কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচিতির পাতায় . . .
ছেলেবেলার চিঠি
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাটি প্রথমে "সমতট" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৭.২০২৪।

Hello,
কেমন আছ ভাই, আমার প্রিয় ছেলেবেলা ?
মনে পড়ে, সেই ডাংগুলি আর ক্রিকেট খেলা ?
আরও ছিল -- চু-কিৎ কিৎ, পিট্টু, গাদি,
আবার খেতাম ঘটি-গরম কাড়াকাড়ি ?
সেই যে বিকেল বেলা ছাদে আমি লাটাই ধ'রে
আর ঐ দূর আকাশে দাদার হাতে ঘুড়ি ওড়ে
কত ছিল কত হাসি মজা, পেট-কাট্টি, ভো কাট্টা।
গরম কালে স্কুলের পরে, ছুট লাগাতাম সাঁতার ক্লাবে!
সেখানে সবাই মিলে এপাং ওপাং ঝপাং ঝপাং
যেন পুকুর ভরা দলে দলে ওড়াং ওটাং।
আবার শনি মঙ্গল ছুটি হলে, যেতে হত নাচের স্কুলে
সেখানে বজ্রসেন কিংবা শ্যামা, অর্জুন বা চণ্ডালিকা।
তারপর --------
কখন যে ঘনিয়ে এল মেয়ে বেলা বন্ধ হল সকল খেলা।
দাদার কিছু বদলানো না শুধু আমার এল শাড়ি ওড়না
মা বলল হয়ে গেছি অনেক বড় সাঁতার নাচ সবই ছাড়।
যাবে না আর মাঠে ছাদে, বলে গীটার তুলে দিল হাতে।
আমি তখন অবাক হয়ে আকাশ পাতাল ভাবছি বসে
বড় হলাম কোথায় কিসে, হ'ল না তো ওরা টুটা, দাদা,
খোকা কিম্বা ভোলা ! বড় কেবল আমার বেলা ?
এমন সময় বাবা আমায় বলল এসে
বড় হওয়ায় দুঃখ কিসে ? অনেক মজা বড় হবার
কত কিছু জানবি এবার।
বুঝিয়ে বলল, তোর মায়ের যেমন শনি ঠাকুর
তুই সাথী কর রবি ঠাকুর
পাবি গান কবিতা ঝুরি ঝুরি কত গল্প চিঠি আর ডাইরি
শুনে আমি দুঃখ ভুলে যেই ছেলেবেলা দিলাম ছেড়ে
সোনার তরীর খেয়া বেয়ে, ছোট ছোট ঢেউ দুলিয়ে
এল চারু মৃণাল কাদম্বিনী, এল কুমুদ এলা বিনোদিনী
আরও পরে --------- একদিন
মেয়ে বেলাও সাঙ্গ হলো, বউ-এর বেলা শুরু হলো
অন্য বাড়ি অন্য জীবন, কত বিধি কত বারণ !
তবু ছিল আমার বৈকুণ্ঠের খাতা খোলা
ছিল ফটিক অমল নন্দিনী আর মুক্তধারা।
যখনই পড়তাম জীবনস্মৃতি
পেতাম যেন সুধার হাতে রাজার চিঠি।
ধীরে ধীরে আরও সময় এগিয়ে যখন
বেলা গিয়ে বিকেল হ'ল, মায়ের আঁচল পাল তুলল,
বাড়ল দায় আর দায়িত্ব, তখন মানুষ গড়া শুরু হ'ল।
সময় যত এগিয়ে চলল, মায়ের বাছা বেড়ে উঠল,
ক্রমে তারা রড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেল,
ব্যাস আমার দায় হালকা হ'ল।

শেষে আজ,
এই বুড়ো বেলার একলা ঘরে
সেই রবি ঠাকুরকেই সাথী করে
আমি কিন্তু বেশ আছি ভাই ছেলেবেলা,
ইতি,
        তোমার প্রিয় সন্ধ্যোবেলা।

*********************









*
পাঁচুর মা
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
মাতৃ দিবস উপলক্ষে লেখা। যে মায়েদের জীবনে আজকের দিনটা নেই তাদের উদ্দেশ্যে। কবিতাটি প্রথমে "সমতট" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৭.২০২৪।

পাঁচুর মা তোমাকে নিয়ে কেউ কোনোদিন কবিতা লিখবে না,
অবশ্য তাতে তোমার কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি নেই,
তুমি তোমার মতই থাকবে ---
প্রতিদিন ভোর রাতে বিছানা ছেড়ে উঠে স্বামীর খাবার বানাবে,
গুছিয়ে দেবে তার সঙ্গের যন্ত্রপাতি,
সযত্নে কৌটোয় ভরে দেবে তার মধ্যাহ্ন ভোজ,
তারপর ঘরদোর পরিষ্কার ক'রে
পাঁচুকে নাইয়ে খাইয়ে স্কুলে পাঠাবে।
এবার শুরু হবে এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি,
কোথাও ঘরমোছা - বাসনমাজা
কোথাও সাবানকাচা - রান্নাকরা
তার মধ্যেই কোনো একটা বাড়িতে
জলখাবারটা জুটে যাবে।
দুপুরে বাড়ি ফিরে আবার বাড়ির কাজ,
কাজ সেই একই,
ঘর মোছ, বাসন মাজ, রান্না কর, সাবান কাচ,
তার সঙ্গে শাশুড়িকে খাওয়ানো,
আর তার মুখঝামটা খাওয়া।
তারপর বিকেলেও মোটামুটি একই গৎ,
তবে সকালের তুলনায় একটু হালকা।
সন্ধ্যে বেলা বাড়ি ফিরে পাঁচুকে খেতে দেবে,
রাতের রান্না করবে, আর একটু রাত হলেই
মাতাল স্বামীর মার খাবে,
খানিক ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদবে
আবার তাকে খাইয়ে দাইয়ে
রাতভর সোহাগও করবে।
পাঁচুর মা কোনোদিন ভেবে দেখছ
তুমি কে, তোমায় কেমন দেখতে ?
কিংবা কোন রঙটা তোমাকে মানায় বেশি......
কমলা না বেগুনি, লাল না সবুজ ?
অথবা কী খেতে তুমি ভালোবাসো ........
মোচা না লাউ, হিংচে না পালং ?
জান না, কোনোদিন জানার চেষ্টাও করবে না।
পৃথিবীর ইতিহাসে কত মহামতি এলেন
তাঁরা কত মহাব্রত পালন করলেন।
ক্রীতদাস, সর্বহারা, শ্রমজীবীদের
মুক্তির জন্য লড়াই হ'ল, বিপ্লব হ'ল,
কত কবিতা লেখা হ'ল, গান গাওয়া হ'ল।
কিন্তু পাঁচুর মা-দের শ্রম নেই, মন নেই,
সুখ নেই আবার অসুখও নেই।
কোনো চাওয়া নেই, তাই কোনো পাওয়াও নেই।
পাঁচুর মা, আর কতদিন ?
যে লোকটাকে দেবতা মানলে,
তার দেবদাসী হয়ে কাটিয়ে দিলে গোটা জীবন,
তার যে কেবল হুঁশ আছে, মন নেই।
পাঁচুর মা, এবার তো জেগে ওঠো !
তোমার তো মন হুঁশ সবই আছে,
তুমি অন্তত মনের সঙ্গে হুঁশ মেলাও,
পাঁচুর মা, এবার তো তুমি মানুষ হয়ে ওঠো।

*********************









*
১৯১৯ ---- ২০১৯
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাটি প্রথমে "সমতট" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৭.২০২৪।

মনে কর হঠাৎ গেলাম ফিরে
আজি হতে শতবর্ষ আগে।
ঘন মেঘে আঁধার ঘনায় দেখে
রাখাল বালক গোঠের থেকে ফেরে।
ছেলের দল খেলাধুলো ভুলে
মায়ের কাছে গল্প শুনতে ছোটে।
ঝড় বাদলে গাছে ঝোপে ঘাসে
কী পুলকে মাতন জেগে ওঠে।
ঠিক তখনই শহর ইমারতে
ধূসর মেঘে ভয় ঘনিয়ে আসে
ধুলোর ঝড়, বৃষ্টি নামে পাছে
লোকের ভীড়ে পথ উপচে পড়ে।
পথের ধারে কুকুর গুলো ভয়ে
লেজ গুটিয়ে আড়াল খুঁজে ফেরে।
মনে কর এমন যদি ঘটে
আজি হতে শতবর্ষ আগে।
কঠিন শীতে পথের 'পরে শুয়ে
কেউ যদি বা কাতর হয়ে পড়ে
গরম চাদর জড়িয়ে দিল গায়ে
কে যেন সে কোথা থেকে এসে।
কারও অসুখ যেই পড়ল চোখে
সবাই মিলে সুখ খুঁজতে ছোটে।
ওদিকে ঐ গুরুপল্লীর মাঠে
কবি দাদু আপনমনে ঘোরে।
বলাকারা সন্ধ্যা হতে না হতে
উড়ে গেছে ঝিলম নদী ছেড়ে।
ধূলার 'পরে শঙ্খ ছিল পড়ে
আরাম চেয়ে লজ্জা শুধু পেলে।
এমনি এক চৈত্র শেষের দিনে
আজি হতে শতবর্ষ আগে
পাঞ্জাবের জালিয়ানালা বাগে
শিখ বোশেখী পালন করতে এসে
আবালবৃদ্ধবনিতা সব মিলে
জুটেছিল সমান আবেগ নিয়ে
সইফ আর সত্য পালের খোঁজে
কেন তাদের কোথায় এল রেখে।
ডায়া সাহেব হুকুম দিল এসে
বাগের দোর বন্ধ করে দিয়ে
চালাও গুলি মিনিট দশেক ধরে।
পরের দিনে ডায়া হেসে বলে,
'শুনছি নাকি শ'তিন গেছে মরে' !
জগৎ অবাক পশুত্ব তার দেখে।
এবার যদি তাকাও ফিরে এসে
সেদিন থেকে শতবর্ষ পরে
বাগের দেয়াল কবেই গেছে ভেঙে
সে কি শুধু অমৃতসরে আছে?
স্বাধীন মানুষ স্বাধীন দেশে বসে
মানুষ খুনে মাতছে স্বাধীন ভাবে।
ভারত জুড়ে জালিয়ানাবাগ হয়ে।
ডায়ায় ডায়ায় দেশটা গেছে ভরে।
অজপাঁড়াগাঁ নগর শহরতলি
বাংলা কিম্বা অন্য রাজ্যগুলি
খুনটা যেন বেন্দাবনের হোলি।
ভাগ্যি তুমি আজ নেই গো কবি
শঙ্খ আবার ধূলায় গড়াগড়ি
রাখী তোমার ছিঁড়ে কুটি কুটি।
এবার ভাবি চোখ বন্ধ করে
আজি হতে শতবর্ষ পরে
মানুষ আবার মানুষ হয়ে উঠে
খুন করতে হাত কি যাবে কেঁপে ?
পরের ভালো দেখতে ভালো লাগে
পরের কষ্টে মনটা ভারী হবে।
সবাই মোরা থাকি একই দেশে
একের ভালোয় সবার ভালো হবে।
মিথ্যা যা তা যত জোরেই বলি
মিথ্যা কী আর সত্যি হয়ে যাবে?
শাসন দখল এসব ভুলে গিয়ে
ভালোবাসার জয়ধ্বনি দেবে।
হবে না কি এসব সত্যি সত্যি
আজি হতে শতবর্ষ পরে ?

*********************









*
ঘুমের মাঝে স্বপ্নে ছিল
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
রচনা ১২.৮.২০২২। এই কবিতাটি মিলনসাগরেই প্রথম প্রকাশিত হলো, ৭.৭.২০২৪।

ঘুমের মাঝে স্বপ্নে ছিল
জীবন বুঝি আনন্দময়
জেগে উঠে বুঝেছিলাম
জীবন হলো কর্মময়।
কর্মে মেতে দেখতে পেলাম
কর্ম বড় আনন্দময়
শেষে দেখি কর্মময়
জীবনখানাই স্বপ্নময়।

*********************









*
চরৈবেতি
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাটি প্রথমে "সমতট" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৭.২০২৪।

মন বলে চল বেড়িয়ে পড়ি
এদেশ ওদেশ বিদেশ ঘুরে
চোরকাঁটায় যে মাঠ ঢেকেছে
পথ যেখানে বেঁকে গেছে।
লাঠি হাতে ঝাঁকরা চুলে
গোঁজা আছে জবা ফুলে
আবার তারা হাঁক ছেড়েছে
হা রে রে রে, হা রে রে রে।
হিল্লি দিল্লি বাংলা জুড়ে
ধম্ম ভেঁড়ে কম্ম ছেড়ে
মন মরেছে হুঁশ ঘুচেছে
ভাঁওতা শুধু বক্তিমেতে।
মায়ের মনে অভয় দিয়ে
সকল বারণ নাকোচ করে
সেইখানেতে আজ কি আবার
যাবে কোনো বীরপুরুষে ?
ঢাল তলোয়ার ঝনঝনিয়ে
কী ভয়ানক লড়াই করে
ঘুচিয়ে দেবে গুঁড়িয়ে দেবে
গদির লোভ আর ক্ষমতাকে।
বেহারাগুলো ঝোপের ধারে
কাঁপবে না আর ভয়ে ভয়ে
দরদ দিয়ে মনের টানে
আসবে তারা দলে দলে।
যারা শুধু ভাবতে পারে
শুদ্ধ মতি সরল মনে
মনের সাথে হুঁশ মিলিয়ে
কেবলমাত্র ভালবেসে।
দাদারা সব অবাক হয়ে
ভাববে বসে এরা কে রে !
ভ্যাবলা হয়ে দেখবে চেয়ে
কোথায় এরা চলল সবে ?
ততক্ষণে ওরা সবাই
ছুট মেরেছে কাশের বনে
দুগ্গা আর অপুর সাথে
যাচ্ছে সবাই রেল দেখতে।
ছুট্ ছুট্ ছুট্ উধাও বেগে
রেলের গতি পিছে ফেলে
এগিয়ে যাবে মাথা তুলে
হাতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে।
দাদাগিরি ঘুচিয়ে দিয়ে
রক্ত মেখে ঘেমে নেয়ে
সবাই মিলে বলবে এসে
লড়াই এবার গেছে থেমে।
ওরা যতই এগিয়ে যাবে
কালো ধোঁয়া পিছে ফেলে
ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এসে
সব কালিমা ধুইয়ে দেবে।

*********************









*
করোনার করুণায়
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
এই কবিতাটি মিলনসাগরের "করোনা ভাইরাস ও পরিযায়ী শ্রমিকের দেয়ালিকায়" প্রথম প্রকাশিত হয় ২৭.৬.২০২৪ তারিখে। সেই পাতায় গিয়ে এই কবিতাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন ...

করোণা করল কোয়ারেনটিন
ভাইরাস করতে ধ্বংস
দেহ ছেড়ে মনটা তখন
ডানা মেলতেই ব্যস্ত।
নাই বা হলো মাঠে যাওয়া
বারান্দাতেও রোদ্দুর
ছাদ কি সবার ভাগ্যে থাকে
তবে মনের গতি সুদূর।
চোখের পাতা বন্ধ করে
মনের ডানা মেলে
আমি তখন উড়ে গেছি
শিলং পাহাড় ছেড়ে।
রইল পড়ে চটি জোড়া
খাটে উপুর করা বই
চশমাটও গেলাম রেখে
সাথে আধখাওয়া দুধখই।
বন্ধ চোখের পাতায় ভাসে
কত বিচিত্র সব ছবি
এ কি আমার চেনা শহর
হেথায় আমি থাকি?
পাশের বাড়ির নীরেণবাবু
এমনিতে ফিটফাট
এখন তিনি লুঙ্গি পরে
খাটে পিটছেন তাস।
লকার মাঠের গুণ্ডা ছেনো
জীবন পকেট মেরেই চলে
সেও তো দেখি একইভাবে
তাস পেটাচ্ছে খাটে।
বন্ধ ক্লাব বন্ধ পার্টি
বন্ধ মাল্টিপ্লেক্স
বাংলার ঠেক বন্ধ
আবার বন্ধ যত প্রেস।
হায় করোনা এ কী হলো
খ্যামতা তোমার অসীম
কোটিপতি রিক্সাওয়ালা
এক আসনে বিলীন।
আবার তুমি প্রমাণ করলে
মিছে অহং বোধের বড়াই
সবার ওপর মানবধর্ম
তাহার ওপর কিছু নাই।

*********************









*
A.A.A.D.D.
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
YouTube এর একটা vdoর অনুপ্রেরণায় লেখা কবিতা। কবিতাটি প্রথমে "সমতট" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৭.২০২৪।

মালী আসেনি, ভাবলাম বাগানে গিয়ে নিজে
গাছগুলোয় জল দিই, যা গরম পড়েছে !
বাগানে যাবার পথে যেই উঠেছি বারান্দায়,
ইস্ এটাই আগে ধুতে হবে, ধূলোয় ধূলোময় !
পরক্ষণেই চোখে পড়ল বারান্দার টেবিলে
কালকের চিঠিগুলো এখনও আছে পড়ে।
নাঃ বারান্দা ধোবার আগে চিঠিগুলো দেখি
কোনোটা যদি জরুরি থাকে তাই আর কি!
বাছাবাছি করে বাজে চিঠিগুলো নিয়ে
ফেলতে গেলাম টেবিলের তলার বীন-এ।
কিন্তু এ বাব্বা বীনটা যে একেবারে ভর্তি !
এটাকেতো খালি করা দরকার এখুনি।
বীন নিয়ে ফেলতে যাচ্ছি, তখনই মনে হলো
ওহ্ ঐ চিঠির মধ্যে তো আছে bill গুলোও
না বীন পরে হবে আগে bill গুলো ঘাঁটি।
যদি due date পেরিয়ে যায় সেটা আগে দেখি।
যা ভেবেছি ঠিক তাই, দিতে হবে পরশুর মধ্যে
অতএব চেক গুলোই লিখে রেডি করি আগে।
চেক বইটা বের করলাম ড্রয়ারের থেকে
এহে একটা পাতাই যে বাকি পড়ে আছে!
আলমারির ড্রয়ারে রাখা আছে নতুন টা
যাই আগে নিয়ে আসি ঐ চেক বই টা।
ঘরে যেতে গিয়ে দেখি desk এর ওপরে
কালকের আধখাওয়া coke আছে পড়ে।
ভাবলাম চেক বইটা আনবার আগে
ওটাকে একপাশে সরিয়ে রাখতে হবে।
চেক লিখতে গিয়ে যদি পড়ে যায় ওটা,
কেলেঙ্কারি এক কাণ্ড হয়ে যাবে সেটা।
কী সরাবো ! এ তো পুরো গরম হয়ে গেছে
যাই এটাকে আগে রেখে আসি ফ্রীজে।
Coke ফ্রীজে রাখতে গিয়ে রান্নাঘরের পথে
চোখ পড়লো vass এ রাখা ফুলগুলোর দিকে।
এ হে vass এ তো এখুনি জল দিতে হবে
নাহলে তো ফুলগুলো শুকিয়েই যাবে।
Coke রেখে জল দেব ভাবতে গিয়ে
দেখি চশমাটা vassটার পাশে পড়ে আছে।
সকাল থেকে চশমাটা খুঁজে খুঁজে মরছি
তাই ভাবলাম ওটা আগে deskএ রেখে আসি।
না, আগে vassএ জল দিই রাখব চশমা পরে
চশমা রেখে বাটি আনতে গেলাম রান্নাঘরে।
জল ভরতে এগোচ্ছিলাম বেসিনের দিকে
বোঝো ! T.V .র রিমোটটা তো পড়ে এইখানে !
বাড়ির লোকগুলো সব এতটাই ভুলো ?
কাল রাতে এই নিয়ে তো কত কাণ্ড হলো।
যাই রিমোটটা আগে জায়গামতো রাখি
কিন্তু না তারও আগে vass টায় জল দিই।
বাটি থেকে vass এ গেলাম জল ঢালতে
একগাদা জল ছলকে পড়ে গেল মেঝেতে।
ও মা গো! সবকিছু ফেলে রেখে দিয়ে
ছুটলাম জল মোছার ন্যাতাটা আনতে।
জল মুছতে বসে দেখি ঘরের এক কোণে
হারিয়ে যাওয়া দুলের push টা আছে পড়ে।
গত দু'দিন ওটা নিয়ে কত অশান্তি গেছে
সোনা হারানো খারাপ তাই মেজাজ বিগড়েছে।
এক হাতে ন্যাতা আর অন্য হাতে সোনা
আমি এবার কী করব বুঝতেই পারছি না।
না হলো জল দেওয়া বাগানের গাছে
বারান্দাটাও ধূলোময় হয়ে পড়ে আছে
বীনটা এখনও বাজে কাগজে ভর্তি
চেকগুলো লেখাও রয়ে গেল বাকি
Coke টা তো এখনও ফ্রীজের বাইরে
রিমোটটা সম্ভবত এখনও kitchen
চশমাটা শেষ পর্যন্ত কোথায় যে রইল
দুলের push টা কি অবশেষে তোলা হ'ল
জল মুছে ন্যাতাটাই বা কোথায় রাখলাম
আমি তো আবার back to zero হয়ে গেলাম!!
জানি জানি তোমরা যারা হাসছ এটা পড়ে
মনে রেখ তোমাদেরও দিন আসছে ঘনিয়ে।
এ হ'ল "A.A.A.D.D." মানে এটাই নাম রোগটার
Age Activated Attention Deficit Disorder.

*********************









*
কবি তুমি কলম ধরো কোন্ মানুষের কান্না দেখে ?
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাটি মিলনসাগরেই প্রথম প্রকাশিত হয় ৭.৭.২০২৪ তারিখে।

কবি তুমি কলম ধরো কোন্ মানুষের কান্না দেখে ?
ধরার আগে ভাব নাকি, হিন্দু না মুসলিম ও কে ?
বোধ যা বলে মনে মনে তাই তো ঝরে কালি হয়ে,
প'ড়ে সেটা বুঝতে হলে, ভাবতে হবে মগজ দিয়ে।
বুঝতে হবে বোধের পথে মনন দিয়ে, হৃদয় দিয়ে।
অবোধ যারা অবুঝ তারা বুঝতে কি আর পারবে সবে ?
বুঝতে হলে পড়তে হবে- এটাও যেমন সত্যি, তবে
পড়লেই যে বুঝবে সবে, এমন কি আর হতে পারে ?
পড়ে গেলেই পাঠক হবে তেমন তো নাও হতেই পারে।
পড়তে পড়তে পাঠক হওয়া যায় নাকি গো এ ভবেতে ?
ভাবে, বোধে, মনের থেকে পাঠক হয়ে উঠতে হবে।

*********************









*
রূপকথা
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতাটি প্রথমে "সমতট" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মিলনসাগরে প্রকাশ ৭.৭.২০২৪।

এমন যদি এক রূপকথা হ'ত
ধূ ধূ মাঠের মাঝে এক টিলা
টিলার ওপর এক প্রাচীন গীর্জা,
মাঠের একপাশে নদীটা বয়ে চলেছে
ছোট ছোট ঢেউ গুলোতে নাচন তুলে
সেখানে নাও ভাসিয়েছে কিশোর মাঝি।
তো সেই গীর্জার ঘণ্টাধ্বনি আর
কিশোরের ভাটিয়ালি বিকেলের পড়ন্ত রোদে
মিলে মিশে হয়ে গেল একাকার।
হাতে হাত ধরে দুজনে এগিয়ে চলেছে
দূরে ও প্রান্তের নীল বাড়িটার দিকে
বেলা তো পড়ে এসেছে, রোদ গেছে কমে,
মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে ভীড় করছে
সীগাল আর পানকৌড়ির দল।
হাত ধরা দুজন একটু থামল,
হয়তো জিরোতে বা সৃষ্টির তাগিদে -
ওদের একজন আটপৌরে ধুতি প'রে
চোখের চেতনাটুকুই তার সম্বল।
অন্য জনের মাথায় ঝোড়ো টুপি,
মুখে পাইপ, দৃষ্টিতে পড়ন্ত সূর্যের সোনা।
টুপিটা একটু নামিয়ে বসে পড়ল ঢিপিটার ওপর
হাত চলে গেল ঝোলার ভেতর
বেরিয়ে এলো ইজেল আর ক্যানভাস
রঙ তুলি সচল হবার সাথে সাথে
রূপশালী ধানের গন্ধ জরিয়ে ধরল তাকে।
ঢিপিটাকে ছেয়ে আছে যে তরুণ হিজল গাছ
ধুতি পরা মানুষটা জড়িয়ে ধরল তাকে
পরম আদরে হাত বুলোতে লাগলো তার গায়ে
যেন হিজলের হৃৎস্পন্দন মিশে যাচ্ছে
ওর হৃৎপিণ্ডের আওয়াজের সাথে।
সেই মহেন্দ্র ক্ষণে দূর থেকে ভেসে আসে
জাহাজের ভোঁ আর রাখালের বাঁশির মেঠো সুর
পাইপের ধোঁয়া মিশে যায় শিশিরের ফোটায়
রোদ ঢাকা টুপি ছায়া পায় হিজলের পাতায়।
ফলন্ত ধানের সোনা যেন নুয়ে পড়ে চুমো দেয়
কচি সবুজ ঘাসেদের গায়ে মাথায় ডগায়।
ওদিকে রঙ তুলি ঝড় তোলে ইজেলের পাতায়
আর পেঁচা ইঁদুর ভীড় করে ধুতিপরা পায়ের তলায়।

*********************









*
আম্ফানের জন্য
কবি মীনাক্ষী বন্দ্যোপাধ্যায়
এই কবিতাটি মিলনসাগরেই প্রথম প্রকাশিত হলো, ৭.৭.২০২৪।

ছোট্ট আধফোটা কুঁড়িটার আর
ফুল হয়ে ফোটা হলো না __
খড়কুটোর বাসায় খোলস ভেঙে
উঁকি মারা কচি ঠোঁটগুলোর
দেখা হলো না এ জগতের
ভুবন ভোলানো রূপ __
খেলা করা হলো না
রোদ ঝলমল পাতার বারান্দায় __
দখিণা বাতাসে দোলা হলোনা
ডালের দোলনায়
বৃষ্টির স্নেহবর্ষণ - তাও পেল না __

গতকাল পর্যন্ত
ওরাও হয়ত স্বপ্ন দেখেছিল
একসাথে বেড়ে ওঠার,
ওরাও হয়ত ভালোবেসেছিল
ভ্রমরের গুঞ্জন আর
পাখপাখালির কূজন,
হয়তো পথ চেয়ে বসে ছিল
মৌমাছির

আর আজ
ঐ পাহাড় প্রমাণ ঝড়ের দাপটে
একসাথে হুড়মুড়িয়ে লুটিয়ে পড়ল।
পরের দিন সবাই হারিয়ে গেল,
মিশে গেল জঞ্জালের স্তূপে।

*********************