রাধিকার মানভঙ্গ কবি নরোত্তমদাস এই পদটি ১৯১৪ সালে সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্য সম্পাদিত “নরোত্তম দাস” সংকলনের ৮৪-পৃষ্ঠায় এইরূপে দেওয়া রয়েছে। “রাধিকার মানভঙ্গ”নামক এই দীর্ঘ পদটির সম্বন্ধে সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য তাঁর গ্রন্থের শেষে দেওয়া “মন্তব্য”-এ, ১৩১-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . .
“নানা গ্রন্থ হইতে এবং কয়েকজন বৈষ্ণবের নিকট হৈতে আমরা পদ সংগ্রহ করিয়া এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করিয়াছি। পরিশেষে “রাধিকার মানভঙ্গ” শীর্ষক একটী কবিতা ইহাতে বিনিয়োজিত করা হইয়াছে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ ইহা নরোত্তম ঠাকুরের বিরচিত বলিয়া প্রথম প্রকাশ করেন। তারপর কৃষ্ণনগরে এক সাহিত্যিক বন্ধুর নিকটে সুলিখিত একখানি পুরাতন খাতায় ঐ কবিতাটী প্রাপ্ত হই---উভয়ে কিছু পাঠ বৈলক্ষণা দৃষ্ঠ হয়। আমরা উভয় কবিতা মিলাইয়া পাঠান্তর করত এই গ্রন্থে সন্নিবেশ করিলাম। . . . . . . নবদ্বীপের বৈষ্ণব সাহিত্যিক শ্রীযুক্ত গোবিন্দ দাস মহাশয় বলেন, ঐ কবিতা খেতরীর নরোত্তম দাস ঠাকুরের বিরচিত নহে। উহা অন্য কোন নরোত্তম নামধেয় কবির হইতে পারে। খেতরীর নরোত্তম ঠাকুরের পদসমূহের ভাব গভীর ও ধর্ম্মমত সম্পূর্ণ দার্শনিক তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। রাধিকার মানভঞ্জন কবিতার ধর্ম্মমত সরস ও ভাষা-ভাব নিম্ন শ্রেণীর। . . . এ কথা নিতান্ত অগ্রাহ্য করা যায় না। আমরা সেই জন্য রাধিকার মানভঞ্জন কবিতাটী পৃথক করিয়া মুদ্রিত করিলাম। নরোত্তম দাসের সমগ্র পদ একত্র প্রকাশ করিতে ইহা পরিত্যাগ করাও সুষ্ঠ বলিয়া মনে করা যায় নাই; কেন না তাঁহা হইলে গ্রন্থখানি অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে। এখন পাঠকগণ বিচার করিয়া লইবেন, ইতি।”--- সুরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য্য, “নরোত্তম দাস”॥
মান করিয়া রাধা বসেছে বিরলে। ধড়া চূড়া বান্ধি কৃষ্ণ গেলা হেন কালে॥ সমুখে দাঁড়াল কৃষ্ণ পূরিয়া মুরলী। আড় নয়নে গৌরী শ্যাম অঙ্গ নেহারি॥ ধুয়া॥ . হে দেগো ললিতা সখী। . কালরূপ না হেরে আঁখি॥ ১॥ শুন গো ললিতা সখী বলি এ স্বরূপ। আর না হেরিব আমি কালা কানুরূপ॥ কালাবিষে জর জর হইল মোর তনু। আমার আঙ্গিনা হইতে জাইতে বল কানু॥ ধুয়া॥ . না হেরিব চিকন কালা। . অন্তরে বিষের জ্বালা॥ ২॥ কাল সঙ্গে প্রেম আমি না করিব আর। আপ্তজ্ঞান অন্তরে নাহিক যহার॥ পরের বেদনা যেই কিছুই না জানে। তার সঙ্গে প্রেম করি মরি কি কারণে॥ ধুয়া॥ . কাল অঙ্গ অহি হবে। . উলটিয়া মোরে খাবে॥ ৩॥ কালিয়া কবরী বাঁধে কাঁপিয়া বসনে। কাল কাদম্বিনী পানে না চাহে নয়ানে॥ পিক অলি ই ছিল রাধার সমুখে। উড়াইয়া দিল দুই আপনার দুখে॥ ধুয়া॥ . যা রে নাগর আন ভিতে। . যথা তোমার লয় চিতে॥ ৪॥ বুঝিয়া রাধার মন দেব হৃষিকেশ। বিচিত্র করিয়া হরি বানাইল বেশ॥ অনন্ত প্রভুর মায়া কে বুঝিতে পারে। শত শত কৃষ্ণ হইয়া চারিদিগে ফিরে॥ ধুয়া॥ . যে দিগে হেরয়ে গোরী। . সেই দিগেতে দেখি হরি॥ ৫॥ বিধুমুখ ঝাঁপি গোরী পীতবাস দিয়া। বসিলেন বিনোদিনী অধোমুখ হইয়া॥ পূর্ণিমার চন্দ্র যেন মেঘে আচ্ছাদিল। তাহাতে বসন দিয়া বদন ঝাঁপিল॥ ধূ॥ . পূর্ণ শশধরমুখী। . বসনে রাখিল ঢাকি॥ ৬॥ নয়ান মেলিল রাধা মন কুতুহলে। দেখি শ্যাম বংশীধারী বনমালা গলে॥ দেখিয়া বিস্ময় হইল রাধা বিনোদিনী। ঊর্দ্ধমুখে রহিলেন হ’য়ে অভিমানী॥ ধূ॥ . গগনে হেরিতে গোরী। . দেখে শ্যাম বংশীধারী॥ ৭॥ একি অসম্ভব সখী কহিতে না পারি। যে দিকে ফিরাই আঁখি সেইদিকে হরি॥ মুদিত নয়ানে হাম থাকিব বসিয়া। কোন দিকে না হেরিব নয়ান মেলিয়া॥ ধূ॥ . মুদিয়ে কমল আঁখি। . বসিলেন বিধুমুখী॥ ৮॥ রাধার নয়ানে কৃষ্ণ প্রবেশ করিল। ত্রিভঙ্গ হইয়া শ্যাম তথা দাঁড়াইল॥ অন্তরের মধ্যে কৃষ্ণ বিরাজ করয়। নয়ান মুদিয়া রাধে অধোমুখী হয়॥ ধূ॥ . শুন গো ললিতা সখী। . অন্তরে গোবিন্দ দেখি॥ ৯॥ যাও যাও প্রিয়সখী বল তুমি যাইয়া। নীরস কুসুমে অলি কেন ফিরে ধাইয়া॥ আমি রাধে কেতকী কুসুম সমতুল। তবে কেন আমা লাগি ফিরে অলিকুল॥ ধূ॥ . আমি রাধে বলহীন। . মানেতে হইয়াছি ক্ষীণ॥ ১০॥ শুনগো ললিতা সখী আমার বচন। পরিহরি কালরূপ যাব কুঞ্জবন॥ যথায় নাহিক রবি শশীর প্রকাশ। গোপনে রহিব আমি মনে করিলাম আশ॥ ধূ॥ . যতো মায়া করিল হরি। . তথাচ না হেরে গোরী॥ ১১॥ ললিতা বলেন রাধে শুন মোর বাণী। তোমা লাগি আকুল হইল নীলমণি॥ নারীর এতেক মান কভু ভাল নয়। তোমা প্রাণ না দেখি আকুল হৃদয়॥ ধূ॥ . তব মান দেখি ভারি। . আকুল হইল হরি॥ ১২॥ সখীর এতেক কথা শুনিয়া অন্তর। ক্রোধ করি কমলিনী বলিল উত্তর। চন্দ্রাবলী ল’য়ে কেলি করুক শ্রীহরি। কালিয়া বরণ আমি হেরিতে না পারি॥ ধূ॥ . যাও নাগর মজিলা যাতে। . না চাহি তোমার ভিতে॥ ১৩॥ ললিতা বলয়ে রাধা শুন মন দিয়া মন। তোমা লাগি গোপীনাথ আকুল জীবন॥ এতো বড় মান তোমার উচিত না হয়। যেই মানে প্রাণনাথ আকুল-হৃদয়॥ ধূ॥ . যার প্রাণধন যে। . তারে মান করে কে॥ ১৪॥ রাধার নিকটে আসি দেবচক্রপাণি। করযোড় করি বলে শুন বিনেদিনী॥ না কর এমত মান শুনহ সুন্দরী। নিশ্চয় কহিল আমি নিতান্ত তোমারি॥ ধূ॥ . শুন রাধে তোমা বলি। . সাদা মনে দিলি কালী॥ ১৫॥ সতী হইয়া মিথ্যা বাক্য বলহ আপনে। ধর্ম্মশাস্ত্র জানি মান কর কি কারণে॥ হাস্য পরিহাস্য মাত্র করিয়াছি আমি। ইহা শুনি মান রাধে করিয়াছ তুমি॥ ধূ || . যদি আর তথা যাই। . তবে সে তোমার দোহাই॥ ১৬॥ শুনিয়া কৃষ্ণের কথা কহে রসবতী। হেরিতে না পারি আমি কালিয়া মূরতি॥ ধড়া চূড়া পীতবাস যেন চক্ষুর শূল। শিখিপুচ্ছ বনমালা যেন বিষ তুল॥ ধূ॥ . গুমান ভঞ্জন নাম ধর। . গুমান সহিতে নার॥ ১৭॥ শুন রাধে কমলিনী বলি যে নিশ্চয়। পদ্ম তেজি অলি কোথা শিমুলেতে যায়॥ শশী বিনা চকোরের অন্য নাই গতি। কহিল মনের কথা শুন রসবতী॥ ধূ॥ . তুমি রাধে কমলিনী। . চন্দ্রাবলী কুমুদিনী॥ ১৮॥ শুনিয়া কৃষ্ণের কথা কহে কমলিনী। তবে কেন তথা থাকি গোঁয়াইলা রজনী॥ করাঘাত অঙ্গে চিহ্ন কঙ্কণের দাগ। সকল শরীরে তোমার দেখি অঙ্গরাগ॥ ধূ॥ . রতি-কেলি করি তথা। . এখনে এসেছ হেথা॥ ১৯॥ শুনিয়া রাইর কথা কহে গদাধর। শুন কমলিনী রাই আমার উত্তর॥ নিত্য নিত্য যান হর কুচনীনগরে। সর্ব্ব নিশি থাকি তথা আইসে নিজ ঘরে॥ ধূ॥ . কোচো বধুগণো সঙ্গে। . ক্রিয়া করে নানা রঙ্গে॥ ২০॥ নিত্য নিত্য গৌরী তাহা দেখিবারে পায়। তথাপি নাহিক রাগ শিব সদা ধ্যায়॥ কখন না করে মান শিবের উপর। কুচনীনগরে শিব থাকে নিরন্তর॥ ধূ॥ . রতি করে ত্রিপুরারি। . মান নাহি করে গৌরী॥ ২১॥ হরি হর এক অঙ্গ নাহি ভেদাভেদ। তবে কেন রসবতী মনে করো খেদ॥ পুরুষ ভ্রমরা জাতি স্থির নাহি পায়। যথাতে প্রচুর মধু তথা বসি খায়॥ ধূ॥ . নারী যার দ্বোচারিণী। . সেই হবে অভিমানী॥ ২২॥ আমি চন্দ্র তুমি তারা একত্র উদয়। আমি তরু তুমি লতা জানিহ নিশ্চয়॥ আমি হংস তুমি নদী একত্র থাকিব। তোমাকে ছাড়িয়া আমি কোথা নাহি যাব॥ ধূ॥ . তুমি জল আমি মীন। . বিহারিব রাত্রিদিন॥ ২৩॥ কোনরূপে রাইর মান না হবে ভঞ্জন। কান্দিতে কান্দিতে শ্যাম করিল গমন॥ যথাতে বসিয়া আছে বৃন্দা দেবী সতী। তথাতে গেলেন শ্যাম বিমল মূরতি॥ ধূ॥ . তথা গিয়া বনমালী। . কান্দে রাধা রাধা বলি॥ ২৪॥ শুন বৃন্দা আমার মনের যত দুখ। প্রাণ স্থির নহে মোর বিদরয়ে বুক॥ মণি মুক্তা ছাড়া মোর যতেক আছিল। তাহা হারাইয়া যেন হইল পাগল॥ ধূ॥ . আনি বৃন্দা দেহো সুধা। . ঘুচাহ মনের ক্ষুধা॥ ২৫॥ কান্দিয়া বিকল হইল দেব গদাধর। হৃদয়ের মাঝে ধারা বহে নিরন্তর॥ পীতবাস তিতিল চক্ষেতে বহে নদী। দরিদ্র অধম যেন হারাইল নিধি॥ ধূ॥ . কান্দিয়া বলয় হরি। . আনি বৃন্দা দেহো প্যারি॥ ২৬॥ আমার হাতের বাঁশী কে করিল চুরি। সঘনে নিঃশ্বাস ছাড়ে দেবতা শ্রীহরি॥ শিখিপুচ্ছ চূড়া ছিল বকুলের ফুল। পথে ত্যাগ কৈল কৃষ্ণ হইয়া ব্যাকুল॥ ধূ॥ . শুন বৃন্দা বলি তোরে। . প্যারি আনি দেহো মোরে॥ ২৭॥ হাতের মুরলী কৃষ্ণ ফেলিল টানিয়া। সঘনে নিশ্বাস ছাড়ে শ্রীরাধা বলিয়া॥ ললিতা বিশাখা দূতী চম্পকলতিকা। তার মধ্যে বিনোদিনী চাঁপার কলিকা॥ কাদম্বিনী মধ্যে যেন তাড়িত প্রকাশ। এমত সুন্দরী রাধে আমারে নৈরাশ॥ ধূ॥ . রবির প্রকাশ দেখি। . প্রফুল্ল কমলমুখী॥ ২৮॥ ধূলায় ধূসর তনু মলিন বদন। মুরলীতে রাধা নাম জপে ঘনে ঘন॥ ক্ষণে উঠে ক্ষণে বইসে মন উচাটন। ক্ষণে ক্ষণে বৃন্দা ঠাঁই জিজ্ঞাসে বচন॥ ধূ॥ . যাও বৃন্দা রাধার কাছে। . প্রাণ মোর নাহি বাঁচে॥ ২৯॥ শুনিয়া কৃষ্ণের কথা বলে বৃন্দা সতী। শুনহ নাগর তুমি আমার মিনতি॥ নারী বেশে যাও তথা আছে রাই বসি। অবিলম্বে হও গিয়া শ্রীমতীর দাসী॥ ধূ॥ . আমার বচন ধর। . আনি শঙ্খ হাতে পরো॥ ৩০॥ অকারণে ক্রন্দন যে করহো শ্রীহরি। তোমার ক্রন্দন আর সহিতে না পারি॥ পীতবাস ধড়া চূড়া যায় গড়াগড়ি। বিচিত্র মুরলী তোমার ক্ষিতি আছে পড়ি॥ ধূ॥ . আমার বচন শুন। . নারী হইয়া যাও পুন॥ ৩১॥ কৃষ্ণবর্ণ ছাড়ি হরি অন্য বর্ণ ধর। আনিয়া সুচারু শাড়ী কটিদেশে পরো॥ পীন পয়োধর ঢাকি শিরে দেহো টানি। বাম পদো আগু করি চলহ আপনি॥ ধূ॥ . তবে কেহো না চিনিবে। . রাই আসি দেখা দিবে॥ ৩২॥ পিরীতি বচন তোমায় কহিবেক প্যারি। জিজ্ঞাসিলে কহিবে আমি দাস্য কর্ম্ম করি। তাহাতে নাহরী যদি করে উপহাস। কহিবা দাসীত্ব কর্ম্মে রাখ নিজ পাশ॥ ধূ॥ . তোমার আগে আমি যাব। . প্যারিকে বুঝায়ে কবো॥ ৩৩॥ তুমি দেব চক্রপাণি সংসারের সার। তোমার মায়াতে হরি ত্রিজগত বন্ধ। রাধার মানের হেতু কেনো হইল ধন্ধ॥ ধূ॥ . তুমি যদি মায়া কর। . জগৎ ভুলাইতে পারো॥ ৩৪॥ জগত ঈশ্বর তুমি সংসারের সার। কে বুঝিতে পারে হরি মহিমা তোমার॥ তুমি দিবা তুমি নিশি তুমি নিরাকার। করিলা অনন্ত লীলা হইয়া অবতার॥ ধূ॥ . তোমার ভকতো যেই। . তব মায়া বুঝে সেই॥ ৩৫॥ যখন সলিলময় আছিল মেদিনী। তখন আশ্রয়মাত্র ছিলা চক্রপাণি॥ রজো গুণে ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন যখন। সত্ত্বগুণে তুমি তারে করহ পালন॥ ধূ॥ . তমগুণে পশুপতি। . তোমা ভাবে দিবা রাতি॥ ৩৬॥ জীবের জীবন তুমি সবাকার বল। তোমার মায়াতে বলী গেলো রসাতল॥ আপনি পাসরো কেন সেই সব কথা। নারী বেশে যাও তুমি প্যারী আছে যথা॥ ধূ॥ . তুমি আদি নিরঞ্জন। . তোমা ভাবে ত্রিভুবন॥ ৩৭॥ শুন শুন মোর বাক্য দেব চক্রপাণি। পূর্ব্বে যেন একবার হইলা মোহিনী॥ চিনিতে নারিল তোমা যত দেবাসুর। সেইরূপে যাও তুমি রাধার অন্তঃপুর॥ ধূ॥ . শোকাকুলে দহে হরি। . বৃন্দা তাহে দিল বারি॥ ৩৮॥ বৃন্দার বাক্য শুনি শ্যাম হইলা উল্লাস। হস্তের উপরে যেন পাইল আকাশ॥ আছিল শ্যামের শোক রাধার লাগিয়া। নিবারণ কইলা বৃন্দা উপায় কহিয়া॥ ধূ॥ . নারী হইল চক্রপাণি। . বৃন্দার বচন শুনি॥ ৩৯॥ দিব্য বেশ আভরণ পরিল প্রচুর। চরণে পরিলা হরি বাজন নূপুর॥ কালরূপ অঙ্গরাজ কৈল হরিতালে। বনমালা তেজি গলে দিল রত্নমালে॥ ধূ॥ . ললাটে সিন্দূর ফোটা। . যেন রবি করে ছটা॥ ৪০॥ সুচারু নারীয়া বেশ বানাইল বেণী। মেঘের আড়েতে যেন ঘন সৌদামিনী || হস্তেতে কঙ্কণ যেন করে ঝিকিমিকি। দেখিয়া গগন শশী মেঘে হইল লুকি॥ ধূ॥ . ব্রজপতি নারী হৈল। . গগন শশী লাজে মৈল॥ ৪১॥ পট্ট বস্ত্র পরি গেল ত্যাগি পীতবাস। অতি ক্ষীণ কৈল কটি তাহে দিব্য বাস॥ বাম করে বীণা যন্ত্র বাজায় সুন্দর। গমন করিল হরি রাধার গোচর॥ ধূ॥ . গমন করিল হরি। . বীণা যন্ত্র হাতে করি॥ ৪২॥ কৃষ্ণকে কহেন বৃন্দা শুন মোর বাণী। তোমার আগে যাই আমি যথা বিনোদিনী॥ বাম পদো আগে তুমি ফেলি গদাধর। ধীরে ধীরে আইস তুমি রাধার গোচর॥ ধূ॥ . শ্যাম আগু গিয়া বৃন্দা। . রাধাকে করয়ে নিন্দা॥ ৪৩॥ রাধারে নিন্দিয়া বৃন্দা কহে কটু বাণী। শুন রসবতী তুমি হইলা কলঙ্কিনী॥ তোমার সমান দুষ্ট নাহি দেখি মেয়া। কোপানলে দহে তনু তোমারে দেখিয়া॥ ধূ॥ . শুন রাধে রসবতি। . কি হবে তোমার গতি॥ ৪৪॥ সতীর এতেক মান কভু নাহি শুনি। পতির উপরে মান ক্ষমা কর তুমি॥ সাধ্য সাধনা তোমা সর্ব্ব জনে করে। অসম্ভব শুনি কথা পতি নাহি হেরে॥ ধূ॥ . তোমার কঠিন হিয়া। . দয়া নাই চান্দ মুখ চাইয়া॥ ৪৫॥ শুন গো রাধিকা তুমি বচন আমার। চিনিয়া না চিনো তুমি প্রাণ আপনার॥ তুমি হেন কতো রাধা শ্যামের হৃদয়। বিশ্বম্ভররূপ শ্যাম করিল নিশ্চয়॥ ধূ॥ . হেন কৃষ্ণ হাতে ঠেলি। . দুই কুলে দিলে কালী॥ ৪৬॥ শুন বেটী গোপ ঢেটী বলিয়ে তোমারে। তব মানে কৃষ্ণ যদি যায় দেশান্তরে॥ আর রতি-কেলি যে করিবে কারে লইয়া। সেই কথা মোর স্থানে কহো বিবরিয়া॥ ধূ॥ . যদি মরে নীলমণি। . কেমনে বাঁচিবে ধনী॥ ৪৭॥ শুন ধনী রসবতী আমার বচন। কিবা হেতু নাহি হের দেব সনাতন॥ সুমতি হইয়া তুমি বলহ আমারে। নিকটে পাইয়া রত্ন কেনে ফেলো দূরে॥ ধূ॥ . মান করে কি করিলি। . পেয়ে নিধি হারাইলি॥ ৪৮॥ শুন সতী গুণবতী হিত বলি আমি। পতির উপরে মান ক্ষমা কর তুমি॥ আপ্তপতি অবহেলা করে যেই জনে। তাহার দুখের কথা না যায় কহনে॥ ধূ॥ . তব মানে এই হবে। . কান্দিতে জনম যাবে॥ ৪৯॥ যদি হারি ত্যাগ করি যায় দেশান্তরি। তোমার মানের উপায় কি হবে সুন্দরী॥ একাকিনী রহিবা হেথা হইয়া মানিনী। কৃষ্ণত্যাগ কৈলে কেহ না শুধাবে বাণী॥ . মান করি রইলে বসি। . কে তোমায় সাধিবে আসি॥ ৫০॥ একে মানী তাহে ধনী শুনি কটুতর। শীত পক্ষে শিশির যেন বাড়ে নিরন্তর॥ ক্রোধ করি বলে ধনী শুন বৃন্দা সতি। আমার আঙ্গিনা হইতে যাও শীঘ্রগতি॥ ধূ॥ . কোপে রাই কম্পিত হইল। . দেখি বৃন্দা ত্রাস পাইল॥ ৫১॥ দেখিয়া রাধার মান বৃন্দা পাইল ত্রাস। নারীর প্রতিজ্ঞা এতো একি সর্ব্বনাশ॥ ক্ষণমাত্র করে মান পতিব্রতা সতী। নিশ্চয় কহিল আমি শুন গুণবতী॥ ধূ॥ . তৃণের আনল যেন। . নারী লোকে মান তেন॥ ৫২॥ তৃণ মাঝে অগ্নি যেন ক্ষণমাত্র থাকে। তিল মাত্র চন্দ্র যেন কালো মেঘে ঢাকে॥ কুমুদ কলিকা যেন ক্ষণেক মুদিত। চন্দ্র দরশনে যেন হয় প্রকাশিত॥ নারীর এমতি মান কুমুদিনী সম। রবির প্রকাশে যেন নাশ হয় তম॥ ধূ॥ . যেমন কুহক বাজি। . নারীর মান হেন বুঝি॥ ৫৩॥ বৃন্দা বলে প্যারী কৃষ্ণ প্রতি মান করি। কি কারণে কালরূপ না হেরো সুন্দরী॥ কালতে বেষ্টিত স্বর্গ মর্ত্ত্য রসাতল। কাল ছাড়া কেহো নহে জানহ সকল॥ ধূ॥ . শুন রাধে বলি ভাল। . পাতালে বাসুকী কাল॥ ৫৪॥ কালো গৌর দুই বর্ণ বিধাতা সৃজিল। তাহাতে কালরূপ সবে বাখান করিল॥ হেন কাল রূপে রাধে না করিও মান। এই কৃষ্ণ কালরূপ জগতে বাখান॥ ধূ॥ . শুন রসবতী গোরী। . তোমার অন্তরে হরি॥ ৫৫॥ হরি ছাড়া কেহো নহে শুনহ সুন্দরী। যে নাম জপিয়া যোগী হইল ত্রিপুরারি॥ কালকূট পান করি মৃত্যু কৈল জয়। কালা-নাম জপি ধরে নাম মৃত্যুঞ্জয়॥ ধূ॥ . কালো সর্প পাইয়া হরে। . গলায় গাঁথিয়া পরে॥ ৫৬॥ না জানিয়া কালরূপে অভিমান কর। কালী পদতলে দেখ দেব মহেশ্বর॥ অনেক তপস্যা করি সর্ব্ব দেবগণ। তবে মহাকালী দেবী পাইল দরশন॥ ধূ॥ . কালী দেবী দরশনে। . হরষিত দেবগণে॥ ৫৭॥ তত্ত্ব না জানিয়া রাধে করিয়াছ মান। আমার বচন প্যারী না করিও আন॥ কংসাসুর দর্প কৃষ্ণ ভাঙ্গে অনায়াসে। তৃণবত মহাবীর বিনাশে নিমিষে॥ ধূ॥ . যখনেতে শিশু হরি। . করে ধরে মহাগিরি॥ ৫৮॥ আমার বচন রাধে শুন কুতূহলে। যখন আছিলা কৃষ্ণ যশোদার কোলে॥ মৃত্তিকা ভক্ষণ হরি করিল তখন। মুখ মেলি দেখাইল তারে নারায়ণ॥ ধূ॥ . না জানিয়া পুণ্যবতী। . বান্ধিল গোলোকপতি॥ ৫৯॥ যদি মুখ বিস্তারিত কৈল যদুপতি। বিশ্বরূপ বদনে দেখিল যশোমতি || স্থাবর জঙ্গম যত দূরেতে আছিল। কৃষ্ণের মুখেতে রাণী দেখিল সকল॥ ধূ॥ . বিস্ময় হইয়া রাণী। . কোলে নিল নীলমণি॥ ৬০॥ অবিরত ভাবে যারে দেবশিরোমণি। ধ্যান করে সদাশিব দিবস রজনী॥ শুন গো সুন্দরী তুমি আমার বচন। এই কৃষ্ণ জগন্নাথ জগত-জীবন॥ ধূ॥ . তুমি যারে করো মান। . সেই করে পরিত্রাণ॥ ৬১॥ শুন ধনী বিনোদিনী বলিয়া তোমারে। হেন কৃষ্ণ সঙ্গে মান কিসের অন্তরে॥ শোকের সাগরে হরি ভাসায়ে আপনে। ইহা দেখি কিছু দয়া নাহি তোর মনে॥ ধূ॥ . অন্তরে প্রেমের নদী। . ভাসে হরি নিরবধি॥ ৬২॥ আমার বচন প্যারী না করিও হেলা। যেখানে থাকয়ে হরি আন এই বেলা॥ অবশ্য আছয়ে এথা প্রভু বনমালী। বিনা জলে কোথায় থাকে চিরকাল বালি॥ ধূ॥ . তোমার মান অহি হৈয়া। . দংশিবে তোমার হিয়া॥ ৬৩॥ শুন ধনী তেজ মান বুদ্ধির সাগর। হিত বাক্য বলি এবো তোমার গোচর॥ কহি হিত কর পিরীত নাগরের সাথে। আপনে জানহ সব ক্ষমা কর চিতে॥ ধূ॥ . শেষে রাধে এই হবে। . মান গেলে লজ্জা পাবে॥ ৬৪॥ বৃন্দার এতেক কথা শুনি বিনোদিনী। রুষিয়া তাহাকে ধনী কহে কটুবাণী॥ না বলিও হেন কথা শুন বৃন্দাসতী। আর না হেরিব আমি কালিয়া মূরতি॥ ধূ॥ . কালরূপ না হেরিব। . কাল কথা না শুনিব॥ ৬৫॥ বৃন্দা বলে শুন ধনী আমার বচন। কালো কেশে বেশ তুমি ধর কি কারণ॥ নয়ানে কাজল ধনী তুমি কেন পর। আঁখি মধ্যেতে কাল মণি কেন ধর॥ ধূ॥ . কাল ভাল নহে বল। . তবু চক্ষুর মণি কাল॥ ৬৬॥ কালরূপ নিন্দা কর গোয়ালার ঝী। বিধাতা করিল কাল এখন করিবে কি॥ কাল গৌর দুই বর্ণ আছে এ সংসারে। কাল কবরী কেন তবে সবে ধর শিরে॥ ধূ॥ . তুমি বল কাল কাল। . যার কাল তার ভাল॥ ৬৭॥ শুন গো রাধিকা তুমি কাল নিন্দা কর। আপনি আছিলা কালো তাহা নাহি ধর॥ ত্রেতাযুগে কৃষ্ণ যখন রাম অবতার। তুমি রাধে ছিলা সীতা বনিতা তাহার॥ ধূ॥ . বৃন্দার বচন শুনি। . লাজ পাইল কমলিনী॥ ৬৮॥ শতস্কন্ধ মহাবীর জানে ত্রিভুবন। তুমি রামা হইয়া শ্যামা করিলা নিধন॥ ঘোররূপা লোলজিহ্বা অসি ধরি করে। নিশায় কাটিয়া তুমি পাড়িলা আহারে॥ ধূ॥ . তুমি কালী সবে জানে। . কাল সঙ্গে মান কেনে॥ ৬৯॥ বৃন্দার বচনে রাধা হইল সুধীর। অঙ্কুশ প্রহারে যেন মত্ত হস্তী স্থির॥ মৃদুভাবে বলে রাধা শুন বৃন্দাসতী। অতঃপর যাও তুমি আপন বসতি॥ ধূ॥ . বৃন্দাকে দেখিয়া হরি। . জিজ্ঞাসে কোথায় গৌরী॥ ৭০॥ শুন হরি যত গারি বলিল বচন। আপনার মান লইয়া আইলাম আপন॥ আগে যত কইলাম আমি তোমার পিরীতি। অসুর নাশিতে যেন রোষে দৈত্যপতি॥ ধূ॥ . লইয়া আপন মান। . আইলাম হরি তোমার স্থান॥ ৭১॥ কালিয়ে বরণ রাধে না হেরে নয়ানে। শুনিয়া তোমার নাম হাত দেয় কানে॥ শুনিয়া তোমার নাম মহামানী হইল। নিকটে কোকিল ছিল উড়াইয়া দিল॥ ধূ॥ . অই রাধে যায় শ্যাম। . ভাঙ্গহ রাধার মান॥ ৭২॥ এতেক বলিয়া বৃন্দা চলিল সত্বর। উপনীত হইল গিয়া আপনার ঘর॥ শ্রীহরি উঠিয়া তবে করিল গমন। ধীরে ধীরে গেলা কৃষ্ণ রাধার ভবন॥ ধূ॥ . বাম পদো আগে ফেলি। . চলিলেন চক্রপাণি॥ ৭৩॥ সাত পাঁচ ভাবি হরি হরষিত মন। গমন করিলা কৃষ্ণ রাধার সদন॥ বাম করে বীণা যন্ত্র গজেন্দ্রগামিনী। উপনীত হইল গিয়া যথা বিনোদিনী॥ ধূ॥ . শ্যাম অঙ্গ যদি দেখে। . রাই নয়ান মুদিয়া থাকে॥ ৭৪॥ রড় দিয়া কহে গিয়া যথা আছয়ে রাধিকা॥ শুনি ধনী বিনোদিনী হইল বাহির। হেন কালে আসি তথা মিলিল তিমির॥ ধূ॥ . হেরিয়া সিন্দূর রেখা। . চান্দে মেঘে হইল দেখা॥ ৭৫॥ রাধিকা বলেন বামা শুন মোর বাণী। কি নাম কোথায় ঘর কহো তুমি শুনি॥ কোন হেতু আগমন আমার এথায়। কি লাগিয়া ফিরো তুমি উদাসিনী প্রায়॥ ধূ॥ . যে বাক্য বলহ তুমি। . সে সাধ পূরাব আমি॥ ৭৬॥ ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী কিবা চন্দ্রের রোহিণী। একাকিনী ভ্রম কেন জগত-মোহিনী॥ চোর খলো জনে দেখি নাহি করো ভয়। বীণা যন্ত্র হাতে দেখি দ্বোচারিণী প্রায়॥ ধূ॥ . স্বরূপে কহো না আমা। . কিবা সতী সত্যভামা॥ ৭৭॥ শুন রামা বলি তোমা করিয়া বিনয়। তোমা রূপ দেখিয়া দেবতা মোহ পায়॥ তোমা রূপ বাখানিতে কাহার শকতি। কেমতে দেহেতে প্রাণ ধরে তোর পতি॥ ধূ॥ . দেখিয়া আকুল আমি। . কেমনে রহিয়াছ তুমি॥ ৭৮॥ কালর লাগিয়া মান করিয়াছি আমি। তাহাতে দ্বিগুণ মান বাড়াইলা তুমি॥ হেন রূপবতী ত্যাগি তোমার নাগর। কেমতে আছয়ে জিয়া না হইয়া কাতর॥ ধূ॥ . না দেখিয়া তোমা মুখ। . কেমনে ধরেছে বুক॥ ৭৯॥ বল নারী সত্যি করি আমার সাক্ষাতে। কোথা হইতে আসিয়াছ যাইবে কোথাতে॥ কিবা পতি অন্য কার ঘরে ছিল গিয়া। সেই হেতু মান করি তুমি আইলা ধাইয়া॥ ধূ॥ . জানিল মনের কথা। . মান করি আইলে হেথা॥ ৮০॥ আইস ধনী দুই মানী এক ঠাই থাকি। ইহার সমান দুখ পতি নাহি দেখি॥ মোর পতি চন্দ্রাবলী সঙ্গে কৈল রঙ্গ। এই হেতু নাহি হেরি আমি শ্যাম অঙ্গ॥ ধূ॥ . দুই মানী সখী হইয়ে। . একত্র থাকিব শুয়ে॥ ৮১॥ এতেক বলিয়া রাধা হরষিত মন। বীণাযন্ত্র গান করো শুনি দুইজন॥ রাধার বচন শুনি বীণা হাতে করি। কৃষ্ণ কৃষ্ণ করি বীণা বাজায় সুন্দরী॥ ধূ॥ . ধরিয়া বীণার তাল। . কৃষ্ণ গুণ গায় ভাল॥ ৮২॥ অহে কৃষ্ণ জগন্নাথ কৃপা করো মোরে। তোমার নামের গুণে সর্ব্ব দুঃখ হরে॥ নাম শুনি দূরে যায় দুঃখ আর মান। কৃষ্ণ কৃষ্ণ করি বীণা করিয়াছে গান॥ ধূ॥ . শুনিয়া বীণার গান। . বাড়িল রাধার মান॥ ৮৩॥ কৃষ্ণ কথা শুনি রাধা উঠিল রুষিয়া। গর্ত্ত হইতে সর্প যেন উঠিল রুষিয়া॥ যাও যাও এথা হইতে না করিও গান। তোমা গান শুনি মোর বিদরয়ে প্রাণ॥ ধূ॥ . শুনিয়া বীণার গান। . উথলে রাধার মান॥ ৮৪॥ যে নাম শুনিলে কাণে হাত দেই আমি। সেই নাম বীণাতে গান কর তুমি॥ এথা হইতে শীঘ্র করি যাওতো সুন্দরী। কৃষ্ণ নাম যেই করে তাহারে না হেরি॥ ধূ॥ . এখনে জানিল আমি। . অভিমানী নহো তুমি॥ ৮৫॥ শুন রাধা বিনোদিনী বলে ভগবানে। কৃষ্ণ বিনা মোর যন্ত্র অন্য নাহি জানে॥ পূর্ব্বের আশ্বাস ছিল রাধে করিবা পালন। এখন যাইতে বল কিসের কারণ॥ ধূ॥ . তুমি সতী পতিব্রতা। . এক মুখে দুই কথা॥ ৮৬॥ কৃষ্ণের বচনে রাই হইল হরষিত। কর যোড়ে কহে কথা হইয়া সাবহিত॥ মানী জন হও যদি থাকো মোর কাছে। কপট করিলে পুন লজ্জা পাবে পাছে॥ ধূ॥ . কহ শুনি ছিলে কোথা। . কোন মানে আইলে হেথা॥ ৮৭॥ শুনিয়া রাধার কথা বলেন শ্রীহরি। শুন ধনী বিনোদিনী থাকি মধুপুরী॥ মধু-পিয়াসিনী পাম, কৃষ্ণ মন্ত্র জপি। পতি পরবাস্যা মোর এই হেতু তাপী॥ ধূ॥ . পরবাসে মোর পতি। . কি হবে আমার গতি॥ ৮৮॥ মোর পতি কালরূপ ভুবন-মোহন। তাহার সদৃশ নাহি দেখি একজন॥ কেশ মধ্যে হেমচাপা যেন রবি আভা। মেঘ মধ্যে শিখিগণ করে অতি শোভা॥ ধূ॥ . মোর রূপ শশিকলা। . যেন শোভে মেঘমালা॥ ৮৯॥ রম্ভাবৎ বলি নাথ করিয়া আমারে। অনাথ করিয়া প্রভু ভাসাইলা সাগরে॥ কাণ্ডারী বিহনে তরী হইল হীনবল। তাহার কারণে আমি হইয়াছি পাগল॥ ধূ॥ . ঘাটের নৌকা ঘাটে আছে। . কাণ্ডারী পলাইয়া গেছে॥ ৯০॥ করিয়া পুরুষের পর রাগ পতি গেলো ঘর। মায়ার কলিকা তাহে হইল বিস্তর॥ ফুটিত কমল পুষ্পে নাহি যাই অলি মধু ভরে ভাঙ্গিয়া পড়িল সেই কলি॥ ধূ॥ . মধু ভরে ভাঙ্গে কলি। . তথাপি না আইসে অলি॥ ৯১॥ শুনিয়া কৃষ্ণের কথা বলে রসবতী। আমার বচনে রামা কর অবগতি॥ দুঁহার সমান দুখ শুন কহি তোমা। না করিও অভিমান চিত্তে দেহো খেমা॥ . মোর দুখ তোরে কব। . তোমার দুখ-ভাগী হব॥ ৯২॥ শুনিয়া রাইর কথা বলিল শ্রীহরি। উদর পূরিতে আমি দাস্য কর্ম্ম করি॥ অভয় প্রদান করি করহ পালন। কত কাল তোমা স্থানে করিব বঞ্চন॥ ধূ॥ . শুন রাধে বিনোদিনী। . বানাইতে জানি বেণী॥ ৯৩॥ কেশ ধরি বেশ করি সুরঙ্গ সুন্দর। ললাটে হেরিলে যেন ভ্রম যায় দূর॥ বুকের কাচলি আমি পরাই যাহারে। হেরিলে পারেন মোহ নাগর তাহারে॥ ধূ॥ . আমি যদি বেশ করি। . লাজে মরে বিদ্যাধরী॥ ৯৪॥ মণিময় অভরণ পরাই যাহারে। হেরিলে তাহার পতি যাইতে নারে দূরে॥ কটিতে কিঙ্কিণী আমি পরাই যাহারে। হেরিলে তাহার পতি হয় গলার হারে॥ ধূ॥ . আমি বেশ করি যায়। . কাম রতি মোহ যায়॥ ৯৫॥ শুনিয়া কৃষ্ণের কথা ভাবে রসবতী। মনে মনে ভাবি রাই করিল যুকতি॥ এমন সুন্দরী রাখি নাহি মোর ভালো। পরিণামে হইবেক অধিক জঞ্জাল॥ ধূ॥ . হেন রূপ দেখি শ্যাম। . আমারে হইবে বাম॥ ৯৬॥ এতেক ভাবিয়া গোরী বলিল তাহারে। আমার আশ্রম ছাড়ি যাও নিজ ঘরে॥ মানশোকে শোকদুখী আমি শুনহ রূপসী। সখীগণ আছে মোর কাজ নাই দাসী॥ ধূ॥ . যাও নারী ছিলা যথা। . কাজ নাই মোর হেথা॥ ৯৭॥ এতেক শুনিয়া কৃষ্ণ ছাড়েন নিশ্বাস। দেখা দিয়া রাই মোরে হইল নৈরাশ॥ দুখী হইয়া আইলাম রাধে তোমা গুণ শুনি। তাহে কেন বিনোদিনী কহো কটু বাণী॥ ধূ॥ . করি রাধে সুশীতল। . পিপাসাতে দেহো জল॥ ৯৮॥ অন্তরে ব্যাকুল আমি বলি যে তোমাকে। পতিব্রতা নারী যেই অনুগতো রাখে॥ ক্ষুধিতেরে অন্ন দেহো পিপাসিতে জল। সেই নারী সুখভোগ করয়ে সকল॥ ধূ॥ . নয়ানে হেরিয়া দেখো। . দুখিনীরে কাছে রাখো॥ ৯৯॥ রাধিকা বলেন বামা শুন মোর বাণী। নিজালয় যাও তুমি ভূবনমোহিনী॥ এমত রূপসী মোর কাজ নাই হেথা। রাখিয়া আপন মান যাও ছিলা যথা॥ ধূ॥ . তাপের তাপিত আমি। . তাহে তাপ দিলা তুমি॥ ১০০॥ বিনোদিনী কথা পুন শুনিয়া শ্রীহরি। এমত উচিত তোমা না হয় সুন্দরী॥ কিছু ভিক্ষা দেহো মোরে বিনোদিনী রাই। আশীর্ব্বাদ করি আমি নিজ স্থানে যাই॥ ধূ॥ . শুন রাই রসবতি। . দেহো ভিক্ষা শীগ্রগতি॥ ১০১॥ দেবতা গন্ধর্ব্ব আদি তোমা করে স্তুতি। সকল পুরাণে শুনি তুমি ভাগ্যবতী॥ বেদ শাস্ত্রে শুনিয়াছি তোমার মহিমা। ব্রহ্মা হরি হরে দিতে নারে যার সীমা॥ ধূ॥ . আনি রাধে দেহো ভিক্ষা। . প্রাণ মোর কর রক্ষা॥ ১০২॥ পূর্ব্বে রাই তুমি শুন বলিলা আমারে। যেই ভিক্ষা চাই আমি দিবতো সত্বরে॥ আকাশের চন্দ্র যদি ভূমিতলে পড়ে। তথাপি সতীর বাক্য কভু নাহি নড়ে॥ ধূ॥ . যদি আপন প্রাণ যায়। . তবু সতী সত্য কয়॥ ১০৩॥ কৃষ্ণের এতেক কথা শুনিয়া সত্বরে। অনিরুদ্ধ-সুত (১ ) যেন পড়িলেক শিরে॥ ১। অনিরুদ্ধ সুত - বজ্র। হিত বিপরীত কথা বাবে গুণবতী। কৃষ্ণ ভিক্ষা করে পাছে হেন লয় মতি॥ ধূ॥ . পতিহীন এই নারী। . যদি ভিক্ষা করে হরি॥ ১০৪॥ এতেক বিচার মনে করে রসবতী। শ্যাম ভিক্ষা করে পাছে হেন ভাবে সতী॥ যদি মোর প্রাণ চায় দিবত সতরী (২)। ২। সতরী - সত্বর। তথাচ হরিকে আমি নাহি দিতে পারি॥ ধূ॥ . যদি কৃষ্ণ ভিক্ষা যাচে। . কি হবে আমার পাছে॥ ১০৫॥ কৃষ্ণ বিনা যাহা চাহে তাহা আমি দিব। জীবন থাকিতে কৃষ্ণ আমি না ছাড়িব॥ ধূ॥ . কৃষ্ণ বিনা যাহা চায়। . সেই ভিক্ষা দিব তায়॥ ১০৬॥ আমার বচন তুমি শুনহ সুন্দরী। প্রাণ যদি চাহ আমি তাহা দিতে পারি॥ হরি ছাড়া যেই ভিক্ষা চাহ মোর তরে। সেই ভিক্ষা দিব আমি যাও নিজ ঘরে॥ ধূ॥ . যতোকাল আমি জীব। . শ্যামচান্দ না ছাড়িব॥ ১০৭॥ ধন অর্থ প্রাণ কিবা চাহিস আমার। নহে বল দেই আমি গজমতি হার॥ সর্ব্ব দুঃখ দূরে যাবে হবে বহু ধন। সুখেতে বঞ্চহ জাইয়া আপনা ভূবন॥ ধূ॥ . অনাথের নাথ হরি। . জীবনে ছাড়িতে নারি॥ ১০৮॥ এতেক রাধার কথা শুনিয়া শ্রীহরি। মনেতে জানিল রাধা নিতান্ত আমারি॥ প্রেমানন্দে পুলকিত হইল অন্তর। হারাইয়া ধন যেন পাইল সাগর॥ ধূ॥ . রাধার বচন শুনি। . হরষিত চক্রপাণি॥ ১০৯॥ রাধিকা বলেন শুন আমার বচন। বিরহ আনলে মোর দগধ জীবন॥ কি বলিব বিধাতারে মোরে কইল নারী। ক্ষণে ক্ষণে লয়ে মনে বিষ খাইয়া মরি॥ ধূ॥ . কি বলিব বিধাতারে। . সকলি কপালে করে॥ ১১০॥ মানশোকে হইল আমি বড়ই পীড়িত। বিধির নিকটে যাই হেন লয় চিত॥ জিজ্ঞাসিব বিধাতারে অনেক প্রকারে। এমত কলঙ্কিনী কেনো করিল আমারে॥ ধূ॥ . জানিব বিধাতার কাছে। . নারী জন্মে কি ফল আছে॥ ১১১॥ কখন মরিতে চাহি জলে দিয়া ঝাঁপ। কি করিব প্রাণ তেজি মনে রবে তাপ॥ এমন জনমে মোর নাহি প্রয়োজন। দিবা রাতি দহে তনু যেন পোড়ে বন॥ ধূ॥ . নারী জন্ম ভাল নয়। . পরাধিনী হইতে হয়॥ ১১২॥ কিন্তু মোর মনে এক আছে এ কথন। পূরাইব সেই সাধ হইয়া তপন॥ আপনে হইয়া কৃষ্ণ কৃষ্ণ করি রাধা। চন্দ্রাবলী লইয়া কেলি করিব মন-সাধা॥ ধূ॥ . আপনে হইব হরি। . শ্যামকে করিব গৌরী॥ ১১৩॥ রাধার বচনে কৃষ্ণ মনে অনুরাগ। বিষ খাইয়া রাধে পাছে করে প্রাণ ত্যাগ॥ শ্রীহরি বলেন রাধে শুন মোর বাণী। তোমার নিকটে আছে দেব চক্রপাণি॥ অন্তরে ভাবনা কর সেই কালরূপ। নিকটে পাইবা কৃষ্ণ কহিলুঁ স্বরূপ॥ ধূ॥ . অন্তরে ভাবিহ গোরী। . তোমা ছাড়া নহে হরি॥ ১১৪॥ রাধিকা বলেন মোর মনে হেন লয়। আমাকে তেজিয়া হরি গিয়াছে নিশ্চয়॥ নিশ্চয় গিয়াছে হরি যথা চন্দ্রাবলী। নির্ব্বাণ আনলে ঘৃত কেবা দিল ঢালি॥ ধূ॥ . চন্দ্রাবলী সঙ্গ করি। . আমারে তেজিল হরি॥ ১১৫॥ শুন রামা বলি তোমা মনের যে দুখ। অন্তরে বিরহ ব্যথা মনে নাহি সুখ॥ ক্ষণে ক্ষণে মানে মানে করি আমি মান। বিষ খাইয়া তেয়াগিব এ ছার পরাণ॥ ধূ॥ . মনে করি ফণি ধরি। . গরল ভখিয়া মরি॥ ১১৬॥ রাধিকা যতেক বলে হইয়া অভিমানী। প্রিয় বাক্যে রাধাকে শান্তয়ে চন্দ্রাননী॥ কৃষ্ণ মন্ত্র জপ তুমি কর নিরবধি। সেই হরি হইবে হংস তুমি হবে নদী॥ ধূ॥ . সে হরি করিবে পার। . কৃষ্ণ তোমার গলার হার॥ ১১৭॥ জগতের নাথ কৃষ্ণ জানে সর্ব্বজন। গাত্রের গরবে তুমি না চিন আপন॥ অহর্নিশি ভাবে বসি দেব সনাতন। দূরে যায়ে সর্ব্ব দুঃখ কহিল বচন || ধূ || . ভাব বসি সর্ব্বক্ষণ | . হেথা পাবে নারায়ণ॥ ১১৮॥ রাধিকা বলেন শ্যামা শুনহ বচন! খোড়া হই চলো কেনো কহো বিবরণ॥ কিবা ব্যাধি হইল তোমার চরণ মাঝারে। তাহার বৃত্তান্ত তুমি কহতো আমারে॥ ধূ॥ . শুনহ মোহিনী রামা। . কিবা ব্যাধি হইল তোমা॥ ১১৯॥ শুনিয়া রাধার কথা বলে গদাধর। পতিশোকে অতি আমি হইয়াছি কাতর॥ আসিতে তোমার এথা উচাটন মনে। পথেতে উছট ঘা হইল চরণে॥ ধূ॥ . সেই হতে পদ ভারী। . সমানে চলিতে নারি॥ ১২০॥ শুনিয়া কৃষ্ণের কথা ললিতা বিশাখা। আপাদ পর্য্যন্ত আসি নিরখিল তথা॥ নারীর মানের হেতু হইলা নারী বেশ। নিশ্চয় জানিল সখী দেব হৃষীকেশ॥ ধূ॥ . শ্যাম রূপ করি লুকি। . আইলা হরি মায়ারূপী॥ ১২১॥ ইঙ্গিত কহিল কাণে ললিতা বিশাখা। শুনিয়া কুপিত হইল মানিনী রাধিকা॥ যাও যাও এথা হইতে যথা লয় মন। তোমারে রাখিয়া মোর নাহি প্রয়োজন॥ ধূ॥ . লইয়া আপন মান। . যাও হরি নিজ স্থান॥ ১২২॥ এক বোল বলিতে কৃষ্ণ বলে সাত আট। তোমা সমান নাহি রাধে নারী লোকের ঠাট॥ এক বোল দুই বোল হইল বোলাবুলী | রধিকা হইল অহি নকুল বনমালী || ধূ | . রাধার বচন শুনি . প্রাণ দহে অভিমানী || ১২৩ || লজ্জিত হইয়া রাধে রহিলেক মৌনে | ধীরে ধীরে ডাকে কৃষ্ণ নাহি শুনে কাণে || আকুল হইয়া কৃষ্ণ করিল গমন | শোকাকুলী হইলেক রাধিকার মন || ধূ || . ভাবে হরি কি করিল | . পাইয়া নিধি হারাইল || ১২৪ || ভাবিয়া চিন্তিয়া কিছু না পাইল হরি | উপনীত হইল আসি আপনার পুরী || নারীবেশ সম্বরিলা দেব হৃষীকেশ | পূর্ব্বে যেন কৃষ্ণ ছিলা হইলা নিজবেশ || ধূ || . শিখিপুচ্ছ চূড়া মাথে | . মুরলী করিল হাতে || ১২৫ || নারীবেশ ছাড়ি কৃষ্ণ ধড়া চূড়া পরি | ছিদাম সুদাম যথা গেলেন শ্রীহরি || জিজ্ঞাসে কৃষ্ণের তরে ভাই দুই জন | কি হেতু বিরস দেখি তোমার বদন || ধূ || . কাহার সময় মন্দ | . তোমা সনে করে দ্বন্দ্ব || ১২৬ || কোন জনে বোলাইল কৃষ্ণ কালসর্প | নিমিষে করিব চূর্ণ তাহার বলদর্প || অঘাসুর বকাসুর পুতনা রাক্ষসী | এ সব মারিয়া রাখিয়াছ স্বর্গ-বাসী || ধূ || . বিশিষিয়া কহো শ্যাম | . কারে বিধি হইল বাম || ১২৭ || শুনিয়া ছিদাম কথা বলিলেন শ্যাম | দ্বন্দ্ব না করিয়াছি আমি শুনহ ছিদাম || মান করি বসিয়াছে রাধা বিনোদিনী | না চাহে আমার পানে নাহি কহে বাণী || ধূ || . কিরূপে তথাতে যাব | . কেমনে প্যারিকে পাব || ১২৮ || আমার বচন তুমি শুনহ সুবল | দূতীরে ডাকিয়া আন কহিব সকল || সুবল বচনে দূতী আইসে শীঘ্রগতি | আদ্যোপান্ত যত কথা কহিল দূতী প্রতি || ধূ || . শুন দূতী সুবদনী | . কিসে পাব বিনোদিনী || ১২৯ || রাধার লাগিয়া শ্যাম হইয়া কাতর | নয়ানে বহয়ে নদী অতি ঘোরতর || দূতী বলে ক্রন্দন আর না কর শ্রীহরি | অবিলম্বে হও তুমি জটিল ভিখারী || ধূ || . তবে তুমি পাবে গোরী | . হও তুমি জটাধারী || ১৩০ || কান্দিয়া দূতীর প্রতি বলেন শ্রীহরি | কেমনে হইব আমি জটিল ভিখারী || দূতী বলে মোর কথা শুনহ গদাধর | অবিলম্বে হও তুমি ভোলা মহেশ্বর || ধূ || . শুন প্রভু মোর কথা | . যোগীবেশে যাও তথা || ১৩১ || ধড়া চূড়া তেজি তুমি ধর যোগীবেশ | বাম করে ধর শিঙ্গা জটাভার কেশ || বনমালা তেজি গলে দেহো রত্নমালা | পীত বস্ত্র পরিহরি পরো ব্যাঘ্র ছালা || ধূ || . শিরে ধরি সুরেশ্বরী | . হও তুমি জটাধারী || ১৩২ || শ্রবণে ধুতূরার ফুল করহ বিরাজিত | অর্দ্ধ চন্দ্র ললাটেতে করহো ভূষিত || রুদ্রাক্ষের মালা করে জপ সর্ব্বক্ষণ | তবে সে পাইবা রাধা কহিল কারণ || ধূ || . রাধার নিকটে যাইয়া | . মান ভিক্ষা লহ যাইয়া || ১৩৩ || আমার বচন প্রভু দড় করি ধর | রাধার নিকটে যাইয়া মান ভিক্ষা কর || আকাশের চন্দ্র সূর্য্য ভূমি যদি পড়ে | যোগীর বচন প্রভু কভু নাহি লড়ে || ধূ || . শ্যামরূপ পরিহরি | . হও তুমি জটাধারী || ১৩৪ || ত্রেতাযুগে তুমি যবে রাম অবতার | তখনি আছিলা সীতা সঙ্গতি তোমার || যোগীবেশে ভিক্ষা হেতু গেল দশানন | ক্ষুধিত পীড়িত আমি বলিল রাবণ || ধূ || . শত্রুভাব না বুঝিল | . অঙ্কের বাহির হইল || ১৩৫ || এতেক শুনিয়া কৃষ্ণ দূতীর বচন | কোথায় পাইব দূতী যোগীর ভূষণ || তাহার উপায় দূতী বলহ আমারে | কোথা আছে যোগীবেশ আনি দেহো মোরে || ধূ || . করো দূতী এই কাজ | . আনি দেহো যোগী-সাজ || ১৩৬ || শুনিয়া কৃষ্ণের কথা পুন বলে দূতী | অবিলম্বে পূজা কর দেব পশুপতি || যোগীবেশ আছে শুন কৈলাস ভুবনে | ছিদাম পাঠাইয়া দেহো শিবের সদনে || ধূ || . পূজ দেব ত্রিপুরারি | . যোগীবেশ পাবে হরি || ১৩৭ || শুনিয়া দূতীর কথা দেব নারায়ণ | ছিদামেরো পাঠাইল কৈলাস ভুবন || সহস্রেক বিল্বদলে লইয়া নারায়ণ | যোগীবেশ হেতু পূজে দেব পঞ্চানন || ধূ || . ভক্তি ভাবে গদাধর | . ধ্যান করে মহেশ্বর || ১৩৮ || তুমি দেব মহেশ্বর সদা অনুরাগী | রাধার মানের হেতু হইতে চাই যোগী || তোমার যতেক বেশ দেহো মোর তরে | ছিদামে পাঠাইয়াছি তোমার গোচরে || ধূ || . তুমি দেব মহেশ্বর | . মোর প্রতি দয়া কর || ১৩৯ || নারীর মরম তুমি জানহ সকল | সতীর কারণে প্রভু হয়েছিলা পাগল || পাগল হইলুঁ আমি রাধার কারণে | ধ্যান করিলাম তোমা এই সে কারণে || ধূ || . করোযোড়ে স্তুতি করি | . কৃপা করে ত্রিপুরারি || ১৪০ || অনাথের নাথ তুমি দেখ পশুপতি | খণ্ডাও মনের দুখ, দিয়া রসবতী || হরিহর এক অঙ্গ তাহে এত দুখ | পার্ব্বতী লইয়া তুমি কর নানা সুখ || ধূ || . দিয়া নানা পুষ্পাঞ্জলি | . পূজে হর বনমালী || ১৪১ || বহুল স্তবন হরি করে রাই শোকে | সেই পুষ্প পড়িলেক শিবের মস্তকে || কৌশলে পার্ব্বতী সঙ্গে দেব মহেশ্বর | রতন সিংহাসন পরি করে থর হর || ধূ || . ধ্যান করি শূলপাণি | . সর্ব্বত্র হইল জ্ঞানী || ১৪২|| ধ্যান করি ত্রিপুরারি সকলি জানিল | হেন কালে ছিদাম আসি প্রণাম করিল || সদাশিব জিজ্ঞাসিল ছিদামের স্থানে | কহো তো ছিদাম শুনি এমন হইল কেনে || শুনি মহাদেব বাক্য কহিল ছিদাম | শ্রীহরির তরে রাধে হইয়াছে মান || ধূ || . তোমা বেশ দেহো হর | . যোগী হবে গদাধর || ১৪৩ || ছিদামের বাক্য শুনি দেব পঞ্চানন | নন্দীরে ডাকিয়া তবে বলিল বচন || আনহ ভিক্ষার ঝুলি আর ব্যাঘ্র ছাল | | ললাটের শশী আর দিব্য হাড় মাল || ধূ || . ধর ছিদাম লহো করে . দেহো নিয়া গদাধরে || ১৪৪ || এতেক শুনিয়া নন্দী বলিল সত্বর | আমার বচন শুন দেব মহেশ্বর || ছিদামকে রাখি বন্দী দেহ নিজ বেশ | আমি গিয়া আসি দিয়া যথা হৃষীকেশ || ধূ || . পুন বেশ দিলে তবে | . ছিদাম খালাস হবে || ১৪৫ || এতেক শুনিয়া শিব নন্দীর বচন | কহিল ছিদামের তরে দেব পঞ্চানন || যোগী বেশ লাগি তুমি বন্দী থাক হেথা | যাইবে লইয়ে নন্দী কৃষ্ণ আছে যথা || ধূ || . নন্দী চলে হরষিতে | . কৃষ্ণ দরশন পাইতে || ১৪৬ || আনন্দে চলিল নন্দী কৃষ্ণ আছে যথা | মুখে কৃষ্ণগুণ গান হরিষ সর্ব্বদা || বায়ু বেগে চলিলেন মহেশের দাস | নিমিষে চলিয়া গেলা শ্রীহরির পাশ || ধূ || . যোগী বেশ করে দিল | . পদে পড়ি প্রণমিল || ১৪৭ || নন্দীকে দেখিয়া হরি জিজ্ঞাসে বচন | ছিদাম রহিল কোথা কহতো কারণ || শুনিয়া কৃষ্ণের কথা পুন বলে নন্দী | যোগী বেশ লাগি শিব রাখিয়াছে বন্দী || ধূ || . পুন বেশ পাইলা হরে | . ছিদাম আসিবে ঘরে || ১৪৮ || ছিদামের কথা কৃষ্ণ নন্দী মুখে শুনি | নন্দীকে বলিল হেথা থাকহ আপনি || রাধিকার মানভঙ্গ হইলে তারপর | পুন লইয়া যাবে তুমি শিবের গোচর || ধূ || . হাতে শিঙ্গা হাড়মাল | . বিভূতি বাঘের ছাল || ১৪৯ || কর্ণে পরিলেন হরি ধুতূরার ফুল | ললাটেতে অর্দ্ধচন্দ্র হস্তেতে ত্রিশূল || পীতবাস তেজিলেন হরষিত মনে | ব্যাঘ্রচর্ম্ম পরিধান করিলা যতনে || যোগীবেশ হইল প্রভু বৈকুন্ঠপতি | স্বর্গে থাকি দেবগণ কৈল বহু স্তুতি || ধূ || . নটবর বেশ ত্যাগি | . শ্যামচান্দ হইল যোগী || ১৫০|| জটামধ্যে ভাগীরথী করে কুল কুল | মধুপানে ত্রিনয়ানে করে ছল ছল || অগৌর চন্দন তেজি রাখিল বিভূতি | অবয়ব হইল যেন শিবের অব্যক্ত পশুপতি || ধূ || . অর্দ্ধচন্দ্র শোভে ভালে | . তাহে হাড়মালা গলে || ১৫১ || শিরেতে বেষ্টিত জটা বক্ষে শোভে ফণী | কান্ধেতে ভাঙ্গের ঝুলি লইল বনমালী || নর মুণ্ড হস্তে লয়ে ভিক্ষাপাত্র করি | রাধার নিকটে পুন চলিল শ্রীহরি || ধূ || . শিঙ্গাতে পূরিয়া সান | . মুখে হরি গুণগান || ১৫২ || এইমতে আনন্দেতে চলিল শ্রীহরি | পথেতে দেখিল তাহা রোহিণী সুন্দরী || রোহিণী বলিল যোগী শুনহ বচন | কোথায় নিবাস তোমার কোথায় গমন || ধূ || . কহ যোগী বিবরিয়া | . তোমা লাগি ফাটে হিয়া || ১৫৩ || অল্পবয়সে তোমার কেন যোগীবেশ | তোমারে দেখিয়া মোর তনু হইল শেষ || এমত বয়সে তোমার হেন ধর্ম্ম নয় | নিজপুরী যাও ফিরি কহিলুঁ তোমায় || ধূ || . তোমারে দেখিয়া যোগী | . আমি হইলাম অনুরাগী || ১৫৪ || হেন অঙ্গে শোভা করে চুনি আর মতি | তাহাতে যে পরিয়াছ শিবের বিভূতি || তোমা গলে শোভে ভাল মণিরত্ন মাল | তাহাতে কটিতে তোমার দেখি ব্যাঘ্রছাল || ধূ || . ভুবন মোহন রাজে | . হেন বেশ নাহি সাজে || ১৫৫ || তোমারূপ দেখিয়া আমার তনু বিদরয় | হেন অঙ্গে ব্যাঘ্র চর্ম্ম শোভা নাহি হয় || কোটী সূর্য্য জিনিয়া তোমার অঙ্গের যে ছটা | এমত বয়সে তুমি শিরে ধর জটা || ধূ || . যার দাস শশিকলা | . তার গলে হাড় মালা || ১৫৬ || শুন যোগী তোমা লাগি স্থির নহে প্রাণ | বারণ করিতে পুন ধৈরয না মান || তোমার বালাই ল’য়ে আমি যাই মরি | ফিরে ঘরে যাও তুমি দেখিতে না পারি || ধূ || . প্রাণ কান্দে তোমা লাগি | . ফিরে ঘরে যাও হে যোগী || ১৫৭ || এমত সুন্দর রূপ দেখিয়াছে কভু | বিভূতিয়া গ্রাস কৈল হইয়া যেন রাহু || তোমার জননী যোগী অতি বিপরীত | কেমতে ধৈরয মানি রাখিয়াছে চিত || ধূ || . কেমতে আছয়ে জীয়া | . তোমাকে বিদায় দিয়া || ১৫৮ || অনুমানে বুঝিলাম নাহি তার দয়া | তোমাকে করিয়া যোগী ধরিয়াছে কায়া || কেমন জননী পুন দেহে প্রাণ ধরে | তোমাকে করিয়া যোগী রহিয়াছে ঘরে || ধূ || . হেন মনে অনুমান | . সেই বুঝি অভিমান || ১৫৯ || এমত সুন্দর চান্দ পাঠাইয়াছে দূরে | কেমতে নিশ্চিন্তে সে যে রহিয়াছে ঘরে || অনুমানে বুঝি সেই কভু নাহি ঘরে | তোমাকে খুঁজিয়া বুঝি ফিরিছে নগরে || ধূ || . কি বুঝি তোমারে চাইয়া | . নগরে ফিরিছে ধাইয়া || ১৬০ || আমার বচন তুমি শুন জটাধারী | যোগী বেশ ছাড়ি তুমি যাও নিজ পুরী || তোমার জননী যোগী তোমার লাগিয়া | নগরে ফিরিছে ধাইয়া অনাথিনী হইয়া || ধূ || . যাও যোগী তেজি ভিক্ষা | . জননীরে কর রক্ষা || ১৬১ || আমার বচন শুন যাও মায়ের কোলে | তোমা হারাইয়া যেন ফিরিছে পাগলে || অবিলম্বে যাও তুমি মায়ের নিকটে | আছুক মায়ের কাজ মোর প্রাণ ফাটে || ধূ || . শুন যোগী তোমা বলি | . তোমার মাতা পাগলিনী || ১৬২ || যেই অঙ্গে শোভা করে রজত কাঞ্চন | সেই অঙ্গে করিয়াছ বিভূতি-ভূষণ || কান্ধের ফেলাহো ঝুলি তেজ ব্যাঘ্রছাল | নাহি শোভে যোগী বেশ নবীনছাওয়াল || ধূ || . হেরিতে তোমার মুখ | . বিদারে আমার বুক || ১৬৩ || শুনহ জটিল তুমি নাহি যাও কোথা | পালন করিবো আমি থাকো মোর হেথা || দধি দুগ্ধ ঘৃত ননী করাইব ভোজন | তেজিয়া যোগীর বেশ আইস মোর স্থান || ধূ || . চল যোগী মোর বাড়ী | . শিবের ভূষণ ছাড়ি || ১৬৪ || বিভূতি তেজিয়া তুমি আইস মোর ঘরে | বলরাম হইতে তোমায় পালিব সাদরে || ক্ষীর সর ননী ছানা আছে মোর ঘরে | দুই কর পূর্ণ করি দিব তো তোমারে || ধূ || . যোগী বেশ তেজো তুমি | . তোমারে পালিব আমি || ১৬৫ || ও চান্দ বদনে তুমি যারে বল মা | অনুমানে বুঝি তার জন্ম হবে না || কতেক তপস্যা করি তোমার জননী | হরগৌরী পূজি পাইল তোমা গুণমণি || ধূ || . শুনরে নিষ্ঠুর যোগী | . প্রাণ কান্দে তোমা লাগি || ১৬৬ || রোহিণীর এত কথা শুনিয়া শ্রীহরি | প্রীত বাক্যে কহেন কথা অতি সুমাধুরী || শিশুকাল হইতে ভিক্ষা করি আমি | আমাকে রাখিয়া মাতা কি করিবা তুমি || ধূ || . আমাকে দেখিয়া রাণী | . কেন তুমি পাগলিনী || ১৬৭ || তীর্থ পরিশ্রম আমি করিয়া ভ্রমণ | গয়া গঙ্গা রারাণসী করি যে গমন || শিশুকাল হইতে আমার তীর্থ পরিশ্রম | কখন নিবাস করি বদরিকাশ্রম || ধূ || . কোন হেতু অভিলাষী | . আমি যোগী তীর্থবাসী || ১৬৮ || ভিক্ষুক জনের রাখি হবে কোন কর্ম্ম | আজ্ঞা কর চলে যাই যথা নিজ ধর্ম্ম || এতেক বলিয়া হরি চলিল সত্বর | রোহিণী কহিল গিয়া যশোদা গোচর || ধূ || . শুন গো যশোদা রাণী | . যেন তোমার নীলমণি || ১৬৯|| শুন যশোমতি আমি বলিয়ে তোমার স্থানে | হেরিয়া যোগীর বেশ না ধরে পরাণে || কৃষ্ণের সমান রূপ অঙ্গভঙ্গ হেলা | কোটীচন্দ্র জিনিয়া বদন উজলা || ধূ || . যে দেখেছে একবার | . সে কি পাসরিবে আর || ১৭০ || কৃষ্ণের আকৃতি যতো ধরে সেই যোগী | তীর্থ পরিশ্রম করে গৃহধর্ম্ম ত্যাগি || রাখিতে চাহিলুঁ আমি অনেক যতনে | আমার বচন যোগী না শুনিল কাণে || ধূ || . তোর নীলমণি প্রায় | . দেখি রাণি যোগী যায় || ১৭১ || কেমনে নিশ্চিন্ত রাণি আছ নিজকাজে | দেখসিয়া যোগীবর চলেছে বিরাজে || এমতো বয়সে যোগী হাতে লইল থাল | শিবনাম লইয়া সদা বাজাইছে গাল || ধূ || . দেখসিয়া পুণ্যবতি | . যেন গোলোকের পতি || ১৭২ || এতেক শুনিয়া রাণী রোহিণীর কথা | ছাড়িয়া মথনদড়ি চলিলেক তথা || উর্দ্ধমুখী ধায় রাণী যোগীবর কাছে | কাঁটা খোচা নাহি মানে নাহি চাহে পাছে || ধূ || . ডাকে রাণী উর্দ্ধমুখী | . দাঁড়া যোগী তোরে দেখি || ১৭৩ || নীলমণি না দেখিয়া হইয়াছি আকুল | বাড়াবাড়ি ধায় রাণী নাহি বান্ধে চুল || দাঁড়া দাঁড়া করি রাণী ডাকে উর্দ্ধ করে | কৃষ্ণের বদলে আমি হেরিব তোমারে || ধূ || . উর্দ্ধমুখে ডাকে রাণী | . যোগী নাহি শুনে বাণী || ১৭৪ || আড় নয়ানে হরি দেখিল চাহিয়া | পাগলের প্রায় মাত্র আসিতেছে ধাইয়া || এতেক দেখিয়া কৃষ্ণ লাগিল চিন্তিতে | আমাকে দেখিলা রাণী না দিবা যাইতে || ধূ || . এতো ভাবি ব্রজপতি | . চলিলেন শীঘ্রগতি || ১৭৫ || না শুনে মায়ের কথা নাহি চাহে ফিরি | দ্রুতগতি চলিলেন অতি শীঘ্র করি || পাছে পাছে ধায় রাণী না পায়ে দেখিতে | অঙ্গেতে গলিত ঘর্ম্ম না পারে চলিতে || ধূ || . যদি যোগী বাড় আগে | . শিবের দোহাই লাগে || ১৭৬ || এতেক শুনিয়া যোগী শিবের দোহাই | মায়ের কাতর দেখি দাঁড়াইল তথাই || যোগীর নিকটে গিয়া নন্দের রমণী | হেরিয়া গোবিন্দ মুখ বলে প্রিয়বাণী || ধূ || . হেন মনে অনুমানি | . তুমি আমার নীলমণি || ১৭৭ || দেখিয়া যোগীর রূপ রাণী গেলো ভুলে | দুই কৃষ্ণ পাইলাম আইস বাছা কোলে || আমার বালক কৃষ্ণ নবীন বয়েস | সেই মত দেখি আমি তোমার যে বেশ || ধূ || . যেমন আমার কৃষ্ণধন | . তোমাকে দেখি তেমন || ১৭৮ || আইস যোগী মোর বাড়ী লইয়া যাব আমি | ক্ষীর সর ননী দিব যতো খাও তুমি || এমত বয়সে তুমি নাহি হও যোগী | ফিরিয়া চলহ ঘরে শুনহ বৈরাগী || ধূ || . আমার বচন ধর | . মায়ের প্রাণ রক্ষা কর || ১৭৯ || এতেক বলিয়া রাণী কোলে তুলি লইল | মরকত মণি যেন নন্দরাণী পাইল || আনন্দে বিভোরা হইয়া রাণী কহে কথা | দুই নীলমণি মোরে দিলেন বিধাতা || ধূ || . অনেক জপের ফলে | . দুই কৃষ্ণ পাইলাম কোলে || ১৮০ || রাণীর এতেক বাক্য শুনিয়া শ্রীহরি | ধীরে ধীরে কহেন কৃষ্ণ বচন মাধুরী || আমাকে ছাড়িয়া দেহো শুন নন্দরাণী | ফলমূলহারী আমি নাহি খাই ননী || ধূ || . আমি যোগী তীর্থবাসী | . কেন তুমি অভিলাষী || ১৮১ || তীর্থবাসী হই আমি বস্ত্রে নাহি কাজ | দুখের সাগরে ভাসি করিয়া বিরাজ || ধূ || . শুন বাক্য রাণী তুমি | . ছাড়ি দেহো যাই আমি || ১৮২ || শুন শুন নন্দরাণি বলি গো তোমারে | তেজোহ আমার আশা ছাড়ি দেহো মোরে || নিমিষে করিব নষ্ট তোর রাম কানু | শাপে ভষ্ম করিব তোমার যত ধেনু || ধূ |\ . মোরে যদি দেহো তাপ | . দিব আমি ব্রহ্মশাপ || ১৮৩ || নন্দ | উপানন্দ আর সানন্দা প্রভৃতি | অতিনন্দ | মহানন্দ | তোর যতো জ্ঞাতি || নবলক্ষ ধেনু তোর যবত্স সহিত | শাপে নষ্ট করি আমি যাব শীঘ্র গতি || ধূ || . এতো শুনি ভয়ে রাণী | . বিদায় কৈল নীলমণি || ১৮৪ || শুনিয়া যোগীর কথা ভয়াতুর মন | কোল হইতে নীলমণি ছাড়িল তখন || যাও যাও যোগী তুমি সেই স্থানে থাকো | একবার তুমি মোরে মা বলিয়া ডাকো || ধূ || . এত বলি নন্দরাণি | . ছাড়ি দিল নীলমণি || ১৮৫ || কান্দিতে কান্দিতে রাণী যায় নিজ ঘরে | দুনয়ানে জল রাণীর পড়িতেছে ধারে || মায়া করি চলি যায় দেব গগাধর | শিঙ্গাতে পূরিয়া সান চলিল সত্বর || ধূ || . করেতে লইয়া থাল | . গলে শোভে হাড় মাল || ১৮৬ || ঘন ঘন শিব শিব বলে যদুমণি | উপস্থিত হইল গিয়া যথা বিনোদিনী || ভিক্ষা দেহো বলি তবে দাঁড়াইল যোগী | অন্যমনে ছিলা সখী উঠিল চমকি || ধূ || . মৃগচর্ম্ম শিরে ধরি | . সম্মুখে দাঁড়াইলা হরি || ১৮৭ || মহা তেজোময় যোগী দেখিয়া ললিতা | শীঘ্রগতি রাধিকারে জানাইল বার্ত্তা || যোগীর বচন শুনি রাধা বিনোদিনী | সরল হৃদয় আইল যথা চক্রপাণি || ধূ || . করযোড়ে রসবতী | . যোগীরে করয়ে স্তুতি || ১৮৮ || রাধিকা বলেন যোগী বলিয়ে তোমারে | কিবা হেতু এথা আইলা কহত আমারে || ধূ || . আমি রাধে দুখভাগী . প্রাণ ভিক্ষা লহ যোগী || ১৮৯ || রাধার বচনে শ্যাম মনে বড় সাধ | প্রিয়ভাষে রাধারে করিল আশীর্ব্বাদ || আইয়তে যাউক কাল হউক চির আয়ু | তোমার বচনে রাধে প্রীত হইল বহু || ধূ || . তুমি রাধে সাধ্যে সতী | . আমি তো ভিক্ষুক জাতি || ১৯০ || বহুদেশ ভিক্ষা আমি করিয়া বেড়াই | তোমাসম গুণবতী কভু দেখি নাই || সর্ব্বদুখ দূরে গেলো দেখি তোমার মুখ | আশ্বাসিয়া খণ্ডাহ আমার মন দুখ || ধূ || . তোমার বচন শুনি | . আনন্দ আমার প্রাণি || ১৯১ || জটিল বলেন রাধে শুন মোর কথা | তোমার হাতের ভিক্ষা লইব সর্ব্বথা || ত্রেতাযুগে ছিলা তুমি রামের বনিতা | রাবণে হরিল তোমায় নাম ছিল সীতা || ধূ || . দশাননে যোগী বেশে | . দাঁড়াইলা তোমার পাশে || ১৯২ || লক্ষ্মণ বচন তুমি করিলা লঙ্ঘন | অঙ্কের বাহির তুমি হইলা তখন || ফলমূল নানা দ্রব্য লইয়া কুতূহলে | ধর ধর বলি দিলা দশানন থালে || ধূ || . তোমা হেরি দশানন | . তেজিল আপন প্রাণ || ১৯৩ || হেন গুণবতী তুমি আমি জানি তোমা | দনুজ দলনী তুমি পতিব্রতা রামা || তোমার হাতের ভিক্ষা যেই জনে লয় | আয়ু বৃদ্ধি হয় তার কহিল নিশ্চয় || ধূ || . এই হেতু আমি যোগী | . তোমার স্থানে ভিক্ষা মাগি || ১৯৪ || রাধিকা বলেন যোগী শুন মোর বাণী | এই স্থানে কিছু কাল দাঁড়াও আপনি || নিকটে আসিয়া আমি হেরি তোমার মুখ | তোমাকে দেখিয়া যোগী বিদরয়ে বুক || ধূ || . এইখানে দাঁড়াও তুমি | . তোমার মুখ দেখি আমি || ১৯৫ || এমত কালেতে তুমি কেন হেন বেশ | শরীরের আভা দেখি যেন হৃষীকেশ || তীশাতীশী হরি কিবা দেব ত্রিপুরারি | কোন দেব আইলা তুমি বুঝিতে না পারি || ধূ || . আমি মানি দুখ রামা | . চিনিতে না পারি তোমা || ১৯৬ || সন্ন্যাসীর বেশে তোমায় নাহি দেখি ভাল | দিব্য বস্ত্র দেই আমি তেজো ব্যাঘ্র ছাল || হাড় মালা তেজো গলে দেহ রত্ন মালা | শিঙ্গা জটা তেজো তুমি হস্তের যে থালা || ধূ || . আমি যদি মনে করি | . সোণার বাঁশী দিতে পারি || ১৯৭ || রাধিকা কহেন যোগী কহি তত্ত্ব সার | দেখিয়া তোমারে প্রাণ বিদরে আমার || তোমারে দেখিয়া যোগী বিদরয়ে বুক | নবীন বয়সে তুমি হইয়াছ ভিক্ষুক || ধূ || . নূতন যোগী হইলা তুমি | . হেরি দুখে মরি আমি || ১৯৮ || আমার বচন তুনি শুন যোগীবর | যেই ভিক্ষা চাহ তুমি দিব তা সত্বর || করী দন্ত সম কথা জানহ আমার | কভু মিথা নহে শুনে কহিলাম সার || . রাধা হইল কল্পতরু | . ভিক্ষুক অনাথের গুরু || ১৯৯ || শ্রীহরি বলেন রাধে মোর প্রাণ রাখ | ধন অর্থ নাহি চাই মানের ভিক্ষুক || তব মান দেখি রাই হইয়াছি কাতর | মান ভিক্ষা দিয়া রাধে প্রাণ রক্ষা কর || ধূ || . আর ভিক্ষা নাহি চাই | . মান ভিক্ষা পাইলা যাই || ২০০ || তখনে জানিল রাধে দেব হৃষীকেশ | আমার মানের হেতু হইলা যোগী বেশ || কোথা পাইলা যোগী বেশ কহো তো মুরারি | বলিরে ছলিলা যেন বামন রূপ ধরি || আমারে ছলিলা তুমি মানের কারণ | বলিরে ছলিলা যেই হইয়া বামন || ধূ || . বলিরে ছলিলে যেন | . মান ভিক্ষা কর তেন || ২০১ || রাধিকা বলেন প্রভু হইলাম মানত্যাগী | দাসীর লাগিয়া প্রভু কেন হইলা যোগী || নিশ্চয় জানিল হরি কভু নহে দূরে | বাঁকা নয়ান দেখি যেন দেব গদাধরে || ধূ || . আমার কারণে হরি | . হইল তুমি দণ্ডধারী || ২০২ || রাধিকা বলেন মান গেলেন সকল | তোমারো চাতুরি প্রভু যেন গঙ্গাজল || তথাপি তোমারে আমি মান ভিক্ষা দিল | প্রেমে পুলকিত কৃষ্ণ নাচিতে লাগিল || ধূ || . শুনিয়া রাধার বাণী | . হরষিত চক্রপাণি || ২০৩ || প্রেমের তরঙ্গে তথা ভাসিল শ্রীহরি | বামপাশে দাঁড়াইল রাধিকা সুন্দরী || সহচরী সভে মেলি হেরিতে লাগিল | চান্দে মেঘে দুই জনে একত্র হইল || ধূ || . রাধে চান্দ শ্যাম কাল | . ভুবন করেছে আলো || ২০৪ || হেরিয়া কৌতুক হইল ললিতা বিশখা | রাম সীতা যেন মতে সেই মতে দেখা || ক্ষণে ক্ষণে শ্যামরূপ বনমালা গলে | দেখিয়া সকল সখী পড়ে গেলো ভুলে || ধূ || . ললিতা বলে গো সখি ! . হেনরূপে নাহি দেখি || ২০৫ || ;চিনিতে না পারে কেহো শ্যামের মূরতি | ক্ষণে হরি ক্ষণে হর দেখিয়া আকৃতি || অনন্ত প্রভুর মায়া মহিমা অপার | শিব শুক আদি অন্ত না পায় যাঁহার || ধূ || . হের দেখ ত্রিপুরারি | . বামেতে শোভিছে গৌরী || ২০৬ || সর্ব্ব মায়া সম্বরিলা দেব গদাধর | রাধাকৃষ্ণ হইল পুন জগত ঈশ্বর || ধড়া চূড়া বেণু হাতে মাথে শিখী-পাখা | দেখিয়া বিস্ময় হইল ললিতা বিশখা || ধূ || . যে দেখেছে একবার | . সে কি পাসরিবে আর || ২০৭ || অন্তরে হইল সুখী যতেক রমণী | রাধিকা বলেন প্রভু শুন মোর বাণী || কোথায় পাইলা যোগীবেশ কহো তত্ত্ব শুনি | দাসীর লাগিয়া যোগী হইল চক্রপাণি || আমার কারণে প্রভু হইলা যোগীবেশ | তোমার কারণে মোর তনু হইলা শেষ || ধূ || . নটবর বেশ ত্যাগি | . দাসীর লাগি হইলা যোগী || ২০৮ || তোমার লাগিয়া প্রিয়া পূজিলাম হর | ছিদাম রহিল বান্ধা যথা মহেশ্বর || পুনরপি যোগীবেশ পাঠাইলা কৈলাস | তবে সে ছিদাম ভাই হইবে খালাস || ধূ || . শুন রসবতী রাধা | . ছিদাম কৈলাসে বান্ধা || ২০৯ || চলত শ্রীমতী যাই আপনার স্থানে | নন্দীকে পাঠাইয়া দেই শিবের সদনে || মহাদেব বেশ পুন পাঠাইয়া দিব | আপনার ধড়াচূড়া আপনি পরিব || ধূ || . হরবেশ হরকে দিবো | . তবে সে ছিদামকে পাবো || ২১০ || ছিদাম কারণে আমি অন্তরে কাতর | চল শীঘ্রগতি যাই আপনার ঘর || তোমা ছাড়া নহি আমি জানিও নিশ্চয় | অবিলম্বে চলহ দুহে যাই নিজালয় || ধূ || . নন্দী যে কৈলাসে যাবে | . তবে ছিদাম খালাস হবে || ২১১ || পুলকিত দুই অঙ্গ মজিলেক চিত | সলিল কমলে যেন হইল পিরীত || মিলন হইল কৃষ্ণ শ্রীমতী সহিত | নিকুঞ্জ মন্দিরে গেলা বিচিত্র শয্যায় || ধূ || . দুই অঙ্গ পুলকিত | . প্রেমরসে বিকশিত || ২১২ || শ্রীমতী বলেন প্রভু করি নিবেদন | তোমার প্রেমেতে পুন হইল বন্ধন || এমতে থাকিবা হরি আমার অন্তরে | মৃণালের সূত্র যেন ছাড়িয়া না ছাড়ে || ধূ || . তুমি সে গোলোকবাসী | . ছিদাম মানী হইলাম দাসী || ২১৩ || চন্দ্রাবলী হেতু মান করিয়া ছিলাম আমি | যোগীবেশ হইয়া তাহা খণ্ডাইলা তুমি || তোমার গলার হার রাধিকা সুন্দরী | নিশ্চয় কহিলাম আমি শুনহ শ্রীহরি || ধূ || . আগে ছিলাম অভিমানী | . এখন আমি হইলাম রাণী || ২১৪ || হরি হরি বলো ভাই ভরিয়া বদন | আনন্দে করেন কৃষ্ণ রাধিকারমণ || স্বর্গেতে দেবতাগণ আনন্দিত হইল | পারিজাত সুগন্ধি চন্দন বৃষ্টি কৈল || ধূ || . দুইরূপ সমতুল | . কালো জলে জবা ফুল || ২১৫ || চারিদিকে জয় জয় সখী সবে বলে | নিকুঞ্জ মন্দিরে হরি রাই লইল কোলে || চতুর্দ্দিকে সখী সবে দেয় করতালি | রাধিকা সহিত কৃষ্ণ করে রস-কেলি || . যেন শোভে শ্যামর কোলে | . চাঁদের মালা মেঘের গলে || ২১৬ || অঙ্গে অঙ্গে হেলাহেলি ভিড়া ফিরে বাহু | শরতের পূর্ণচন্দ্র গ্রাসিল যেন রাহু || কাচে বেড়া কাঞ্চন কাঞ্চনে বেড়া কাচে | রাধাকৃষ্ণ দুই তনু এক হইয়া আছে || . ধন্য বৃন্দাবন হইল | . শ্রীরাধা গোবিন্দ পাইল || ২১৭ || ললিতা বলে গো শুন দিয়া মন | আজি বৃন্দাবনে হইল চন্দ্রেতে গ্রহণ || তোমা সম ভাগ্যবতী নাহি পৃথিবীতে | পূর্ণ প্রীতি পাইয়া দান করিতে উচিত || ধূ || . পাইলা তুমি ভগবান | . করহ আমা প্রীতিদান || ২১৮ || ভাগ্যবস্তু নিকটে থাকয়ে দুঃখীজন | দান পাইতে আশ তার থাকয়ে যেমন || আমি পুরোহিত হব কৃষ্ণ হবে দানী | তুমি বসি কর দান শুন বিনোদিনী || ধূ || . শুনিয়া ললিতার বাণী | . দানে বৈসে সুবদনী || ২১৯ || তিল তুলসী জল লইয়া নিজ করে | ভাগ্যবতী রাধিকা যৌবন দান করে || কৃষ্ণ-প্রীতি অঙ্গ রাই সমাপন কৈল | সখী সব আনন্দেতে জয় ধ্বনি কৈল || তবে পুন ললিতা যে বলিল বচন | কি দক্ষিণা দিবা মোরে আনহ এখন || রাই বলে কৃষ্ণ বিনা যাহা চাহ তুমি | সর্ব্বস্ব দিবার শক্তি ধরি যেন আমি || . কৃষ্ণ বিনা চাহ যেই ধন | . দেই আমি এই ক্ষণ || ২২০ || ললিতা বলেন তোমার কৃষ্ণকে না চাই | যেই দক্ষিণা দিবা আগে সত্য কর রাই !!! রাই বলে কৃষ্ণ বিনা চাহ যেই ধন | সত্য সত্য সেই দক্ষিণা দিব এইক্ষণ || ধূ || . রাই যদি সত্য কৈল | . ললিতার আনন্দ হৈল || ২২১ || যে দক্ষিণা চাই আমি শুন বিনোদিনী | নিকুঞ্জে করিবা কেলি দুই জন যখনি || ধূ || . যখন দুজনে একত্র হইবা | . যুগল চরণ মোর মাথে দিবা || ২২২ || ব্রহ্মা আদি দেব যারে সদাই ধেয়ায় | তুমি সে বেঁধেছ, প্রেমে হেন যুবরায় || ধূ || . যেই পদরেণু লাগি | . শঙ্কর হইল যোগী || ২২৩ || . বল সবে হরি হরি | . শমনে যাইবা তরি || . রাধা কৃষ্ণ মিলন হইল || ধূ || . বল সবে হরি হরি | . গোবিন্দ পাইল গৌরী || ২২৪ ||