পল্লীশ্রী কবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার সজনীকান্ত দাস, সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য, রসিকচন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত বঙ্গশ্রী পত্রিকার আষাঢ় ১৩৪৮ সংখ্যায় (জুন ১৯৪১) প্রকাশিত। কবির তখন মাত্র ১৮ বছর বয়স!
বল্লীঘেরা পল্লীমায়ের ছায়াশীতল প্রাণে, যে সুর বাজে ঐ যে জাগে রাখাল ছেলের গানে। একহাতে তাঁর পাঁচনখানি, আরেক হাতে বাঁশী, পল্লীমায়ের বিষাদ-ঘন ঠোঁটে ফোটায় হাসি। কোথাও ফোটে আকন্দ যুঁই, কোথাও বেলী চাঁপা, মন্দ-মৃদুল বাতাস ভরে শ্যামল পাতার কাঁপা। ঐ যে নদী ছোট্ট নদী চলছে এঁকে বেঁকে, পল্লী মায়ের চরণতলে ঢেউয়ের দোলা রেখে। পল্লীবধু ঘোমটা ফাঁকে---চাইনী সে চঞ্চল, চলছে ধীরে কলসী কাঁখে আনতে ঘাটে জল। গ্রামে সবাই চল রে ফিরে বাঁধবি সেথায় ঘর, সকাল বেলার দেখবি সবে প্রথম রবির কর। মুগ্ধ চিতে শুনবি বারেক রাখাল ছেলের বাঁশী, দেখবি সবে দৃশ্যে নব পল্লীমায়ের হাসি। শুনবি সবে আপন মনে প্রভাত পাখীর গান, হাওয়ার বুকে ভেসে আসা নদীর কলতান। গান গেয়ে ঐ ধায় চলে যায় পানসী নায়ের নেয়ে, চৈত্র আকাশ আঁধার করে মেঘ আসে ঐ ছেয়ে। প্রণাম করি পল্লী তোমায় তুলনাহীন ভবে, বল্লীঘেরা পল্লীবুকে চল রে ফিরে সবে।
দুর্মদ কবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত “পরিচয়” পত্রিকার মাঘ ১৩৪৮ সংখ্যায় (জানুয়ারী ১৯৪২) প্রকাশিত। কবির তখন মাত্র ১৮ বছর বয়স।
এখানে রয়েছে পড়ে পৃথিবীর নগ্ন রূপ যত ; তারে আমি দেখিয়াছি, ভয়ে লাজে উঠিয়াছি কাঁপি। বিস্তীর্ণ উদার মেঘে বিদ্যুৎ আরতি করে কত ; বজ্রের গম্ভীর কণ্ঠে বিদ্রোহের ধ্বনি ওঠে ছাপি। এখানে আসেনি কেহ ফাগুনের মহা উত্সবে, এখানে পায়নি কেহ বসন্তের নব সমাচার। নির্জ্জন অরণ্য মাঝে দেখিয়াছি বিভীষিকা সবে ; জীবন বীণার মাঝে বাজে নাই নব ঝঙ্কার।
এখানে জীবন পরে দেখিয়াছি মরুভূমি ধূ ধূ, হেথায় শুনেছি আমি রক্তের মহা কলরব। ঊষর প্রান্তরে তবু আমি একা ছুটিয়াছি শুধু ; জীবনের বালুচরে শুনিয়াছি তরঙ্গের স্তব। মানুষের কামনায় শুনিয়াছি সমুদ্র গর্জ্জন, দেখিয়াছি জীবনের জীবনেরে পেতে ব্যাকুলতা। জীবনের শেষপ্রান্তে জীবনেরে দিতে বিসর্জ্জন ; কারো মুখে শুনি নাই ত্যাগদৃপ্ত এতটুকু কথা।
এখানে দেখেছি আমি রক্তমাখা ধূসর গোধূলি, রাঙ্গা চোখে রক্ত স্বপ্ন, দেখিয়াছি জাগে বিস্ময়। প্রত্যহের রূঢ়তায় ন্যুব্জ দেহ মোর দিনগুলি ; চলে গেছে ধীরে ধীরে যায় নাই রাখি সঞ্চয়। এখানে দেখেছি আমি মানুষের ভয়াবহ রূপ, কঙ্কালের স্তূপ হেরি কাঁপিয়াছে সদা সৃষ্টি প্রাণ। স্তব্ধীভূত অন্ধকারে তারকারা করে বিদ্রূপ ; এখানে নয়নে মোর কে করিবে নব দৃষ্টি দান!
শরৎ সে চিরদিন যাত্রী কবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার আশ্বিন ১৩৪৮ ( অক্টোবর ১৯৪১ ) সংখ্যা থেকে পাওয়া। মিলনসাগরে প্রকাশ - ১৫ই আগস্ট ২০১৮
সুন্দর ধরাতল সৃষ্টির বক্ষে দৃষ্টিতে লাগে নব স্পর্শ, নিশির শিশিরে ভেজা শ্যামল তৃণদল মধুর মিলন ঘনরাত্রি । হৃদয়ের দ্বারে দ্বারে আজি কেন বারে বারে জেগে ওঠে অভিনব হর্ষ, নিবিড় মমতা তবু অনন্তকাল পথে শরৎ সে চিরদিন যাত্রী । বলাকার অন্তরে নিবিড় চেতনা জাগে, উড়ে যায় পাখা নেড়ে গগণে ; সন্ধ্যার তারা যত নিদ্ হারা আঁখি নিরে জাগিছে রাতের পর রাত্রি । বনের কুসুম যত ঘুমের বাঁধন ছিঁড়ি গন্ধ ছড়ায় শুধু সঘনে— নিবিড় মমতা তবু অনন্তকাল পথে শরৎ সে চিরদিন যাত্রী । নিথর গহিন রাতে সমীরণ আঁখি পাতে নিয়ে আসে সুখময়ী তন্দ্রা, বাউলের সঙ্গীতে মঙ্গল ধ্বনি ঐ রাগিণী কাঁপিয়ে তোলে রাত্রি । গৌরব-ভরা ঐ সৌরভ সুন্দর কুঞ্জে এলায় নিশি সন্ধ্যা ; নিবিড় মমতা তবু অনন্তকাল পথে শরৎ সে চিরদিন যাত্রী । কুঞ্জে কুঞ্জে ঐ অলিকুল গুঞ্জে, তার সাথে বিহগের সঙ্গীত, জ্যো’স্না মুখরিত সুখতারা নির্জ্জন আজি এ রূপালী ধন রাত্রি, চারি ধারে নব সাড়া ধরণী পাগ’ল-পারা জেগে উঠে পুলকের ইঙ্গিত ; নিবিড় মমতা তবু অনন্তকাল পথে শরৎ সে চিরদিন যাত্রী ।