কবি বাদল সরকারের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি বাদল সরকারের পরিচিতির পাতায় . . .
লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালী
নাট্যকার কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের এই কবিগানটি সম্পূর্ণ এখানে তোলা হয়েছে। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

মুখ বন্ধ...
কবিগান লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালী...

“লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালী" এর চরিত্র দুটি ---
পচা ও খুড়ো।

****************************

*
মুখ বন্ধ, লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালী
কবি বাদল সরকার
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১২.২০২৫।

     লিখেছিলাম শহরের জন্য। আমার শহরে বড়ো হওয়া ; গ্রামের খবর না জেনে কেটে গেছে জীবনের বেশির ভাগ। তার মানে দেশের বারো-আনার খবর না জেনে।
     যখন জানতে শুরু করলাম, তখন মনে হোলো, আমারই মতো অনেক শহরবাসী যা এতোদিন জানেন নি, তাদের জানানো দরকার। যেটুকু জ্ঞান হয়েছে, সেইটুকুই জানানো দরকার। তাই এই কবিগান লিখেছিলাম শহরবাসীকে উদ্দেশ করে।
     আমাদের নাটাগোষ্ঠী “শতাব্দী” অভিনয় করতে গিয়ে কিন্তু দেখলো --- শহরের চেয়ে গ্রামেই এ গান চলছে বেশি। সব খবর গ্রামের লোকের জানা, তবু তাঁদের আগ্রহ বেশি। হয় তো তাঁদের কথা বলা হচ্ছে বলেই। সে যাই হোক, প্রধানত তাঁদেরই দাবিতে “লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালী" ছাপা হোলো এবং বিনা লাভে বিক্রির ব্যবস্থা হোলো।
     এ নাটক প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৭৫ সালে। তৃতীয় থিয়েটারে কমপক্ষে পঁচাশিবার অভিনীত হয়েছে।
     একটা কথা! এ নাটকে দরদাম বা মজুরির যার যা থাকে, তা লেখার সময়কার।
     এ পাঁচালী গাইতে কোনো অনুমতি লাগবে না, কোনো দক্ষিণা দিতে হবে না। শুধু কারা কোথায় করছেন জানালে সুখী হবো।

বাদল সরকার

****************************

*
লক্ষ্মীছাড়ার পাঁচালী
কবি বাদল সরকার
মিলনসাগরে প্রকাশ ১৫.১২.২০২৫।

[ ঢোল ইত্যাদি নিয়ে দোহারের দল বসেছে। কবিদের একজন বয়স্ক, গ্রাম সম্পর্কে অন্য কবির খুড়ো, ধুতি চাদর পরিধানে। তরুণ কবিটির পরিধানে লুঙ্গি ও গেঞ্জি, কাঁধে গামছা। এর নাম ধরা যাক পচা। ]

পচা॥--- (গান : পাঁচালী সুর)
হে মা লক্ষ্মী তোমার পুজা সর্ব ঘরে ঘরে।
তোমারই বন্দনা মা গো সর্ব নারী করে॥
সারাজীবন তবু তোমার দেখা নাহি মেলে।
তোমার বুঝি নাই মা মনে আমরা তোমার ছেলে॥
আমরা যারা গতর খাটাই ফসল ফলাই ক্ষেতে।
দুটি বেলা দু'মুঠো ভুাত তাও জোটে না পাতে॥
মাঠে মাঠে সোনার বরণ দেখি তোমার হাসি।
হেঁসেল ঘরে নাই মা তুমি সবাই উপবাসী॥
নাই মা ঘরে নাই উঠোনে পাড়ায় কোথাও নাই।
খুঁজে খুঁজে মরি তবু দেখা নাহি পাই॥
অবশেষে পেলাম দেখা তুমি বস্তা বাঁধা।
মহাজনের গোলা থেকে লরীর উপর গাদা॥
হে মা লক্ষ্মী তোমার কাছে বৃথা গেলো ভিক্ষা।
তোমার পূজা করবো না আর হয়ে গেছে শিক্ষা॥
ঢের হয়েছে এবার মাগো পেন্নাম তোমার খুরে।
লক্ষ্মীছাড়া হলাম আমি তুমি থাকো দূরে॥
ওরে লক্ষ্মীপেঁচার ছা, ঘাড়ে করে মাকে নিয়ে ব্যাঙ্কে চলে যা।
ওরে লক্ষ্মীপেঁচার ছা, মহাজনের গোলা হয়ে ব্যাঙ্কে চলে যা।
ওরে লক্ষ্মীপেঁচার ছা, মজুতদারের লরী চেপে ব্যাঙ্কে চলে যা।
ওরে লক্ষ্মীপেঁচার ছা, কালোবাজার আলো করে ব্যাঙ্কে চলে যা।
     ওরে যা যা যা যা!

খুড়ো॥---
আরে বাপরে বাপরে বাপরে বাপরে বাপরে বাপরে বাপ!
শুনলেন বাবুরা? শুনলেন? নাস্তিক! ঘোর নাস্তিক!
লক্ষ্মী ছেড়ে লক্ষ্মীছাড়া? ঘোর কলি ডুবলো ধরা!
মতিচ্ছন্ন হোলো পুরা, উচ্ছন্নে গিয়েছে ওরা,
     আনছে ডেকে সর্বনাশা ঝড়!
ডুববে ওরা, ডুববো মোরা, ডুববো সবাই,
     ডুববে সকল বিশ্বচরাচর!
তার চেয়ে শুনুন বাবুরা! আমার বন্দনা শুনুন।

     (গান : সুর- “মেরা জুতা হ্যায় জাপানী”)
এসো মা লক্ষ্মী চলিয়া ওদের কর্ণটি মলিয়া
বাবুর সিন্দুক আছে খোলা তুমি আসিবে বলিয়া।
বাবু নিত্য তোমার ভৃত্য তোমার চরণ ধরে
     মা গো তোমর চরণ ধরে।
ভক্তিভরে ঠাকুরঘরে মার্বেল বাঁধাই করে
     মা গো মার্বেল বাঁধাই করে।
মা গো ফসল তো ওঠে এসো হাঁটিয়া হাঁটিয়া।
এসো মা লক্ষী চলিয়া...
বাবু শক্ত তোমার ভক্ত সদাই দিবস রাতে
     মা গো সদাই দিবস রাতে।
রূপোর পাটে সোনার খাটে তোমার আসন পাতে
     মা গো তোমার আসন পাতে।
এসো দাদনে ও ধারে এসো চক্রবৃদ্ধিহারে
এসো বেনামী জমিতে এসো শ্রীকৃষ্ণ-বাজারে
এসো মা লক্ষ্মী চলিয়া...

পচা॥---
বাঃ বাঃ কবিখুড়ো, ভালো বন্দনা গেয়েছো! বলি গানের সুরটা কোথেকে পেলে?

খুড়ো॥---
এই সুর এখন সব্বাই নিচ্ছে!

পচা॥---
হ্যাঁ হ্যাঁ, গণসঙ্গীত, বোম্বাই থেকে আমদানি। আরো আমদানি করো খুড়ো, গাঁয়ে গাঁয়ে ছড়িয়ে দাও তোমার গণসঙ্গীত।

খুড়ো॥---
তুই বাজে কথা ছেড়ে গাওনা শুরু কর দেখি?

পচা॥---
করবো বই কী, নিশ্চয় করবো। দেখুন বাবুরা, ইনি আমার খুড়ো হন, কবিখুড়ো। এনার ঘাড়ের ওপর মাথা, সে মাথা বন বন করে ঘোরে। লাট্টুর মতো ঘোরে। সে লাট্টুর লেত্তি আছে গাঁয়ের মাথা সমাজের মাথা দেশের মাথা কর্তাবাবুদের হাতে। বলি ওহে কবিবর!
একটি কথা শুধাই তোমায় দাও দেখি উত্তর।

খুড়ো॥---
একটা কেন দশটা ,শুধাও না!
     (গান : পাঁচালীর সুর)

পচা॥---
আমিও মানুষ বাবুও মানুষ দু'টো করে হাত
দু' পা দু' চোখ তবুও কেন আমরা ভিন্ন জাত?

খুড়ো॥---
হায় রে।
          (গান)
লক্ষ্মী গেলে বুদ্ধিও যায় প্রমাণ এইখানেই
কে বলেছে ভিন্ন তোরা? কোনোই তফাৎ নেই।
ভারতমাতার সন্তান সব বাবু তুমি মোরা,
মায়ের চোখে সবাই সমান বুঝিস নাকি তোরা?

পচা॥---
তাই যদি হয় তবে কেন বাবুর দালান কোঠা?
বাবুর ছেলে রাজভোগেতে হচ্চে কেন মোটা?
(আর) আমার চালে খড় নেইকো দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে,
আজ জোটে ভাত কালকে আবার হাঁড়ি নাহি চড়ে।
বাবুর ঘরে জ্বলতেছে আজ ইলেক্টরি বাতি
তেল নেইকো আমার ঘরে সদাই আঁধার রাতি।
বাবুর কথায় ওঠে বসে পুলিস চৌকিদার
আমার বেলায় ট্যাঁ ফোঁ হলেই জোটে চোরের মার।

খুড়ো॥---
একেই বলে পাঁঠা।
এমন মুখ্যু পাবে নাকো খুঁজলে সারা গাঁ-টা।
          (গান)
(বলি) পাঁচটা আঙুল হাতে আছে, সমান তারা হয়?
এক মায়েরই পাঁচটা ছেলে এক রকম তো নয়?
ঢ্যাঙা আছে বেঁটে আছে, আছে ফর্সা কালো,
বোকা আছে চালাক আছে, আছে মন্দ ভালো,
কেউ বা আছে সুবোধ বালক, সুবোধ মতিগতি,
কোনোটা বা পাজির হাঁড়ি, সর্বদা দুর্মতি।
সবাই জানে সুবোধ যারা মানুষ তারাই হয়,
গাড়িঘোড়া তারাই চড়ে লক্ষ্মী তাদের রয়।
(আর) দুষ্টু যারা বুদ্ধু যারা লক্ষ্মী তাদের ছাড়ে,
ভাত জোটে না, মরে তারা দেনার বোঝা ঘাড়ে।

পচা॥---
বলি কবি খুড়ো! তুমি তো আমাকে চেনো, না কি?

খুড়ো॥---
হ্যাঁ হ্যাঁ চিনবো না কেন? তুই তো পরাণ মণ্ডলের বেটা পচাই মণ্ডল।

পচা॥---
তবে একবার বুকে হাত দিয়ে বলো খুড়ো, কোন দোষে আমার এমন হাল।
          (গান)
বলো কোন দোষেতে আমার এমন হাল?
কী পাপ করেছি, (আমি) কী পাপ করেছি যে মোর
নেইকো চুলোচাল?
বলো কোন দোষেতে আমার এমন হাল?

খুড়ো॥---
     (গান : সুর--শুকসারী সংবাদ)
ছেলেবেলায় পাঠশালাতে বছর খানেক গেলি
তারপরে যে লেখাপড়া জলাঞ্জলি দিলি
     ও তোর সেই হোলো কাল।

পচা॥---
     গুরুমশাই সিধে নেবেন প্রতি মাসে মাসে
ভাত জোটে না সিধে বলো কোথা থেকে আসে
     তাই তো ছাড়ি পাঠশাল।

খুড়ো॥---
ভাত জোটে না সেও তো তোমার দোষের কথাই হোলো
কুঁড়েমি আর ফাঁকিবাজি দেষটাকে ডোবালো
     সে আর বলবো কতো।

পচা॥---
জেনেশুনে মিছে কথা বলছো কেন খুড়ো
ফসল কাটার সময় মাঠে খাটে ছোলো বুড়ো
     খাটে গাধার মতো।

খুড়ো॥---
ঐ তো বলি বছরে তো ছ'মাসও খাটো না
বাকি সময় ক্ষেতে মাঠে কখনো হাঁটো না
     ফসল একটি করে।

পচা॥---
জল না পেলে সার না পেলে ক'টা ফসল হবে
পাম্পু বসাও সার এনে দাও দেখবে ফসল তবে
     সারা বছর ধরে।

খুড়ো॥---
ও সব বলে এখন কেবল নিজেরই দোষটি ঢাকা
বিদ্যেবুদ্ধি পরিশ্রমে বাবুর হোলো টাকা
     তাতে চক্ষু টাটায়।

পচা॥---
বাবুর টাকা বিদ্যে বুদ্ধি পরিশ্রমে নয়
আমাদেরই রক্ত চুষে বাবুর টাকা হয়
     আরো টাকা খাটায়।

খুড়ো॥---
দেখো দেখো দেখো দেখো দেখো দেখো দেখো দেখো বিটকেল যুক্তি।
এই করে গেলো দেশ গেলো দেশ গেলো দেশ নেই কো মুক্তি!

          (গান)
লক্ষ্মীছাড়া ওরে
ক্যামনে বোঝাই তোরে,
আমরা সবাই এক পরিবার এক হেঁসেলে খাই,
(কিন্তু) পরিবারের মাথার উপর কর্তা থাকা চাই।
তাই যদি না হবে
শান্তি কোথায় রবে?
যার যা খুশি করলে তখন ভাঙবে পরিবার,
মারকাটারি চলবে কেবল জুটবে না আহার!

পচা॥---
আহা মরি মরি
কর্তাকে গড় করি,
এখন কতো জুটছে আহার দুই বেলা পেট ভরি!
আটা গোলার পিণ্ডি খেয়ে লম্বা ঢেকুর ছাড়ি।
বলবো কতো আর
এমন পরিবার
কর্তা মুটোয় ঘি দুধ খেয়ে উপোস আর সবার।

খুড়ো॥---
নেমক হারাম তাকেই বলি এমন বিচার যার!
শুনুন বাবুমশাই শুনুন! চাষার কথাটা শুনুন একবার! বলি---

          (গান : কীর্তন)
ঘরে যখন থাকে না চাল, ছেলে মেয়ের জোটে না ভাত,
কাহার কাছে পাতো তখন সিড়িঙ্গে ঔ লম্বা হাত?
বান ভাসিলে আকাল হলে কাহার কাছে যাও রে চলে,
কে তখন বাঁচায় রে তোদের, কাহার দয়ায় ভরে রে পাত?
(ঐ) বাবুরা বাঁচায়!
কর্জ দিয়ে বাবুরা বাঁচায়।
উপুর হস্তে কর্জ দিয়ে
বিপদকালে বাবুরা বাঁচায়।
বিপদকালে বাবুরা বাঁচায়।
(আহা) মায়ার শরীর দয়া গভীর
তোদের তখন বাবুরা বাঁচায়।
বিপদকালে বাবুরা বাঁচায়।
উপোস থেকে বাবুরা বাঁচায়।
কর্জ দিয়ে বাবুরা বাঁচায়।

পচা॥---
বলো খুড়ো আরো বলো, শুনতে বড়ো লাগছে ভালো,
সাত টাকা মাস চক্রবৃদ্ধি, বাবু আমায নুন খাওয়ালো!
(আর) ফসল যখন ওঠে ঘরে, বাবু তখন নড়ে চড়ে,
দেনার দায়ে জলের দরে ফসল কিনে বাসে ভালো।
তারপর --- ছ’মাস গেলে
(আমার) ধান ফুরোলো চাল ফুরোলো
সব ফুরোলো ছ'মাস গেলে
ডাল ফুরলো তেল ফুোরোলো
সব ফুরলো ছ'মাস গেলে
কবি রে! কবি রে!
ফুরোলো তো সবই, খেতে থাকে খাবি, প্রাণ তো বাচেনা ;
ফুরোলো তো সবই, ফুরোলো না শুধু বাবুদের কাছে দেনা!
তখন --- আবার ছুটিয়া যাই আবার কর্জ চাই
     সাত টাকা মাসে সুদ তাই সই
বাজারে সাজানো মাল আমারই তৈরি চাল
     তিনগুণ দরে তাই কিনে খাই।
(তবু) নুন খেয়েছি
বাবুদের নুন খেয়েছি,
বিপদকালে চড়া সুদে
বাবুর কাছে নুন খেয়েছি।
(তাই গুণ গেয়েছি
আমার চাল সে আমিই খেয়ে
বাবুর নুনের গুণ গেয়েছি!
কপালটাকে দোষী করে
বাবুর নুনের গুণ গেয়েছি।
পরিবারের কর্তাবাবু
নুন দিয়েছে গুণ গেয়েছি।

তারপর, শুনুন বাবুরা,

তারপর একদিন সুদে সুদে অন্ধকার
জমি গেলো ক্রোক হয়ে ডুবে গেলো সংসার।
তখন --- বাবুদের দরবারে বলি দিয়ে ধরণা
জমিটাকে আমারেই ভাগচাষে দ্যান না?

তখন, বাবুর যদি দয়া হয়, ভেবেচিন্তে বাবুর যদি দয়া হয়, বাবু বলতে পারেন---

দিতে পারি,
তোমায় আমি দিতে পারি,
গবর্মেন্টে রেজিস্টারি
না করিলে দিতে পারি।
খাতয় খারিজ না করালে
ভাগে তোমায় দিতে পারি।
আধি ভাগ দিলে পরে
     ভাগে তোমায় দিতে পারি।
শুনুন বাবুরা!
     সরকারি আইন বলে---ভাগচাষীর ভাগ বারোআনা,
     বাবুদের সিধে কথা---আধার বেশি কেউ পাবনো।
     সরকারি আইন বলে---ভাগচাষীর নাম খাতায় লেখো,
     বাবুদের সিধে কথা---তা যদি হয় রাস্তা দেখো!

এই যে, কবিখুড়ো। এই আমাদের পরিবারের কর্তাবাবু! তা কর্তাবাবুর নুন খেয়েছি। তাই সই। আধাভাগ দেবো, খাতায় নাম লেখাবো না, যদি ভাগে দেন। আর যদি সে দয়া না হয়?
     মজুর হইয়া খাটিয়া খাটিয়া তিন টাকা রোজ পাবো
     চাল কিলোপ্রতি সাড়ে তিনটাকা তবু তো যা হোক খাবো
কারণ?
কাজ মেলে না,
প্রতিদিন কাজ মেলে না,
মাসের মধ্যে দশ বারো দিন
তাও তো দেখি কাজ মেলে না।
হাজার হাজার জমিহারা
সবাই ঘোরে কাজ মেলে না।
তিন টাকা রোজ তাও মেলে না।
কাজ না পেলে পেট চলে না।

খুড়ো॥---
আরে আরে এই ব্যাটা! সব গান তুই যে একাই গেয়ে দিলি রে? ভেবোছিস এই করে আসর মাতাবি? ভেবেছিস তোর যতো বাজে কথা মিথ্যে কথা শুনে বাবুরা সব ভুলে যাবেন?

পচা॥---
তো কও না খুড়ো! হিম্মৎ থাকে তো জবাব দাও।

খুড়ো॥---
আরে জবাব দেবো কী রে ব্যাটা? তোর সওয়াল থাকলে তো জবাব দেবো? তুই বলেছিসটা কী? ফসল কেনা বেচা, জমি কেনা বেচা, ভাগে জমি দেওয়া, জন থাটানো---এই তো সাত কাহন গাইলি! তা এর মধ্যে কোনটা অন্যায্য বল? বলুন বাবুরা, অন্যায্য কোনটা? সব বাজারের রেট দর যখন যেমন আছে, তেমনি লেনদেন হচ্ছে। বলুন বাবুরা, অন্যায্য কোনখানে হোলো? অন্যায্য হলে---থানাপুলিশ আছে, কোর্টকাছারি আছে, এ বাবা মহারানির রাজত্ব। মগের মুলুক তো নয়?

(গান : সুরর---রামপ্রসাদী)
মা গো এদের বুঝিয়ে দে না।
এদের ধ্যান ধারণা নেইকো কিছুই, গণতন্ত্র তাও বোঝে না।
মা গো এদের বুঝিয়ে দে না।
গণতন্ত্রে সবাই স্বাধীন, সবাই থাকে বেঁচে বর্তে,
সাধ্যি থাকলে বুদ্ধি থাকলে সবাই পারে খেতে পরতে।
যারা অবোধ, শুধু তাদের মা গো
এমন রাজ্যেও ভাত জোটে না।
মা গো এদের বুঝিয়ে দে না।
খোলা বাজার আছে পড়ে স্বাধীনভাবে বেচা কেনা,
আইন কানুন সবার তরে, গা বাঁচিয়ে লুঠে নে না!
শুধু বোকার মতো চিড়বিড়িয়ে ভাঙলে আইন পার পাবে না!
মা গো এদের বুঝিয়ে দে না।

পচা॥---
ঠিক বলেছো খুড়ো। এই এতোক্ষণে একটা সত্যি কথা বলেছো।
“খোলা বাজার আছে পড়ে, গা বাঁচিয়ে লুঠে নে না!”

খুড়ো॥---
কী কী কী---আমি তাই বলেছি? আমি তো বললুম---“আইন কানুন সবার
তরে, গা বাঁচিয়ে---”

পচা॥---
ঐ একই কথা খুড়ো, মনের কথা ফস করে বেরিয়ে পড়েছে।

খুড়ো॥---
দেখ দেখ মিথ্যে কথা বলিস নি। বাবুরা সব ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না, বুঝলি? বলুন বাবুরা। ঝাজার আছে, আইন কানুন আছে, জিনিসপত্র কম থাকলে গাম বাড়ে, বেশি থাকলে দাম কমে। ন্যায্য বাজারে ন্যায্য দরে---

পচা॥---
বাজে কথা খুড়ো। জিনিসপত্র কম করে বানায়, মজুত করে রাখে, বাজার দর বাড়াতে। তোমাদের কাছে দুনিয়াটা একটা বাজার, মানুষ কিছুই না।

খুড়ো॥---
আরে পাঁঠা, মানুষের জন্যেই তো বাজার?

পচা॥--- না খুড়ো, বাজার তোমাদের, তোমরা মানুষ নও। মানুষ নিয়ে বাজারে তোমরা কেনা বেচা করো। ওসব আর চলবে না খুড়ো।
খুড়ো॥---
বাজার তো খোলা পড়ে আছে! তোরাও কেন এসে---

পচা॥---
না খুড়ো! খোলা বাজার আমাদের দরকার নেই। বাজারই দরকার নেই আমাদের! আমরাই বানাবো, আমরাই খাবো, বেচা কেনার ধার ধারবো না।

খুড়ো॥---
দেখো শালার বুদ্ধি। বেচা কেনা চিরকালই আছে!

পচা॥---
মিথ্যে কথা খুড়ো! চিরকাল ছিল না, চিরকাল থাকবেও না। অনেক বানাতে পারি আমরা, সবাই মিলে ভাগ করে খেতে পারি। কিসের বাজার? কিসের বেচা কেনা? কিসের টাকা কড়ি, বিষয় সম্পত্তি?

(গান : সুর ভাটিয়ালী)
(আমরা) যা কিছু চাই সবই তো বানাই,
ফালতু কেন বাজার যাবো?
টাকার চাকর কেন হবো?
ভাগ করে সব খাবো,
(এসো) ভাগ করে সব খাবো।
এই দুনিয়ায় যা কিছু দরকারী,
আমরা সবাই মিলে বানিয়ে নিতে পারি,
সাধ্যমতো খাটবো সবাই,
যার যা দরকার নিয়ে যাবো,
কেনা বেচায় কী ফল পাবো?
ভাগ করে সব খাবো।
আমার তোমার কেন বলি? টাকা কেন জমিয়ে চলি?
সবার তরে সবাই মোরা, এই কথাটা কেন ভুলি?
সবই বানাই সব যদি পাই তবে
বিষয় আশয় জমিয়ে কী আর হবে?
থানা পুলিশ ব্যাঙ্ক আদালত উঠিয়ে দিয়ে ঘর বানাবো,
ভালোবাসার বান ভাসাবো,
আবার মানুব হবো,
(ও ভাই) আবার মানুষ হবো।

--- শেষ ---