীদেবী রাখে নাম পাণ্ডব-আনন্দ॥ দ্রৌপদী রাখিলা নাম দেব দীনবন্ধু। পাপী তাপী নাম রাখে করুণার সিন্ধু॥ সুদাম রাখিলা নাম দারিদ্র্যভঞ্জন। ব্রজবাসী নাম রেখে ব্রজের জীবন॥ দর্পহারী নাম রাখে অর্জ্জুন সুধীর। পশুপতি নাম রাখে খগরাজবীর॥ যুধিষ্ঠীর নাম রাখে দেব যদুবর। বিদুর রাখিলা নাম কাঙ্গালের ঠাকুর॥ বাসুকী রাখিলা নাম দেব সৃষ্টিস্থিতি। ধ্রুবলোকে নাম রাখে ধ্রুবের সারথি॥ নারদ রাখিলা নাম ভক্ত-প্রাণধন। ভীষ্মদেব নাম রাখে লক্ষ্মী-নারায়ণ॥ সত্যভামা নাম রাখে সত্যের সারথি। জাম্বুবতী নাম রাখে দেব যোদ্ধাপতি॥ বিশ্বামিত্র রাখে নাম সংসারের সার। অহল্যা রাখিল নাম পাষাণ-উদ্ধার॥ ভৃগুমুনি নাম রাখে জগতের হরি। পঞ্চমুখে রামনাম জপে ত্রিপুরারি॥ কুঞ্জকেশী নাম রাখে বলি সদাচারী। প্রহ্লাদ রাখিলা নাম নৃসিংহ মুরারি॥ দ্যৈত্যারি দ্বারকানাথ দারিদ্র্য-ভঞ্জন। দয়াময় দ্রৌপদীর লজ্জা নিবারণ॥ স্বরূপে সভার হয় গোলোকেতে স্থিতি। বৈকুণ্ঠে ক্ষীরোদশায়ী কমলার পতি॥ রসময় নাগরিক নাগর অনুপাম। নিকুঞ্জবিহারী হরি নবঘনশ্যাম॥ শালগ্রাম দামোদর শ্রীপতি শ্রীধর। তারকব্রহ্ম সনাতন পরম ঈশ্বর॥ কল্পতরু কমললোচন হৃষীকেশ। পতিতপাবন গুরু জ্ঞান উপদেশ॥ চিন্তামণি চতুর্ভুজ দেব চক্রপাণি। দীনবন্ধু দেবকীনন্দন যদুমণি॥ অনন্ত কৃষ্ণের নাম অনন্ত মহিমা। নারদাদি ব্যাসদেব দিতে নারে সীমা॥ নাম ভজ নাম চিন্ত নাম কর সার। অনন্ত কৃষ্ণের নাম মহিমা অপার॥ শঙ্খভরি সুবর্ণ১ গোকোটি কর২ দান। তথাপি না হয় কৃষ্ণনামের সমান॥ যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি। নামের সহিত আছেন আপনি শ্রীহরি॥* ব্রহ্মা আদি দেব যারে ধ্যানে নাহি পায়। সে হরি বঞ্চিত হৈলে কি হবে উপায়॥ হিরণ্যকশিপুর উদরবিদারণ। প্রহ্লাদে করিলা রক্ষা দেব নারায়ণ॥ বলিরে ছলিতে প্রভু হইলা বামন। দ্রৌপদীর লজ্জা হরি কৈলা নিবারণ॥ অষ্টোত্তর শত নাম যে করে পঠন। অনায়াসে পায় রাধা-কৃষ্ণের চরণ॥ ভক্তবাঞ্ছা পূর্ণ কর নন্দের নন্দন। মথুরায় কংসধ্বংস লঙ্কায় রাবণ॥ বকাসুর বধ আদি কালিয়দমন। দ্বিজহরিদাস কহে নাম সংকীর্ত্তন॥
টীকা - পাঠান্তর - ১। শততার সুবর্ণ। ২। কন্যা - পাঠান্তর। * এই চিহ্নের পর কোন কোন গ্রন্থে এই চারি পংক্তি আছে :--- শুন শুন ওরে ভাই নাম সংকীর্ত্তন। যে নাম শ্রবণে হয় পাপ বিমোচন॥ কৃষ্ণ নাম ভজ জীব আর সব মিছে। পলাইতে পথ নাই যম আছে পিছে॥---জগবন্ধু ভদ্র, মৃণালকান্তি ঘোষ, গৌরপদতরঙ্গিণী, ৩৬৬-পৃষ্ঠা॥
এই পদ ও পরবর্ত্তী চারিটী পদ, বৈষ্ণবেরা কার্ত্তিকমাসে নামসংকীর্ত্তনরূপ দ্বারে দ্বারে খঞ্জরি ও করতাল সহ গান করিয়া থাকেন, অতএব আমরা এই পাঁচটী পদ এই স্থানে গ্রহণ করিলাম।---জগবন্ধু ভদ্র, মৃণালকান্তি ঘোষ, গৌরপদ-তরঙ্গিণী, ৩৬৩-পৃষ্ঠা॥ সেই পাঁচটি পদ হল - প্রেমদাসের “অশেষ গুণের নিধি গৌরাঙ্গসুন্দর”, নরোত্তম দাসের “কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য অবতার”, শচীনন্দনের “জয় জয় গৌরহরি শচীনন্দন”, দ্বিজ হরিদাসের “ভাদ্রকৃষ্ণা-অষ্টমীতে দেবকী উদরে” এবং নরোত্তম দাসের “প্রণমহ কলিযুগ সর্ব্বযুগসার”।
প্রণমহ কলিযুগ সর্ব্বযুগসার। হরিনাম সংকীর্ত্তন যাহাতে প্রচার॥ কলি ঘোর-পাপাচ্ছন্ন অন্ধকারময়। পূর্ণশশধর ভেল চৈতন্য তাহায়॥ শচী-গর্ভসিন্ধু মাঝে চন্দ্রের প্রকাশ। পাপ তাপ দূরে গেল তিমিরবিনাশ॥ ভকত-চকোর তায় মধুপান কৈল। অমিয়া মথিয়া তাহা বিস্তার করিল॥ পূর্ণকুম্ভ নিত্যানন্দ অবধৌতরায়। ইচ্ছা ভরি পান কৈলা অদ্বৈত তাহায়॥ ঢাসিয়া ঢালিয়া খায় আর যত জন। প্রেমদাতা নিতাইচাঁদ পতিতপাবন॥ প্রেমের সমুদ্র ভেল চৈতন্য গোসাঞী। নদী নালা সব আসি হৈল একঠাঁই॥ পরিপূর্ণ হৈয়া বহে প্রেমামৃত ধারা। হরিদাস পাতিল তাহে নাম নৌকা পারা॥ সংকীর্ত্তন-ঢেউ তাহে তরঙ্গ বাড়িল। ভকত-মকর তাহে ডুবিয়া রহিল॥ তৃণকপি ভাসে যত পাষণ্ডীর গণ। ফাঁফরে পড়িয়া তারা ভাবে মনে মন॥ হরিনামের নৌকা করি নিতাই সাজিল। দাঁড় ধরি হরিদাস বাহিয়া চলিল॥ প্রেমের পাথারে নৌকা ছাড়ি গেল যবে। কূল পাব বলি কেহ নৌকা ধরে লোভে॥ চৈতন্যের ঘাটে নৌকা চলিল যখন। হাটের পত্তন নিতাই রচিল তখন॥ ঘাটের উপরে হাট খানা বসাইল। পাষণ্ড দলন নাম নিশান গাড়িল॥ চারিদিকে চারিরস কুঠরি পূরিয়া। হরিনাম দিল তার চৌদিকে বেড়িয়া॥ চৌকিদার হরিদাস ফুকারে ঘনে ঘন। হাট করি বেচে কিনে যার যেই মন॥ হাটে বসি রাজা হৈল প্রভু নিত্যানন্দ। মুচ্ছদ্দি হইল তাহে মুরারি মুকুন্দ॥ চৈতন্য ভাণ্ডারী আর পণ্ডিত গদাই। অদ্বৈত মুন্ সি ভেল দামোদর পরখাই॥ প্রেমের রমণী ভেল দাস নরহরি। চৈতন্যের হাটে ফিরে লইয়া গাগরী॥ ঠাকুর অভিরাম আইলা হাসিয়া হাসিয়া। কৃষ্ণপ্রেমে মত্ত হৈয়া ফিরেন গর্জ্জিয়া॥ আর যত ভক্ত আইল মণ্ডলি করিয়া। হাট মধ্যে বৈসে সব সদাগর হইয়া॥ দাঁড়ি ধরি গৌরীদাস পণ্ডিত ঠাকুর। তৌল করি ফিরেন প্রেম যার যত দূর॥ শ্রীবাস শিবানন্দ লিখেন দুই জন। এইমত প্রেম-সিন্ধু-হাটের পত্তন॥ সংকীর্ত্তনরূপ মদ হাটে বিকাইল। রাজ-আজ্ঞামতে বংশী-আদি পান কৈল॥ পান করি মত্ত সবে হইল বিভোল। নিতাই চৈতন্যের হাটে হরি হরি বোল॥ দীনহীন দুরাচার কিছু নাহি মানে। ব্রহ্মার দুর্লভ প্রেম দিলা জনে জনে॥ এই মত গৌড়দেশে হাট বসাইয়া। নীলাচলে বাস কৈলা সন্ন্যাস করিয়া॥ তাহা যাঞা কৈল প্রভু প্রতাপ প্রচুর। সার্ব্বভৌম ভট্টাচার্য্যের দর্প কৈলা চূর॥ প্রতাপরুদ্রেরে কৃপা কৈলা গৌরহরি। রামানন্দ সঙ্গে দেখা তীর্থ গোদাবরী॥ হাট করি লেখা জোখা তুমার করিয়া। রামানন্দের কণ্ঠে থুইল ভাণ্ডার পূরিয়া॥ সনাতন রূপ যবে আসিয়া মিলিলা। ভাণ্ডার স্মউরি রূপ মোহর করিলা॥ মোহর লইয়া রূপ করিলা গমন। প্রভু পাঠাইল তারে শ্রীবৃন্দাবন॥ তাঁহা যাঞা কৈলা রূপ টাকশাল পত্তন। কারিগর আইলা যত স্বরূপের গণ॥ কারিগর হৈঞা রূপ অলঙ্কার কৈলা। ঠাকুর বৈষ্ণব যত হৃদয়ে ধরিলা॥ সোহাগা মিশ্রিত কৈলা রস পরখিয়া। গলিত কাঞ্চন ভেল প্রকাশ নদীয়া॥ পাঁজা করি শ্রীরূপ গোসাঞী যবে থুইলা। শ্রীজীব গোসাঞী তাহা গড়ন করিলা॥ থরে থরে অলঙ্কার বহুবিধ কৈল। সদাগর হৈয়া কেহ বেতন লইল॥ নরোত্তমদাস আর শ্রীশ্রীনিবাস। অলঙ্কার ঝালাইয়া করিল প্রকাশ॥ এই রস বশ দেখি সর্ব্বশাস্ত্রে কয়। লোক অনুসারে মিলে রূপের কৃপায়॥ শ্রীগুরুকৃপায় ইহা মিলিবে সর্ব্বথা। সংক্ষেপে কহিব কিছু এই সব কথা॥ প্রেমের হাট প্রেমের বাট প্রেমের তরঙ্গ। প্রেমাধীন গৌরচন্দ্র পূর্ব্বলীলারঙ্গ॥ প্রেমের সাগরে হংস শ্রীরূপ হইল। ক্ষীর নীর রত্নমণি পৃথক্ করিল॥ মুঞি অতি ক্ষুদ্র জীব অতিমন্দ ছার। কি জানি চৈতন্যলীলা সমুদ্র পাথার॥ শ্রীগুরুবৈষ্ণব পদ হৃদয়েতে ধরি। চৈতন্যের হাটে নিত্য ঝাড়ুগিরি করি॥ করুণাসাগর মোর গৌর নিত্যানন্দ। দাস নরোত্তম কহে হাটের প্রবন্ধ॥
টীকা - এই পদ ও পরবর্ত্তী চারিটী পদ, বৈষ্ণবেরা কার্ত্তিকমাসে নামসংকীর্ত্তনরূপ দ্বারে দ্বারে খঞ্জরি ও করতাল সহ গান করিয়া থাকেন, অতএব আমরা এই পাঁচটী পদ এই স্থানে গ্রহণ করিলাম।---জগবন্ধু ভদ্র, মৃণালকান্তি ঘোষ, গৌরপদ-তরঙ্গিণী, ৩৬৩-পৃষ্ঠা॥
সেই পাঁচটি পদ হল - প্রেমদাসের “অশেষ গুণের নিধি গৌরাঙ্গসুন্দর”, নরোত্তম দাসের “কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য অবতার”, শচীনন্দনের “জয় জয় গৌরহরি শচীনন্দন”, দ্বিজ হরিদাসের “ভাদ্রকৃষ্ণা-অষ্টমীতে দেবকী উদরে” এবং নরোত্তম দাসের “প্রণমহ কলিযুগ সর্ব্বযুগসার”।
মহামহা মহোত্সব সম্পূর্ণ কারণ কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯১৬ সালে প্রকাশিত, হরিলাল চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বৈষ্ণব পদাবলী সংকলন “শ্রীশ্রীপদরত্ন-মালা”, ৪৬৭-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে।
মূরতিশিঙ্গারিনী রাসবিহারিনী কবি নরোত্তম দাস এই পদটি চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা সমস্ত জীবন ধরে, ১৮৭০ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত এবং তাঁর পুত্র রাজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বারা ১৯২২ সালে প্রকাশিত “শ্রীশ্রীপদামৃতসিন্ধু”, ১২৮-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। এই পদটির প্রথম আট পংক্তির শেষে গোবিন্দ দাসের ভণিতা রয়েছে। এই অবধি পদটি নিশ্চিতভাবে গোবিন্দদাসের।
এর পরের আট পংক্তি, নরোত্তম দাস ভণিতাযুক্ত “রাই অঙ্গ ছটায় উদিত ভেল দশদিশ” শিরোনামের পদ, সম্পূর্ণ রূপে। গ্রন্থের সম্পাদনার ত্রুটির জন্য এই দুটি পদ একত্রে প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে। পদটির সংগ্রহের প্রায় ৪৮ বছর পরে গ্রন্থটি সম্পাদনা করে প্রকাশিত করা হয়েছিল। আমরা তবুও এইরূপে পদটি এখানে কবি নরোত্তম দাসের পাতায় প্রকাশিত করলাম।