.
জর্জ বিশ্বাস - ^^ উপরে ফেরত
শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস সুপরিচিত ছিলেন জর্জ বিশ্বাস বা জর্জ দেবব্রত বিশ্বাস বা জর্জদা নামেও। তাঁর জন্মের সময়ে, ১৯১১ সালে, ভারতে রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত সফর ও দিল্লী দরবার চলছিল। সেই সুবাদে তাঁর ডাক নাম রাখা হয় জর্জ। পরবর্তীতে অনুরাগী ও সঙ্গীতজগতে তিনি জর্জ বিশ্বাস বা আদর করে 'জর্জদা' নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। .
কবির স্কুল, কলেজ ও ছাত্রজীবন - ^^ উপরে ফেরত
তাঁর স্কুল জীবন কাটে কিশোর গঞ্জেই। ১৯২৭ সালে কিশোরগঞ্জ হাই স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন।
১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে কলকাতার সিটি কলেজের রামমোহন হোস্টেলের হিন্দু ছেলেরা হোস্টেলে সরস্বতী পূজা করার জন্য বায়না ধরে। কিন্তু সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ তার অনুমতি দিতে রাজি হন নি কারণ কলেজের সংবিধান ও নিয়মে তার প্রাবধান ছিল না।
সেই সময়ে সিটি কলেজের হিন্দু ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান কংগ্রেস নেতা সুভাষচন্দ্র বসু (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) ও তাঁর দাদা শরৎচন্দ্র বসু। প্রতিবাদী ছাত্ররা কলেজের গেটের বাইরে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত করে। ১লা মার্চ কলকাতার অ্যালবার্ট হলে, যা এখন কফি হাউস বলে খ্যাত, এক বিশাল জনসভায়, কলেজের গোঁড়ামীর বিরদ্ধে এক জোরদার ভাষণ দেন সুভাষচন্দ্র বসু। শরৎচন্দ্র বসু হিন্দু ছেলেদের বলেন সিটি কলেজ ছেড়ে অন্যান্য কলেজে গিয়ে ভর্তি হতে। এই নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) সাথে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রবল মতভেদ দেখা যায়।
ইতিহাসের এই ছোট্ট অথচ দাগ রেখে যাওয়া ঘটনার বিবরণ ও বিশ্লেষণ আমরা পাই অলকরঞ্জন বসুচৌধুরীর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত, “পলিটিক্সের ধূলিচক্রে রবীন্দ্রনাথ” গ্রন্থের “দেশনায়কের সন্ধানে” অধ্যায়ে।
এর পরেই হিন্দু ছাত্ররা সিটি কলেজ ছেড়ে যেতে থাকে। সেই সময়ে কলকাতার ব্রাহ্ম সমাজ থেকে সব ব্রাহ্ম ছাত্রছাত্রিদের সিটি কলেজে এসে ভর্তি হয়ে কলেজটিকে টিকিয়ে রাখার আহ্বান করা হয়। সেই আহ্বানে সারা দিয়ে শিল্পী-কবি দেবব্রত বিশ্বাস, ১৯২৭ সালের শেষদিকে অথবা ১৯২৮ সালের শুরুর দিকে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে ট্রান্সফার নিয়ে সিটি কলেজে (আমহার্স্ট স্ট্রীট) এসে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে তিনি আই.এ. পরীক্ষা পাশ করে, কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজের বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিশাস্ত্রে এম.এ. পরীক্ষা পাশ করেন। .
কবির কর্মজীবন - ^^ উপরে ফেরত
১৯৩৪ সালে তিনি বিনা মাইনেতে, এলিট সিনেমার উল্টো দিকে, হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে চাকরি পেলেন। তাঁর খরচ চালাতেন টিউসনি করে।
১৯৩৫ সালের মে মাস থেকে তিনি ৫০ টাকা মাইনেতে সেখানকার পাকা চাকুরুজীবি হলেন। ১৯৫৬ সালে, ভারত সরকার হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে অধিগ্রহণ করে L.I.C. বা লাইফ ইনসিওরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া করেন। ১৯৭১ সালের অগাস্ট মাসে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁদের বামপন্থী ইউনিয়ান থেকে তাঁকে বিদায় সম্বর্ধনা দেবার প্রস্তাব কে তিনি না করে দেন।
বামপন্থী হয়েও, বামপন্থীদের ভেতর বিভেদ, মতান্তর এবং পরস্পরের প্রতি সহিংসতা তাঁকে খুব ব্যথা দিয়েছিল। আগেই ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। শেষে ইউনিয়নের তরফের বিদায় সম্বর্ধনাও না করে দেন।
.
কবির রবীন্দ্রনাথকে দেখা - ^^ উপরে ফেরত
শিল্পী কবি দেবব্রত বিশ্বাস, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯২৮ সালের ৮ই ভাদ্র যা ছিল ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূরণের দিন। এই উপলক্ষে কর্নওয়ালিস স্ট্রীট বা বর্তমান বিধান সরণীর সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরে একটি বিশেষ ভাদ্রোৎসব পালনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেদিনকার সকাল বেলার উপাসনার কাজ করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রিত করা হয়েছিল। তিনি সেদিন বেশ অসুস্থ ছিলেন কিন্তু তা সত্বেও তিনি উপাসনার কাজ করেছিলেন দুর্বল কণ্ঠে এবং শেষে একটি ব্রাহ্মসঙ্গীত গেয়েছিলেন ক্ষীণ কণ্ঠে। কবির তখন মাত্র ১৭ বছর বয়স!
চাকরি পাওয়ার পর শান্তিনিকেতনে প্রথমবার যান ১৯৩১ সালের ডিসেম্বরের শেষে, ৭ই পৌষ। ওই দিন সকালে সেখানেও উপাসনা হতো এবং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথকে সেখানেও দেখেন উপাসনা করতে।
.
শিল্পীর রবীন্দ্রনাথকে গান শোনানো - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৪ সালে কবি সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) জামাতা জ্যোতির্ময় দত্ত তাঁদের “কলকাতা” পত্রিকার জুন-জুলাই সংখ্যায় “একটি অসাক্ষাৎকার” নামের সাক্ষাৎকারে একটি প্রশ্নের উত্তরে শিল্পী কবি দেবব্রত বিশ্বাস জানান --- “রবীন্দ্রনাথ আমার গান শুনেছিলেন।” কবে, কোথায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়েছিলেন, তা আর উল্লেখ করেন নি। এই পুরো সাক্ষাৎকারটি আমরা পাই কবির আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত” ১৪৫-পৃষ্ঠা থেকে।
.
পূর্ববঙ্গে শৈশবের ম্লেচ্ছ জীবন - ^^ উপরে ফেরত
কবির শৈশব ও বাল্যকাল কাটে কিশোরগঞ্জ শহরে। তাঁরা ব্রাহ্ম বলে সেখানকার স্কুলে তাঁকে ম্লেচ্ছ বলে ডাকা হতো। এমন কি ক্লাসে, তিনি যে বেঞ্চে বসতেন সেই বেঞ্চে কোনো হিন্দু ছেলে বসতো না। তখন তাঁর বন্ধুদের মধ্যে ছিলো মুসলমান ও খ্রীষ্টান ছেলেরা। ৭ম-৮ম শ্রেণীতে ওঠার পরে তাঁর সাথে কয়েরজন হিন্দু সহপাঠী ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হয়। তাঁদের বাড়িতে সঙ্গীতের চল ছিল। তাঁদের সাথে মিশতে গিয়ে, নিজেকে কখনই ম্লেচ্ছ মনে হয় নি। অনেক হিন্দু তাঁকে ভালবাসতেন, স্নেহ করতেন কিন্তু তা সত্বেও অনেকের বাড়িতেই তাঁর যাতায়াত ছিল, “বাইর-বাড়ি-ঘর” অর্থাৎ “বাইরের বৈঠকখানা” বা “বসবার ঘর” পর্যন্ত।
ছোটবেলায়, খেলার মাঠে তাঁরা ফুটবল খেলতেন, ফুটবলের অভাবে জাম্বুরা বা বড় বাতাবীলেবু দিয়ে। বড় হয়েও সবার সাথে মিলে খেলাধুলা করেছেন। খেলার সময় কেউ তাঁকে ম্লেচ্ছ বলে ঘৃণা করতো না। তাঁরও সেই সময়টা নিজেকে ম্লেচ্ছ মনে হতো না।
.
শিল্পীর গান শেখা - ^^ উপরে ফেরত
শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস কারও কাছে প্রথাগত সঙ্গীতশিক্ষা লাভ করেন নি। ছোটবেলা থেকেই গান শুনে শুনেই তুলে ফেলতেন। বাইরে মাঝি-মাল্লাদের গান, মুসলমান রাখাল ছেলেদের গান, ভিখারীদের গান। মা সারাদিন সংসারের ফাঁকে ফাঁকে গুন্ গুন্ করে গান গাইতেন। তিনি নাকি আগে ব্রহ্মসমাজের মন্দিরে অনেক গান করতেন। বাড়িতে একটি ছোট হারমোনিয়াম ছিল। রোজ সন্ধ্যায় তাঁর মা, অবলা দেবী, হারমোনিয়াম বাজিয়ে ব্রহ্মসঙ্গীত গাইতেন। ভাই বোনেরা তা শুনে শুনেই তুলে ফেলতেন। তাঁরাও রোজ মায়ের সঙ্গে সন্ধ্যায় গান গাইতেন। পরে বাবা একটি অরগান কিনে দিয়েছিলেন। সেই অরগান আসার পর তাঁদের গানের উৎসাহ বেড়ে গিয়েছিল। ব্রহ্মসঙ্গীত ছাড়া অন্যান্য গানও, বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে তখনকার দিনের রেকর্ডের গান বা কলের গান, প্রেমের গান, সবই বাইরে বন্ধুদের বাড়িতে বা গ্রামাফোন রেকর্ডের দোকানে শুনে শুনেই শিখেছিলেন।
১৯২৮ থেকে কয়েক বছরের মধ্যে কলকাতার বিভিন্ন ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে মাঘোৎসবে ও ভাদ্রোৎসবে তিনি ব্রাহ্ম সমাজের গাইয়েদের দলে নিজের আসন পাকা করে নিয়েছিলেন।
.
বাম পন্থা ও দেবব্রত বিশ্বাসের গণসঙ্গীত - ^^ উপরে ফেরত
১৯৩৮ থেকেই, যখন ব্রিটিশরা পরাধীন ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনী করে রেখেছিল, তিনি বাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তখনকার ইয়ুথ কালচারাল ইনস্টিটিউট, ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি স্বদেশী গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গানগুলি গাইতেন।
১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরকম সময় দেবব্রতর সঙ্গে গণসঙ্গীতকার হেমাঙ্গ বিশ্বাসের (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) আলাপ হয়। তিনি তাঁকে বলেছিলেন, “জর্জদা, রবীন্দ্রসঙ্গীত যেভাবে আপনি গাইলেন সেইভাবে যে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া যায় তা আগে ভাবতেও পারিনি”। ওই সময়েই তাঁর সঙ্গে জ্যেতিরিন্দ্র মৈত্ররও (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) আলাপ হয়। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের সময় জ্যেতিরিন্দ্র মৈত্রর তাঁর নবজীবনের গান রচনা করা শুরু করে দেবব্রতকে দেখাতেন, যিনি সেই গানের অনেকগুলিতে সুরারোপ করেন। সেই নবজীবনের গান বহু অনুষ্ঠানেও তিনি গাইতেন।
১৯৪৩ সালে বামপন্থী সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে তিনি বম্বেতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির অধিবেশনে গিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালেই বম্বেতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় গণনাট্য সঙ্ঘ বা IPTA বা Indian People's Theatre Association । যুক্ত ছিলেন ঋত্বিক ঘটক (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...), বিজন ভট্টাচার্য (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...), উৎপল দত্ত (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) , সলিল চৌধুরী (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...), পৃথ্বীরাজ কাপুর, খাজা আহমেদ আব্বাস প্রমুখরা। বিজন ভট্টাচার্যর নবান্ন নাটক বিপুল সারা জাগিয়েছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেবব্রত গাইতেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় বা হারীনদার হিন্দী গানও। গাইতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) প্রমুখরা।
সলিল চৌধুরীর সুরে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) “অবাক পৃথিবী” ও “বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে” গান দুটিও IPTA ও নানা বামপন্থী সভায় সবাই মিলে গাইতেন।
এই সময়ে তিনি পঙ্কজ মল্লিকের কাছ থেকেও গান তুলেছিলেন যা তিনি IPTA র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতেন।
শম্ভু মিত্র (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) ও তৃপ্তি মিত্রের সাথে তাঁর খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। ১৯৪৮ সাল নাগাদ তিনি শম্ভু মিত্রর বহুরূপী নাট্য গোষ্ঠির “রক্তকরবী” নাটক ও তুলসী লাহিড়ীর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) “ছেঁড়া তার” নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন।
এরকম দিনগুলিতেই, ১৯৪৪ সালে, তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন তাঁর “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত” গ্রন্থের ৭১-পৃষ্ঠায়, “বাঁয়ের রাস্তা” অধ্যায়ে যা আমাদের মতে, তাঁর পরবর্তী রবীন্দ্রসঙ্গীত জীবনে কি হতে চলেছে, তার একটি ঝলক হয়ে দেখা দিয়েছিল। আমরা তা এখানে উল্লেখ করছি শিল্পীর নিজের কথায়...
“আমার সিটি কলেজের দিনগুলিতে আমার একজন সহপাঠী সুধীন দত্তের কথা উল্লেখ করেছিলাম। এবার তার সম্বন্ধে একটি গল্প লিখতে হচ্ছে। সুধীন তার কয়েকজন, চেনা-পরিচিত বন্ধুদের নিয়ে ঠিক করল কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশ নাটকটি মঞ্চস্থ করবে। ব্যাপারটি হয়েছিল ১৯৪৪ সনে। নয় রাত্রি ধরে কলকাতার তিনটি প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চস্থ করা হবে। সুধীন আমায় রাজপুত্রের গানগুলি গেয়ে দেবার জন্য পাকড়াও করল --- রাজীও হয়ে গেলাম। সব ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেল --- রিহার্সালও বিজয় সিং নাহারের বাড়িতে কুমার সিং হলে শুরু হয়ে গেল।
তাসের দেশের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন :
রাজাসাহেব --- সরোজরঞ্জন চৌধুরী
রাণীবিবি --- উত্তরাদেবী
সওদাগর পুত্র --- সুজন ঠাকুর
ছক্কা --- শ্যাম লাহা
পঞ্জা --- সাগরময় ঘোষ
তিরি --- রঞ্জিত রায়
দুরি --- সুজিত ঠাকুর
সম্পাদক --- ইন্দুভূষণ রায়
দহলা পণ্ডিত --- প্রশান্ত রায়
রুহিতন --- সুধীন্দ্র দত্ত
হরতনী --- সংযুক্তা সেন
টেক্কাকুমারীগণ --- সরস্বতী শাস্ত্রী, রাণী রায়, গীতা রায়, বাণী বোস, মঞ্জুলা দত্ত, মঞ্জু সেন, বিভা নাহার
নৃত্য পরিচালক --- কেলু নায়ার
গানে --- রাজেশ্বরী দত্ত, উমা চ্যাটার্জি, সন্তোষ সেনগুপ্ত, আব্দুল আহাদ, সুধীন চ্যাটার্জি, কল্যাণ চ্যাটাজি, আব্দুল লতিফ
সঙ্গীত পরিচালনা --- শান্তিদেব ঘোষ।
গানের দলে আমিও ছিলাম এবং রাজপুত্রের গানগুলি আমাকে গাইতে হত। দু তিন রাত আভিনয় হয়ে যাবার পর পরিচালক মহাশয় নাটকের শেষ গানটি আমায় গাইতে নির্দেশ দিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “গানটি with pleasure গাইব) না with out pleasure গাইব ?” তিনি with pleasure গাইবার নির্দেশ দিলেন। নাটকের শেষ গানটি ছিল “ভাঙো, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও ভাঙো।” তখনকার দিনে গানটি কারা গাইতেন আমার একদম মনে নেই ; কিন্তু গানটি গাওয়া হত খুব পেলব ভঙ্গীতে। সেদিন আমি আমাদের গণনাট্য সঙ্ঘের অনুষ্ঠানগুলিতে যেভাবে গানটি গাইতাম ঠিক সেই ভঙ্গীতে দ্রুতলয়ে গাইতে আরম্ভ করলাম। দেখতে পেলাম দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যশিল্পী কেলু নায়ার প্রাণের আনন্দে স্টেজের ধুলো উড়িয়ে নেচে নেচে বেড়াচ্ছেন কিন্তু অন্যরা ঠিক সুবিধে করতে পারছেন না। গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই যবনিকা পতন। তারপরেই ভর্ৎসনার সুরে আমার কাছে কৈফিরত চাওয়া হল ওইভাবে আমি গানটি গাইলাম কেন। আমি বলেছিলাম আমায় with pleasure গাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেই ওইভাবে গেয়েছি। বলা বাহুল্য ওই গান পরে আর আমায় গাইতে হয়নি।”
.
শিল্পীর বিদেশ সফর - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৫ সালে ভারত সরকারের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তিনিও চীনে গিয়েছিলেন।
১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসে রেঙ্গুনে গিয়েছিলেন, ব্রহ্মদেশীয় বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনে গান গাইতে আমন্ত্রিত হয়ে।
১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের ঢাকার ছাত্র সমাজের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন গান গাইতে।
.
দেবব্রত বিশ্বাসের প্রথম গানের রেকর্ড - ^^ উপরে ফেরত
১৯৩৫ সালের পর কোনো সময়ে তাঁর সহপাঠী সন্তোষ সেনগুপ্ত তাঁকে সেনোলা রেকর্ড কোম্পানীতে নিয়ে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। কাজী নজরুল তাঁর গান শুনে তাঁকে দিয়ে দুটি গান শিখিয়ে সেখানে রেকর্ড করান। তার মধ্যে একটি গান ছিল "মোর ভুলিবার সাধনায় কেন সাধো বাদ"। কোনো অজ্ঞাত কারণবশতঃ গান দুটির রেকর্ড প্রকাশিত হয়নি।
তাঁর অতি নিকটজনের মধ্যে বহু গাইয়ে শিল্পী ছিলেন। যাঁদের মধ্যে তাঁর টুলু মাসী অর্থাৎ সুপ্রভা রায় ও বুঁচি মাসী, যিনি পরে তাঁর জ্যাঠতুতো বৌদী হন, কনক দাস, পরে কনক বিশ্বাস, ছিলেন সাহানা দেবীর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) মতোই রবীন্দ্র নাথের বিশেষ স্নেহের পাত্রী।
ত্রিশের দশকের শেষ দিকে অথবা চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে কনক দাসের সঙ্গে H.M.V. থেকে দুটি গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর প্রথম রেকর্ড। গান দুটি ছিল “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান” (গানটি শুনতে এখানে ক্লিক্ করুন...) ও “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব” (গানটি শুনতে এখানে ক্লিক্ করুন...)।
.
বয়সকালে রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে হরিজন - ^^ উপরে ফেরত
তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া নিয়ে ঘোর বিবাদের সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় তাঁর পুরো গায়ক জীবন ধরেই। সম্ভবত তিনি যেহেতু রবীন্দ্রসঙ্গীত সহ কোনো গানই প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার মধ্য দিয়ে শেখেন নি, এবং তিনি বাম আন্দোলনের অনুষ্ঠানাদিতে গণসঙ্গীত গাইতেন যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়কিও ছিল সেই রকম। যা শুনে সাধারণ মানুষের খুব ভাল লেগে যেত এবং তিনি অন্যতম জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক হয়ে উঠে এসেছিলেন।
সে কালের কিছু নামকরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী এতে হয়তো কিছুটা বিব্রত এবং ঈর্ষান্বিত বোধ করতেন। জনসাধারণ ও রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমীদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা ছিল যে এরকম কিছু মানুষের কলকাঠি নাড়ানোর জন্যই বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ড, নানা কারণ দেখিয়ে, তাঁর বহু গান রেকর্ড করার পরে অনুমতি দেন নি প্রকাশ করার।
বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডের কিছু ক্ষমতাবান কর্মকর্তা, তাঁর জীবন অতীষ্ঠ করে রেখেছিলো তাদের স্বেচ্ছাচারী কাজের মধ্য দিয়ে। কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড যাতে শ্রোতাদের কাছে না পৌঁছয়, তার জন্য তারা সবকিছু করতে তৈরী থাকতেন। তাদের অবিমৃষ্যকারিতা এবং হঠকারিতার জন্য বাংলার রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমী মানুষ তাঁর বহু রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন।
তাঁর “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত” গ্রন্থে বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ড থেকে পাওয়া বহু চিঠি ও তাঁর দেওয়া সে সব চিঠির উত্তর দেওয়া রয়েছে, যাতে তিনি জানিয়েছেন যে তিনি কেন তা ওইভাবে গেয়েছিলেন যাতে কোনো ভুল ছিল না। তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সে কালের কিছু নামকরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর প্ররোচনায় তাঁর বিরুদ্ধে মিউজিক বোর্ডের সঞ্চালকরা এই কাজ করতেন, এবং কখনও কখনও তারা বন্ধুবর্গের কাছে তা গর্ব করে বলতেনও।
অথচ বহু বিখ্যাত, রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আসা মানুষ তাঁর গান শুনে মুগ্ধ ছিলেন। প্রমথনাথ বিশী (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) একবার তাঁর ঘরে এসে একটি ক্যাসেট দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর জন্য কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করে দেবার জন্য! সেই গান শুনে প্রথমবাবু দিল্লী থেকে চিঠিতে লিখেছিলেন -- “দিল্লীর যে মানসিক মরুভূমির মধ্যে আমায় সময় সময় থাকতে হয়, সোখানে ফিতেয় তোলা আপনার কণ্ঠে গীত একগুচ্ছ গান আছে --- সেগুলো এই মরুভূমির মরুদ্যান। হাজারবার শুনেও তৃপ্তি হয় না।”
একের পর এক এরকম ধাক্কা থেকে খেতে শেষে ১৯৬৯ সালে শিল্পী নিজেই ঠিক করেন যে তিনি আর রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করবেন না। কিন্তু ১৯৭০ সালে হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানির চণ্ডীচরণ সাহা আবার তাঁকে ধরলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করার জন্য।
তিনি চণ্ডীবাবুকে বুঝিয়ে বলেছিলেন যে বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ড তাঁর রেকর্ড অনুমোদন করছেন না। তিনি গান রেকর্ডিং এর সময়ে অনেক বাদ্যযন্ত্রীর সাহায্য নেন। রেকর্ড কোম্পানির তাতে অনেক খরচা হয়। কিন্তু যদি তা মিউজিক বোর্ডের অনুমোদন না পায় তাহলে তাদের অনেক ক্ষতি হয়। তাতে তিনি অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করেন। তবুও চণ্ডীবাবু অনেক করে বলার পরে তিনি ১৯৭০ এর শেষ বা ১৯৭১ এর শুরুতে অনেকগুলি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করান। তার মধ্যেও অনেকগুলি বিশ্বভারতীর অনুমোদন পায়নি।
এরপর তিনি আর কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করান নি।
১৯৭৬ সালের অক্টোবরে শিলং এর একটি ব্রাহ্ম কনফারেন্সে তাঁকেও আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। সেখানে তখনকার বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডের এক পদস্থ কর্মচারী পূর্নেন্দু গাঙ্গুলীকে তিনি বলেছিলেন ---
“আমার জন্ম হয়েছিল ওই ব্রাহ্মসমাজেই ; সেই সূত্রে রবীন্দ্রসংগীত আমার বড় ভাই। সেই বড় ভাইএর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল আমার মায়ের কোলে বসে। এতো দীর্ঘকাল পরে আবার কি আমার বড় ভাইএর সঙ্গে পরিচিত হতে হবে কয়েকজন গায়কগায়িকার মারফত, যাঁরা আমার চাইতে বয়সে অনেক ছোট এবং যাদের ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই নেই? এ ব্যাপারটিকে কি আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব?”
.
কলকাতার ছিচল্লিশের দাঙ্গা - ^^ উপরে ফেরত
আমরা কবির আত্মজীবনী “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত” গ্রন্থের ৬৫-পৃষ্ঠা থেকে ১৯৪৬ সালের কলকাতার হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা সম্বন্ধে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, তাঁরই নিজের ভাষায় এখানে তুলে দিচ্ছি...
“এইভাবেই দিনগুলি বেশ কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ ১৯৪৬ সনের আগস্ট মাসে কলকাতায় শুরু হয়ে গেল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা। কত নিরীহ লোক যে তখন প্রাণ হারাল তার কোনো হিসেব নেই। সেই সময়ে কয়েক মাসের জন্য শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি আমার বাড়িতে আমার পাশের ঘরেই থাকত। আমাদের অফিসের একজন বিশেষ পরিচিত বীরেন দে ও তার পরিবারের সবাইকে বিপন্ন অঞ্চল থেকে এনে আমার বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য রেখে দিলাম। আমার মা ও ছোট বোনও দোতলায় একটি ঘরে থাকতেন। দাঙ্গা যখন পুরোদমে চলছিল, হঠাৎ আমাদের গণনাট্য সঙ্ঘের একজন গায়ক --- কলিম শরাফী (মুসলমান) কলকাতার বাইরের কোনো অঞ্চল থেকে আমার বাড়িতে এসে হাজির হল। সে জানতই না যে কলকাতায় নারকীয় কাণ্ড চলছে। কলিমকে আমার ঘরেই লুকিয়ে রাখলাম। কয়েকদিন পর শহরের অবস্থার একটু উন্নতি হলে, করিম শরাফীকে একটি গান্ধী টুপী মাথায় পরিয়ে বাসে করে নিয়ে ডেকার্স লেনে কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে কাকাবাবুর অর্থাৎ কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের হাতে সঁপে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।”
.
সাতচল্লিশের স্বাধীনতা ও হিন্দুস্থান-পাকিস্তান - ^^ উপরে ফেরত
১৯৪৭ সালের ১৫ই অগাস্ট, দেশ ভাগ হয়ে হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল। ১৪ তারিখের সন্ধ্যা থেকেই তিনি দেখেছিলেন রাস্তায়, হাটে, মাঠে হিন্দু মুসলমানের কোলাকুলি।
কিন্তু স্বাধীনতার সাথে দেশভাগ, এই শিল্পী-কবি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। যে পূর্ববঙ্গে তাঁর জন্ম হয়েছিল, যে পূর্ববঙ্গে তাঁর শৈশব থেকে বড় হওয়া, যে পূর্ববঙ্গে তাঁর নিজের ঘরবাড়ি আত্মীয়স্বজন রয়েছে, সেই পূর্ববঙ্গ এখন আর তাঁর দেশ নয়, বিদেশ, এই ভাবনায় তাঁর মন ভেঙে পড়েছিল। এমন স্বাধীনতা তাঁর কাছে অর্থহীন মনে হয়েছিল, আরও কোটি কোটি মানুষর মতো। আর সে জন্যেই তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির “Support Nehru Govt” কাজটি, নিতান্তই অযৌক্তিক মনে হয়েছিল, যা তিনি তাঁর দল কে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
.
বিশ্বভারতী ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের কপিরাইট - ^^ উপরে ফেরত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনার ওপর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কপিরাইট বা স্বত্ব আসলে শেষ হবার কথা ছিল ৩১.১২.১৯৯১ তারিখে, কবির মৃত্যুর ৫০ বছর পর। কিন্তু বিশ্বভারতীর চাপের কছে মাথা নত করে ভারত সরকার কপিরাইট আইনে স্বত্বের মেয়াদ মৃত্যুর পর ৫০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬০ বছর করে দেয়। ফলে বিশ্বভারতীর কপিরাইট ২০০১ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়।
এই কপিরাইটের বলেই শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের গান নিয়ে রেকর্ড বার করতে বাধা দিয়ে আসছিলেন বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের কয়েকজন, কিছু বিশিষ্ট মানুষের প্রভাবে, নানা কারণ দেখিয়ে, যা আমরা, সাধারণ মানুষরা কখনও মেনে নেই নি। বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের এই বিচিত্র কাজের ফলে দেবব্রত বিশ্বাস রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশিত করতে পারেন নি বা প্রতিবাদ জানিয়ে রেকর্ড করেন নি জীবনের একটা বড় সময় ধরে। এর ফলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আর রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রেমীদের।
.
একটি প্রতিবাদী ভাস্কর্য - ^^ উপরে ফেরত
২০০২ সালে, শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের মৃত্যুর প্রায় ২২ বছর পর, ৩১.১২.২০০১ তারিখে বিশ্বভারতী কপিরাইট শেষ হবার পরে, শিল্পী মিলন সেনগুপ্ত, “রবির মুক্তি” নামের একটি প্রতিবাদী ভাস্কর্য তৈরী করেন যার ছবি এখানে দেওয়া হলো। ছবির উপরে ক্লিক্ করলে ছবিটি বড় করে ফুটে উঠবে।
.
কবি দেবব্রত বিশ্বাসের রচনা ও কবিতা - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৫ সালে ভারতীয় শান্তি কমিটির উদ্যোগে, সরকারের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তিনিও চীনে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে চীনে তাঁর অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে তাঁর কয়েকটি লেখা তখনকার স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখাগুলি একত্র করে ১৯৭৮ সালে অন্তরঙ্গ চীন নামে বই আকারে প্রকাশিত করেন। এছাড়া রয়েছে ১৯৭৮ সালে রচিত তাঁর আত্মজীবনীমূলক প্রতিবাদী গ্রন্থ “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত”।
তাঁর কবিতা মূলত গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ কে উৎসর্গ করা দুটি কবিপ্রণাম। এবং ১৯৮০ সালে রচিত গান “ক্যারে হেরা আমারে গাইতায় দিল না”।
তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত আর রেকর্ড করবেন না বলে স্থির করেন ১৯৭২ সালে। ১৯৭২ সালেই, “গুরুবন্দনা” নামে, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত দুটি গান রচনা করে সুর দিয়ে হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানীতে রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরা গানদুটি প্রকাশ করেন নি, কোনো অজ্ঞাত কারণবশতঃ। এই ঘটনার পেছনে কোনো গোপন হাত কাজ করেছিল কি না তা তিনি জানতে পারেন নি বলে তাঁর আত্মজীবনী “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত”-এ (১১২-পৃষ্ঠায়) লিখে গিয়েছেন।
আমরা মিলনসাগরে তাঁর সেই দুটি কবিতা ও গান এখানে তুলে আগামী দিনের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করবো।
বাঙালীদের বহু বদনাম আছে। তাঁরা অলস, তাঁরা আড্ডাবাজ, ফাঁকিবাজ, আরও অনেক কিছু। কিন্তু বাঙালীর যে ভাল গুণগুলি আছে, তার মধ্যে একটা হলো কবিতা লেখা! প্রায় সব বাঙালীই জীবনে দু-এক লাইন কবিতা লেখেন বা লিখেছেন। মিলনসাগরে আমাদের চেষ্টা সেই কবিতার মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক বাঙালীদের মিলনসাগরের কবিদের সভায় ধরা। মিলনসাগরের বাংলা কবিতার কালানুক্রমিক সূচী আসলে বাঙালীর ইতিহাস হয়ে উঠছে, কবিদের জীবনীর মধ্য দিয়ে।
কবি দেবব্রত বিশ্বাস এর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল : srimilansengupta@yahoo.co.in
হোয়াটসঅ্যাপ : +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭
এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ৩.৫.২০২৬
উৎস ---
জর্জ বিশ্বাস - ^^ উপরে ফেরত
শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস সুপরিচিত ছিলেন জর্জ বিশ্বাস বা জর্জ দেবব্রত বিশ্বাস বা জর্জদা নামেও। তাঁর জন্মের সময়ে, ১৯১১ সালে, ভারতে রাজা পঞ্চম জর্জের ভারত সফর ও দিল্লী দরবার চলছিল। সেই সুবাদে তাঁর ডাক নাম রাখা হয় জর্জ। পরবর্তীতে অনুরাগী ও সঙ্গীতজগতে তিনি জর্জ বিশ্বাস বা আদর করে 'জর্জদা' নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। .
কবির স্কুল, কলেজ ও ছাত্রজীবন - ^^ উপরে ফেরত
তাঁর স্কুল জীবন কাটে কিশোর গঞ্জেই। ১৯২৭ সালে কিশোরগঞ্জ হাই স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাশ করে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন।
১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে কলকাতার সিটি কলেজের রামমোহন হোস্টেলের হিন্দু ছেলেরা হোস্টেলে সরস্বতী পূজা করার জন্য বায়না ধরে। কিন্তু সিটি কলেজ কর্তৃপক্ষ তার অনুমতি দিতে রাজি হন নি কারণ কলেজের সংবিধান ও নিয়মে তার প্রাবধান ছিল না।
সেই সময়ে সিটি কলেজের হিন্দু ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান কংগ্রেস নেতা সুভাষচন্দ্র বসু (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) ও তাঁর দাদা শরৎচন্দ্র বসু। প্রতিবাদী ছাত্ররা কলেজের গেটের বাইরে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত করে। ১লা মার্চ কলকাতার অ্যালবার্ট হলে, যা এখন কফি হাউস বলে খ্যাত, এক বিশাল জনসভায়, কলেজের গোঁড়ামীর বিরদ্ধে এক জোরদার ভাষণ দেন সুভাষচন্দ্র বসু। শরৎচন্দ্র বসু হিন্দু ছেলেদের বলেন সিটি কলেজ ছেড়ে অন্যান্য কলেজে গিয়ে ভর্তি হতে। এই নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) সাথে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রবল মতভেদ দেখা যায়।
ইতিহাসের এই ছোট্ট অথচ দাগ রেখে যাওয়া ঘটনার বিবরণ ও বিশ্লেষণ আমরা পাই অলকরঞ্জন বসুচৌধুরীর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত, “পলিটিক্সের ধূলিচক্রে রবীন্দ্রনাথ” গ্রন্থের “দেশনায়কের সন্ধানে” অধ্যায়ে।
এর পরেই হিন্দু ছাত্ররা সিটি কলেজ ছেড়ে যেতে থাকে। সেই সময়ে কলকাতার ব্রাহ্ম সমাজ থেকে সব ব্রাহ্ম ছাত্রছাত্রিদের সিটি কলেজে এসে ভর্তি হয়ে কলেজটিকে টিকিয়ে রাখার আহ্বান করা হয়। সেই আহ্বানে সারা দিয়ে শিল্পী-কবি দেবব্রত বিশ্বাস, ১৯২৭ সালের শেষদিকে অথবা ১৯২৮ সালের শুরুর দিকে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে ট্রান্সফার নিয়ে সিটি কলেজে (আমহার্স্ট স্ট্রীট) এসে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে তিনি আই.এ. পরীক্ষা পাশ করে, কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজের বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। ১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিশাস্ত্রে এম.এ. পরীক্ষা পাশ করেন। .
কবির কর্মজীবন - ^^ উপরে ফেরত
১৯৩৪ সালে তিনি বিনা মাইনেতে, এলিট সিনেমার উল্টো দিকে, হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে চাকরি পেলেন। তাঁর খরচ চালাতেন টিউসনি করে।
১৯৩৫ সালের মে মাস থেকে তিনি ৫০ টাকা মাইনেতে সেখানকার পাকা চাকুরুজীবি হলেন। ১৯৫৬ সালে, ভারত সরকার হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে অধিগ্রহণ করে L.I.C. বা লাইফ ইনসিওরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া করেন। ১৯৭১ সালের অগাস্ট মাসে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁদের বামপন্থী ইউনিয়ান থেকে তাঁকে বিদায় সম্বর্ধনা দেবার প্রস্তাব কে তিনি না করে দেন।
বামপন্থী হয়েও, বামপন্থীদের ভেতর বিভেদ, মতান্তর এবং পরস্পরের প্রতি সহিংসতা তাঁকে খুব ব্যথা দিয়েছিল। আগেই ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। শেষে ইউনিয়নের তরফের বিদায় সম্বর্ধনাও না করে দেন।
.
কবির রবীন্দ্রনাথকে দেখা - ^^ উপরে ফেরত
শিল্পী কবি দেবব্রত বিশ্বাস, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯২৮ সালের ৮ই ভাদ্র যা ছিল ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূরণের দিন। এই উপলক্ষে কর্নওয়ালিস স্ট্রীট বা বর্তমান বিধান সরণীর সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরে একটি বিশেষ ভাদ্রোৎসব পালনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেদিনকার সকাল বেলার উপাসনার কাজ করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রিত করা হয়েছিল। তিনি সেদিন বেশ অসুস্থ ছিলেন কিন্তু তা সত্বেও তিনি উপাসনার কাজ করেছিলেন দুর্বল কণ্ঠে এবং শেষে একটি ব্রাহ্মসঙ্গীত গেয়েছিলেন ক্ষীণ কণ্ঠে। কবির তখন মাত্র ১৭ বছর বয়স!
চাকরি পাওয়ার পর শান্তিনিকেতনে প্রথমবার যান ১৯৩১ সালের ডিসেম্বরের শেষে, ৭ই পৌষ। ওই দিন সকালে সেখানেও উপাসনা হতো এবং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথকে সেখানেও দেখেন উপাসনা করতে।
.
শিল্পীর রবীন্দ্রনাথকে গান শোনানো - ^^ উপরে ফেরত
১৯৭৪ সালে কবি সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) জামাতা জ্যোতির্ময় দত্ত তাঁদের “কলকাতা” পত্রিকার জুন-জুলাই সংখ্যায় “একটি অসাক্ষাৎকার” নামের সাক্ষাৎকারে একটি প্রশ্নের উত্তরে শিল্পী কবি দেবব্রত বিশ্বাস জানান --- “রবীন্দ্রনাথ আমার গান শুনেছিলেন।” কবে, কোথায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়েছিলেন, তা আর উল্লেখ করেন নি। এই পুরো সাক্ষাৎকারটি আমরা পাই কবির আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত” ১৪৫-পৃষ্ঠা থেকে।
.
পূর্ববঙ্গে শৈশবের ম্লেচ্ছ জীবন - ^^ উপরে ফেরত
কবির শৈশব ও বাল্যকাল কাটে কিশোরগঞ্জ শহরে। তাঁরা ব্রাহ্ম বলে সেখানকার স্কুলে তাঁকে ম্লেচ্ছ বলে ডাকা হতো। এমন কি ক্লাসে, তিনি যে বেঞ্চে বসতেন সেই বেঞ্চে কোনো হিন্দু ছেলে বসতো না। তখন তাঁর বন্ধুদের মধ্যে ছিলো মুসলমান ও খ্রীষ্টান ছেলেরা। ৭ম-৮ম শ্রেণীতে ওঠার পরে তাঁর সাথে কয়েরজন হিন্দু সহপাঠী ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হয়। তাঁদের বাড়িতে সঙ্গীতের চল ছিল। তাঁদের সাথে মিশতে গিয়ে, নিজেকে কখনই ম্লেচ্ছ মনে হয় নি। অনেক হিন্দু তাঁকে ভালবাসতেন, স্নেহ করতেন কিন্তু তা সত্বেও অনেকের বাড়িতেই তাঁর যাতায়াত ছিল, “বাইর-বাড়ি-ঘর” অর্থাৎ “বাইরের বৈঠকখানা” বা “বসবার ঘর” পর্যন্ত।
ছোটবেলায়, খেলার মাঠে তাঁরা ফুটবল খেলতেন, ফুটবলের অভাবে জাম্বুরা বা বড় বাতাবীলেবু দিয়ে। বড় হয়েও সবার সাথে মিলে খেলাধুলা করেছেন। খেলার সময় কেউ তাঁকে ম্লেচ্ছ বলে ঘৃণা করতো না। তাঁরও সেই সময়টা নিজেকে ম্লেচ্ছ মনে হতো না।
.
শিল্পীর গান শেখা - ^^ উপরে ফেরত
শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস কারও কাছে প্রথাগত সঙ্গীতশিক্ষা লাভ করেন নি। ছোটবেলা থেকেই গান শুনে শুনেই তুলে ফেলতেন। বাইরে মাঝি-মাল্লাদের গান, মুসলমান রাখাল ছেলেদের গান, ভিখারীদের গান। মা সারাদিন সংসারের ফাঁকে ফাঁকে গুন্ গুন্ করে গান গাইতেন। তিনি নাকি আগে ব্রহ্মসমাজের মন্দিরে অনেক গান করতেন। বাড়িতে একটি ছোট হারমোনিয়াম ছিল। রোজ সন্ধ্যায় তাঁর মা, অবলা দেবী, হারমোনিয়াম বাজিয়ে ব্রহ্মসঙ্গীত গাইতেন। ভাই বোনেরা তা শুনে শুনেই তুলে ফেলতেন। তাঁরাও রোজ মায়ের সঙ্গে সন্ধ্যায় গান গাইতেন। পরে বাবা একটি অরগান কিনে দিয়েছিলেন। সেই অরগান আসার পর তাঁদের গানের উৎসাহ বেড়ে গিয়েছিল। ব্রহ্মসঙ্গীত ছাড়া অন্যান্য গানও, বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে তখনকার দিনের রেকর্ডের গান বা কলের গান, প্রেমের গান, সবই বাইরে বন্ধুদের বাড়িতে বা গ্রামাফোন রেকর্ডের দোকানে শুনে শুনেই শিখেছিলেন।
১৯২৮ থেকে কয়েক বছরের মধ্যে কলকাতার বিভিন্ন ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে মাঘোৎসবে ও ভাদ্রোৎসবে তিনি ব্রাহ্ম সমাজের গাইয়েদের দলে নিজের আসন পাকা করে নিয়েছিলেন।
.
বাম পন্থা ও দেবব্রত বিশ্বাসের গণসঙ্গীত - ^^ উপরে ফেরত
১৯৩৮ থেকেই, যখন ব্রিটিশরা পরাধীন ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনী করে রেখেছিল, তিনি বাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তখনকার ইয়ুথ কালচারাল ইনস্টিটিউট, ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি স্বদেশী গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গানগুলি গাইতেন।
১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরকম সময় দেবব্রতর সঙ্গে গণসঙ্গীতকার হেমাঙ্গ বিশ্বাসের (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) আলাপ হয়। তিনি তাঁকে বলেছিলেন, “জর্জদা, রবীন্দ্রসঙ্গীত যেভাবে আপনি গাইলেন সেইভাবে যে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া যায় তা আগে ভাবতেও পারিনি”। ওই সময়েই তাঁর সঙ্গে জ্যেতিরিন্দ্র মৈত্ররও (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) আলাপ হয়। ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের সময় জ্যেতিরিন্দ্র মৈত্রর তাঁর নবজীবনের গান রচনা করা শুরু করে দেবব্রতকে দেখাতেন, যিনি সেই গানের অনেকগুলিতে সুরারোপ করেন। সেই নবজীবনের গান বহু অনুষ্ঠানেও তিনি গাইতেন।
১৯৪৩ সালে বামপন্থী সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে তিনি বম্বেতে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির অধিবেশনে গিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালেই বম্বেতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় গণনাট্য সঙ্ঘ বা IPTA বা Indian People's Theatre Association । যুক্ত ছিলেন ঋত্বিক ঘটক (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...), বিজন ভট্টাচার্য (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...), উৎপল দত্ত (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) , সলিল চৌধুরী (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...), পৃথ্বীরাজ কাপুর, খাজা আহমেদ আব্বাস প্রমুখরা। বিজন ভট্টাচার্যর নবান্ন নাটক বিপুল সারা জাগিয়েছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেবব্রত গাইতেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় বা হারীনদার হিন্দী গানও। গাইতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) প্রমুখরা।
সলিল চৌধুরীর সুরে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) “অবাক পৃথিবী” ও “বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে” গান দুটিও IPTA ও নানা বামপন্থী সভায় সবাই মিলে গাইতেন।
এই সময়ে তিনি পঙ্কজ মল্লিকের কাছ থেকেও গান তুলেছিলেন যা তিনি IPTA র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতেন।
শম্ভু মিত্র (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) ও তৃপ্তি মিত্রের সাথে তাঁর খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। ১৯৪৮ সাল নাগাদ তিনি শম্ভু মিত্রর বহুরূপী নাট্য গোষ্ঠির “রক্তকরবী” নাটক ও তুলসী লাহিড়ীর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) “ছেঁড়া তার” নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন।
এরকম দিনগুলিতেই, ১৯৪৪ সালে, তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন তাঁর “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত” গ্রন্থের ৭১-পৃষ্ঠায়, “বাঁয়ের রাস্তা” অধ্যায়ে যা আমাদের মতে, তাঁর পরবর্তী রবীন্দ্রসঙ্গীত জীবনে কি হতে চলেছে, তার একটি ঝলক হয়ে দেখা দিয়েছিল। আমরা তা এখানে উল্লেখ করছি শিল্পীর নিজের কথায়...
“আমার সিটি কলেজের দিনগুলিতে আমার একজন সহপাঠী সুধীন দত্তের কথা উল্লেখ করেছিলাম। এবার তার সম্বন্ধে একটি গল্প লিখতে হচ্ছে। সুধীন তার কয়েকজন, চেনা-পরিচিত বন্ধুদের নিয়ে ঠিক করল কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের তাসের দেশ নাটকটি মঞ্চস্থ করবে। ব্যাপারটি হয়েছিল ১৯৪৪ সনে। নয় রাত্রি ধরে কলকাতার তিনটি প্রেক্ষাগৃহে মঞ্চস্থ করা হবে। সুধীন আমায় রাজপুত্রের গানগুলি গেয়ে দেবার জন্য পাকড়াও করল --- রাজীও হয়ে গেলাম। সব ব্যবস্থা পাকাপাকি হয়ে গেল --- রিহার্সালও বিজয় সিং নাহারের বাড়িতে কুমার সিং হলে শুরু হয়ে গেল।
তাসের দেশের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন :
রাজাসাহেব --- সরোজরঞ্জন চৌধুরী
রাণীবিবি --- উত্তরাদেবী
সওদাগর পুত্র --- সুজন ঠাকুর
ছক্কা --- শ্যাম লাহা
পঞ্জা --- সাগরময় ঘোষ
তিরি --- রঞ্জিত রায়
দুরি --- সুজিত ঠাকুর
সম্পাদক --- ইন্দুভূষণ রায়
দহলা পণ্ডিত --- প্রশান্ত রায়
রুহিতন --- সুধীন্দ্র দত্ত
হরতনী --- সংযুক্তা সেন
টেক্কাকুমারীগণ --- সরস্বতী শাস্ত্রী, রাণী রায়, গীতা রায়, বাণী বোস, মঞ্জুলা দত্ত, মঞ্জু সেন, বিভা নাহার
নৃত্য পরিচালক --- কেলু নায়ার
গানে --- রাজেশ্বরী দত্ত, উমা চ্যাটার্জি, সন্তোষ সেনগুপ্ত, আব্দুল আহাদ, সুধীন চ্যাটার্জি, কল্যাণ চ্যাটাজি, আব্দুল লতিফ
সঙ্গীত পরিচালনা --- শান্তিদেব ঘোষ।
গানের দলে আমিও ছিলাম এবং রাজপুত্রের গানগুলি আমাকে গাইতে হত। দু তিন রাত আভিনয় হয়ে যাবার পর পরিচালক মহাশয় নাটকের শেষ গানটি আমায় গাইতে নির্দেশ দিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “গানটি with pleasure গাইব) না with out pleasure গাইব ?” তিনি with pleasure গাইবার নির্দেশ দিলেন। নাটকের শেষ গানটি ছিল “ভাঙো, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও ভাঙো।” তখনকার দিনে গানটি কারা গাইতেন আমার একদম মনে নেই ; কিন্তু গানটি গাওয়া হত খুব পেলব ভঙ্গীতে। সেদিন আমি আমাদের গণনাট্য সঙ্ঘের অনুষ্ঠানগুলিতে যেভাবে গানটি গাইতাম ঠিক সেই ভঙ্গীতে দ্রুতলয়ে গাইতে আরম্ভ করলাম। দেখতে পেলাম দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্যশিল্পী কেলু নায়ার প্রাণের আনন্দে স্টেজের ধুলো উড়িয়ে নেচে নেচে বেড়াচ্ছেন কিন্তু অন্যরা ঠিক সুবিধে করতে পারছেন না। গান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই যবনিকা পতন। তারপরেই ভর্ৎসনার সুরে আমার কাছে কৈফিরত চাওয়া হল ওইভাবে আমি গানটি গাইলাম কেন। আমি বলেছিলাম আমায় with pleasure গাইতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলেই ওইভাবে গেয়েছি। বলা বাহুল্য ওই গান পরে আর আমায় গাইতে হয়নি।”
.
শিল্পীর বিদেশ সফর - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৫ সালে ভারত সরকারের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তিনিও চীনে গিয়েছিলেন।
১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসে রেঙ্গুনে গিয়েছিলেন, ব্রহ্মদেশীয় বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনে গান গাইতে আমন্ত্রিত হয়ে।
১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের ঢাকার ছাত্র সমাজের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন গান গাইতে।
.
দেবব্রত বিশ্বাসের প্রথম গানের রেকর্ড - ^^ উপরে ফেরত
১৯৩৫ সালের পর কোনো সময়ে তাঁর সহপাঠী সন্তোষ সেনগুপ্ত তাঁকে সেনোলা রেকর্ড কোম্পানীতে নিয়ে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেন। কাজী নজরুল তাঁর গান শুনে তাঁকে দিয়ে দুটি গান শিখিয়ে সেখানে রেকর্ড করান। তার মধ্যে একটি গান ছিল "মোর ভুলিবার সাধনায় কেন সাধো বাদ"। কোনো অজ্ঞাত কারণবশতঃ গান দুটির রেকর্ড প্রকাশিত হয়নি।
তাঁর অতি নিকটজনের মধ্যে বহু গাইয়ে শিল্পী ছিলেন। যাঁদের মধ্যে তাঁর টুলু মাসী অর্থাৎ সুপ্রভা রায় ও বুঁচি মাসী, যিনি পরে তাঁর জ্যাঠতুতো বৌদী হন, কনক দাস, পরে কনক বিশ্বাস, ছিলেন সাহানা দেবীর (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) মতোই রবীন্দ্র নাথের বিশেষ স্নেহের পাত্রী।
ত্রিশের দশকের শেষ দিকে অথবা চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে কনক দাসের সঙ্গে H.M.V. থেকে দুটি গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর প্রথম রেকর্ড। গান দুটি ছিল “সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান” (গানটি শুনতে এখানে ক্লিক্ করুন...) ও “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব” (গানটি শুনতে এখানে ক্লিক্ করুন...)।
.
বয়সকালে রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে হরিজন - ^^ উপরে ফেরত
তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া নিয়ে ঘোর বিবাদের সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় তাঁর পুরো গায়ক জীবন ধরেই। সম্ভবত তিনি যেহেতু রবীন্দ্রসঙ্গীত সহ কোনো গানই প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষার মধ্য দিয়ে শেখেন নি, এবং তিনি বাম আন্দোলনের অনুষ্ঠানাদিতে গণসঙ্গীত গাইতেন যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়কিও ছিল সেই রকম। যা শুনে সাধারণ মানুষের খুব ভাল লেগে যেত এবং তিনি অন্যতম জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়ক হয়ে উঠে এসেছিলেন।
সে কালের কিছু নামকরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী এতে হয়তো কিছুটা বিব্রত এবং ঈর্ষান্বিত বোধ করতেন। জনসাধারণ ও রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমীদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা ছিল যে এরকম কিছু মানুষের কলকাঠি নাড়ানোর জন্যই বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ড, নানা কারণ দেখিয়ে, তাঁর বহু গান রেকর্ড করার পরে অনুমতি দেন নি প্রকাশ করার।
বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডের কিছু ক্ষমতাবান কর্মকর্তা, তাঁর জীবন অতীষ্ঠ করে রেখেছিলো তাদের স্বেচ্ছাচারী কাজের মধ্য দিয়ে। কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড যাতে শ্রোতাদের কাছে না পৌঁছয়, তার জন্য তারা সবকিছু করতে তৈরী থাকতেন। তাদের অবিমৃষ্যকারিতা এবং হঠকারিতার জন্য বাংলার রবীন্দ্রসঙ্গীতপ্রেমী মানুষ তাঁর বহু রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন।
তাঁর “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত” গ্রন্থে বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ড থেকে পাওয়া বহু চিঠি ও তাঁর দেওয়া সে সব চিঠির উত্তর দেওয়া রয়েছে, যাতে তিনি জানিয়েছেন যে তিনি কেন তা ওইভাবে গেয়েছিলেন যাতে কোনো ভুল ছিল না। তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সে কালের কিছু নামকরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীর প্ররোচনায় তাঁর বিরুদ্ধে মিউজিক বোর্ডের সঞ্চালকরা এই কাজ করতেন, এবং কখনও কখনও তারা বন্ধুবর্গের কাছে তা গর্ব করে বলতেনও।
অথচ বহু বিখ্যাত, রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে আসা মানুষ তাঁর গান শুনে মুগ্ধ ছিলেন। প্রমথনাথ বিশী (মিলনসাগরে তাঁর কবিতার পাতায় যেতে...) একবার তাঁর ঘরে এসে একটি ক্যাসেট দিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর জন্য কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করে দেবার জন্য! সেই গান শুনে প্রথমবাবু দিল্লী থেকে চিঠিতে লিখেছিলেন -- “দিল্লীর যে মানসিক মরুভূমির মধ্যে আমায় সময় সময় থাকতে হয়, সোখানে ফিতেয় তোলা আপনার কণ্ঠে গীত একগুচ্ছ গান আছে --- সেগুলো এই মরুভূমির মরুদ্যান। হাজারবার শুনেও তৃপ্তি হয় না।”
একের পর এক এরকম ধাক্কা থেকে খেতে শেষে ১৯৬৯ সালে শিল্পী নিজেই ঠিক করেন যে তিনি আর রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করবেন না। কিন্তু ১৯৭০ সালে হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানির চণ্ডীচরণ সাহা আবার তাঁকে ধরলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করার জন্য।
তিনি চণ্ডীবাবুকে বুঝিয়ে বলেছিলেন যে বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ড তাঁর রেকর্ড অনুমোদন করছেন না। তিনি গান রেকর্ডিং এর সময়ে অনেক বাদ্যযন্ত্রীর সাহায্য নেন। রেকর্ড কোম্পানির তাতে অনেক খরচা হয়। কিন্তু যদি তা মিউজিক বোর্ডের অনুমোদন না পায় তাহলে তাদের অনেক ক্ষতি হয়। তাতে তিনি অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করেন। তবুও চণ্ডীবাবু অনেক করে বলার পরে তিনি ১৯৭০ এর শেষ বা ১৯৭১ এর শুরুতে অনেকগুলি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করান। তার মধ্যেও অনেকগুলি বিশ্বভারতীর অনুমোদন পায়নি।
এরপর তিনি আর কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করান নি।
১৯৭৬ সালের অক্টোবরে শিলং এর একটি ব্রাহ্ম কনফারেন্সে তাঁকেও আমন্ত্রণ করা হয়েছিল। সেখানে তখনকার বিশ্বভারতীর মিউজিক বোর্ডের এক পদস্থ কর্মচারী পূর্নেন্দু গাঙ্গুলীকে তিনি বলেছিলেন ---
“আমার জন্ম হয়েছিল ওই ব্রাহ্মসমাজেই ; সেই সূত্রে রবীন্দ্রসংগীত আমার বড় ভাই। সেই বড় ভাইএর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল আমার মায়ের কোলে বসে। এতো দীর্ঘকাল পরে আবার কি আমার বড় ভাইএর সঙ্গে পরিচিত হতে হবে কয়েকজন গায়কগায়িকার মারফত, যাঁরা আমার চাইতে বয়সে অনেক ছোট এবং যাদের ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই নেই? এ ব্যাপারটিকে কি আমার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব?”
.
কলকাতার ছিচল্লিশের দাঙ্গা - ^^ উপরে ফেরত
আমরা কবির আত্মজীবনী “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত” গ্রন্থের ৬৫-পৃষ্ঠা থেকে ১৯৪৬ সালের কলকাতার হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা সম্বন্ধে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা, তাঁরই নিজের ভাষায় এখানে তুলে দিচ্ছি...
“এইভাবেই দিনগুলি বেশ কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ ১৯৪৬ সনের আগস্ট মাসে কলকাতায় শুরু হয়ে গেল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা। কত নিরীহ লোক যে তখন প্রাণ হারাল তার কোনো হিসেব নেই। সেই সময়ে কয়েক মাসের জন্য শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি আমার বাড়িতে আমার পাশের ঘরেই থাকত। আমাদের অফিসের একজন বিশেষ পরিচিত বীরেন দে ও তার পরিবারের সবাইকে বিপন্ন অঞ্চল থেকে এনে আমার বাড়িতে কয়েক দিনের জন্য রেখে দিলাম। আমার মা ও ছোট বোনও দোতলায় একটি ঘরে থাকতেন। দাঙ্গা যখন পুরোদমে চলছিল, হঠাৎ আমাদের গণনাট্য সঙ্ঘের একজন গায়ক --- কলিম শরাফী (মুসলমান) কলকাতার বাইরের কোনো অঞ্চল থেকে আমার বাড়িতে এসে হাজির হল। সে জানতই না যে কলকাতায় নারকীয় কাণ্ড চলছে। কলিমকে আমার ঘরেই লুকিয়ে রাখলাম। কয়েকদিন পর শহরের অবস্থার একটু উন্নতি হলে, করিম শরাফীকে একটি গান্ধী টুপী মাথায় পরিয়ে বাসে করে নিয়ে ডেকার্স লেনে কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে কাকাবাবুর অর্থাৎ কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের হাতে সঁপে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।”
.
সাতচল্লিশের স্বাধীনতা ও হিন্দুস্থান-পাকিস্তান - ^^ উপরে ফেরত
১৯৪৭ সালের ১৫ই অগাস্ট, দেশ ভাগ হয়ে হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছিল। ১৪ তারিখের সন্ধ্যা থেকেই তিনি দেখেছিলেন রাস্তায়, হাটে, মাঠে হিন্দু মুসলমানের কোলাকুলি।
কিন্তু স্বাধীনতার সাথে দেশভাগ, এই শিল্পী-কবি কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি। যে পূর্ববঙ্গে তাঁর জন্ম হয়েছিল, যে পূর্ববঙ্গে তাঁর শৈশব থেকে বড় হওয়া, যে পূর্ববঙ্গে তাঁর নিজের ঘরবাড়ি আত্মীয়স্বজন রয়েছে, সেই পূর্ববঙ্গ এখন আর তাঁর দেশ নয়, বিদেশ, এই ভাবনায় তাঁর মন ভেঙে পড়েছিল। এমন স্বাধীনতা তাঁর কাছে অর্থহীন মনে হয়েছিল, আরও কোটি কোটি মানুষর মতো। আর সে জন্যেই তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির “Support Nehru Govt” কাজটি, নিতান্তই অযৌক্তিক মনে হয়েছিল, যা তিনি তাঁর দল কে জানিয়ে দিয়েছিলেন।
.
বিশ্বভারতী ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের কপিরাইট - ^^ উপরে ফেরত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনার ওপর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কপিরাইট বা স্বত্ব আসলে শেষ হবার কথা ছিল ৩১.১২.১৯৯১ তারিখে, কবির মৃত্যুর ৫০ বছর পর। কিন্তু বিশ্বভারতীর চাপের কছে মাথা নত করে ভারত সরকার কপিরাইট আইনে স্বত্বের মেয়াদ মৃত্যুর পর ৫০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৬০ বছর করে দেয়। ফলে বিশ্বভারতীর কপিরাইট ২০০১ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়।
এই কপিরাইটের বলেই শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের গান নিয়ে রেকর্ড বার করতে বাধা দিয়ে আসছিলেন বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের কয়েকজন, কিছু বিশিষ্ট মানুষের প্রভাবে, নানা কারণ দেখিয়ে, যা আমরা, সাধারণ মানুষরা কখনও মেনে নেই নি। বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের এই বিচিত্র কাজের ফলে দেবব্রত বিশ্বাস রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড প্রকাশিত করতে পারেন নি বা প্রতিবাদ জানিয়ে রেকর্ড করেন নি জীবনের একটা বড় সময় ধরে। এর ফলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আর রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রেমীদের।
.
একটি প্রতিবাদী ভাস্কর্য - ^^ উপরে ফেরত
২০০২ সালে, শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের মৃত্যুর প্রায় ২২ বছর পর, ৩১.১২.২০০১ তারিখে বিশ্বভারতী কপিরাইট শেষ হবার পরে, শিল্পী মিলন সেনগুপ্ত, “রবির মুক্তি” নামের একটি প্রতিবাদী ভাস্কর্য তৈরী করেন যার ছবি এখানে দেওয়া হলো। ছবির উপরে ক্লিক্ করলে ছবিটি বড় করে ফুটে উঠবে।
.
কবি দেবব্রত বিশ্বাসের রচনা ও কবিতা - ^^ উপরে ফেরত
১৯৫৫ সালে ভারতীয় শান্তি কমিটির উদ্যোগে, সরকারের একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে তিনিও চীনে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে চীনে তাঁর অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে তাঁর কয়েকটি লেখা তখনকার স্বাধীনতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই লেখাগুলি একত্র করে ১৯৭৮ সালে অন্তরঙ্গ চীন নামে বই আকারে প্রকাশিত করেন। এছাড়া রয়েছে ১৯৭৮ সালে রচিত তাঁর আত্মজীবনীমূলক প্রতিবাদী গ্রন্থ “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত”।
তাঁর কবিতা মূলত গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ কে উৎসর্গ করা দুটি কবিপ্রণাম। এবং ১৯৮০ সালে রচিত গান “ক্যারে হেরা আমারে গাইতায় দিল না”।
তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত আর রেকর্ড করবেন না বলে স্থির করেন ১৯৭২ সালে। ১৯৭২ সালেই, “গুরুবন্দনা” নামে, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত দুটি গান রচনা করে সুর দিয়ে হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানীতে রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁরা গানদুটি প্রকাশ করেন নি, কোনো অজ্ঞাত কারণবশতঃ। এই ঘটনার পেছনে কোনো গোপন হাত কাজ করেছিল কি না তা তিনি জানতে পারেন নি বলে তাঁর আত্মজীবনী “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত”-এ (১১২-পৃষ্ঠায়) লিখে গিয়েছেন।
আমরা মিলনসাগরে তাঁর সেই দুটি কবিতা ও গান এখানে তুলে আগামী দিনের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারলে নিজেদের ধন্য মনে করবো।
বাঙালীদের বহু বদনাম আছে। তাঁরা অলস, তাঁরা আড্ডাবাজ, ফাঁকিবাজ, আরও অনেক কিছু। কিন্তু বাঙালীর যে ভাল গুণগুলি আছে, তার মধ্যে একটা হলো কবিতা লেখা! প্রায় সব বাঙালীই জীবনে দু-এক লাইন কবিতা লেখেন বা লিখেছেন। মিলনসাগরে আমাদের চেষ্টা সেই কবিতার মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক বাঙালীদের মিলনসাগরের কবিদের সভায় ধরা। মিলনসাগরের বাংলা কবিতার কালানুক্রমিক সূচী আসলে বাঙালীর ইতিহাস হয়ে উঠছে, কবিদের জীবনীর মধ্য দিয়ে।
কবি দেবব্রত বিশ্বাস এর মূল পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন।
আমাদের ই-মেল : srimilansengupta@yahoo.co.in
হোয়াটসঅ্যাপ : +৯১ ৯৮৩০৬৮১০১৭
এই পাতা প্রথম প্রকাশ - ৩.৫.২০২৬
উৎস ---
- দেবব্রত বিশ্বাসের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত”, ১৯৭৮, করুণা প্রকাশনী।
- অলকরঞ্জন বসুচৌধুরী, “পলিটিকসের ধূলি চক্রে রবীন্দ্রনাথ”, দে'জ পাবলিশিং।
- সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু সম্পাদিত "সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান", ১ম ও ২য় খণ্ড, ২০১০।