কবি বাদল সরকারের কবিতা
যে কোন কবিতার উপর ক্লিক করলেই সেই কবিতাটি আপনার সামনে চলে আসবে।
*
কবি বাদল সরকারের পরিচিতির পাতায় . . .
সা-----রা-----রা-----ত্তি-----র
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “সারারাত্তির” নাটকের প্রথম দৃশ্যে, বৃদ্ধের কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

বৃদ্ধ॥
সা-----রা-----রা-----ত্তি-----র
সারারাত্তির প্রহরে প্রহরে
দণ্ডে দণ্ডে পলে অণুপলে
কতো অর্বুদ অণু পরমাণু
তিলে তিলে মিশে একটি রাত্রি বেঁধেছে।
অন্ধকারের দীর্ঘ সূতোয়
চূর্ণ চূর্ণ কণিকা কণিকা
কতো মুহূর্ত মুহূর্তমালা গেঁথেছে।
     [ চোখ ফিরে এলো স্ত্রীর দিকে ]
জেগে-থাকা চোখ মেলে-রাখা চোখ
ঘুমের বিরামে বঞ্চিত চোখ
জ্বালাধরা দুটো নির্মম চোখ
স্বপ্ন-কোমল ধবল অঙ্গে
দৃষ্টি-কঠিন চাবুকের দাগ পেতেছে।
[ বৃদ্ধ থামলেন ]

****************************









*
সারারাতির খোলা দুই চোখে
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “সারারাত্তির” নাটকের দ্বিতীয় দৃশ্যে, বৃদ্ধের কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

বৃদ্ধ॥ ---
এই ঘরে বহু কথা জমা হয়ে আছে। বহু বহু কথা। অনেক কথা। ওরা যায় না। ওরা ভাসতে থাকে। ভারী বিষাক্ত বাষ্প হয়ে জমে থাকে---এই ঘরে, ঐখানে, ঐ কোণে, ঐ দেওয়ালে, ঐ সব জিনিসের কোণে খাঁজে আনাচে-কানাচে। রাতে ওরা বেরোয়, ওরা ঘোরে, ছড়ায়, জড়ায়, কুণ্ডলী পাকায়। শত শত বিষাক্ত কিলবিলে সাপের মতো ওরা কুণ্ডলী পাকায়। আর চেনায়। আর জানায়। আর সারারাত্তির ধরে আমি ওদের মধ্যে বসে থাকি, ঘুরে বেড়াই পায়চারি করি। ওরা আমাকে চেনায়। আর জানায়। আর বোঝায়। আর চেতনার বিষে বিষে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। সব বিষ গিয়ে জমা হয় আমার এই দুটো চোখে। এই দুটো চোখে। এই দুটো জেগে থাকা, খুলে রাখা, মেলে ধরা চোখে। এই দুটো চোখ! সারা রাত্তির! সারা রাত্তির!

সারারাতির খোলা দুই চোখে
জমে থাকা বিষ ছোবলে ছোবলে
বিষাক্ত যতো কথার ছোবলে
কতো হলাহল চেতনার বিষ
সারারাত্তির এই দুটো চোখে নিয়েছি।
পুষে রাখা কথা জমে থাকা কথা
চেতনার বিষে বিষাক্ত কথা
এই ঘরে এই বিষের আধারে
সারা রাত্তির ছড়িয়ে ছড়িয়ে গিয়েছি।
তবু এ আমার---এ আমার কথা,
এ ঘর আমার, এ আমার বিষ,
যতো কথা আছে আনাচে কানাচে
ছায়াতে ছায়াতে কোণে খাঁজে মিশে
যতো কথা আছে সবই একা আমি
একে একে এনে পুষে পুষে রেখে দিয়েছি।
হ্যা, আমি একা! আর কেউ নয়! আমি একা!
এ আমার ঘর! তোমরা যাও! শুতে যাও।
     [ নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলো ওরা।... আলো নিভে গেলো। অন্ধকারের মধ্যে তাঁর কণ্ঠস্বর ভেসে উঠলো। ]
সারারাত্তির আমি তো একাই
যতো কথা সবই আমি তো একাই
একে একে এনে পুষে পুষে রেখে দিয়েছি।
     [ পর্দা নেমে এলো অন্ধকারে ]

****************************









*
তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “সারারাত্তির” নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে, বৃদ্ধের কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

বৃদ্ধ॥ --- তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি।
     [ স্ত্রী ঝাঁপিয়ে পড়লো বৃদ্ধের বুকে। বিশ্ব উজাড় করে ঢেলে দিলো বৃদ্ধের বুকে। নিজেকে নিঃশেষ করে মিশিয়ে দিলো বৃদ্ধের বুকে। বৃদ্ধ গ্রহণ করলেন একখানি হাতে। রাশি রাশি চুলের মধ্যে একখানি হাত--- স্বপ্নের স্বীকৃতি। অন্য হাত সেই পুরোনো ছায়ায়। আলো নিভে গেলো। অন্ধকারে দুজনে এক। দুজনে একটি অন্ধকার। ]
সারারাত্তির কথার পাথরে
শান দিয়ে দিয়ে কথার পাথরে
আমার দু’ চোখে শান দিয়ে দিয়ে
খোলা দুই চোখে নির্মম শান রেখেছি।
স্বপ্নের ভয়ে সজাগ প্রহরী
সারারাত্তির ধারালো দু চোখে জেগেছি।
তবু মনে মনে আবার আবার,
স্বপ্ন বুনেছি আবার আবার,
নির্বোধ এক অধ্যবসায়ে
প্রতি বার বার নির্বোধ মনে
তোমাকে স্বপ্ন তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি।

****************************









*
মন বসে তবু আবার আবার
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “সারারাত্তির” নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে, বৃদ্ধের কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

বৃদ্ধ॥ ---
মন বসে তবু আবার আবার
স্বপ্ন বুনেছে আবার আবার
নির্বোধ এক অধ্যবসায়
প্রতি বার বার নির্বোধ মনে
তোমাকে স্বপ্ন তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি।
     [ বৃদ্ধ থামলেন। এখানেই থামবার কথা। কিন্তু না। আবার শুরু হলো। ]
নির্মম শান ধারালো দু'চোখ
ধারালো ছুরিতে আবার কাটবে?
আবার কি দেবে বাতাসে ছড়িয়ে
ছিঁড়ে খুঁড়ে সব বাতাসে ছড়িয়ে?
এ ঘরের রাতে আবার কি চোখ
স্বপ্নের দেনা ধারালো ছুরিতে চোকাবে?
আবার কি মন ধ্রংসাবশেষ
স্বপ্নের যতো ধ্বংসাবশেষ
ভিখিরি এ মন কুড়িয়ে কুড়িয়ে
আবারও কি সব স্মৃতির খলিতে ঢোকাবে?

****************************









*
যা হবার হোক। সারারাত্তির
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “সারারাত্তির” নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে, বৃদ্ধের কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

বৃদ্ধ॥ ---
যা হবার হোক। সারারাত্তির
তবু তো দু’চোখ সারারাত্তির
মনের স্বপ্ন তবু তো দু'চোখ মেনেছে।
শেষ হয় হোক। তবু তো রাত্রি---
অসম্ভবের সম্ভাবনাকে জেনেছে।

****************************









*
চারুশীলা মহিলা ও বিচক্ষণ মহোদয়গণ
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “যদি আর একবার” নাটকের প্রথম অঙ্ক দ্বিতীয় দৃশ্যের শেষে, সত্য-এর কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

সত্য॥ ---
সুধীজন।
চারুশীলা মহিলা ও বিচক্ষণ মহোদয়গণ।
পৃথিবীর পরিক্রমা বন্ধ যদি না হয়, তা হলে
সকালের ভার নেবে দ্বিপ্রহর। সেও যাবে চলে,
অপরাহ্ন দখল জানাবে, ক্ষণিকের, তারপর
সন্ধ্যা হবে। দিনান্তের দাবী নিয়ে রাত্রির প্রহর
বসে রবে অপেক্ষায়। ক্ষান্তিহীন আয়াহ্নগতিতে
পৃথিবী অক্লান্ত খাটে দিনগুলি পার করে দিতে ;
সভ্যতার ইতিহাস বৃদ্ধ হলে ক্ষতি নাই তার।
ক্ষতি কার? বনলতা? সঞ্চয়-অতসী-করুণার?
ব্রজলাল? রতিকান্ত? অথবা কি আমার আপনার?
ভুলপথে মোড় ঘুরে সবই যদি হাহাকারে ডোবে,
অতীতের প্রতারণা বর্তমান ডোবায় বিক্ষোভে---
তবে কি বা আসে যায় সভ্যতার আয়ুক্ষয় হলে?
পৃথিবী যাক না ঘুরে, দিন আসুক, দিন যাক চলে।
     [ সত্য থামলো। দূরে মাদলের শব্দ, গ্রামে উৎসবের বাদ্যধ্বনি। ধিতাং তা, ধিতাং তা। সত্যর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন মাদলের তালে মিশে যাচ্ছে। ]
কিন্ত না! এখন এসব তর্ক না।
আজকে থাকুক বক্তৃতা, মাদল বাজে ধিতাং তা! ধিতাং তা।
আজকে বাতাস নেশায় চুর, আজকে মাতাল সমুদ্দুর,
সূয্যিমামা যায় টাটে, রাত হোলো যে দিন কাটে,
আকাশ কালো অন্ধকার, তারার চোখে ঠাট্টা কার?
এক্ষুনি চাঁদ উঠবে ঠিক, ঢাকবে আলোয় দিগ্বিদিক।
মাদল বলে--- ‘ধিতাং তা, সামাল সবাই, ঘরকে যা!’
ভয়টা কিসের, ভয়ট কি? দেখতে মজা চাস না কি?
আজকে যে দিন বছরকার, আজকে সে দিন চমৎকার!
     [ একটা প্রচণ্ড স্ফূর্তিতে সত্যর গলা চড়ছে, নাচ বাড়ছে ]
মাদল বাজে ধিংতা তা! জোরসে বাজা ধিতাং তা!
ধিংতি নাতিন ধিতাং তিন! আজ সে এক মজার দিন!
ধিংতি নাতিন ধিতাং তিন! আজ সে কি এক দারুণ দিন!
আসবে হেথায় বুড্ঢা জিন! বুড্ঢা জিন! বুড্ঢা জিন!

****************************









*
রাতের পৃথিবী রাতের আকাশ রাতের চাঁদ
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “যদি আর একবার” নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে, সত্য-এর কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

সত্য॥ ---
রাতের পৃথিবী রাতের আকাশ রাতের চাঁদ
রাতের বাতাসে পরীরা পেতেছে আজব ফাঁদ
রাতের সাগর জ্যোৎস্নানীল
পূরন্ত ঢেউ দরাজদিল
সোনালী বালির আলিঙ্গনের মেটায় সাধ
রাতের আকাশে হেসে কুটি কুটি রাতের চাঁদ।

রাতের মানুষ নালিশ তোমার স্তব্ধ হোক
রাতের সাগরে ডুবুক তোমার ব্যর্থ শোক
ভুলের মাশুল দিও না আর
সুরু করে দেখো আর একবার
আবার জীবন সাজাক তোমার নতুন চোখ
নতুন অতীত এনেছে রাতের কল্পলোক।

****************************









*
মহামতি রতিকান্ত, ব্রিজলাল এবং সঞ্জয়
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “যদি আর একবার” নাটকের দ্বিতীয় অঙ্কে, সত্য-এর কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

সত্য॥ ---
সুধীজন!
চারুশীলা মহিলা ও বিচক্ষণ মহোদয়গণ!
মহামতি রতিকান্ত, ব্রিজলাল এবং সঞ্জয়,
অতসী, করুণা আর বনলতা পেয়েছে সময়
ঠিক রাস্তা বেছে নিতে অতীতের চৌমাথায় ফিরে।
দেখে যদি হিংসে হয়, ব্রজপুরে সমুদ্রের তীরে
নেপচুন হ্যাপি লজ---ঠিকানা তো আগেই দিয়েছি ;
বছরে যে একদিন, সে কথাও বলেই নিয়েছি।
পৃথিবীর পরিক্রমা চলবে তো আরো বহুদিন,
সভ্যতার ইতিহাস অসমাপ্ত, এখনো বিলীন
ভবিষ্যৎ অজানার অন্ধকারে। অতীতের ভার
তবু যদি ক্লান্ত করে---বুড্ঢা জিন করুক উদ্ধার।
নাটক আর একটু বাকি, তবু যে এসব কথ বলি,
হেতু তার---আমি আর নেই এতে। নমস্কার, চলি।

****************************









*
নাড়ির বন্ধন
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “শেষ নেই” নাটকের সুমন্তর কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

সুমন্ত॥ ---
নাড়ির বন্ধন
কেটে গেছে জন্মলগ্নে, তবু, আমরণ
পাকে পাকে পিষ্ট করে রেখে দাও।
ভুলে যাও---জঠরের দেনা
শৈশবে গিয়েছে চুকে, আজ তার হিসেব হবে না।
তোমার কল্যাণে আজ বিকলাঙ্গ মন-প্রাণ-দেহ---
আহা, মাতৃস্নেহ!

****************************









*
বদ্ধ জল। গভীরের অন্তরালে
কবি বাদল সরকার
বাদল সরকারের “শেষ নেই” নাটকের সুমন্তর কণ্ঠে কবিতা। আমরা শুধু কবিতার অংশটুকু তুলে দিলাম নাটকের অন্য ডায়লগ ও বিবরণী বাদ দিয়ে, যতটা সম্ভব। মিলনসাগরে প্রকাশ ৩০.৫.২০২৬।

সুমন্ত॥ ---
বদ্ধ জল। গভীরের অন্তরালে
পাতালে পাথরে গাঁথা অনড় প্রাসাদ
অচলায়তন। রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার
জড়তার বিষের আস্বাদ।
নাগকন্যা পাতালের রাণী,
তোমার এ হাতছানি --- কবরের ডাক।
বুকে যতো তন্ত্রী আছে ছিঁড়ে যায় যাক,
তবুও ভাসার মন্ত্রে ভেসে যাই স্রোতে
প্রলয়ের পথে।
বাঁধের অচল ভিতে ভাঙনেব শব্দ শোনা যায়,
নাগকন্যা! তোমাকে বিদায়।

****************************