কবি নিরুপমা দেবী ১ এর কবিতা
*
এলোরে দুরন্ত বান ডুবালো মাঠের ধান
কবি নিরুপমা দেবী
১৯৪০ সালে নিরুপমা দেবীর লেখা “যুগান্তরের কথা” উপন্যাসের “যুগান্তরের ব্যথা”  
অনুচ্ছেদের গান, ৯৭-পৃষ্ঠা। গানটি এমনভাবে দেওয়া রয়েছে যে মনে হতে পারে যে এটি
কোনও প্রচলিত বর্ষা-প্লাবনের গান। তা বোঝাতে গানটির আগের কয়েকটি লাইনও  
আমরা এখানে তুলে দিলাম। গানটি যদি সত্যই প্রচলিত গান অথবা অন্য কোনও কবির
রচনা হয়, তাহলে প্রমাণ সহ জানালে আমরা তা শুধরে দিয়ে তথ্য-প্রেরকের প্রতি  
কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবো এই পাতায়।


ভোরের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ ভেঙে পড়লো।  সে  কি  বৃষ্টি! সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে  জলের
স্রোত। বানে চারদিক সমুদ্র হ’য়ে উঠ্ লো, ঘরের পেছনে যে কাশ ফুল ফুটছে এমনি ফেনা
ভেসে চল্ লো। ছেলেরা দোলাই গায়ে মুড়ির ধামি নিয়ে দুয়োরে ব’সে জলের দিকে চেয়ে
গাইতে লাগ্ লো।

এলোরে দুরন্ত বান ডুবালো মাঠের ধান
.        সর্ব্ব জীবে করে হায় হায়।
আসমান হুড় হুড় ক’রে পূবে লাগে ঢেউ
গেরামের কুকুরগুলা করে ঘেউ ঘেউ।
গাছপালা ডুবিয়ে গেল আর বনের বাঘ,
গাছের আগায় বেঁচে র’ল ধেড়ে বেটা কাগ।
ভাঙিতে ভাঙিতে বান বর্দ্ধমান নিল,
সহর পহর গ্রাম সকলি ডুবাল।
মরা গরুর ভেলা পেয়ে বাঘ যায় ভেসে
গাছের আগে ব’সে কাক ম’ল হেসে।
বাঘ বলে “কাগা যখন ডুববে বাঁশের আগা
কোন্ চুলোতে থাকবি ওরে হরিনগরের কাগা?”
“শাখায় আছি পাখা নেড়ে উড়ে যাব আমি,
হাঁটু জলে বাঘ ভায়া প’ড়ে থাক্ বে তুমি।”
কাগে বাঘে গণ্ডগোল অপরূপ কথা---
স্রোতের ঠেলায় ভেসে গেল হুগলি কলকাতা।

.              ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নমো বঙ্গভূমি শাওলাঙ্গিনী
কবি নিরুপমা দেবী
১৯১৫ সালে নিরুপমা দেবীর লেখা “দিদি” উপন্যাসের অষ্টম পরিচ্ছেদের গান, ২৭৩-পৃষ্ঠা।
ম্যালেরিয়া নিয়ে লেখা গান!


নমো বঙ্গভূমি শাওলাঙ্গিনী!---
দিকে দিকে জননী জ্বরপ্রসারিণী!

সুদূর নীলাম্বর-প্রান্ত সঙ্গে
ম্যালেরিয়া-ধোঁয়া মিশিতেছে রঙ্গে,
চুমি পদধূলি চলে পিলেগুলি---
রূপসী নরণী পানা-পুষ্করিণী!---
তাল তমালদল নীরবে বন্দে,
কারণ উজাড় দেশ কলেরা বসন্তে,

নীরবে ঘুমাও নীরব-গ্রামিণী!---
কিসে এ দুঃখ মা গো কেন এ দৈন্য,
সে কথা আমরা ছাড়া কে জানিবে অন্য?
পালাই পালাই ডাক ছাড়ে পুত্রগণ!---

বত্সর পরে যদি গ্রামে জোটে সবে,
অমনি চাপিয়ে ধর ‘জননী গরবে’,
তখন ডাক ঝাট্ বৈদ্য, না হয় পালাও সদ্য,
চিনেছি তোমারে পীলেরুগী জননী!---

.              ***************  
.                                                                               
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
বর্ষা রাত্রে
কবি নিরুপমা দেবী
ভারতী পত্রিকা, আশ্বিন ১৩২৮ সংখ্যা (মার্চ ১৯২১) থেকে নেওয়া। “দিদি” উপন্যাসের
রচয়িতা কবি নিরপমা দেবীর সেই সময়ে ৩৮ বছর বয়স। অপর নিরুপমা দেবীর তখন
২৬ বছর বয়স। তাই এই কবিতাটি কার তা আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।
অপর নিরুপমা দেবীর একটি কবিতা রয়েছে “বর্ষাছবি” শিরোনামের তাঁর ১৩২৫ বঙ্গাব্দে
(১৯১৮) প্রকাশিত “ধূপ” কাব্যগ্রন্থে। সেই কবিতাটি পড়তে, মিলনসাগরে অপর নিরপমা
দেবী ২ এর পাতায় যেতে
এখানে ক্লিক করুন . . .


শাওন গগন ঘেরা সিন্দুর মেঘে
পশ্চিম হতে বায়ু বহে ঘনে বেগে।
ঝম্ ঝম্ চলে বারি গলি জলধরে
ছুটায়ে গিরির বুকে শত নির্ঝরে।

কলকল রবে ধেয়ে ছুটে চলে জল
সবুজে ভরায়ে তোলে মরুতৃণ দল।
বসন্ত জেগে ওঠে তৃণ-পল্লবে
ঝরে পড়ে নীপ-রেণু ঘন সৌরভে।

আঁধার গগন হ’তে নামি শিরশিরে
গুরু গুরু রবে মেঘ নিঘোষি ফিরে।
শ্রাবণ রজনী বুকে ,ঘন আঁধারে
স্বপনের আনাগোনা চলে অভিসারে।

বাহি কত জনপদ,        কত দূরপথ
গিরি-দরি-প্রান্তর          চড়ি মেঘ-রথ
ছুটায়ে তড়িৎ-কশা,      স্বপনের হাতে
হাত ধরাধরি করি        এলে এই রাতে?

হেথা কোথা অতীতের ছায়াময় ঘর!
এযে অবারিত মাঠ গিরি-প্রান্তর!
ঠেলি রুঢ়-যবনিকা দাঁড়াইলে আসি,
ঘন মেঘে খেলে মুহু তড়িতের হাসি।

চেতনে এ অচেতনে ওগো একি ভেদ,
মিশে গেছে কোন্খানে যুগবাহী ছেদ!
সেই সব---সেই সব---সেই দুইজন,
মাঝখানে মহাকাল হ’য়ে অচেতন!

.              ***************  
.                                                                                 
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর