কবি দামোদর - আমরা ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত পদাবলী সংকলন “বৈষ্ণব পদাবলী”-তে তিনটে দামোদর ভণিতার পদ পেয়েছি। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ইতিহাসে তিনজন দামোদরের উল্লেখ পাওয়া যায়।
স্বরূপ দামোদর - পাতার উপরে . . . তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণ করার পরের নাম। তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল পুরুষোত্তম আচার্য। তাঁর বাড়ী ছিল নবদ্বীপে। তিনি নাকি শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলা কালে, শ্রীরাধার অতি অন্তরঙ্গ সখী “বিশাখা” ছিলেন।
চৈতন্যচরিতামৃতের অন্ত্য খণ্ডে রয়েছে যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে গূঢ় ব্রজের রস প্রদান করেছিলেন, তা যে সাড়ে তিন জন ব্যক্তি আস্বাদন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার মধ্যে স্বরূপ-দামোদর অন্যতম পূর্ণ ব্যক্তি। বাকি আড়াই জন হলেন হলেন রায় রামানন্দ, শিখি মাহিতি ও অর্ধজন শিখি মাহিতির ভগ্নী মাধবী দাসী।
প্রভু লেখা করে যাঁরে রাধিকার গণ। জগতের মধ্যে পাত্র সাড়ে তিন জন॥ স্বরূপ-দামোদর, আর রায় রামানন্দ। শিখি মাহিতি তিন, তাঁর ভগ্নী অর্দ্ধজন॥ ---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্য খণ্ড, ২য় পরিচ্ছেদ॥
স্বরূপ দামোদর নিয়ে যুধিষ্ঠির জানার উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . যুধিষ্ঠির জানা (মালীবুড়ো) তাঁর “শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য” গ্রন্থের ১৪-পৃষ্ঠায় স্বরূপ দামোদর সম্বন্ধে লিখেছেন . . . “কবিকর্ণপুরের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ পাঠে জানা যায়, পুরুষোত্তম আচার্য সন্ন্যাস গ্রহণ করে ‘রসরূপতা’ প্রাপ্ত হয়েছিলেন, তাই ‘স্বরূপ-দামোদর’ নামে খ্যাত হন। ‘রসরূপতা’র অর্থ হলো---কৃষ্ণপ্রেমে মাতোয়ারা হওয়া। . . . তিনি চৈতন্যদেব অপেক্ষা বয়সে জ্যেষ্ঠ ছিলেন। পুরীধামে মহাপ্রভুকে প্রতিনিয়ত রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। নৃত্যগীতে তাঁর অসাধারণ পারদর্শিতা ছিল। প্রথম জীবনে স্বরূপ দণ্ডী শাখাভুক্ত অদ্বৈতবাদী সন্ন্যাসী ছিলেন। পুরীধামে শ্রীচৈতন্যকে দেখে মুগ্ধ হন এবং মহাপ্রভুর সেবাব্রত গ্রহণ করেন। স্বরূপ শ্রীচৈতন্যের অন্ত্যপর্ব্বে একান্ত ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে এসেছিলেন। ফলে অভিনব প্রেমধর্মের নিগূঢ় তত্ত্বকথা তিনি যতখানি জানতেন, এত ভাল জানা আর কারো দ্বারা সম্ভব ছিল না।”
স্বরূপ দামোদর নিয়ে জগবন্ধু ভদ্র উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . জগবন্ধু ভদ্র তাঁর গৌরপদ-তরঙ্গিণীর পদকর্ত্তৃগণের পরিচয়ের ৬৪-পৃষ্ঠায় স্বরূপ দামোদর সম্বন্ধে লিখেছেন . . . “স্বরূপ নির্জ্জনে থাকেন, কাহারো সঙ্গে বড় কথাবার্ত্তা কহেন না। এ দিকে অগাধ পাণ্ডিত্য, কৃষ্ণরসতত্ত্ব-বেত্তা, দেহ প্রেমরূপ, ---এক কথায় ‘সাক্ষাৎ মহাপ্রভুর দ্বিতীয় স্বরূপ’। কেহ কোন গ্রন্থ, শ্লোক, গীত ইত্যাদি প্রভুকে শুনাইতে ইচ্ছা করিলে, তাহা স্বরূপের নিকট পরীক্ষার জন্য উপস্থাপিত করিতে হইত। তিনি দেখিতেন যে, ইহা ভক্তিসিদ্ধান্ত-বিরুদ্ধ কিংবা রসাভাস কি না। যদি সেরূপ কোন দোষ না থাকিত, তথন ইহা মহাপ্রভুকে শুনান হইত।”
১৮৮৯ সালে জগদীশ্বর গুপ্তের সরল টীকা ও ব্যাখ্যা সহ সম্পাদিত, ১৬১৫ সালে কৃষ্ণদাস কবিরাজ বিরচিত চৈতন্যচরিতামৃতের মধ্যলীলা, ১০ম পরিচ্ছেদ, ২৩৪-পৃষ্ঠায় স্বরূপ দামোদরের পরিচয় এবং তাঁর নীলাচলে এসে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে মিলনের বর্ণনা এভাবে রয়েছে . . .
আর দিনে আইলা স্বরূপ দামোদর ; প্রভুর অত্যন্ত মর্ম্ম রসের সাগর। পুরুষোত্তম আচার্য তাঁর নাম পূর্ব্বাশ্রমে ; নবদ্বীপে ছিলা তিঁহ প্রভুর চরণে। প্রভুর সন্ন্যাস দেখি উন্মত্ত হইয়া ; সন্ন্যাস গ্রহণ কৈল বারাণসী গিয়া। চৈতন্যানন্দ গুকু তাঁর আজ্ঞা দিলেন তাঁরে ; ‘বেদান্ত পড়িয়া পড়াও সমস্ত লোকেরে’। পরম বিরক্ত তিঁহ পরম পণ্ডিত ; কায়মনে আশ্রিয়াছে শ্রীকৃষ্ণ চরিত। নিশ্চিন্তে কৃষ্ণ ভজিব এই ত কারণে ; উন্মাদে করিল তিঁহ সন্ন্যাস গ্রহণে। সন্ন্যাস করিলা শিখাসূত্র ত্যাগ রূপ ; যোগপট্ট না লইল, নাম হইল স্বরূপ। গুরু ঠাঁঞি আক্ষা মাগি আইলা নীলাচলে ; রাত্রি দিনে কৃষ্ণ প্রেম আনন্দ বিহ্বলে। পাণ্ডিত্যের অবধি ; বাক্য নাহি কার সনে ; নির্জ্জনে রহেন সব লোক নাহি জানে। কৃষ্ণ রস তত্ত্ব বেত্তা, দেহ প্রেমরূপ ; সাক্ষাৎ মহাপ্রভুর দ্বিতীয় স্বরূপ। গ্রন্থ, শ্লোক, গীত কেহ প্রভুপাশে আনে ; স্বরূপ পরীক্ষা কৈলে প্রভু পাছে শুনে। ভক্তিসিদ্ধান্ত বিরুদ্ধ আর রসাভাস ; শুনিলে না হয় প্রভুর চিত্তের উল্লাস। অতএব স্বরূপ গোঁসাই করে পরীক্ষণ ; শুদ্ধ হয় যদি, প্রভুরে করান শ্রবণ। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, শ্রীগীতগোবিন্দ ; এই তিন গীতে করায় প্রভুর আনন্দ। সঙ্গীতে গন্ধর্ব্ব সম, শাস্ত্রে বৃহস্পতি ; দামোদর সম কেহ নাহি মহামতি।
স্বরূপ দামোদরের কড়চা - পাতার উপরে . . . স্বরূপ দামোদরের লেখা গ্রন্থের নাম “স্বরূপ দামোদরের কড়চা”। এই গ্রন্থের উল্লেখ নানা গ্রন্থে থাকলেও আজ পর্যন্ত এই গ্রন্থ আবিষ্কৃত হয়নি। কড়চা শব্দের অর্থ সাধারণত পদ্যে লেখা ইতিবৃত্ত, দিনলিপি, জীবনী বা বৃত্তান্ত বা ডায়েরী। পরবর্তী কালে শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনীকাররা এই গ্রন্থকেই তাঁর শেষ জীবনের বিবরণের আকরগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। মহাপ্রভুর প্রথম জীবনের বর্ণনার আকড় গ্রন্থ হিসেবে তাঁরা মুরারি গুপ্তের কড়চাকেই ব্যবহার করেছেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর চৈতন্যচরিতামৃতে, কৃতজ্ঞচিত্তে সেই ঋণ স্বীকার করে গিয়েছেন, গ্রন্থের একাধিক স্থানে। তার মানে কৃষ্ণদাস কবিরাজ, সম্ভবত এই গ্রন্থ হাতে পেয়েছিলেন। তার পরে, মুরারীগুপ্তের কড়চা পাওয়া গেলেও স্বরূপ দামোদরের কড়চা গ্রন্থটি আর পাওয়া যায়নি।
আদি লীলা মধ্যে প্রভুর যতেক চরিত ; সূত্ররূপে মুরারী গুপ্ত করিলা গ্রথিত। প্রভুর মধ্য শেষ লীলা স্বরূপ দামোদর ; সূত্র ধরি গাঁথিলেন গ্রন্থের ভিতর। সেই দুইজনের সূত্র দেখিয়া শুনিয়া ; বর্ণনা করেন বৈষ্ণব ক্রম যে করিয়া। ---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, আদিলীলা, ১৩শ পরিচ্ছেদ, ৩১১-পৃষ্ঠা॥
যুধিষ্ঠির জানা (মালীবুড়ো) তাঁর “শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান রহস্য” গ্রন্থের ১৬-পৃষ্ঠায় লিখেছেন . . . “কলকাতা বটতলা থেকে সহজিয়া বৈষ্ণবপন্থার নিগূঢ় সাধনভজন সংক্রান্ত দু’একটি পুস্তক যা ছাপা হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘স্বরূপ-দামোদরের কড়চা’ নামে --- সেগুলি অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন রচনা। কেউ যদি সেগুলিকেই আসল বই বলে মনে করে, তা’ হলে নিঃসন্দেহে প্রতারিত হবেন।”
স্বরূপ গোঁসাঞি আর রঘুনাথ দাস ; এ দোঁহার কড়চাতে এ লীলা প্রকাশ। সে কালে এই দুই রহে মহাপ্রভু পাশে ; আর সব কড়চাকর্ত্তা রহে দূরদেশে। ক্ষণে ক্ষণে অনুভবি এই দুই জন ; সংক্ষেপ বাহুল্যে করে কড়চা গ্রন্থন। স্বরূপ সূত্রকর্ত্তা, রঘুনাথ বৃত্তিকার ; তার বাহুল্য বর্ণি পাঁজি টীকা ব্যবহার। ---কৃষ্ণদাস কবিরাজ, চৈতন্যচরিতামৃত, অন্ত্যলীলা, ১৪শ পরিচ্ছেদ, ২১৬-পৃষ্ঠা॥
স্বরূপ দামোদরের কড়চা গবেষণার বিষয় - পাতার উপরে . . . কৃষ্ণদাস কবিরাজ তাঁর বৃদ্ধ বয়সে, বৃন্দাবনে থেকে তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাই “স্বরূপ দামোদরের কড়চা” সেখানে থাকা আশ্চর্যের নয়। শ্রীজীব আদিদের আদেশে, শ্রীনিবাস আচার্য, নরোত্তম ঠাকুর ও শ্যামানন্দের (দুঃখী কৃষ্ণদাস) নেতৃত্বে, মল্লরাজ বীর হাম্বীরের রাজ্যের বনবিষ্ণুপুর দিয়ে বৃন্দাবন থেকে নদীয়ার পথে বিভিন্ন বৈষ্ণব গ্রন্থ নিয়ে যাওয়ার সময়ে বীর হাম্বীরের পোষ্য ডাকাতরা, সেই সব গ্রন্থের বাক্সকে ধনরত্নের বাক্স ভেবে চুরি বা লুঠ করে। বীর হাম্বীরের সভায় অভিযোগ জানানোর পরে বহু গ্রন্থ ফিরে পাওয়া গিয়েছিল। “স্বরূপ দামোদরের কড়চা” গ্রন্থটি এই ঘটনাতেই চুরি ও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল কি না তা গবেষণার বিষয়।
চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থ নিয়ে আরেকটি প্রচলিত কাহিনী আছে। ১৬১৫সালে, কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থটি, জগদীশ্বর গুপ্ত, সরল টীকা ও ব্যাখ্যা সহকারে সম্পাদিত ও প্রকাশিত করেন, ১৮৮৯ সালে। তিনি “গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী”-তে লিখেছেন যে বৃন্দাবনে, গ্রন্থ রচনা শেষ করার পরে বৃদ্ধ কৃষ্ণদাস কবিরাজ তা প্রকাশনার অনুমতি চাইতে তদানীন্তন বৃন্দাবনের সর্বোচ্চ গোস্বামী শ্রীজীবের কাছে গ্রন্থটি উপস্থাপন করেন। শ্রীজীব দেখলেন যে, গ্রন্থে বৈষ্ণব ধর্ম্মের গূঢ় রহস্য এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উপদেশ, বাংলাভাষায় লেখা হয়েছে, যা গৌড়ের সাধারণ মানুষের ভাষা। তিনি আশঙ্কা করলেন যে বইটি যদি প্রকাশিত করা হয় তাহলে সাধারণ মানুষের সহজবোদ্ধ হবে এবং শ্রীরূপ, সনাতন এবং তাঁর নিজের সংস্কৃত ভাষায় লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ হয়তো মানুষ আর সেভাবে পড়বে না। তাই তিনি সেই গ্রন্থটি যমুনায় ভাসিয়ে দিলেও তা পুনরায় মদনমোহনের ঘাটে ফিরে আসে। তখন তিনি তা আর জলে না ভাসিয়ে দিয়ে বৃন্দাবনের গ্রন্থশালায় বন্ধ করে রাখেন। প্রকাশিত করার অনুমতি দিলেন না। পরে পরমানন্দ সেন বা কবিকর্ণপুরের কথায় শ্রীজীব গোস্বামীই প্রকাশিত করার অনুমতি দেন কিন্তু বইটি বৃন্দাবনেই রেখে দেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের এক শিষ্য মুকুন্দ সেই গ্রন্থটি নকল করে রেখেছিলেন। সেই গ্রন্থটিই কৃষ্ণদাস পরে সংশোধন করে বাংলার মানুষের কাছে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন।
গবেষকগণ অনুসন্ধান করে দেখতে পারেন যে, এই ঘটনাবলির যদি কিছুটাও সত্য হয়ে থাকে তাহলে কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতের আকড়গ্রন্থ স্বরূপ দামোদরের কড়চারও একই অবস্থা হয়ে থাকতে পারে কি না!
দামোদর পণ্ডিত - পাতার উপরে . . . শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ ভক্ত ও পরিকর ছিলেন। তিনি শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে প্রথম দেখ করেন তাঁর সন্ন্যাসগ্রহণের পরে অদ্বৈতাচার্যের বাড়িতে। তিনি মহাপ্রভুর সঙ্গে এরপরে নীলাচলে গিয়েছিলেন। পরে শ্রীচৈতন্য তাঁকে নবদ্বীপে, তাঁর মাতা শচীদেবীর কাছে পাঠিয়ে দেন।
তিনি রথযাত্রাকালে শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে থাকতেন। তিনি পুরীতে স্বরূপ দামোদরের কীর্তনের দলে একজন কীর্তনিয়া ছিলেন। তিনি নানা সময়ে শ্রীচৈতন্যকে শাসন করে বকাঝকাও করতেন।
তিনি নাকি শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলা কালে, “শৈব্য” নামের বদমেজাজী এক গোপী ছিলেন।
প্রাপ্ত “দামোদর” ভণিতার পদাবলী কোন দামোদরের? - পাতার উপরে . . . আমরা যে তিনটি পদ সংগ্রহ করেছি তার ভণিতা “দামোদর”। এই দামোদর, স্বরূপ দামোদর না কি দামোদর পণ্ডিত সে কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। বৈষ্ণব পদাবলীর সংকল ও সম্পাদক হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় এ বিষয়ে কোনো নির্দেশ দিয়ে যাননি। দুই জনই কীর্ত্তনিয়া ছিলেন। তবে স্বরূপ দামোদর, তাঁর কড়চা রচনা করেছিলেন বলে তাঁর দ্বারা এই পদ রচনা অস্বাভাবিক নয় বলে আমরা মনে করছি। তবে বহু কীর্তনিয়া পদকর্তাও ছিলেন। তাই দামোদর পণ্ডিতও এই পদের রচয়িতা হতে পারেন।
অপর দিকে উপরোক্ত গোবিন্দদাস কবিরাজের মাতামহ দামোদর সেনও পণ্ডিত ও কবি ছিলেন। তবে তিনি ছিলেন শাক্ত। প্রাপ্ত দামোদর ভণিতার সব পদই রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক। শাক্ত কবির পক্ষে বৈষ্ণব পদ রচনা, আশা করা যায় না। তবে পরিণত বয়সে, শ্রীচৈতন্যের ভাবধারায় প্রাণিত হয়ে বা বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ যদি করে থাকেন তাহলে এ পদ তাঁর দ্বারা লেখা সম্বভ হতেই পারে। গোবিন্দদাস কবিরাজের ক্ষেত্রে যা হয়েছিল।
বৈষ্ণব পদাবলী সম্বন্ধে আবদুল করিমের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . শিক্ষাবীদ, সাহিত্যিক, গবেষক ও প্রাচীন পুথির সংগ্রাহক, শ্রী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত “সাহিত্য” পত্রিকার পৌষ, ১৩২৫ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯১৮), তাঁর “সঙ্গীত শাস্ত্রের একখানি প্রাচীন গ্রন্থ” প্রবন্ধে লিখেছেন . . . “. . . বৈষ্ণব পদাবলীর মত সুন্দর জিনিস বঙ্গসাহিত্যে আর নাই। কাণের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া প্রাণ আকুল করিয়া তুলিতে পারে, এমন সুধাস্রাবী ঝঙ্কার বৈষ্ণব পদাবলী ভিন্ন বাঙ্গালায় আর কিছুতে নাই।”
দামোদর সেন নিয়ে সীতানন্দ ঠাকুরের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ২৫শে বৈশাখ ১৩৬২ বঙ্গাব্দে (৭-৯ মে ১৯৫৫) প্রকাশিত, নবদ্বীপ বকুলতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিত্যানিরঞ্জন কবিরাজ সম্পাদিত বিভিন্ন বিশিষ্টজনের লেখা প্রবন্ধ সংকলন “আমার জানা শ্রীখণ্ড” গ্রন্থে, সীতানন্দ ঠাকুরের “শ্রীখণ্ড গ্রামের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” প্রবন্ধে, ৭-পৃষ্ঠায় শ্রীখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত খ্যাতিমানদের মধ্যে পণ্ডিত ও কবি দামোদর সেনের উল্লেখ করেছেন। তিনি ছিলেন মহাকবি গোবিন্দদাস কবিরাজ ও তাঁর অগ্রজ রামচন্দ্র কবিরাজের মাতামহ। সেই সূত্রে তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও প্রভু নিত্যানন্দের সমকালীন।
দামোদর সেন সম্বন্ধে সীতানন্দ ঠাকুর তাঁর উপরোক্ত “শ্রীখণ্ড গ্রামের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” প্রবন্ধে লিখেছেন . . .
“দামোদর সেন - ধন্বন্তরী গোত্রীয় বৈদ্য। দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত ও সুকবি ছিলেন। তিনি ছিলেন শক্তি উপাসক, দশভুজা ছিল তাঁর পূজিত কুলদেবী। পাশে থাকত শালগ্রাম শিলা। তাঁর বাস ছিল বর্ত্তমান খণ্ডেশ্বরী তলার কাছাকাছি স্থানে। তাঁর সম্বন্ধে উক্তি আছে--- পাতালে বাসুকির্বক্তা স্বর্গে বক্তা বৃহস্পতিঃ। গৌড়ে গোবর্দ্ধনো দাতা খণ্ডে দামোদরঃ কবি॥ কোন এক দিগ্বিজয়ী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতকে তর্কযুদ্ধে পরাস্ত করায় সেই ব্রাহ্মণ তাঁকে ‘অপুত্রক হও’ বলে অভিসম্পাত করেন। দামোদরের বিনীত প্রার্থনায় প্রসন্ন হয়ে পুনরায় বর দেন যে তাঁর এমন কন্যা জন্মাবে যাঁর গর্ভে দুই মহাভাগ্যবান পুত্রের আবির্ভাব ঘটবে। পণ্ডিত রামচন্দ্র কবিরাজ ও সুপ্রসিদ্ধ পদকর্ত্তা গোবিন্দদাস হলেন সেই দুই ভাগ্যবান পুরুষ। . . .”
এর পরের অনুচ্ছেদে বা প্যারাগ্রাফে চিরঞ্জীব ও সুলোচন এর পরিচয়-তে লিখেছেন . . .
“. . . জাতি বৈদ্য। পূর্ব্বে বাড়ী ছিল গঙ্গাতীরস্থ কুমারনগরে। দামোদর সেনের একমাত্র কন্যা সুনন্দার সঙ্গে চিরঞ্জীবের বিয়ে হয়। দুজনেই নরহরির (নরহরি দাস) খুব অনুগত ও গৌরভক্ত ছিলেন। তাঁরা প্রতি বত্সর নরহরির সঙ্গে পুরী যেতেন। উভয়ই ছিলেন পরম বৈষ্ণব ও পণ্ডিত। পুত্রদ্বয় ছিলেন শ্রীনিবাসাচার্য্যের শিষ্য ও নরোত্তম ঠাকুরের মিত্র।”
ভক্তিরত্নাকরে দামোদর সেনের উল্লেখ - পাতার উপরে . . . অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে বিরচিত নরহরি চক্রবর্ত্তী ঘনশ্যামের “ভক্তিরত্নাকর” গ্রন্থের নবম তরঙ্গের ৫৭২- পৃষ্ঠায় গোবিন্দদাস কবিরাজের সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে তাঁর মাতামহ দামোদর সেন সম্বন্ধেও লিখেছেন। আমরা তা থেকে সংশ্লীষ্ট অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি।
সবে মহাসুখী গোবিন্দের সদগুণেতে। গোবিন্দ পাইলা সুখ সবার স্নেহেতে॥ ঐছে বিলসয়ে এক চিন্তামাত্র সবে। শ্রীআচার্য্য চরণ কিঙ্কর হব কবে॥ কবে শ্রীআচার্য্য প্রভু দীক্ষা মন্ত্র দিব। উদ্ধারিয়া অধমে আপন করি নিব॥ ঐছে খেদ গোবিন্দ করয়ে অনুক্ষণ। ইথে কহি গোবিন্দের পূর্ব্ব বিবরণ॥ কুমারনহরে বৈসে অতি শুদ্ধাচার। ভগবতী বিনা কিছু না জানয়ে আর॥ গীতপদ্যে করে ভগবতীর বর্ণন। শুনি হর্ষ শক্তি-উপাসক সঙ্গিগণ॥ ভগবতী প্রতি ঐছে হইল যেন মতে। তাহার কারণ এবে কহি সংক্ষেপেতে॥ শক্তি উপাসক মাতামহ দামোদর। ভগবতী যাঁর বশীভূত নিরন্তর॥ দামোদর কবিরাজ সর্ব্বত্র প্রচার। তার কন্যা সুনন্দা গোবিন্দ পুত্র যার॥