| কবি নরোত্তম দাস-এর পদাবলী |
| শ্রীগুরুচরণ করহ ভজন কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত, মণীন্দ্রমোহন বসু সম্পাদিত “সহজিয়া সাহিত্য”, ৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। শ্রীগুরুচরণ করহ ভজন জগত মোহিত যারা। জগতে কি গুণে শয়নে-স্বপনে কাহার লাগিয়ে ঝুরা॥ নাইকা হইয়া বস্তু জানাইয়া সামান্য রসেতে মাতে। ইকূল উকূল দুকূল পাথারে পড়িয়ে তরঙ্গ-মাঝে॥ অগাধ সলিলে প্রেমেরি হিল্লোলে সদাই বাঢ়এ ঢেউ। সেই সে পেয়েচে সেই সে রেখেচে আর না বুঝএ কেউ॥ বহু ভাগ্যে জানি কোটী মধ্যে গণি সেই সেই হবে পার। নরোত্তম কয় সাধুসঙ্গ হয় উপায় নাহিক আক॥ . *********** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| প্রেমের পীরিতি মধুর রস কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত, মণীন্দ্রমোহন বসু সম্পাদিত “সহজিয়া সাহিত্য”, ২৯-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। শ্রী প্রেমের পীরিতি মধুর রস ইহার জনম কোথা। কাহাতে প্রেম পীরিতি-রতন নিগূঢ় রস বা কোথা॥ মধুর বসতি-কথা শুনিতে আনন্দ হয়। মধুর আশ্রয় সে মধু-রস জানে যে যাহার অঙ্গেতে মানুষ রয়॥ যত সব জনে রতি রস ভণে আশ্রয় বলিয়া কয়। না জানে মানুষ সন্ধান ভরম মানুষ এ রস না লয়॥ একটি মানুষ সেই সদারসে বিলসই বেদ-বিধি না জানে মহিমা। আপনার সম করে রূপেতে জগৎ হরে আনন্দেতে নাহিক উপমা॥ ঈশ্বর আদি যত তার রসে উন্ মত আনন্দ চিন্ময় নাম ধরে। নরোত্তমদাসে কয় জানিলে তাহারে পাই কেমনে জানয়ে জীব-ছার॥ মন্তব্য - জিনি সমস্ত জগতে রসের বিলাস করেন, বেদান্তও যাঁহার মহিমা জানে না, যাঁহার রূপে জগৎ বিমোহিত, এবং যিনি পূর্ণ আনন্দময়, তিনিই একমাত্র মানুষ। এইরূপে জগতের পরম পিতাকে বর্ণনা করা হইয়াছে। নরোত্তম এই পদ রচনা করিতে পারেন, তাহাতে তাঁহার সহজিয়া সম্পর্ক ধরা পড়ে না। কিন্তু এই পদের সহিত সহজধর্ম্মের সম্পর্ক এই যে এই সকল বিশেষত্ব সমন্বিত মানুষকেই সহজ মানুষ বলা হইয়া থাকে। রূপ, প্রেম ও রসের উপাসক সহজিয়ারা নিত্যপুরুষে এই সকল গুণের পরিপূর্ণতার কল্পনা করিয়াছেন, এবং যাঁহারা প্রকৃত রূপরসবেত্তা তাঁহাদিগকে অবলম্বন করিয়া তাঁহারা ঐরূপ রূপরসবেত্তা হইবার উদ্দেশ্যে সাধনা করেন। ---মণীন্দ্রমোহন বসু, “সহজিয়া সাহিত্য”॥ . *********** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| ভরত মুখেতে শুনি ভগবান্ কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত, মণীন্দ্রমোহন বসু সম্পাদিত “সহজিয়া সাহিত্য”, ৩৫-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। ভরত মুখেতে শুনি ভগবান্ সহজ মানুষ কথা। মানুষ আকৃতি মানুষ প্রকৃতি ভরত মুখেতে গাথা॥ গোলোকনাথ যেই সে মানুষ মনে আরোপণ করে সদা। আরোপ জানিয়া মহা সঙ্কর্ষণ সহজ মানুষ হইলা। সহজ রূপেতে সহজ মানুষ আস্বাদে মানুষ-লীলা॥ এমতি করিয়া মানুষ-ভজন শুনহে ভকত ভাই। নরোত্তম কহে এমতি জানিহ ইহার উপরে নাই॥ . *********** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| স্বরূপ বিহনে মঞ্জরী জনম কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত, মণীন্দ্রমোহন বসু সম্পাদিত “সহজিয়া সাহিত্য”, ৫৬-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। স্বরূপ বিহনে মঞ্জরী জনম কখন নাহিক হয়। মঞ্জরী বিহনে দরশন-হীন--- মনে কিছু নাই লয়॥ পুরুষ প্রকৃতি মঞ্জরীতে স্থিতি ব্রজ-অনুসারে হয়। অনুগত বিনে কার্য্যসিদ্ধি নহে তেই সে গোসাঞে কয়॥ কেবা অনুগত কাহাক সহিত জানিব কেমন গুণে। @ন অনুগত মঞ্জরী সহিত ভাবিয়ে দেখহ মনে॥ দেখ কল্পলতা বৃষভানু-সুতা অঙ্গেতে মঞ্জরী শোভে। মঞ্জরী উদিত মধু বিকশিত @@@@@@@@॥ ভ্রমরা ভ্রমরী দোহে সে একুই পঙ্কজ-বাহন হয়। তেই কবিরাজ গুরুর সমাজ একত্রে করিল ছয়॥ আগে অনুবাদ কহিয়ে সম্বাদ পশ্চাতে বিধেয় কয়। এই ছয় তত্ত্ব যে জনা বিদিত সেই স্বতঃসিদ্ধ হয়॥ ষড়ঙ্গ স্বভাব পুষ্পে অনুরাগ করণ সে মধুপানে। মন-ভৃঙ্গরাজ মঞ্জরী-সমাজ রস করে আস্বাদনে॥ ভ্রমরা ভ্রমরী জনম ষড়াঙ্গী তেই সে মধুপ কহে। আছে বহুজন করে মধুপান ষড়াঙ্গি কেহত নহে॥ কহে নরোত্তম হরিষে বিশেষে ছয়টি জানয়ে যে। কোটিকে চাহিতে গুটিকে মিলয়ে রসিক জানিহ সে॥ @ - অপাঠ্য অক্ষর। . *********** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| শুনহ কহিয়ে সার কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত, মণীন্দ্রমোহন বসু সম্পাদিত “সহজিয়া সাহিত্য”, ৬২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। শুনহ কহিয়ে সার। এ সপ্ত স্বর্গ উপরি বৈকুণ্ঠ অপার ঐশ্বর্য্য যার॥ বৈকুণ্ঠ উপরি জ্বলন্ত গোলক জগত মোহন ধাম। তাহার উপরি নিত্য বৃন্দাবন যাহাতে বিহরে শ্যাম॥ তাহার মহিমা নাই দিতে সীমা ভজন করিয়ে শুন। মুখে কৃষ্ণগুণ মঞ্জরীর গুণ কহি স্বরূপের গণ॥ করিতে বিচার সব শূন্যাকার কোথায় তাহার স্থান। ভাবিতে গণিতে সব বিপরীত কেমনে পাইব পার॥ শুধু সাধু জন মিছে তার গণ বড়ই কুটিল গতি। আসিতে যাইতে সেই সে পারিবে শ্রীরূপ যাহার পতি॥ স্বরূপ-তরণী বাহিতে বাহিতে রূপ-কর্ণধার মিলে। তরণী সেবিয়া শ্রীরূপ ভাবিয়া বাহিয়া চলিলা হেলে॥ শ্রীগুণ মঞ্জরী সদা সেবা করি সাধহ মনেরি সাধা। আরোপে স্বরূপ ভজিতে পারিলে পাইবে স্রীমতী রাধা॥ স্বভাব ছাড়িয়ে স্বভাব ধরিয়ে সাধু সনে কর দেখা। সে সাধু কেমন স্বভাব যেমন জানিবে কুমার পোকা॥ অন্য কীট ধরি নিজ গৃহে পূরি আপন বরণ করে। তেমতি জানিবে সাধু মহাজন স্বভাব ছাড়াতে পারে॥ স্বভাব ছাড়াইয়ে প্রেম জানাইয়ে আপন বরণ করে। কবে নরোত্তম দাস অভাজন এবার তরাহ মোরে॥ মন্তব্য - শ্রীনন্দ-নন্দনকে ভজনা না করিয়া রসের ভজন অবলম্বন করিতে হইবে, ইহাই সহজিয়া মত। এখানে নন্দনন্দনের আসনে রসকে বসান হইয়াছে ; ধর্ম্মের এইরূপ অভিব্যক্তি এক মাত্র চৈতন্য-পরবর্ত্তী যুগেই হইতে পারে। ---মণীন্দ্রমোহন বসু, “সহজিয়া সাহিত্য”॥ . *********** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| কাম কাম বলি সবাই বলয়ে কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত, মণীন্দ্রমোহন বসু সম্পাদিত “সহজিয়া সাহিত্য”, ৭০-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। কাম কাম বলি সবাই বলয়ে না জানে কামের মর্ম্ম। কাম না বুঝিয়া সামান্যে মজিয়া আচরে সহজ ধর্ম্ম॥ কাম কাম বলি জগতে বলয়ে ধ্বনি। সামান্য জনে কি চিনিতে পারয়ে রজত কাঞ্চন মণি॥ যারে কাম বলি দেহে করে কেলি নবীন মদন গুরু। জগত সকল কামেতে বিকল কাম সে কল্পতরু॥ পুরুষ প্রকৃতি কামেতে উত্পত্তি কামেতে সবার জন্ম। পশু পক্ষী সব কামেতে উদ্ভব কামেতে সবার কর্ম্ম॥ কামের শরীর অতি মনোহর কামের গঠনখানি। মদন, মাদন, শোষণ, স্তম্ভন, মোহন, এ পঞ্চ গণি॥ কাম উপাসনা কাম সে সাধনা কাম কেলি সব তন্ত্র। কামের মাধুরী শ্রীরূপ-মঞ্জরি কাম হরিনাম মন্ত্র॥ কাম বৃন্দাবন কাম গোপীগণ কাম নিত্য করে বাস। কাম গুরুজন করে আকর্ষণ কাম করে সবে আশ॥ কামের চরিতি অকৈতব রীতি প্রেমের সহিত দেহ। ছাড়ি বেদ-মত ধর্ম্ম বিপরীত যাজন করয়ে সেহ॥ অপক দেহেতে এ কাম সাধিতে ই-কুল উ-কুল যায়। বামন হইয়া বাহু পশারিয়া চান্দ ধরিবারে চায়॥ অন্ধজন যেন বিপথে গমন নড়ি হারাইয়া ফিরে। কোম সাধুজন হাতে ধরি পুনঃ সুপথে আনয়ে তারে॥ তবে সে তাহার মনের আন্ধার সাধু-সমাগমে যায়। কহে নরোত্তম অকাতব প্রেম অনায়াসে মিলে তায়॥ . *********** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |
| বৈষ্ণব গোসাঞি কাহারে কহিব কবি নরোত্তম দাস এই পদটি ১৯৩২ সালে প্রকাশিত, মণীন্দ্রমোহন বসু সম্পাদিত “সহজিয়া সাহিত্য”, ৯২-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। বৈষ্ণব গোসাঞি কাহারে কহিব কেথা সে তাহার স্থিতি। যাহাক নাম ল’য়া সন্ন্যাসী হইয়া শ্রীচৈতন্য করেন স্তুতি॥ সে বুঝু জগতে আছয়ে কেমতে কেমন স্বরূপ তার। তত্ত্ব না জানি সেবিতে তাহারে শকতি আছয়ে কার॥ পুরুষ প্রকৃতি করিয়া ভকতি কে তারে সেবিতে পারে। তাহার চরণ সেবিতে বাসনা শ্রীকৃষ্ণ বাসনা করে॥ মহিমা তাহার বেদবিধি পার বৈষ্ণব গোসাই সেহ। প্রেমের সহিতে বিহরে জগতে চিনিতে না পারে কেহ॥ শুনহ কারণ নন্দের নন্দন প্রকৃতি ভাবিয়া শ্যাম। প্রকৃতি হইয়া প্রকৃতি ভাবিয়া জপিছে তাহার নাম॥ শুনহ বচন বিচার তাহার বিচার করিয়া মনে। করিয়া প্রকাশ করিয়া নির্য্যাস দাস নরোত্তম ভণে॥ . *********** . সূচীতে . . . মিলনসাগর |