একাধিক কৃষ্ণদাস - পাতার উপরে . . . আমরা মিনলসাগরে যে দশ রকম “কৃষ্ণদাস” ভণিতার কবির পদ সংগ্রহ করতে পেয়েছি তা হলো “কৃষ্ণদাস”, “কৃষ্ণদাস কবিরাজ”, “দীন কৃষ্ণদাস”, “দীন দুখী কৃষ্ণদাস”, “দীন হীন কৃষ্ণদাস”, “দুখী কৃষ্ণদাস”, “কবি কৃষ্ণদাস”, “কবিকর্মী কৃষ্ণদাস”, “শ্রীকৃষ্ণদাস” এবং “কৃষ্ণদাসানুদাস”। এর সঙ্গে রয়েছে দুখী কৃষ্ণদাসের, রূপগোস্বামী দ্বারা নতুন নামকরণের পর রচিত “শ্যামানন্দ” ভণিতার পদাবলী।
কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ - শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভুর জীবনীর দ্বিতীয় প্রামাণিক গ্রন্থ শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের রচয়িতা। তাঁর সম্বন্ধে জগবন্ধু ভদ্র তাঁর গৌরপদতরঙ্গিণীতে লিখেছেন . . .
“ভক্ত-দিদ্দর্শনীর তালিকা অনুসারে কৃষ্ণদাস কবিরাজ ১৪১৮ শকে (৯০৩ বঙ্গাব্দ, ১৪৯৬ খৃষ্টাব্দ) জন্মগ্রহণ এবং ১৫০৪ শকের (৯৮৯ বঙ্গাব্দ, ১৫৮২ খৃষ্টাব্দ) চান্দ্র আশ্বিন শুক্লপক্ষের দ্বাদশী তিথিতে গোলকগত হন। ইনি অম্বুষ্ঠকুলসম্ভুত ; ইঁহার পিতার নাম ভগীরথ, মাতার নাম সুনন্দা, এবং নিবাস কন্টকনগর বা কাটোয়ার দুই ক্রোশ উত্তরে নৈহাটিগ্রামের সন্নিকট ঝামটপুর গ্রামে ছিল। কৃষ্ণদাস দারপরিগ্রহ করেন নাই। ইঁহার এক কনিষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন। ইঁহারা শৈশবেই পিতৃমাতৃহীন হন। . . .
. . . কৃষ্ণদাস বৃন্দাবনে যাইয়া রূপ সনাতন দাস ও ভট্ট রঘুনাত, গোপাল ভট্ট, লোকনাথ প্রভৃতির নিকট ভক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন এবং ক্রমে মহাপণ্ডিত হইলেন। তত্পরে গ্রন্থ-রচনা করিতে শুরু করিলেন। প্রথমে ‘গোবিন্দ-লীলামৃত’ নামক সংস্কৃত কাব্যগ্রন্থ ও ‘কৃষ্ণকর্ণামৃতের টীকা’ রচনা করেন, এবং শেষ বয়সে গোস্বামীদিগের অনুমতিক্রমে ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ১৫০৩ শকে (১৫৮১ খৃষ্টাব্দ) এই গ্রন্থ রচনা শেষ হয়।”
চৈতন্য চরিতামৃত রচনার কৈফিয়ৎ - পাতার উপরে . . . চৈতন্যচরিতামৃতের রচনা কেন করলেন, তাঁর কৈফিয়তে কৃষ্ণদাস কবিরাজ বলেছেন যে শ্রীচৈতন্যের লীলা বর্ণনা করতে করতে বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত গ্রন্থটির কলেবর অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। এবং এরই মধ্যে বৃন্দাবন দাস, প্রভু নিত্যানন্দের লীলা-কাহিনী লেখার আদেশ পেয়েছিলেন। ফলে শ্রীচৈতন্যের শেষ লীলা আর তাঁর পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব হয়নি। পণ্ডিত হরিদাস, শিবানন্দ চক্রবর্তী এবং বৃন্দাবনবাসী প্রধান প্রধান মহান্তগণের বিশেষ অনুরোধে তিনি চৈতন্যচরিতামৃত রচনা আরম্ভ করেছিলেন বৃদ্ধবয়সে। গ্রন্থটি শেষ করার একবছর পরই তিনি পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটিও আশ্চর্যজনক এবং উল্লেখনীয়।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের মৃত্যু ও বীর হাম্বীর - পাতার উপরে . . . কৃষ্ণদাস কবিরাজ শেষ বয়সে বৃন্দাবনের রাধাকুণ্ডে বসবাস করতেন। চৈতন্যচরিতামৃতের রচনা শেষ করার এক বছর পরে, শ্রীজীব ও ষট্ গোস্বামীদের রচিত বহু গ্রন্থ সহ কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত নিয়ে শ্রীনিবাস আচার্য, নরোত্তম ঠাকুর ও শ্যামানন্দ পুরী, গৌড় অভিমুখে যাত্রা করেন। পথে বনবিষ্ণুপুরের কাছে, সেখানকার মল্লরাজ বীর হাম্বীরের পোষ্য ডাকাতদল, সেই বাক্সে মূল্যবান দ্রব্য রয়েছে ভেবে, তা লুঠ করে। এই সংবাদ বৃন্দাবনে পৌঁছানোর পরে কৃষ্ণদাস কবিরাজ মর্মাহত হয়ে জলে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেন। তাঁকে উদ্ধার করেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি। মানুষ অনেকক্ষেত্রে প্রিয়জন বিয়োগে এই চরম পথ বেছে নেয়। কিন্তু কবি অকৃতদার হওয়ায় তাঁর আপনজন বলতে ছিল তাঁর গ্রন্থ চৈতন্যচরিতামৃত। তাঁর সমস্ত ভালবাসা ও পুত্রস্নেহের পাত্র ছিল তাঁর চৈতন্যচরিতামৃত।
এই বৈষ্ণবগ্রন্থের লুঠের ঘটনা প্রবাহের ফলে মল্লরাজ বীর হাম্বীর বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন এবং একজন বৈষ্ণব পদকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ( নিত্যানন্দ দাস, প্রেম-বিলাস, ত্রয়োদশ বিলাস, ৯৪-পৃষ্ঠা, যশোদালাল তালুকদার প্রকাশিত )
কৃষ্ণদাস কবিরাজের রচনাবলী - পাতার উপরে . . . কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজের অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে “চৌষট্টি দণ্ড নির্ণয়”, “প্রেমরত্নাবলী”, “বৈষ্ণবাষ্টক”, “রাগমালা” ও “রাগময়করণ” প্রভৃতি গ্রন্থ। এই গ্রন্থাবলী তাঁর রচিত বলে বলা হলেও এ সম্বন্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের ভণিতা - পাতার উপরে . . . তিনি "কৃষ্ণদাস" ভণিতায় পদ রচনা করে গিয়েছেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের পদ, তাঁর রচিত মহাকাব্য শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত থেকেই নেওয়া হয়েছে। বেশ কিছু পদে কোন ভণিতা না থাকলেও তা যে তাঁরই রচিত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই কারণ ঐ সব পদই তাঁর গ্রন্থ থেকেই নেওয়া হয়েছে।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত নিয়ে জগদীশ্বর গুপ্তের উদ্ধৃতি - পাতার উপরে . . . ১৬১৫সালে বিরচিত কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থটি, জগদীশ্বর গুপ্ত, সরল টীকা ও ব্যাখ্যা সহকারে সম্পাদিত ও প্রকাশিত করেন, ১৮৮৯ সালে। তিনি এই “গ্রন্থকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী”-তে লিখেছেন--
“রাধাকুণ্ডতীরে গ্রন্থ প্রণয়ণ পরিসমাপ্ত হইলে, ইহা প্রকাশ করিবার জন্য কৃষ্ণদাস অতিশয় ব্যগ্র হইয়া পড়িলেন। তত্কালের নিয়মানুসারে গ্রন্থ প্রকাশের পূর্ব্বে স্থানীয় প্রধান প্রধান মান্য ব্যক্তির অনুমতি লইতে হইত। তাঁহারা গ্রন্থ পাঠ করিয়া যদি প্রকাশ যোগ্য বিবেচনা করিতেন, তবে গ্রন্থ শেষে নিজ নিজ নাম সাক্ষর করিয়া দিতেন ; তখন সে গ্রন্থ সাধারণে লিখিয়া লইতে পারিত। তত্কালে জীব গোস্বামীই বৃন্দাবনস্থ বৈষ্ণব সমাজের অভিনেতা ছিলেন ; বৃদ্ধ কবিরাজ গ্রন্থখানি সঙ্গে লইয়া জীবের নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে ইহা পাঠ করিতে ও প্রকাশের অনুমতি দিতে অনুরোধ করিলেন। জীব গোস্বামী আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া দেখিলেন যে বৈষ্ণব ধর্ম্মের গূঢ় রহস্য ও চৈতন্যোপদেশ সকল বঙ্গভাষায় বিবৃত হইয়াছে ; তাহা অবলীলাক্রমে সাধারণের আয়ত্তাধীন হইবে, অথচ রূপ, সনাতন ও তাঁহার স্বরচিত সংস্কৃত গ্রন্থ সকল অপ্রচারিত থাকিবে ; কেহ আর সে সকলের আদর করিবে না। এই আশঙ্কা করিয়া জীব গোস্বামী কোপাবিষ্ট হইয়া যমুনার জলস্রোতে ঐ গ্রন্থ নিক্ষেপ করিলেন। বর্ণিত (কোন গ্রন্থে এই কথা বর্ণিত আছে, তা জগদীশ্বর গুপ্ত মহাশয় উল্লেখ করেন নি।) আছে যে গ্রন্থ ভাসিতে ভাসিতে মদন মোহনের ঘাটে আসিয়া লাগিয়াছিল ; তখন জীব গোঁসাই তাহা তুলিয়া আনিয়া গোস্বামীদিগের অপরাপর গ্রন্থের সামিল একটি কুঠরীর মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিলেন। কেহ কেহ বলেন যে সাধারণে গ্রন্থের আশ্চর্য্য মহিমা প্রতিপন্ন করিবার জন্য জীবগোস্বামী এই কৃত্রিমকোপ প্রদর্শন করিয়াছিলেন। যাহা হউক বৃদ্ধ বয়সের বহুযত্নের ধন গ্রন্থের এই দশা হইল দেখিয়া, কৃষ্ণদাস মর্ম্মাহত হইয়া শোকাকুল চিত্তে মথুরায় গমন করিলেন এবং আহার নিদ্রা প্রিত্যাগ পূর্ব্বক সর্ব্বদা এই খেদ করিতে লাগিলেন যে সাধারণে পড়িবে বলিয়া তিনি বহু যত্নে যে গ্রন্থ রচনা করিলেন তাহা প্রকাশিত হইল না ও শ্রীচৈতন্যের শেষ লীলাও অপ্রচারিত রহিয়া গেল।
এই সময়ে মুকুন্দ নামে কবিরাজের জনৈক শিষ্য তাঁহাকে জানাইলেন যে যখন চৈতন্যচরিতামৃত রচিত হইতেছিল ; তাহার এক এক পরিচ্ছেদ পরিসমাপ্ত হইলে, তিনি (মুকুন্দ) উহা চাহিয়া লইয়া এক এক প্রস্ত নকল করিয়া রাখিয়াছেন। এই রূপে সমস্ত গ্রন্থের প্রতি লিপি তাঁহার নিকটে রহিয়াছে। ইহা শ্রবণে বৃদ্ধ কবিরাজের আনন্দের সীমা থাকিল না। তিনি ঐ প্রতিলিপি খানি আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া সংশোধনান্তে তাহা গোপনে রাখিয়া দিলেন। ইত্যবসরে শিবানন্দ সেনের পুত্র কবিকর্ণপুর বঙ্গদেশ হইতে বৃন্দাবনে আসিয়া উপনীত হইলেন এবং কৃষ্ণদাসের বাচনিক গ্রন্থ বিবরণ আদ্যোপান্ত অবগত হইয়া জীবকে তাহা জানাইলেন ; এবং ঐ গ্রন্থের টীকা করিয়া তাহা প্রচার করিয়া দিবার জন্য অনুরোধ করিলেন। জীব গোস্বামী অগত্যা কবিকর্ণ পুরের অনুরোধ রক্ষা করিতে সম্মত হইয়া কুঠরী হইতে গ্রন্থ বাহির করত তাহাতে অনুমোদন স্বাক্ষর করিলেন এবং প্রতি পরিচ্ছেদের শেষে ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ পর্য্যন্ত লিখিত ছিল ; তিনি ‘কহে কৃষ্ণদাস’ ভণিতা বসাইয়া দিলেন।
তখন বৃন্দাবনবাসীগণ সকলে ঐ গ্রন্থ লিখিয়া সইলেন ; এবং ব্রজ ধামে উহা প্রচারিত হইয়া গেল। কিন্তু জীব গোস্বামী প্রভৃতি বৈষ্ণবগণ এগ্রন্থ বঙ্গদেশে পাঠাইতে কিছুতেই সম্মত না হওয়ায় কৃষ্ণদাস মুকুন্দ দ্বারা পূর্ব্বোল্লিখিত নকলটি নবদ্বীপে পাঠাইয়া দিলেন। তদবধি ক্রমে এ দেশেক সর্ব্বত্র প্রচারিত হইয়া পড়িল। কৃষ্ণদাসের স্বগস্ত লিখিত মূলগ্রন্থ অদ্যাবধি বৃন্দাবনে রাধাদামোদরের মন্দিরে দেবতার ন্যায় পূজিত হইয়া আসিতেছে ; তাহা এদেশে কখনও আসে নাই।”