কবি রণেশ রায়ের কবিতা
*
তোমার হাসি
কবি রণেশ রায়
কবি পাবল নেরুদার
Your Laughter কবিতা অবলম্বনে।

যদি চাও আমার থেকে ছিনিয়ে নাও,
ছিনিয়ে নাও রুটি তাড়িয়ে নাও বাতাস
কিন্তু তোমার মুখের হাসি
কেড়  না কেড় না তা, অম্লান হয়ে থাক।

শরতের সমুদ্র বুকে তোমার হাসি
ঝর্নার ফেনিল উচ্ছাসে উপচে পড়ে
সে যেন ফুলের প্রস্ফুটন আমার হৃদয় কাননে
আমি অপেক্ষায় তোমার সে হাসির জন্যে
সেই রক্তাভ ফুল,
সে গোলাপ ফুটে ওঠে রক্তিম পৃথিবীর বুকে।

কণ্টকাকীর্ণ সে গোলাপ
যা উপহার দিয়েছ তুমি
নিও না নিও না  তা ছিনিয়ে ;
জলপ্রপাত, হঠাৎ আনন্দ উচ্ছাস তার,
ত্বরিতে যে রূপালী ঢেউ
জন্ম যার তোমার হৃদয়ে
জ্বলে যেন সন্ধ্যার প্রদীপ হয়ে।

তিক্ত সে আমার লড়াই শেষে
ক্লান্ত তন্দ্রামগ্ন চোখে ফিরি আমি
কোন পরিবর্তন দেখি না এ জগতে,
কিন্তু তোমার মুখে যখন হাসি ফোটে
আকাশপারে সে আমায় খোঁজে
আমি পৌঁছে যাই আমার জীবন দুয়ারে।

আমার প্রেম যখন আঁধারে দিশাহারা
কিন্তু অধরে তোমার হাসির ফোয়ারা
তুমি যদি হঠাৎ দেখ
আমার রক্ত ঝরে পথের পাথরে
হাসি যেন থাকে তোমার মুখে
কারণ আমার হাতে তোমার হাসি
মুক্ত তলোয়ার হয়ে ওঠে।

তুমি হাস,, হাস তুমি দিনে রাতে
রাতের জ্যোৎস্নায় কোন এক দ্বীপে পথের বাঁকে,
মলিন ছেলেটি বাজায় বাঁশি
সে তোমাকে ভালোবাসে
তার দিকে তাকিয়ে তোমার হাসি,
কিন্তু আমি যখন চোখ খুলি
যখন আবার তা বন্ধ করি
আমার পা আগে চলে সে আবার পিছিয়ে যায়,
কেড়ে নাও আমার রুটি আমার বাতাস
কেড়ে নাও আলো, ঝর্না আমার,
কিন্তু তাও যেন তোমার মুখে  হাসি দেখি
কেড়ে নিও না সে হাসি তোমার
যদি তোমার হাসি চলে যায়
জেনো,  তা যে মরণ আমার।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
পুনরায় উচ্চারিত হোক
কবি রণেশ রায়
শহীদ কবি মুরারী মুখার্জির “ভালোবেসে চাঁদ হয়ো নাকো” কবিতা অবলম্বনে।

যদি ভালোবাসো

যদি ভালোবাসো এসো তুমি
তবে চাঁদ হয়ে নয়
পারো যদি এসো সূর্য হয়ে
সে আগুন স্পর্শ করুক আমাকে,
আলো হয়ে জ্বলুক অন্ধকার বনানী মাঝে।
যদি ভালোবাসো আমাকে,
ফুল হয়ে ফুটো না তুমি,
যদি পারো,
বজ্র হয়ে গর্জে ওঠো
সে গর্জনে গর্জে উঠি আমি
পৌঁছে দিই যুদ্ধের বার্তা বাতাসে বাতাসে।

চাঁদের স্নিগ্ধতা নদীর কলধ্বনি
নক্ষত্রের আলো বা পাখির গুঞ্জন,
দেখা যাবে শোনা হবে আজ নয় পরে,
কোন এক নিভৃতে।
আজের এই অন্ধকার রাতে
শেষ যুদ্ধ যে বাকি
এসো আগুন জ্বালি
সেটাই যে  আজের দাবি।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হাওয়া বদল
কবি রণেশ রায়

তোমার চিঠিতে জানলাম
দিন কতকের জন্য হাওয়া বদলে গেছ,
তুমি আরও লিখেছো
উবে গেছে ঠান্ডা,
ক্লান্ত হয়ে উঠেছ,
বড় গরম পড়েছে
তেতে উঠেছে শরীরটা
ফেরার তাগিদ বোধ করছ,
ছটপট করছে মনটা
এসে আমার সঙ্গে মিলতে চাও।

আমি বলি, কি দরকার?
দেখা হলেই তো আবার সেই বাকবিতন্ডা
তর্ক বিতর্ক পরস্পর দোষারোপ,
থাক না !

আরো কিছুদিন যাক না-----
দূরে থাকলে আকর্ষণ
কাছে এলে বিকর্ষণ,
আকর্ষণ আর বিকর্ষণে মধ্যাকর্ষণ।

বার্ধক্যে দুজনের দুজনকে দরকার,
আমি অসুস্থ হলে তুমি সেবায়
আর তুমি বিছানায় তো
আমি তদারকিতে তোমার,
তখন শরীরের আকর্ষণটা বিকর্ষণ
আর মনের বিকর্ষণটা আকর্ষণ।

তাই বলি আর কিছুদিন অপেক্ষা কর
মিলব দুজনে  প্রয়োজনে
কোন এক মধুরাতে,
সেই সংসারের আলো আঁধারে
দুজনের আসা আর যাওয়া,
আর একটু ধৈর্য ধর
সময় থাকতে বদলে নাও হাওয়া
হাওয়া বদলটা এখন  দরকার

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মৃত্যুঞ্জয়ী
কবি রণেশ রায়
খালিল জীবরানের
Grave-Digger কবিতা অবলম্বনে সম্প্রসারিত।  

কোন একদিন এক বিষণ্ণ রাতে
আমি এসেছিলাম এ আঁধারে
এসেছিলাম এ সমাধি পরে
নিজের কোন এক অহংকে
যাব আমি নিজেই সমাধিস্থ করে।

কবর খানায়  দেখি সমাধি দাঁড়িয়ে
কার কন্ঠস্বর যেন শ্রবণে
বিরাজে আমার ভাবনায়
আর কেউ নয় সে যে কবর স্বয়ং,
সে আমাকে হাসিমুখে স্বাগত জানায়,
কোলে তুলে নেয় আদরে সোহাগে
নির্জন নিস্তব্ধ এ সমাধিস্থলে
কেউ নেই কাছে অমাবস্যার এ রাতে।
আমরা মুখোমুখি দুজনে এ বিজনে
সে বলে যায় আমাকে
চুপি চুপি  কানে কানে এ আলো আঁধারে ,
“আজ আমি নিজেকে পেয়েছি তোমাতে
পেয়েছি তোমাকে আজ  আপন মননে।
যারা আসে এ সমাধিতে
আর কাউকে নয়
আমি শুধু ভালোবাসি তোমাকে”

আমার প্রত্যয় গভীর হয়,
জানতে চাই, “আমা পরে কেন তুমি প্রসন্ন
কি দিয়ে তোমায় করেছি জয়
আমি তো পূজি নি তোমাকে
কেন তোমার আজের এ সৌজন্য
কিসে আমার এ গৌরব
আমি সামান্য এক,
কিছুই যে নেই দেবার তোমায়”
সে বলে, “তুমি জানো না কি দিলে আমাকে
দিয়ে গেলে একমুঠো ভালোবাসা আমায়,
সবাইকে দেখি কাঁদতে কাঁদতে আসে এখানে
বিরোহিনী কাঁদে বিরহ বেদনায়
সবার অসন্তোষ আমার উপরে
কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যায়,
আমার পরে কত যুগের সঞ্চিত অভিযোগ।
শুধু তোমাকেই দেখি প্রসন্ন চিত্তে
তুমি  পেরেছ আমাকে চিনতে
কোন অভিযোগ নেই আমার পরে
এলে হাসতে হাসতে
ফিরে যাচ্ছ, হাসি দেখি তোমার অধরে
ধন্য আমি তোমাকে পেয়েছি হৃদয় মাঝে”
জীবন মৃত্যুর লুকোচুরি খেলাঘরে
বুঝি আমি আজ
আমি মৃত্যুঞ্জয়ী তার সমাধি অন্তরে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নিশি শেষে
কবি রণেশ রায়

নিশি শেষে
সময়ের প্রবাহ ধরে
চড়াই উৎরাই পথে
আমরা চলি অবিরাম
ঝর্ণার কলকল রবে
পাখির গুঞ্জনে জনকোলাহলে
কাল থেকে কালান্তরে যাত্রা আমাদের
আমরা বার্তাবাহী কালের বার্তা বয়ে চলি
সুখ দুঃখের বারোমাস্যা পরিবর্তনের দিশা
ঝড়ের ইঙ্গিত সে বার্তায়
বাতাসে তুফান মেঘের বজ্রপাত
শীতের শেষে পাতা ঝরে বনানী মাঝে
ধূসর এ জীবন জঙ্গলে
কালের বার্তা জানিয়ে যায়
আঁধার শেষে নতুন কিশলয়
ঊষার আগমনে  সূর্যের উদয়
পুরোনোর বিদায় নতুনের আগমন
নিশি শেষে প্রানের স্পন্দন।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
সত্যের সন্ধানে
কবি রণেশ রায়

আমার ভাবনার খেয়াঘাটে
নির্ভাবনা উঁকি মারে
সে আমায় বলে যায়
কি হবে ভেবে ভেবে
আনন্দে ফুর্তিতে থাক
তুলে রাখ ভাবনা তোমার
জীবনের কারাগারে।
কিন্তু ভাবনা যে আমার চেতনায়
সে যে নীরব প্রেম জীবন আঙিনায়।

হৃদ সমুদ্রের অতলে
সমুদ্র মন্থন তার
ভাবনার গতিপথ ধরে
যাত্রা তার সত্যেরে করে দিশা
কণ্টকিত সে পথ চড়াই উৎরাই
ভাবনায় আমাদের সত্যের সন্ধান
সত্যের সঙ্গে মিথ্যার সংঘাত
নির্ভাবনার চোরা গলিতে
মিথ্যার জয়গান।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
নতুন প্রজন্ম জাগে
কবি রণেশ রায়

সে আজ নেই
ওরা তাকে খুন করেছে
মেঘ বালিকা সাক্ষী হয়ে বাঁচে
বেদনা বিহ্বল অশ্রু চোখে
ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে
স্রোতস্বিনী বয়ে চলে আজও
তার স্রোতধ্বনি আকাশে বাতাসে।

নদীর সে স্রোতধ্বনি
আজও তার কথা বলে
খেয়া বেয়ে চলে
গান ধরে ভাটিয়ালি
কাস্তে হাতুড়ির মিলন সংগীত
ভাটিয়ালির গানে
তার কথা ভেসে ওঠে
বজ্র কণ্ঠে সে বলে
লড়াই এখনও বাকি
যেতে হবে সে পথ ধরে।

শোন ওই বসন্তের নির্ঘোষ
তার সেই বজ্র কণ্ঠে
ভাটিয়ালির গানের সুরে
যৌবন উদ্ভিন্ন উল্লাসে মাতে
কৃষক কাস্তে হাতে
ফসল ফলে ক্ষেতে
হাতুড়ির ঘায়ে ঘায়ে
বার্তা পৌঁছায় দুয়ারে দুয়ারে
তার কন্ঠ স্বরে
আগামী মেলে এসে বর্তমানে
মানুষ একজোট মিছিলে মিছিলে।

ওরা ওকে হত্যা করে ভেবেছিল
বিপ্লব লুপ্ত হবে উর্ণাজাল আর ভয়ে
সমাধিস্থ হবে বিস্মৃতির পাতালে
কিন্তু সে রক্ত বীজ এখনও বেঁচে
নতুন প্রজন্মের রক্তে
নতুন প্রজন্ম জাগে
সে রক্ত বীজের স্পর্ধিত স্পর্শে
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
আমি তো দেখি নি
কবি রণেশ রায়

আমি তো দেখিনি বাংলার মুখ-------
ধান সিঁড়ি বয়ে গেছে কোথা দিয়ে
জানা নেই আমার,
শিরিষের মাথায় শিশির কণা
সে নয় আজ মুক্তোর চ্ছটা
তোলে না আর রুপালি ফণা,
রূপসী বাংলা রূপ কোথায় তার !
স্রোত হারা সে মজা গঙ্গা
মরা গাঙে বান হারা আজ
লাশ কাটা ঘরে শব সারি সারি
ঘুমিয়ে আছে উঠবে না আর
কবি কথা হারা
খুঁজে পায় না আর তাকে কবিতায়।
       
রূপসী বাংলা আজ কালের গহ্বরে
গলিত শব সে লাশ কাটা ঘরে
তবু সে বাংলার  মুখ দেখে

সুচেতনার চেতনা মাঝে
নীরব সাক্ষী হয়ে
বেঁচে থাকে বনলতা সেন
বছরে বছরে একাত্তর
ঘুরে ফেরে সে প্রাঙ্গণ পারে
রূপসী বাংলা সে ঘুমায় আজ
খুঁজে পাবে তাকে লাশের মাঝে।

কবে মরে গেছে বুড়িগঙ্গা
ঝাউ বন আম কাঁঠালের বাগান
ইটের গাঁথুনি আজ
বহুতল হয়ে সেজে বসে
তবু বেঁচে থাকে আশায়
বারান্দায় বসে কবি আজ
নতুন চাঁদ খুঁজে বেড়ায়
পুরোন চাঁদ আজ ফেরার
পূর্ণিমার অমাবস্যায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
মন মাতানো
কবি রণেশ রায়

মনমাতানো কবিতা আমার
তুই যে আলোর পিয়াস
তুই যে আমার দুখের সাথী
তোর হৃদয়ে বাস।
       
মনমাতানো কবিতা আমার
তুই তো আমার শ্বাস
তোর ডিঙ্গায় ভেসে চলি
তুই যে আমার আশ।

মন মাতানো কবিতা  আমার
তুই যে পাখির ডানা
তোর ডানায় ভেসে চলি
নেই যে কোন মানা।

মন মাতানো কবিতা আমার
তুই যে চলার পথ
সে পথে আমার চলা
তৈরি আমার রথ।

মনমাতানো কবিতা আমার
তুই যে আমার চেতনায়
আজের এই আঁধার রাতে
কবিতা আমার পথ দেখায়।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর
*
হৃদয় আজও দহে
কবি রণেশ রায়
নজরুলের তাঁর প্রেমিকা নার্গিসকে লেখা চিঠির কাব্য রূপ দেওয়ার স্পর্ধা দেখালাম তাঁরই
শব্দ বন্ধনে।

বর্ষায় ঘোর ঘন আষাঢ় এ প্রভাতে
বারি ঝরে ঝর ঝর
মেঘ মেদুর গগন প্রাতে,
এ আষাঢ় আমাকে ভাসিয়ে নেয়
কল্পনার স্বর্গলোক থেকে
বেদনার অনন্ত স্রোতে।
তুমি বসে একা নিভৃতে বিজনে
বেদনা সিক্ত গভীর ক্ষত হৃদয়ে,
দহন আমার সে বেদনার আগুনে
আগুনের পরশে বেদনার দহনে
গান হয়ে বেজে ওঠে
অগ্নিবীণা আমার বীণার তানে;
সে গান আমার নিয়ে যায় তোমায়
যক্ষের বিরহ লোকে মেঘসিক্ত গগনে,
সে গান ভালোবাসার অঞ্জলি আমার,
এলোকেশী সুন্দরী কিশোরী তুমি
এ নয়ন দর্শন লভে সৌন্দর্য তোমার,
সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত-মন্দার
আজও জ্বলে নিভৃত হৃদয় আলোয়ে আমার,
তোমার অন্তরের সে বহ্নি শিখা
অন্তরের সে আগুন স্পর্শে না বাহিরের ফুলহার।

জীবন কুসুম কুঞ্জ বনে
কবি আমি, কবিতায় মালা গাঁথি,
সাজাই তোমায় সোহাগে যতনে,
এ সুন্দর বিশ্ব মাঝে আমি সুন্দরের পূজারী,
অসুন্দর কুৎসিতের সাধনা সে নয় আমার,
হানি না আমি কাপুরুষের নিষ্ঠুর বর্বর আঘাত
কাঁটা হয়ে বিঁধি না হৃদয় তোমার,
হৃদয় বেদীতে অনন্ত প্রেম তুমি আমার
কোন অনুযোগ নয় নয় কোন বিরাগ
আজও আমার হৃদয় সিক্ত অনুরাগে তোমার।

মহাকালের স্মৃতি আজও
হানা দেয় বিস্মৃতির অতলে,
এক উদগ্ৰ অতৃপ্তি
দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ার
ভাসিয়ে নিয়েছিল আমাকে,
ঘুম বিদায় নিয়েছিল রাতে।
সে সবই  অতীত আজ
জীবনের অস্তমান অন্তিম লগ্নে
আমি চলেছি আজ দিন শেষে।
গোধূলির রশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে
ফিরিবার পথ নাই আর
আমি চলেছি অজানা সে অন্তে।

এই আমার শেষ চিঠি তোমার তরে
তোমার অশ্রুতে সিক্ত আমার নয়ন
আমার আশীর্বাদ তোমার শিরোপরে,
ভালো থেকো শান্তিতে থেকো
বিশ্বাস রেখো আমার উপরে।

.              ****************                          
.                                                                            
সূচীতে . . .    


মিলনসাগর